৩৮ বছরে বিএনপি’র উল্লেখযোগ্য কিছু অর্জন

0

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তারিখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে। নানা চড়াই উত্রাই পেরিয়ে বাংলাদেশের ঘটনাবহুল রাজনীতিতে এই দল ৩৫টি বছর অতিক্রম করেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিএনপি আজ একটি অপরিহার্য অধ্যায়, প্রধানতম রাজনৈতিক শক্তি, দেশের বৃহত্তম ও সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল। সুদীর্ঘ চলার পথে এই দলটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ অর্জন এনে দিয়েছে দেশ ও জাতিকে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশিত ক্রোড়পত্রে দলের সেইসব উল্লেখযোগ্য অর্জনের ওপর একটি নাতিদীর্ঘ পর্যালোচনা পাঠকের কাছে ১৯৭প্রাসঙ্গিক হিসেবেই বিবেচিত হবে বলে আশা করি।
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ধারণার প্রবর্তন ও জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা
সদ্য স্বাধীন দেশে আওয়ামী অপশাসনের ফলে সৃষ্ট হানাহানি ও অনৈক্যের অবসান করে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তার কালজয়ী বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ধারণাটি সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিসহ বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রে বসবাসরত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোকেও জাতীয় জীবনের মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে সক্ষম হয়েছিল। তিনিই প্রথম উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, বাংলাদেশের মতো সদ্য স্বাধীন একটি দেশের উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য পূর্বশর্ত হলো জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা। তাই শ্রেণী, পেশা, ধর্ম, বর্ণ ও মত নির্বিশেষে রাজনৈতিক কর্মী, নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ মানুষের এক অভূতপূর্ব সম্মিলন ঘটিয়েছিলেন তিনি বিএনপিতে।
বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন
একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থার অবসান করে দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন করেছিলেন বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তিনি বাকশালের জঞ্জাল সরিয়ে নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে সব রাজনৈতিক দলকে রাজনীতি করবার সুযোগ করে দেন। এমনকি বাকশালের আওতায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগকেও পুনরুজ্জীবিত হয়ে রাজনীতি করবার সুযোগ সৃষ্টি করে দেন। ১৯৭৯ সালে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি, আওয়ামী লীগ, মুসলিম লীগ, জাসদ, জামায়াতে ইসলামী, কমিউনিস্ট পার্টিসহ সব রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছিল। সেই নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে বিএনপি। ১৯৯১-৯৬ সময়কালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার গণতন্ত্রকে সুসংহত করার লক্ষ্যে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনর্বহাল করেছিল। এছাড়াও জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটিয়ে ১৯৯৬ সালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি প্রবর্তন করেছিলেন বেগম খালেদা জিয়া।
নৈরাজ্যের অবসান করে দেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা আনয়ন
স্বাধীনতার পর পর আওয়ামী অপশাসনের কারণে দেশে এক সংঘাতময় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। সেনাবাহিনীতে চেইন অব কমান্ড বা নির্দেশসূত্র সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়েছিল। বেসামরিক প্রশাসনেও চলছিল অবাধ স্বেচ্ছাচারিতা ও বিশৃঙ্খলা। বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর বিদ্যমান নৈরাজ্যের অবসান করে দেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থেকে দেশকে রক্ষা করেছিলেন তিনি।
ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি চালু
পরাশ্রিত বা একদেশমুখী পররাষ্ট্রনীতির অবসান করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়া। তার শাসনামলে বাংলাদেশ প্রকৃতপক্ষে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি চালু করেছিল। বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রনীতির মূলকথাটি ছিল তখন—প্রভু নয়, বন্ধু চাই। সমমর্যাদার ভিত্তিতে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইসলামী দেশসমূহসহ বিশ্বের সব বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রের সাথেই সুসম্পর্ক স্থাপনের উদ্যোগ গৃহীত হয়। পরবর্তীকালেও বিএনপি তার শাসনামলগুলোতে একই ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে এসেছে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও অবাধ প্রসার
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা ও এর অবাধ প্রসারে বিএনপি জন্মলগ্ন থেকেই অঙ্গীকারবদ্ধ। বাকশালের অধীনে বিলুপ্ত করে দেয়া সব গণমাধ্যমকে পুনরুজ্জীবিত করে তাদের হৃত স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়া। জাতীয় প্রেস ক্লাবের আজকের জায়গাটি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করে সেখানে সরকারী খরচে ভবন নির্মাণ করে দিয়েছিলেন তিনি। সাংবাদিকতার গঠনমূলক জবাবদিহিতার জন্য প্রেস কাউন্সিল এবং যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের জন্য প্রেস ইনস্টিটিউট গঠন করে দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালেও বিএনপি বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখা এবং এর প্রসার ঘটাতে যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে এসেছে।
বিচার বিভাগের হৃত স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেয়া
বাকশালী চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছিল। পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে বিচার বিভাগের হরণ করে নেয়া স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিয়েছিল বিএনপি। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষায় বিএনপি পরবর্তীকালেও সোচ্চার ভূমিকা পালন করে এসেছে। রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে বিএনপি সবসময়েই অঙ্গীকারবদ্ধ।
সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ সংযোজন

দেশের সংখ্যাগুরু মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিকে গুরুত্ব দিয়ে বিএনপি সংবিধানের প্রারম্ভে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ সংযোজন করেছিল। ১৯৭২ সালের সংবিধানের অন্যতম মূলনীতি ধর্মনিরপেক্ষতাকে প্রতিস্থাপন করে তদস্থলে ‘মহান আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস’ অংশটিও একইসঙ্গে যুক্ত করেছিল বিএনপি। দুঃখজনকভাবে বর্তমান আওয়ামী সরকার মূলনীতি হিসেবে পুনরায় ধর্মনিরপেক্ষতাকে সংবিধানে ফিরিয়ে এনেছে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এবং ‘মহান আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস’ অংশটুকু তারা বাদ দিয়েছে।
কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধি ও খালকাটা কর্মসূচি
বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সাড়া জাগানো কর্মসূচির মধ্যে অন্যতম ছিল কৃষিতে উত্পাদন বৃদ্ধির জন্য সর্বাত্মক প্রয়াস চালানো। তিনি দেশের সব পতিত জমিতে আবাদ করতে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। উন্নতমানের বীজ, সার, কীটনাশক ও আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ করে খাদ্য উত্পাদন বাড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন। তার নেতৃত্বে দেশ খাদ্য উত্পাদনে স্বনির্ভরতা অর্জন করেছিল ১৯৭৮ সালে এবং পরের বছর দেশে খাদ্য উদ্বৃত্ত হয়। আবাদি জমিতে সেচের সুবিধা সম্প্রসারণের জন্য স্বেচ্ছাশ্রমভিত্তিক খালকাটা কর্মসূচি চালু করে বিশাল জাগরণ সৃষ্টি করেছিলেন এই মোহময়ী নেতা। মাইলের পর মাইল হেঁটে নিজ হাতে কোদাল নিয়ে খাল কাটার মাধ্যমে জনগণকে ব্যাপকভাবে উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছিলেন তিনি।
জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালু
বাংলাদেশের উন্নয়নের পথে প্রধান অন্তরায় হিসেবে অনিয়ন্ত্রিত হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে চিহ্নিত করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তার আমলেই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম সারাদেশে মাঠ পর্যায়ে ছড়িয়ে দেয়া হয়।
গণশিক্ষা কার্যক্রম চালু
