৭ই নভেম্বর : বেগম জিয়ার অভিজ্ঞতায়

0

জিসাফো ডেস্কঃ “… উনিশশো পঁচাত্তর সালের ৩রা নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের সময় জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করা হয়। এরপর ৭ই নভেম্বর প্রধানত: কর্নেল তাহেরের উৎসাহে (নেতৃত্বেও কি?) সাধারণ সৈনিকরা বিদ্রোহ করে। জেনারেল জিয়ার বাস ভবনের ফটক ভেঙ্গে তারা তাকে নিয়ে যায় এবং ক্ষমতায় বসায়। এগারো বছর পরে ১৯৮৬ সালে এই কয়দিনের ঘটনাবলী সম্বন্ধে আমি বেগম খালেদা জিয়ার কাছে জানতে চাই। তিনি বলেন :

দু’ তারিখ রাতে আমরা বাইরে গিয়েছিলাম – ডিনার ছিলো একটা। রাত বারোটার দিকে ফিরে এসে আমরা শুয়ে পড়েছি। দুটার দিকে কলিং বেল বাজলো। তখন স্বাভাবিকভাবেই বাসায় কেউ ছিলো না। তো সে (জেনারেল জিয়া) নিজেই দরজা খুলতে গেলো। অনেকক্ষণ পরেও যখন সে ফিরলোনা তখন আমি দেখতে গেলাম। সামনের দরজায় গিয়ে বেশ কিছু লোকজন দেখলাম। আর্মি অফিসার আছে দু’চারজন , আরো লোকজন দেখলাম। দেখলাম আমার স্বামী তাদের সঙ্গে বাইরের বারান্দায় বসেই কথাবার্তা বলছেন। কি হচ্ছে ব্যাপারটা আমি তখনও বুঝে উঠতে পারলাম না। এ রকম ভাবে প্রায় সারা রাতই চলে গেলো। ভোরের দিকে, যখন আলো হোলো, তখন আমার স্বামী তাদেরকে নিয়ে ড্রইংরুমে এসে বসলেন। এর মধ্যে বেশ জানাজানি হযে গেছে ব্যাপারটা। কোয়ার্টার থেকে আমার অর্ডারলি, কাজের লোক – তারা উঠে এসেছে। আমার স্বামী খুব স্বাভাবিকভাবেই – যে রকম সে সব সময় করে, যতো কিছু ঘটে যাক সব সময়ই নর্ম্যালি ব্যবহার করে – সে রকম স্বাভাবিক ভাবেই বললেন – এদেরকে চা নাশতা দাও। ফ্রিজে যা কিছু ছিলো সেসব দিয়ে তাদেরকে খাওয়ানো হলো। সকাল হওয়ার পরই শুধু বুঝতে পারলাম যে ব্যাপারটা অন্য রকম।

সকাল হবার পরে দেখি আমার বাসার গেট বন্ধ। কেউ বাইরে যেতে পারছেনা, কেউ বাইরে যাচ্ছেনা। আমাদের পাশের বাসায় ছিলেন, এখন জেনারেল হয়েছেন – জেনারেল মঈন – তিনি এলেন, একটা আলাপ-সালাপ করলেন, তারপর বললেন, বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাবেন না।

আমার বাসায় যারা ছিলো, দু’জন অফিসার বরাবরই ছিলো, তারা সকলেই আমাদের সঙ্গে নাশতা করলো। সারা দিনই দেখেছি যে ড্রইং রুমে বসে তারা আলাপ করছে, লোকজন আসছে, যাচ্ছে। খালেদ মোশাররফও এসেছিল। আমার স্বামীর সঙ্গে কি কি কথাবার্তা হয়েছে। তারা ও রুমেই আছে। আমার স্বামীও সেখানে বসা, বাইরে যাচ্ছেনা। বাড়ীর আশেপাশে এবং চারিদিকে সামরিক পাহারা, বাড়ীর ভেতরেও আছে। তিন-চারদিন এ রকমই চললো।

