হারিয়ে যাচ্ছে এককালের খরস্রোতা নদী তুরাগ

0

জিসাফো ডেস্কঃগাজীপুর-টাঙ্গাইল অঞ্চলের প্রধানতম নদীর নাম তুরাগ। যমুনা নদী হতে তার উৎপত্তি। কালের বিবর্তনে যমুনার শাখা প্রথমে ধলেশ্বরী, এলাংজানি, লৌহজং, বংশী নদী সর্বশেষে তুরাগ নদী নাম ধারণ করে গাজীপুরে প্রবেশ করে যা মির্জাপুর, কালিয়াকৈর, কড্ডা, কাশিমপুর আশুলিয়া, টঙ্গী, মিরপুর হয়ে তুরাগ নামেই বুড়িগঙ্গার সাথে মিলিত হয়েছে।

বিভিন্ন দেশের হাজারও নদীর মত এ নদী কালের অতল গহবরে বিলীন হতে চলেছে। বাংলাদেশ অসংখ্য নদ-নদীর সমন্বয়ে একটি নদীমাতৃক দেশ হিসেবে পরিচিত। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ধর্মপ্রাণ লক্ষাধিক মুসল্লী টঙ্গীর বিশ্ব ইস্তেমা ময়দানে জমায়েত হন। যার অবস্থানও তুরাগ নদীর তীরে। এক সময় এ তুরাগ নদীই মায়ের মত বুকে জড়িয়ে রাখত এ অঞ্চলের মানুষকে। এ নদীর পানি দিয়ে লাখ লাখ কৃষক পরিবার তাদের কৃষি জমিতে সেচ দিয়ে শস্য উৎপাদন করে জীবিকা নির্বাহ করতো। লাখ লাখ লোকের জীবন প্রবাহ এ নদীর সাথেই বয়ে চলতো। ভ্রমণপিয়াসী হাজার হাজার লোক তাদের রং বেরং-এর পানসি নিয়ে ঘুরে বেড়াত এ নদী দিয়েই। দেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকেরা এ নদীর ওপর ভরসা করে জীবিকা নির্বাহ করত। সে উত্তাল খরস্রোতা নদী তার যৌবন হারিয়ে বিলীনের পথে।

তুরাগের দুইতীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে শত শত শিল্প কারখানা। শিল্প মালিকরা তাদের মিলের বর্জ্য মেশানো পানি ও বর্জ্য নদীতে ফেলে প্রতিনিয়ত নদীর পানি দূষিত করে চলেছে । শিল্প বর্জ্য মেশানো বিষাক্ত পানির কারণে নদীর মাছসহ সকল প্রকার জলজ প্রাণী মরে যাচ্ছে। এতে নদী তীরবর্তীসহ আশপাশের মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় পুষ্টির চাহিদা মিটাতে পারছে না। এ অঞ্চরের জেলে সম্প্রদায় নদী হাওর বিল-ঝিলে মাছ ধরে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করত। নদী শুকিয়ে যাওয়ার ফলে তারা আর পূর্বের ন্যায় মাছ ধরতে না পারায় অসহায়ভাবে জীবন যাপন করছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রখ্যাত নাবিক আর পি যাহা এক সময় জাহাজের ব্যবসায় নিয়োজিত থাকায় তিনি তার অনেক জাহাজ এ নদী দিয়ে চালনা করতেন। তুরাগ নদী ভরাটের ফলে এখন আর সে জাহাজগুলো এ নদীতে চলাচলতো দূরের কথা বড় কোন নৌকাও এ নদী দিয়ে চলতে পারে না। যমুনা নদীর পানি যে ধলেশ্বরী নদী হয়ে তুরাগ নদীতে আসত, সে নদীর মুখে তারাকান্দি নামক স্থানে বাঁধ নির্মাণ করার ফলে এখন আর নদীতে পূর্বের ন্যায় পানি প্রবাহিত হয় না। ফলে তুরাগ নদীতে চরপড়ে নদীর অস্তিত্ব হারাতে চলেছে। নদী ভরাট হওয়ার ফলে কার্তিক/অগ্রহায়ণে নদীতে পানি থাকে না। ফলে এ অঞ্চলের কৃষকসমাজ সেচের অভাবে তাদের কৃষি কার্য চাহিদা মোতাবেক পরিচালনা ও ফসল উৎপাদন করতে পারছে না। এতে দেশের কৃষকসমাজ দিন দিন হতদরিদ্র হয়ে পড়ছে বলেও নদীর পার্শ্ববর্তী বসবাসরত মানুষ দাবি করেন। এ ছাড়া নদী ভরাটের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশে বেড়ে উঠা ভূমি দস্যুদের প্রভাব। ভূমি দস্যুদের ক্ষমতার দাপটে নদী ভরাট করে নদীর কিনারে স্থাপন করা হচ্ছে শিল্প কারখানা। এ তুরাগ নদীর উৎসস্থল হতে বুড়িগঙ্গা পর্যন্ত শত শত শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে।

এভাবে নদী ভরাট করে শিল্প স্থাপন করা হলে এদেশের সকল ছোট-বড় নদী নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে বলে সাধারণ মানবগোষ্ঠীর বিশ্বাস। অসৎ সরকারি কর্মচারীদের যোগসাজশে এককালের প্রমত্তা তুরাগ নদী এখন অনেক স্থানে খালে পরিণত হয়ে গেছে। সরকারি ও বেসরকারি সংগঠনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় তুরাগ নদীকে রক্ষার জন্য অনেক আন্দোলন হলেও তুরাগ দখল থেমে থাকেনি। বিভিন্ন রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে প্রশাসন যদি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করে তাহলে নিকট ভবিষ্যতে তুরাগ নদীর চিহ্ন বাংলাদেশের মানচিত্র হতে মুছে যাবে।