স্বৈরশাসনের পরিণাম শুভ হতে পারে না

0

রাকেশ রহমান

দেশের মিডিয়ায় সব খবর পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে রাজনীতির খবর। ফলে বিদেশি মিডিয়ার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে, যেমনটি বেড়েছিল স্বৈরাচারী এরশাদের আমলে। তখন বিবিসি ও ভোয়া’র (ভয়েস অব আমেরিকা) খবর শোনার জন্য মানুষ ব্যাকুল হয়ে থাকত। রাস্তাঘাটে দোকানপাটে বিদেশি রেডিওর খবর শুনতে মানুষের ভিড় জমে যেত। তখনই মূলত বিদেশি রেডিওতে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে সারাদেশে সাংবাদিক হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন বিবিসির আতাউস সামাদ ও ভোয়ার গিয়াস কামাল চৌধুরী। সেইরকম সাহসী ও নীতিবান সাংবাদিকের এখন খুব অভাব।

তার পরও অনেকক্ষেত্রে বিদেশি মিডিয়াই ভরসা। দেশের মিডিয়ায় প্রকৃত চিত্র না পেয়ে মানুষ সেদিকে ঝুঁকছে। বহির্বিশ্বের খ্যাতনামা অধিকাংশ মিডিয়ায় বাংলাদেশের নাম নানাভাবেই আলোচিত হচ্ছে। একদিকে যেমন জঙ্গি বা সন্ত্রাসবাদের প্রসঙ্গটি আসছে, তেমনি আসছে স্বৈরশাসনের বিষয়টিও।

সম্প্রতি বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্র চলছে। প্রতিবেদনটির সার-সংক্ষেপ হচ্ছে, ‘২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে কার্যত বিরোধী দলবিহীন একটি সংসদ বাংলাদেশে বিরাজ করছে। রাজনৈতিক মহলে সরকারকে অগণতান্ত্রিক হিসেবেও আখ্যায়িত করা হচ্ছে। রাজনীতিবিদরা এমনকি সরকারের শরীক জাতীয় পার্টির নেতারাও বলছেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্র নেই। স্বৈরতন্ত্র চলছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সবার অংশগ্রহণে একটি জাতীয় নির্বাচনের বিকল্প নেই বলে মনে করেন তারা। ভোটারবিহীন ১০ম সংসদ নির্বাচনের আগে যার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল আওয়ামী লীগ।’

বিবিসিকে প্রদত্ত বক্তব্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ১৫৪ জন প্রার্থীকে তারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত করেছে। আওয়ামী লীগের মতো একটি রাজনৈতিক দল এখন জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তাকে এখন যে সমস্ত পন্থা নিতে হচ্ছে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য। এই পন্থাগুলো কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক দলের পন্থা নয়, যেমন জোর করে ক্ষমতায় টিকে থাকা, নির্বাচনকে ম্যানিউপুলেট করা।

একইভাবে ক্ষমতাসীন সরকারের শরিক জাতীয় পার্টির অন্যতম নেতা জিএম কাদের বিবিসিকে প্রদত্ত বক্তব্যে বলেন, বিএনপির জাতীয় নির্বাচন বর্জনের কারণে বাংলাদেশের সংসদ এখন কার্যত বিরোধী দলবিহীন। জাতীয় পার্টিকে গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে বিরোধীদলের নামকরণ করা হয়েছে। কিন্তু এ পর্যন্ত জাতীয় পার্টি সরকারবিরোধী কোনো প্রস্তাবে না ভোট দেয়নি। তাই এটা একটা একদলীয় সংসদ বলা যায়।

জাতীয় পার্টি চাপের মুখে এ অবস্থানে এসেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই সরকার তার গণতান্ত্রিক চরিত্র হারিয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে গণতন্ত্র নেই বলেই আমি মনে করি। একটার পর একটা নির্বাচন খারাপ হচ্ছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যথেষ্ট সংকুচিত করা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। এটাতো নিশ্চিতভাবে স্বৈরশাসন।

সরকার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কথা বলে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে মধ্যবর্তী নির্বাচন দেয়ার কথা বলেছিল। যদিও এখন বলছে ২০১৯ সালের আগে জাতীয় নির্বাচন হবে না। এ প্রসঙ্গে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের বক্তব্য, সরকার বলেছিল এটা। তারও ওপর মানুষ আছে। ১৬ কোটি মানুষ আমাদের, কিন্তু মৌলিক বিষয়ে ঐক্যমত্য আছে। এখানে কেউ অন্য কিছু চায় না, কার্যকর গণতন্ত্র চায়। পাকিস্তান আমল কিংবা বাংলাদেশ আমল যখনই বিতর্কিত নির্বাচন হয়েছে তখনই কিন্তু সমস্যাগুলো সৃষ্টি হয়েছে। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। আজকে একটা কথা বলা হচ্ছে যে উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্যই উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ। তবে সংবিধানের মূলনীতি বাদ দিয়ে তো উন্নয়ন হবে না। সংবিধানের মূলনীতির মধ্যে আছে গণতন্ত্র।