শিক্ষার মাধ্যমে দেশের জনগণকে আরো উত্পাদনশীল জনশক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব বলে বিশ্বাস করতেন বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি জিয়া। শিশুদের স্কুলে পাঠিয়ে আনুষ্ঠানিক শিক্ষাদানের পাশাপাশি নিরক্ষর বয়স্ক জনগোষ্ঠীকেও অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাদানের মাধ্যমে সাক্ষর করে তোলার ব্যবস্থা করেন তিনি। সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় এই গণশিক্ষা কার্যক্রম সারাদেশে আলোড়ন তুলতে সক্ষম হয়েছিল।
বিদেশে জনশক্তি রপ্তানী কার্যক্রম চালু
দেশের বিপুল জনসংখ্যাকে জনশক্তি হিসেবে বিদেশে রপ্তানী করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন রাষ্ট্রপতি জিয়া। তার শাসনামলে পরীক্ষামূলকভাবে সৌদি আরবে স্বল্পসংখ্যক শ্রমিক প্রেরণের মাধ্যমে বিদেশে জনশক্তি রপ্তানীর ধারণাটি বাস্তব রূপলাভ করেছিল, যা আজ দেশের অর্থনীতির অন্যতম মূল স্তম্ভে পরিণত হয়েছে।
গভীর সমুদ্রে মত্স্য আহরণ কার্যক্রম চালু
গভীর সমুদ্রে মত্স্যসম্পদ আহরণের জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন ও যথাযথ উদ্যোগও নিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়া। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গভীর সমুদ্রগামী ট্রলার দিয়ে মত্স্যসম্পদ আহরণের পাশাপাশি নৌবাহিনীকে নিয়োজিত করেছিলেন পার্শ্ববর্তী দেশসমূহের জেলেরা যেন আমাদের সীমানায় এসে অবৈধভাবে মত্স্যসম্পদ লুটে নিতে না পারে তা পাহারা দেয়ার জন্যে।
গার্মেন্ট শিল্প পরীক্ষামূলকভাবে চালু
বাংলাদেশের কৃষিখাতে বিদ্যমান বিপুল ছদ্মবেকারত্ব দূর করার পথ হিসেবে শিল্পখাতের বিকাশকে চিহ্নিত করেছিলেন বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি জিয়া। কিন্তু পুঁজির অভাবে এই দেশে ভারী শিল্প গড়ে তোলা কঠিন হবে বলে হালকা শ্রমঘন শিল্প হিসেবে গার্মেন্ট শিল্পের সম্ভাবনাকে যথোপযুক্ত বলে বিবেচনা করেছিলেন তিনি। তার আমলেই বাংলাদেশে পরীক্ষামূলকভাবে গার্মেন্ট শিল্প হাঁটি হাঁটি পা করে যাত্রা শুরু করে, যা আজ আমাদের রপ্তানী খাতের প্রধানতম স্তম্ভে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ আজ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গার্মেন্ট রপ্তানীকারক দেশ।
গ্রামীণ ব্যাঙ্ক প্রকল্প পরীক্ষামূলকভাবে চালু
গ্রামীণ দারিদ্র্য মোচনের নানা উপায় ও কৌশল নিয়ে রাষ্ট্রপতি জিয়া নিজে যেমন চিন্তা করতেন, তেমনি বিভিন্ন গুণীজনের কাছ থেকে আসা ধ্যানধারণাও যাচাই-বাছাই করে দেখতেন। ড: ইউনূসের ক্ষুদ্রঋণ ধারণাটির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জনতা ব্যাঙ্ক একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প টাঙ্গাইল জেলায় চালু করেছিল শহীদ জিয়ার শাসনামলেই। কালের পরিক্রমায় সেই ক্ষুদ্রঋণ পাইলট প্রকল্প গ্রামীণ ব্যাঙ্ক হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি লাভ করেছে এবং নোবেল পুরস্কার জয় করেছে। বিএনপি তার শাসনামলগুলোতে ড. ইউনূস ও তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাঙ্ককে সর্বাত্মক সাহায্য সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা করে গেছে।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় চালু
দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই নারী। দেশের সামগ্রিক উন্ন্য়নের স্বার্থে পিছিয়ে পড়া নারীসমাজকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে আরো বেশী সম্পৃক্ত করবার প্রয়োজনীয়তা সর্বপ্রথম উপলব্ধি করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়া। দেশের ভবিষ্যত্ যাদের হাতে নির্মিত হবে সেই শিশুদের প্রতিও বিশেষ যত্ন নেয়ার গুরুত্ব তিনি অনুধাবন করেছিলেন। তার আমলে মহিলা ও শিশুবিষয়ক একটি পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন করে সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছিল নারী ও শিশুদের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে।
শিল্পখাতে অগ্রগতিসাধন ও বেসরকারী খাতের সর্বোচ্চ বিকাশ
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হলেও ছদ্মবেকারত্বে থাকা কোটি মানুষের কর্মসংস্থান করতে শিল্পখাতের বিকাশ ছাড়া যে আর কোনো উপায় নেই সেই বাস্তবতাটি শহীদ জিয়া বুঝতে পেরেছিলেন। শুধু সরকারী খাতের বন্ধ কলকারখানা চালু করেই তিনি ক্ষান্ত দেননি বরং বেসরকারী খাতের বিকাশে যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার নীতি গ্রহণ করেছিলেন। তার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের আমলে গৃহীত বেসরকারী খাতকে বিশেষভাবে উত্সাহিত করার এই নীতি পরবর্তী বিএনপি সরকারগুলোর আমলেও অব্যাহত ছিল।
