৮২৭ কোটি টাকার দুর্নীতি করেও অভিযুক্তদের পদোন্নতি

0

জিসাফো ডেস্কঃ রাজধানীর মতিঝিলে নির্মিত হয়েছে ২৩ তলার স্থানে ৩০ তলার দিলকুশা কার পার্কিং। নির্মাণ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি হয়েছে ৮২৭ কোটি টাকার। এ ঘটনায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ১৫ কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করে সম্প্রতি তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশও করেছে তদন্ত কমিটি। কিন্তু অভিযুক্তদের শাস্তি দূরের কথা, উল্টো নয়জনকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে কয়েকজন করপোরেশন ছেড়ে চলে গেছেন। কয়েকজন অবসর নিয়েছেন। মন্ত্রণালয় বা উভয় সিটি করপোরেশন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আগ্রহী নয়। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ওপর বিষয়টি ছেড়ে দিতে চাইছে তারা।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র সাঈদ খোকন জানান, মন্ত্রণালয়ের প্রথম তদন্ত রিপোর্ট নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় পুনঃতদন্ত হয়। সেই রিপোর্ট এখনও পাননি তিনি। এ ছাড়া এ নিয়ে দুদকে মামলা আছে। যার সর্বশেষ অবস্থা জানা নেই তার। তবে প্রয়োজনে খোঁজ নেবেন বলে জানান তিনি।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএন-সিসি) মেয়র আনিসুল হক বলেন, ‘ওই ভবনের মালিক ডিএসসিসি। তারা সেটার তদারকি করবে। তবে ডিএনসিসির কেউ থাকলে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তবে তিনি জানান, এ-সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা তার কাছে এখনও পেঁৗছেনি।

২০০৩ সালের ৫ এপ্রিল সিদ্ধান্ত হয় ডিসিসি নিজস্ব অর্থায়ন ছাড়াও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বঙ্গভবনের উত্তরের প্রাচীর ঘেঁষে ৩৭ দিলকুশা প্লটে চার বিঘা জমির ওপর আধুনিক পার্কিং ও বহুতল বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করবে।

পরে এ সিদ্ধান্ত অমান্য করে ২৩ তলার পরিবর্তে ৩০ তলা ভবন নির্মাণ করা হয়। নাম দেওয়া হয় সানমুনস্টার টাওয়ার। ভবন নির্মাণে এ ছাড়াও নানা অনিয়ম ঘটে। ডিসিসির অসাধু কর্মকর্তারা ডেভেলপারের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে অতিরিক্ত তলা তৈরির সুযোগ করে দেন বলে অভিযোগ ওঠে। ফলে কেপিআইভুক্ত (গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা) বঙ্গভবনের ২০ গজের ব্যবধানে নির্মিত এ ভবন রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। বিষয়টি বঙ্গভবনের দৃষ্টিতে এলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সাবেক যুগ্ম সচিব (তদারকি ও মূল্যায়ন) আবুল কাসেমকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি করা হয়।

তদন্তে অভিযুক্ত ১৫ কর্মকর্তা :তদন্তে দেখা যায়, সিটি করপোরেশন থেকে ডেভেলপারকে প্রথম পাঁচটি তলার নির্মাণব্যয় দেওয়া হয়েছে। অথচ ডেভেলপার পাঁচটির পরিবর্তে তিনটি তলা করেছেন। অর্থাৎ ভিত্তি তৈরিসহ বেশিরভাগ খরচই করেছে ডিসিসি। অথচ মোট ভবনের মাত্র ৩০ শতাংশ ফ্লোর স্পেস দেওয়ার চুক্তি করেছে ডিসিসি। এ ছাড়াও তদন্ত কমিটি ২৩ থেকে ৩০ তলা নির্মাণ, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমতি না নেওয়াসহ ১৮টি অনিয়ম চিহ্নিত করে। এসব অনিয়ম-দুর্নীতির দায়ে ডিসিসির ১১ প্রকৌশলীসহ ১৫ জন কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করা হয়।

তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে কমিটি। অভিযুক্তরা হলেন_ তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নূরুল হক, প্রধান প্রকৌশলী আবদুল কাদির, সচিব মো. সামসুজ্জামান, প্রকল্প পরিচালক সেহাব উল্লাহ, নির্বাহী প্রকৌশলী নূরুল আমিন, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সৈয়দ কুদরত উল্লাহ, সহকারী প্রকৌশলী মফিজুর রহমান খান, সহকারী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ, আইন কর্মকর্তা এমএস করিম, সহকারী সচিব জুনায়েদ আমিন, নির্বাহী প্রকৌশলী মনসুর আহমেদ, উপসহকারী প্রকৌশলী আমিনুর রহমান চৌধুরী ও হারুন-অর রশীদ, নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ শহিদ উল্লাহ ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ফারুখ আজিজ। কিন্তু ওই তদন্ত প্রতিবেদনকে চ্যালেঞ্জ করে নূরুল আমিন ও সৈয়দ কুদরত উল্লাহ এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘ওইসব অনিয়মের সঙ্গে আমরা কোনোভাবেই যুক্ত নই।

নূরুল আমিন জানান, রুটিনওয়ার্ক হিসেবে তিনি কয়েকটি বিলে স্বাক্ষর করেছিলেন মাত্র। এছাড়া ওই ভবনের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। সৈয়দ কুদরত উল্লাহ জানান, ওই প্রতিবেদনের কোনো ভিত্তিই নেই। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার নাম ঢোকানো হতে পারে। আর ডেভেলপার তলা বাড়িয়ে নিলে তার কিছু করার নেই।

পুনঃতদন্তেও তারাই অভিযুক্ত :প্রতিবেদনকে ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ উল্লেখ করে পুনঃতদন্তের দাবি করায় গত জুন মাসে স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সিরাজুল ইসলামকে প্রধান করে আরেকটি তদন্ত কমিটি করা হয়। ওই কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী, কুদরত উল্লাহ প্রথম থেকেই জমি হস্তান্তর, অনুমতি ছাড়া ভবন নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ, ডিসিসির অর্থায়নে পাঁচটি ফ্লোর নির্মাণ, আর্থিক, প্রশাসনিক ও কারিগরি অনুমতি ও বিল পরিশোধের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ২৩ তলা পর্যন্ত ডেভেলপারের মাধ্যমে নির্মাণসহ দরপত্র আহ্বান, বিল পরিশোধ, চুক্তি অনুযায়ী ক্রয় পরিকল্পনা না করা, মূল ড্রয়িং অনুমোদনের আগেই কার্যাদেশ দেওয়া, দরপত্র এড়িয়ে যাওয়াসহ অনেক অনিয়ম তার দায়িত্বকালে হয়েছে। একইভাবে নুরুল আমিন প্রথম পর্যায়ের বিল পরিশোধ, আর্থিক, প্রশাসনিক ও কারিগরি অনুমোদনক্রমে পাঁচটি তলা নির্মাণে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাদের কারোরই ওই সময়ের অনিয়মের দায় বা সংশ্লিষ্টতা এড়ানোর সুযোগ নেই।

অভিযুক্তদের পদোন্নতি :প্রতিটি তলায় ৩২ হাজার বর্গফুট ধরে অতিরিক্ত সাতটি তলায় ২ লাখ ২৪ হাজার বর্গফুট স্পেস তৈরির সুযোগ দিয়েছিলেন অসাধু কর্মকর্তারা। প্রতি বর্গফুটের দাম ১০ হাজার টাকা দরে যার বাজারমূল্য ১ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। নির্মাণব্যয় বাদ দিলেও অন্তত ৫০০ কোটি টাকার আর্থিক সুবিধা দিয়েছিলেন অসাধু কর্মকর্তারা। বিনিময়ে তারা নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এমআর ট্রেডিংয়ের কাছ থেকে সুবিধা পেয়েছেন বলে তদন্তকারীদের অভিমত। অভিযুক্তদের মধ্যে আবদুল কাদির পদোন্নতি পেয়ে বর্তমানে মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে (এমআইএসটি) কর্মরত। সেহাব উল্লাহ ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে স্থায়ী হয়েছেন।

