৭ই নভেম্বর : হত্যা দিবস? না সিপাহী জনতার বিপ্লব দিবস?

0

বিএনপি ৭ই নভেম্বর পালনের উদ্দেশ্যে সোহরাওয়ার্দী ঊদ্যানে জনসভা করার জন্য পুলিশের অনুমতি চেয়েছে। অনুমতি দেয়ার আগেই হানিফ সাহেব হুঙ্কার দিয়েছেন, ‘বিএনপিকে ৭ নভেম্বরের কর্মসূচি পালন করতে দেয়া হবে না’।জনাব হানিফ আরও বলেছেন, পঁচাত্তরের ৩ নভেম্বরের ঘটনা আড়াল করতে সিপাহী বিপ্লবের নামে পঁচাত্তরের ঘাতক গোষ্ঠি তথাকথিত বিপ্লব দিবস পালন করে। এই দিন তারা হাজারও সেনাবাহিনী সদস্য হত্যা করেছে। এই সেনাবাহিনী হত্যাকারীদের মাঠে নামার কোন সুযোগ দেয়া হবে না। তাদেরকে কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে। বিপ্লবের নামে এই ঘাতকদের আশ্রয় প্রশ্রয় দেয়ার কোন সুযোগ নেই।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মরণোত্তর ফাঁসি দাবি করে হানিফ বলেন, বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতা হত্যার নেপথ্যে ছিলেন জিয়াউর রহমান। এই খুনি জিয়াউর রহমানের মরণোত্তর বিচারের মাধ্যমে ৭৫ এর ৩ নভেম্বরের কলঙ্কের কিছুটা হলেও মোচন হবে। জনাব হানিফ যে ভাষায় যে কথা বলেছেন, সেটা গণতন্ত্রের কোনো ভাষা নয়। এবং সেটি গণতন্ত্রও নয়। আপনারা মিটিং করে আপনাদের কথা বলেছেন। বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দলকে মিটিং করতে দিন। মিটিংয়ের পারমিশনটাও ১-২ তারিখের মধ্যেই দিন। দেখুন, হাজার নয়, কত লক্ষ লোকের সমাবেশ হয় ঐ মিটিংয়ে। আর জিয়াউর রহমান ঘাতক ছিলেন কিনা, সেটি তো বিচার করবে আদালত। তো ৭ই নভেম্বরকে আদালতে নিয়ে যান, দেখুন কি বেরিয়ে আসে।

৩রা নভেম্বর ও ৭ই নভেম্বরকে নিয়ে বাংলাদেশের প্রধান ২ রাজনৈতিক দলই শুধু নয়, প্রধান ২ রাজনৈতিক ক্যাম্পের মধ্যেও রয়েছে ২ রকম অবস্থান। একটি উত্তর মেরুর অবস্থান, আরেকটি দক্ষিন মেরুর অবস্থান। ইংরেজিতে যাকে বলে Poles apart. ৩রা নভেম্বর জেল হত্যা সংঘঠিত হয়েছিল, কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু এই ৩রা নভেম্বরই তো জারি হয়েছিল দ্বিতীয় মার্শাল ল’।

ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ নিজেকে মেজর জেনারেল হিসেবে প্রমোশন দেন এবং নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (সিএমএলএ) হিসেবে ঘোষনা করেন। সাফায়েত জামিলকে কর্নেল থেকে ব্রিগেডিয়ার পদে প্রমোশন দেন। তারা ২ জন প্রধান বিচারপতি সায়েমকে প্রেসিডেন্ট ও চিফ মার্শাল ল’ এ্যাডমিনিষ্ট্রেটর হিসেবে নিয়োগ দেন, মার্শাল ল’ জারি করেন, সংবিধান বাতিল করেন এবং জাতীয় সংসদ ভেঙ্গে দেন। বিচারপতি সায়েম ছিলেন দ্বিতীয় প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং তার সময়কালেই জারি হয় দ্বিতীয় মার্শাল ল’। ৩রা থেকে ৭ই নভেম্বর, এই ৫ দিনের ঘটনা ইতিহাস থেকে ভ্যানিশ করে দেওয়া হচ্ছে। ৭ই নভেম্বর যদি হত্যা দিবস হয় তাহলে ঐ দিন সকালে ঢাকা শহরে লক্ষ লক্ষ লোক যে রাস্তায় বের হয়ে শ্লোগান দিয়েছিল, সেটি তাহলে কি ছিল? তাদের শ্লোগান ছিল, “সিকিম নয়, ভূটান নয়, এদেশ আমার বাংলাদেশ”, “ভারত প্রেমের পরিণাম, বাংলা হবে ভিয়েতনাম”, “নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবর”, “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ”, “জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ”।

মৃত্যুর পর জিয়ার জানাযায় ৩০ লক্ষ লোক অংশগ্রহন করে। একজন খুনি বা ঘাতকের জানাযায় কি ৩০ লক্ষ মানুষ অংশ নেয়? এসব ঘটনা আমাদের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা হচ্ছে। তবে ইতিহাসকে চিরদিনের জন্য মুছে ফেলা যায় না।

লেখক

মোবায়দুর রহমান

বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক