স্মরণে নাসিরউদ্দিন পিন্টু : জাতি চিরকাল অনুভব করবে তোমার শূন্যতা

0

বিএনপি’র পরীক্ষিত লড়াকু সৈনিক, ছাত্র-জনতা-এলাকাবাসী, সকলের প্রিয় নাসিরউদ্দিন আহমেদ  পিন্টু ভাই আজ ১ম মৃত্যুবার্ষিকী ।

পিন্টু ভাই ছিলের দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার অত্যন্ত আস্থাভাজন। কিন্তু তা সত্ত্বেও  বারবার কারাবরণ করাই যেন ছিল নাসিরউদ্দিন আহম্মেদ পিন্টু ভাইয়ের নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস।  বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের একটি বড় অংশ কেটেছে তার কারাগারে, এক জেল থেকে অন্য জেলে। 
প্রতিদ্বন্দ্বী দল যখনই ক্ষমতায় এসেছে, তখনই পিন্টুর জায়গা হয়েছে জেলে। বিএনপি’র জন্য অন্তপ্রাণ, এককালের রাজপথ কাঁপানো ছাত্রনেতা পিন্টু গত বছরের এই দিনে তার জীবনের মায়া ত্যাগ করে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন সেই কারাগার থেকেই।

তবে ঢাকায় এলাকার উন্নয়নে অবদানের কথা তার এলাকাবাসী কোনদিনও ভুলে যাবে না।মরহুম নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টু মানুষের মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সকল স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও লড়াই সংগ্রামে যে ভূমিকা পালন করেছিলেন তা দেশবাসী চিরকাল স্মরণ রাখবে। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) একজন অভিজ্ঞ ও জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ এবং সমাজসেবককে হারালো যার শূন্যস্থান সহজে পূরণ হওয়ার নয়।

দেশে ও প্রবাসে নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টুর বিভিন্ন রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৮৪ সালে ঢাকা মহানগরের লালবাগ থানাধীন তৎকালীন ২১ নম্বর ওয়ার্ড (হাজারীবাগ) ছাত্রদলের আহ্বায়ক নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে ছাত্র রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিক অভিষেক ঘটে নাসির 
উদ্দিন আহমেদ পিন্টুর। যদিও তারও প্রায় দুই বছর আগে থেকেই তিনি ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৮৫ সালে তৎকালীন সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় লালবাগ থানার আহ্বায়ক হিসেবে ছাত্রদলের হাল ধরেন তিনি। ১৯৮৯ সালে তিনি ঢাকা মহানগর ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ওই কমিটিতে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন আবুল খায়ের ভূঁইয়া।

19771_1

নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টু জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। কঠোর পরিশ্রম আর নিষ্ঠা দিয়ে তিনি তৃণমূল পর্যায় থেকে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির মত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।  ১৯৯৪ সালে তিনি ঢাকা মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি নির্বাচিত হন। তার সাথে এ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সাইফুল আলম নীরব। একই সময় তিনি ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদকেরও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৭ সালে শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী ও হাবীব-উন-নবী খান সোহেলের কমিটি গঠিত হলে এতে তিনি সিনিয়র সহসভাপতির পদ লাভ
করেন। ১৯৯৮ সালে তিনি ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এ কমিটিতে সভাপতি ছিলেন হাবীব-উন-নবী খান সোহেল। ২০০০ সালে নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টু সভাপতি এবং সাহাবউদ্দিন লাল্টু সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের ১লা অক্টোবর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে
ছাত্রদলের সভাপতির পদে থেকেই ঢাকা-৮ আসন (লালবাগ-হাজারীবাগ-কামরাঙ্গীরচর) থেকে সর্বাধিক ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। যদিও বিএনপি’সহ চারদলীয় জোট সরকার গঠনের কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি গ্রেফতার হয়ে কারাগারে যাতে বাধ্য হয়েছিলেন। কারণ তিনি
ছিলেন অন্যায়ের সাথে আপোষহীন, এ সময় তিনি ২২ দিন কারাগারে ছিলেন। তদুপরি, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলকে সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করার পিছনে তার অবদান চিরস্মরণীয়। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে যখনই বাংলাদেশের গণতন্ত্র হুমকির সম্মুখীন হয়েছে তখনই নাসির
উদ্দিন আহমেদ পিন্টু ঢাকার রাজপথে গর্জে উঠেছেন। বর্তমান অবৈধ সরকারেরও বড় ভয় আর আতঙ্কের নাম ছিল নাসির উদ্দিন পিন্টু। সে কারণেই মিথ্যা মামলায় বছরের পর বছর কারারুদ্ধ রেখে, উন্নত চিকিৎসার সুযোগ না দিয়ে তাকে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে।