নূরুল আমিন ও কুদরত উল্লাহ বর্তমানে ডিএসসিসির ও ডিএনসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী। মো. সামসুজ্জামান উপসচিব থেকে যুগ্ম সচিব হয়েছেন। মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে তার কর্মস্থল অজ্ঞাত। মফিজুর রহমান খান ও আবুল কালাম আজাদ পদোন্নতি পেয়ে ডিএসসিসির নির্বাহী প্রকৌশলী। আবুল কালাম আজাদ উচ্চশিক্ষার জন্য বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায়। মনসুর আহমেদ নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পেয়ে ডিএনসিসিতে কর্মরত। অন্য দুটি প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে বর্তমানে তিনি সাময়িক বরখাস্ত। আমিনুর রহমান চৌধুরী ও হারুন-অর রশীদ পদোন্নতি পেয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী হয়ে ডিএসসিসিতে কর্মরত। এছাড়া নূরুল হক, শহিদ উল্লাহ অবসরে ও ফারুখ আজিজ স্বেচ্ছায় অবসর নিয়েছেন।

দুদকে মামলা :বিষয়টি নিয়ে ২০১২ সালের ২৯ মার্চ শাহবাগ থানায় মামলা করে দুদক। মামলায় অভিযোগ করা হয়, চুক্তি করার সময় সংস্থার ও সরকারের স্বার্থ নজরে না নেওয়ায় সিটি করপোরেশনের ৮২৭ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। মামলায় সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকাকে প্রধান আসামি করে নূরুল হক, সেহাব উল্লাহ, মনসুর আহমদ, আমিনুর রহমান চৌধুরী, মফিজুর রহমান ও নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এমআর ট্রেডিংয়ের মালিক মিজানুর রহমানকে আসামি করা হয়। গত ২৩ সেপ্টেম্বর দুদক সাদেক হোসেন খোকাসহ মনসুর আহমেদ, মফিজুর রহমান ও আমিনুর রহমান চৌধুরীর নাম চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করে আদালতে জমা দেন।

ওই চার্জশিটের বিরুদ্ধে মনসুর আহমেদ রিট করায় আদালত মামলার কার্যক্রম স্থগিত করেন। কিন্তু দুদকের চার্জশিটে সকল অভিযুক্তের নাম না থাকায় দুদকের তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। মনসুর আহমেদ বলেন, ওই প্রকল্পের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তারপরও তার নাম চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অথচ দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্যদের আসামি করা হয়নি। দুদকের পক্ষে তদন্তের দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম জানান, তদন্তের ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি করেছিলেন। কিন্তু আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে সিটি করপোরেশনে তা পাঠানো হয়নি।

ভাঙা হয়েছে চারটি তলা :২০১৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর অভিযান চালিয়ে ডিএসসিসি তাদের ফ্লোর বুঝে নেয়। একই সঙ্গে মালিককে ওপরের ১০টি তলা ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেয়। গত ১১ জানুয়ারি সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, এ পর্যন্ত চারটি তলা ভাঙা হয়েছে। কিন্তু সিঁড়ির অংশটুকু স্তম্ভ আকারে রয়ে গেছে। বেশ কয়েকটি তলার কাজ শেষ না হওয়ায় মোটা রড বেরিয়ে আছে। বর্তমানে ভাঙার কাজ বন্ধ আছে। দ্বিতীয় তলায় ডিএসসিসির ২ নম্বর অঞ্চলের কার্যালয় করা হয়েছে। ছয় থেকে ১৩ তলা পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া দিয়েছে এমআর ট্রেডিং। আরও কয়েকটি তলা ভাড়া হবে বলে সামনে ছোট ব্যানার টাঙানো আছে। এ বিষয়ে এমআর ট্রেডিংয়ের মালিক মিজানুর রহমানের সঙ্গে কথা বলার জন্য যোগাযোগ করলে অফিস থেকে জানানো হয়, ওই ভবন থেকে অস্ত্র উদ্ধারের একটি ‘মিথ্যে মামলায়’ তিনি এখন কারাগারে আছেন। এ ছাড়া কোনো কথা বলতে চাননি তারা।