১৯২৯ সালের আইন মেয়েদেরকে আলোর পথ দেখিয়েছিল

0

জিসাফো ডেস্কঃ প্রগতিশীল নারী ও শিশু বিষয়ক মাননীয় প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি মেয়েদের বিয়ের বয়স নিয়ে বেশ কিছুদিন থেকেই কিছু একটা বলার চেষ্টা করছিলেন। এবার সেটা কাজে দেখিয়ে দিলেন। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৬ এর খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য জমা দেয়া হয়েছে।

অভিজ্ঞতা বলে, কোন আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য জমা দেয়ার পর সেটা যে পাশ হবেই এটা নিশ্চিত। তার উপর বিষয়টি তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়- সামান্য বিষয় ‘বাল্যবিবাহ’ আর এখানে দেখলাম ‘বয়স’ এর ক্ষেত্রে মেয়েদেরকেই ‘বিশেষ ছাড়’ দেয়া হয়েছে মানে পুরুষ এর বয়সের এখানে কোন সীমানা টানা হয়নি যে সে কবে বিয়ে করতে পারবে আর কবে নয়!

“সর্বোত্তম স্বার্থে” নাকি মেয়েদেরকে ১৮ এর আগেই বিয়ে দেয়া যাবে! এই ‘সর্বোত্তম স্বার্থটা’ কে, কিভাবে, কেন এবং কখন নির্ধারণ করে দিবে? যদি মেয়েদের “সর্বোত্তম স্বার্থে” ই বিবেচনা করা হয় তাহলে কি বিয়েই  মেয়েদের ক্ষেত্রে “সর্বোত্তম স্বার্থ”?

গত ১৫ নভেম্বর ২০১৬ ইং তারিখ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদন প্রথম আলোর প্রথম পাতায় ৪ নং কলামে এসেছে। বিবিএস এর জরিপ মতে ২০% বিবাহিত নারী স্বামীর লাঠিপেটার শিকার!

এছাড়া প্রতিদিন আমরা নারী নির্যাতনের নানা ঘটনা দেখছি, পড়ছি, শুনছি এমন কি উপভোগও করছি। এই পরিস্থিতিতে নারীদেরকে প্রগতির পথে বিশেষ ছাড় না দিয়ে শেষ অব্দি নারী শিশু বিয়েতেই বিশেষ ছাড় দিলেন মন্ত্রী? সেলুকাস!

একটি মেয়ে ২০ বছরের আগে সন্তান ধারণ ও প্রসব করলে তার স্বাস্থ্যগত কি কি সমস্যা দেখা দিতে পারে সেইসব নিয়ে কিন্তু দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ সরকার প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ করেছে। এশিয়া ফাউন্ডেশন বা বাংলাদেশ পপুলেশন অ্যান্ড হেলথ কনসোর্টিয়াম (বি পি এইচ সি) যেই ফান্ডিং বন্ধ করে দিলো সাথে সাথে সরকার ভুলে গেল ২০ এর আগে বিয়ে দিলে একটি মেয়ের কি কি ক্ষতি হতে পারে?

একজন আধুনিক বাংলার প্রগতিশীল নারী ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হয়ে কিভাবে এই কথা মেহের আফরোজ চুমকি’র মুখে উচ্চারিত হয় যে, ‘যে কোন অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটতেই পারে’ বাল্যবিবাহ বন্ধ হলেই কিশোর কিশোরীদের প্রেম বন্ধ হয়ে যাবে এমন নয়। ছি! এই কথা বলার পর যে কোন সভ্য দেশের মন্ত্রীর পদত্যাগ চাইতেন সাধারণ জনগণ। আমরা আসলে নিজে কি জানি না যে একটি বিশেষ পদে থেকে, কি বলা উচিত বা কি নয়! কাকে বলা উচিত বা কাকে নয়।

১৯২৯ সালে যে আইন মেয়েদেরকে আলোর পথ দেখিয়েছিল ২০১৬ সালে সেই একই আইন মেয়েদেরকে কি দেখালো??? আলোকিত আঁধার!

একটি মেয়েকে বিয়ের পর শারীরিক ও মানসিকভাবে নানা ধকল সামলাতে হয়। এরপর তো সামাজিক ধকল আছেই। এরই মাঝে যদি তার গর্ভধারণের বিষয়টি এসে পড়ে তাহলে তো আর কোনো কথাই নাই। একজন অপুষ্ট মা কিভাবে সুস্থ শিশু জন্ম দিবেন? একটি কিশোরী কিভাবে জানবে নবজাতকের যত্ন বা প্রসব পরবর্তী মায়ের যত্ন? পেরিনিয়াল টিয়ার বা সারভাইকাল ক্যান্সার কাদের বেশি হয় বা জরায়ু দ্রুত নিচে নেমে আসার মূল কারণগুলি কি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কারো কাছে জেনে নেয়া যেত না?

এটি একটি অপুষ্ট আইন। একটি নারী ও শিশুর জন্য বৈরি আইন। শিশু ও কিশোরীদের জন্য অবান্ধব আইন। একটি অন্ধকার আইন। কিভাবে সম্ভব হলো এই আলোকিত সময়ে আবার অন্ধকারের দিকে যাত্রা শুরু করা? এর ফলে মাতৃমৃত্যু হার যে কেবল বেড়েই যাবে তাই নয় পাশাপাশি বহু বিবাহ হবে, জনসংখ্যা বৃদ্ধিও ঘটবে। এই কিশোরীগুলি কি আদৌ জানে বিয়ের কাবিননামা কি? কিভাবে সেটা পূরণ করতে হয়? অথবা এটাই কি জানে উন্নত বিশ্বে যখন তাদের বয়সী কিশোরীগুলো প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়াচ্ছে তখন সে জঠর জ্বালায় আর্তনাদ করছে!

কন্যাশিশুদের ‘সর্বোত্তম স্বার্থ’ বিষয়টি তাদের ক্যারিয়ার গঠনের ক্ষেত্রে, তাদেরকে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে ভাবা হলো না কেন?

আশা করেছিলাম নারীশিক্ষা বাধ্যতামূলক, নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, নারীর আত্মনির্ভরশীলতার অমর বানী শোনাবে এই আইনের আধুনিক আইন। অথচ কি বিবৃতি দিলেন মাননীয় প্রতিমন্ত্রী মহোদয়! কি বিচিত্র এই দেশ!

আশা করি ডিজিটাল বাংলাদেশের নেত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী কোন অবস্থাতেই এই কিশোরী নির্যাতন আইনটি পাশ করবেন না। সেই আশাতেই থাকলাম।


লেখক : আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী
dilrubashormin@gmail.com