ছাত্র রাজনীতি ছাড়ার পর তিনি মূল দল বিএনপিতে সক্রিয় হন। তিনি ঢাকা মহানগর বিএনপির খোকা-সালাম (সাদেক হোসেন খোকা সভাপতি ও আবদুস সালাম সাধারণ সম্পাদক) কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন। কারাগারে বন্দী অবস্থায় বিএনপির নতুন কমিটি গঠিত হলে তিনি কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরে মির্জা আব্বাসকে আহ্বায়ক ও হাবীব-উন-নবী খান সোহেলকে সদস্য সচিব করে কমিটি গঠিত হলে সেখানে যুগ্ম-আহ্বায়কের দায়িত্ব দেয়া হয় তাকে।রাজনীতির পাশাপাশি পিন্টু শিশু ও ক্রীড়া সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি একজন ভালো 
ফুটবলার ছিলেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সাথে ও পুরান ঢাকার সকল সামাজিক সংগঠনের সাথেই জড়িত ছিলেন তিনি।

pintu-3-300x290

পিন্টু ভাই তার ৩৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনের ১০ বছর জেলে কাটিয়েছেন। জানা যায়, ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত মোট চার দফায় প্রায় সাড়ে তিন বছর জেলে বন্দী ছিলেন। চারদলীয় জোট সরকারের শুরুতে তিনি ২২ দিন জেল খেটেছেন। ওয়ান-ইলেভেনের পটপরিবর্তনের পর ২০০৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তিনি গ্রেফতার হন। সেই সময়ে প্রায় ২২ মাস জেলখানায় কাটে তার। ২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর নির্বাচনের কয়েক দিন আগে তিনি মুক্তি পান। এরপর প্রায় পাঁচ মাস পর ২০০৯ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সংঘটিত বিডিআর বিদ্রোহ মামলায় উসকানি ও সহযোগিতার অভিযোগে আসামি করা হয় তাকে। এই মিথ্যা মামলায় জামিনের জন্য হাইকোর্টে হাজিরা দিয়ে ফেরার পথে ২০০৯ সালের ২রা জুন গোয়েন্দা পুলিশের হাতে আটক হন। পরে ওই বানোয়াট মামলায় যাবজ্জীবন সাজা দেয়া হয় এই সাহসী রাজনীতিবিদকে। সেই সাজা খাটা অবস্থায়ই
গত বছরের এই দিনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তবে পিন্টু’র এই আকস্মিক মৃত্যুতে গণমাধ্যমসহ সর্বত্রই  রাজশাহীর জেলারের বিরুদ্ধে পিন্টুকে চিকিৎসা ব্যবস্হা না দেয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছিল যা আজও বর্ত্তমান।

pintu vai xclusive
এমন কি হঠাৎ করে পিন্টুকে নারায়ণগঞ্জ কারাগার থেকে রাজশাহী কারাগারে স্হানান্তরের ব্যাপারেও সন্দেহ প্রকাশ করেছে ঢাকার বিভিন্ন গণমাধ্যম।

শিক্ষাজীবন : ১৯৬৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন নাসিরউদ্দিন আহম্মেদ পিন্টু। হাজারীবাগের সালেহা হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। এ ছাড়া তিনি ঢাকা সিটি কলেজে উচ্চমাধ্যমিক স্তরের লেখাপড়া করলেও ঢাকার টঙ্গীর একটি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দেন। পরে তিনি জগন্নাথ কলেজ থেকে বিকম এবং হিসাববিজ্ঞানে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টু ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে পুরান ঢাকার লালবাগ থেকে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এর আগে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

বৈবাহিক জীবনঃ ঢাকার সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও ছাত্রদল নেতা ছাইদুর রহমান নিউটনের বোন ‘নাসিমা আক্তার কল্পনা’কে বিয়ে করেন নাসিরউদ্দিন আহম্মেদ পিন্টু। নাসিমা আক্তার কল্পনা নিজেও ছিলেন ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক নির্বাচিত কাউন্সিলর।

সন্তানাদিঃনাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুর বড় ছেলে শাহরিয়া আহমেদ রাতুল কানাডার টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেন। আর ছোট ছেলে নাহান আহমেদ স্কলাস্টিকায় অধ্যয়ন করে।

পিন্টুর বাবা মরহুম নিজাম উদ্দিন পুরান ঢাকায় সমাজ সেবক ছিলেন। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে পিন্টু ছিলেন সবার বড়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক ও আধুনিক সেনাবাহিনীর নির্মাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অনুসারীরা কখনোই স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতীক জাতীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়নি এবং হতেও পারে না। মূলত রাজধানী ঢাকাকে নেতাশূন্য করার নীলনকশার অংশ হিসাবেই সাহসী রাজনীতিবিদ পিন্টুকে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে দেয়া হয়। তার উপর নির্মম নির্যাতন চলে বছরের পর বছর। প্রহসনের বিচারে সাজা দেয়া হয়। এ ধারাবাহিক জুলুমের পরিণতিতে নাসির উদ্দিন পিন্টু শাহাদাৎ বরণ করলেন বললে খুব ভুল বলা হবেনা।

এ অবৈধ আওয়ামী সরকারের হিংস্র থাবায় একে একে আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে গেছেন চৌধুরী আলম, এম ইলিয়াস আলী, সালাউদ্দিন আহমদসহ অনেকেই।

সুতরাং পিন্টু ভাইদের জন্য আজ শোক ও ক্রন্দনই যথেষ্ট নয়, শোককে শক্তিতে পরিণত করে আগামীদিনে সাহস ও সংযমের সাথে দেশকে নেতা ও সেনা শূন্য করার চক্রান্ত মোকাবেলায় বিএনপি’র লক্ষ-কোটি নেতাকর্মীর পাশাপাশি সমগ্র দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

লেখক: মারুফ খান (প্রবাসী সংগঠক, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক কর্মী )