৬০ হাজার কোটি টাকা লুট-পাট: অখ্যাত ডিপি রেলের আড়ালে শেখ রেহানার আতাত ও চক্রান্ত!

0

জিসাফো এক্সক্লুসিভঃ ঢাকা-পায়রা রেলপথ নির্মাণে ভুঁইফোড় ব্রিটিশ কোম্পানির সাথে বাংলাদেশ সরকারের ৬০ হাজার কোটি টাকার সন্দেহজনক চুক্তি নিয়ে যখন সারাদেশ তোলপাড়, তখন লন্ডনের একাধিক সূত্র জানাচ্ছে, ডিপি রেল নামক চুক্তিকারী কোম্পানির আড়ালে মূলত রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোটবোন শেখ রেহানা। তিনি তার মেয়ে ব্রিটিশ এমপি টিউলিপের রাজনৈতিক কানেকশনকে কাজে লাগিয়েছেন।

জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকারের সাথে যে কোনো কোম্পানির নামে চুক্তি করে কাজ বাগাতে শেখ রেহানার কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু তখন তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠতে পারতো। বিশেষ করে এত বিশাল অংকের টাকা হওয়ায় তা নিয়ে ঝুঁকি বেশি। এই প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া থেকে বাঁচতে রেহানা তার মেয়ে টিউলিপের মাধ্যমে লেবার পার্টি নেত্রী রোশনারা আলীকে সামনে নিয়ে আসনে। রোশনারা আবার টিউলিপের খুবই ঘনিষ্ট বলে পরিচিত। এর বিনিময়ে রোশনারা ব্রিটিনের পরবর্তী নির্বাচন ও অন্যান্য রাজনৈতিক ক্ষেত্রে টিউলিপ ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের (মূলত আওয়ামী লীগার) সহযোগিতা পাওয়ার আশ্বাস পেয়েছেন। তার রাজনৈতিক ফান্ডেও ডোনেশনের প্রতিশ্রুতিও দেয়া হয়েছে বলে অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে।

গত সপ্তাহে ঢাকা-পায়রা রেলপথ নির্মাণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারের সাথে চুক্তি করে ডিপি রেল। এরপর অনুসন্ধানে জানা যায়, ভুঁইফোড় এই কোম্পানির প্রতিষ্ঠা হয়েছে এই প্রজেক্টকে উপলক্ষ্য করে! প্রতিষ্ঠানটির জনবল মাত্র ১১। আর পরিশোধিত মূলধন ১০০ পাউন্ড, বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার টাকা। রেলপথ নির্মাণের কোনো অভিজ্ঞতাও এখন পর্যন্ত নেই ডিপি রেলের। যদিও ভুঁইফোড় এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই ঢাকা-পায়রা রেলপথ নির্মাণে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। যা সম্ভব হয়েছে মূলত শেখ রেহানার কারণে।

সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, ৭৫০ কোটি ডলার বা প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির নকশা প্রণয়ন, অর্থায়ন, লাইন নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে ডিপি রেল। নির্মাণকাজে সহযোগিতা করবে চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিআরসি)।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর লন্ডনে কোম্পানিজ হাউজে লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত হয় ঢাকা-পায়রা রেল লিমিটেড (ডিপি রেল), যার নিবন্ধন নম্বর ০৮৮২০৯৭৩। কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের মূল্য দশমিক শূন্য ১ পাউন্ড বা বাংলাদেশী মুদ্রায় ১ টাকার সমান। মোট ১১ জনবলের মধ্যে একজন কোম্পানি সচিব হিসেবে নিযুক্ত। বাকিরা সবাই পরিচালক। তাদের বেশির ভাগেরই নিয়োগ ২০১৬ সালের ২ এপ্রিল ও তার পরে।

পরিচালকদের মধ্যে আনিসুজ্জামান চৌধুরী নামে একজন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূতও রয়েছেন। অন্যরা ব্রিটিশ নাগরিক। তারা হলেন— চার্লস ককবার্ন, পিটার আইলস, ইয়ান ডার্বিশায়ার, ম্যাট স্টেইনার, ডরিয়ান বেকার, বিল রবার্টস, জুলিয়ান লিন্ডফিল্ড, টিম মিডোস স্মিথ, গ্রাহাম লরেন্স ও পল টুইডাল। ব্রিটেনের সংশ্লিষ্ট বিভাগে যোগাযোগ করে জানা যায়, এদের কারোরই ভালো কোনো ব্যবসায়িক বা পেশাদারিত্ব প্রোফাইল নেই।

তিন বছর বয়সী ডিপি রেলের ব্রিটেনে কোনো কর্মকাণ্ড নেই। প্রতিষ্ঠানটিকে তাই কার্যক্রমহীন বা ডরম্যান্ট কোম্পানি হিসেবে মূল্যায়ন করেছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক ক্রেডিট রেটিং প্রতিষ্ঠান এনডোলে। তারা বলছে, প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকদের মধ্যে পাঁচজন সক্রিয়। এছাড়া একজন সক্রিয় কোম্পানি সচিব রয়েছেন। ২০১৪ ও ২০১৫ সালে ডিপি রেলের আর্থিক বিবরণীতে দেখা গেছে, এ দুই বছরই কোম্পানির মূলধন ১০০ পাউন্ডে অপরিবর্তিত রয়েছে।

পায়রা সমুদ্রবন্দরসহ এ এলাকা ঘিরে গৃহীত বিভিন্ন প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করছে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ। ঢাকা-পায়রা রেলপথ প্রকল্পটিও তাদের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। কী যোগ্যতার ভিত্তিতে ডিপি রেলকে কাজ দেয়া হয়েছে জানতে চাইলে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, কাজ শুধু ডিপি রেলকে দেয়া হয়নি। তাদের সঙ্গে রয়েছে রেললাইন নির্মাণে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান চীনের সিআরসি। মূলত তারাই (সিআরসি) নির্মাণকাজ করবে। অর্থ ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ করবে ডিপি রেল।

২৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৫০ কোটি ডলার। এ হিসাবে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় পড়বে ৩ কোটি ১২ লাখ ডলার বা প্রায় ২৪৫ কোটি টাকা। যদিও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে বৈদ্যুতিক সিঙ্গেল ট্র্যাকের লাইন, সিগন্যালিং ও অন্যান্য অবকাঠামোসহ প্রতি কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে খরচ হয় সর্বোচ্চ ২৩ কোটি থেকে ৩১ কোটি টাকা। যদি তা ডিজেল ইঞ্জিনের ২৫ টন এক্সেল লোডের সিঙ্গেল ট্র্যাক হয়, সেক্ষেত্রে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয় ৬ কোটি টাকার মতো। আর সিগন্যালিংয়ের জন্য খরচ হয় আড়াই কোটি টাকার বেশি।