সাত তারিখে রাত্রিবেলা – রাত্রি প্রায় বারোটার সময় থেকে একটু একটু গোলাগুলীর শব্দ হচ্ছিলো। ব্যাপারটা যে কি বুঝতে পারছিলাম না। কিছুক্ষণ গোলাগুলী চলার পর আমরা শুনতে পারলাম যে কতগুলো শ্লোগান হচ্ছে – নারাযে তাকবীর আল্লাহু আকবর – এ রকম শ্লোগান হচ্ছে। আস্তে আস্তে সেটা বাড়তে লাগলো। এক পর্যায়ে দেখলাম যে সকলে এদিকে আসছে, আমাদের বাসার দিকে আসছে। আমার গেট বন্ধ ছিলো, সে গেটটা একদম ভেঙ্গে ফেলার মতো অবস্থা। শেষ পর্যন্ত গেটটা ভেঙ্গেই ফেললো। আমাদের সামনের দরজা ভেঙ্গে সকলে হুড়মুড় করে বাসায় ঢুকে বললো, স্যার কোথায়? আমার স্বামী তখন বেরিয়ে এলেন, ওদের সঙ্গে কথা বললেন। তারপর তারা তাকে ঘাড়ে উঠিয়ে নিয়ে চলে গেলো, তার নামে শ্লোগান দিচ্ছিলো তারা। আর নারায়ে তাকবীর্। তাকে তারা জোর করে, একদম যে রকম অবস্থায় ছিলেন সে রকম ভাবেই উঠিয়ে নিয়ে চলে গেলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় তোমরা তাকে উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছো? তারা বললো, আপনি কোন চিন্তা করবেন না, আমরা তাকে নিয়ে যাচ্ছি, তিনি ভালো থাকবেন।

কতোক্ষণ পরে এসে তার ইউনিফর্ম নিয়ে গেলো তারা। তারা বললো যে আমার স্বামী আর্টিলারী রেজিমেন্টে আছেন। সারাদিন তিনি ওখানেই ছিলেন। মাঝে কতোক্ষণ পর পর লোকজন আসে, খবর দেয় তিনি ভালো আছেন। এ রকম ভাবেই চললো কয়েক দিন। এর মধ্যে সবাই আসে। তখন আমরা দেখেছি যে অবস্থাটা অত্যন্ত খারাপ ছিলো। সত্যিকারের অফিসাররাও দেখেছি যে নানা রকম খারাপ অবস্থায় ছিলো – অনেক ঘটনা আছে – হয়তো পরবর্তীতে কখনো বলবো। তবে তখন সবাই আমার বাসায়। মনে করতো যে আমার বাসাটাই সবচাইতে নিরাপদ এবং যে পারতো সেই এসে এ বাসাটাতেই আশ্রয় নিতো। আমার বাসায় সেদিন অফিসাররা এবং জোয়ানরা এসে আশ্রয় নিয়েছে। যারা এসেছে তাদেরকে যতোটুকু আমরা পেরেছি সাহায্য-সহযোগীতা করেছি। এবং যারা সেদিন – প্রেসিডেন্ট জিয়াকে তিন তারিখ রাত থেকে যারা গার্ড দিয়ে রেখেছিলো, সে অফিসারগুলো, তারা খুব অসহায় বোধ করছিলো – তারা নিরাপদ ছিলোনা। সাধারণ সৈনিকরা তাদের খুঁজে বেড়াচ্ছিলো। তারা খুব উত্তেজিত ছিলো। তাদেরকে খুঁজছিলো এজন্যে যে বিভিন্ন কারণে অফিসারদের উপর তাদের খুব রাগ ছিলো। তিন চারদিন এ রকম অবস্থা ছিলো। তারপর আস্তে আস্তে কিছুটা শান্ত হয়ে এলো।

বেগম খালেদা জিয়া বলেন ১৯৮৬ সালে॥