নারী শিক্ষার ব্যাপক প্রসার
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়ার আমলে নারী উন্নয়নে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় চালু করার ধারাবাহিকতায় ১৯৯১-৯৬ শাসনকালে বিএনপি সরকার নারীসমাজের ভাগ্য উন্নয়নে আরো অর্থবহ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিল। এই সময়ে নারী শিক্ষার প্রসারে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করে। প্রথমে মাধ্যমিক ও পরবর্তীকালে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক করে দেয়া হয়। মেয়ে শিশুদের স্কুল থেকে ঝরে পড়া রোধ করতে শিক্ষা উপবৃত্তিও চালু করা হয়। দরিদ্র শিশুদের শিক্ষার জন্য তার সরকার ‘শিক্ষার জন্য খাদ্য’ নামে এক মহত্ কর্মসূচিও চালু করেন।
অবকাঠামো খাতে ব্যাপক উন্নয়ন
বিএনপি সরকার শুরু থেকেই দেশের অবকাঠামো খাতের উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করে এসেছে। স্কুল, কলেজ, সরকারী ভবন, সড়ক-মহাসড়ক, সেতু-কালভার্ট, বিদ্যুত্, গ্যাসলাইন, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা প্রভৃতি অবকাঠামোগত খাতে বিএনপি সরকারগুলোর সময়ে ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। যমুনা সেতুর মতো বড় বড় সেতু এ সময়ে নির্মিত হয়। বেসরকারী খাতের সর্বোচ্চ বিকাশের মাধ্যমে দেশের শিল্প ও সেবা খাতে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে যথাযথ অবকাঠামো সুবিধা নিশ্চিত করার গুরুত্ব যে অপরিসীম তা বিএনপি সরকারগুলো সবসময়ই অনুধাবন করেছে।
আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা স্থাপন
আর্থিক খাতে বর্তমানে বিরাজমান লুটপাট ও বিশৃঙ্খলার সাপেক্ষে প্রাসঙ্গিকভাবেই বলা যায় যে, বিএনপি সরকারগুলোর সময়ে আর্থিক খাতে সর্বোচ্চমানের শৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভবপর হয়েছিল। বিএনপি শাসনামলগুলোতে শেয়ারবাজারে কখনো লুটেরা দুর্বৃত্তদের পক্ষে কারসাজি করা সম্ভবপর হয়নি, এমনকি ব্যাঙ্কিং খাতেও হলমার্ক-বিসমিল্লাহর মতো কোন কেলেঙ্কারি ঘটানো সম্ভবপর হয়নি। নিবিড় তত্ত্বাবধান ও যথাযথ নীতি সমর্থন প্রদানের মাধ্যমে দেশের পুঁজিবাজার এবং অর্থবাজারকে সুচারুভাবে পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছিল বিএনপি।
সন্ত্রাস দমনে সাফল্য
১৯৯৬-২০০১ সময়কালে আওয়ামী গডফাদারদের ছত্রচ্ছায়ায় সারাদেশে সন্ত্রাসের দৌরাত্ম্য কায়েম হয়েছিল। সে সময় যশোরে উদীচী বোমা হামলা ও ঢাকায় রমনা বটমূলে বোমা হামলার মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনাও ঘটে। দেশবাসীর উদ্বেগ-শঙ্কা নিরসনের লক্ষ্যে ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসেই বিএনপি সরকার সন্ত্রাস দমনে সর্বাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। অপারেশন ক্লিনহার্টের মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে সাঁড়াশি অভিযান চালানো হয় এবং পরবর্তীতে সন্ত্রাসী তত্পরতার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের সুবিধার্থে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন বা র্যাব নামক এলিট ফোর্স গঠন করা হয় ।
উপসংহার
একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে সুদীর্ঘ ৩৮ বছর যাবত্ টিকে থাকা, বিপুল জনপ্রিয়তা ধরে রাখা এবং নিজের প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখতে পারা খুব সহজ কথা নয়। বিএনপি এই কঠিন কাজটি করতে পেরেছে তার গণমুখী ভূমিকা বজায় রাখার মাধ্যমে এবং যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে। এই দল কখনো দেশ শাসন করেছে, আবার কখনো নিয়মতান্ত্রিক বিরোধীদলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে, কখনোবা স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলন সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছে। জনগণ বিএনপিকে গ্রহণ করেছে নিজেদের পক্ষের শক্তি হিসেবে, তাদের প্রিয় রাজনৈতিক দল হিসেবে। বরাবরের মতোই আগামী দিনগুলোতেও বিএনপি দেশ ও জাতির কল্যাণে তার যুগোপযোগী ভূমিকা অব্যাহত রাখবে, এই প্রত্যাশা রইলো প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শুভদিনে।