এর আগে জার্মানভিত্তিক গণমাধ্যম ডয়েচে ভেলে’র এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের গত সাত বছরের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়। তাতে বলা হয়, জনমত উপেক্ষা করে ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করছে সরকার। কিন্তু সেজন্য দমন-পীড়ন ছাড়া উপায় থাকে না। আর এই দমন-পীড়ন চলে মূলত বিরোধীদলের ওপর। এক পর্যায়ে তা সমাজের অন্যান্য শ্রেণি ও পেশার মানুষের ওপর প্রয়োগ হতে থাকে। এতে সমাজে নানা রকমের বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। বেড়ে যায় গুম-খুনের ঘটনা। সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার, এই গুম-খুনের অভিযোগ রাষ্ট্রীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে।

অন্যদিকে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ও তার অঙ্গসংগঠনগুলো নানা রকমের অন্যায়-অনিয়ম, দুর্নীতি, ঠিকাদারি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু সরকারের দমন-নিপীড়নে বিরোধীদল দুর্বল হয়ে পড়ায় এসবের বিরুদ্ধে তেমন প্রতিবাদ হচ্ছে না। সামগ্রিকভাবে দেশে আইনের শাসন বলতে কিছু নেই। জনমানুষের জীবন চরম নিরাপত্তাহীন। ক্ষমতাসীনদের আচার-আচরণ-দাম্ভিকতায় মানুষ অতিষ্ঠ। ক্ষমতাসীনরা তাদের যাবতীয় অপরাধ আড়াল করতে তৎপর। এমনটিই হচ্ছে বাংলাদেশের গত সাত-আট বছরের অবস্থা।

গণমাধ্যমের ওপরও যে সরকারের দমন-পীড়ন চলছে, তারও একটি চিত্র ওই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়। বলা হয়, টিভি ‘টকশো’ নানা কায়দায় দমন করা হচ্ছে। সাংবাদিক ও সম্পাদকদের ওপর রয়েছে গুম ও হত্যার হুমকি। মিডিয়া মালিকদের যেহেতু অন্য ব্যবসা আছে, সেগুলোতে সমস্যা তৈরি করে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। ক্ষেত্রবিশেষ দলীয় মাস্তানদের লেলিয়ে দেয়া হচ্ছে মিডিয়া কর্মীদের ওপর। বিপদের আশঙ্কায় অনেক মিডিয়া নিজ থেকেই নিজেকে ‘সেন্সর’ করছে।

সম্প্রতি ফেসবুক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ করে দিয়ে কারো কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে এক ধরনের ভীতিকর পরিবেশও সৃষ্টি করা হয়েছে। এককথায় ডয়েচে ভেলের প্রতিবেদনে বাংলাদেশে ভয়ঙ্কর স্বৈরশাসন জেঁকে বসার চিত্রই ফুটে ওঠে যা নিয়ে কারোরই দ্বিমত পোষণের সুযোগ নেই।

স্বৈরাচারী এরশাদের আমলেও দেশে এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। দেশের গণমাধ্যমগুলোর স্বাধীনতা ছিল না। তখন বিদেশি গণমাধ্যম বিশেষ করে বিবিসি ও ভোয়া হয়ে ওঠে গণতন্ত্রকামী মানুষের আস্থাস্থল। তবে স্বীকার করতেই হবে, দেশের বর্তমান পরিস্থিতি এরশাদ আমলের চেয়েও অনেক খারাপ এবং এত খারাপ যে, এরশাদের মতো স্বৈরাচারও এখন বলতে বাধ্য হচ্ছেন, দেশে গণতন্ত্র নেই।

আসলে দেশের বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা চলে কেবল স্বাধীনতা-উত্তর মুজিব আমলের সঙ্গেই। তখন উপর্যুপরি লুটপাট চালিয়ে এবং বিরোধীদের কঠোর হাতে দমন করে দেশে কায়েম করা হয়েছিল ভয়াবহ অরাজকতা। ক্ষমতাসীনদের লুটপাট ও রিলিফ আত্মসাতের কারণে দেশে দুর্ভিক্ষ নেমে আসে এবং তাতে কয়েক লাখ নারী-পুরুষ-শিশুর অকাল মৃত্যু ঘটে। কিন্তু দেশের মানুষের প্রতিবাদ করার মতো অবস্থা ছিল না। দেখা গেছে, যারাই দুঃশাসনের প্রতিবাদ করতে গেছেন তারাই প্রকাশ্য ও গোপন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। মিডিয়ার ওপর তখন প্রকাশ্য নির্যাতনই চলতো। রাতে হানা দিয়ে পত্রিকার প্লেট-কম্পোজ ভেঙে দেয়া হত। একপর্যায়ে চারটি বাদে সব দৈনিক বন্ধও করে দেয়া হয়।

তখন সরকারি রেডিও-টিভি ছাড়া অন্য কোনো ইলেকট্রনিক মিডিয়া ছিল না। থাকলে সেগুলোর ভাগ্যেও একই পরিণতি ঘটত, যেমন এই সরকারের আমলে ঘটেছে চ্যানেল ওয়ান, সিএসবি, দিগন্ত ও ইসলামী টিভির ভাগ্যে। তখন মিডিয়া বন্ধ করে যেমন জনগণের বাক-স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছিল, তেমনি সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছিল গণতন্ত্রকে। কায়েম করা হয়েছিল একদলীয় শাসন বাকশাল। অস্বীকার করা যাবে না, বর্তমানে যেন তারই পুনরাবৃত্তি ঘটছে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একদলীয় ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে কার্যত গণতন্ত্রকেই হত্যা করা হয়েছে। এই সরকারের হাতে গণতন্ত্র যে মোটেও নিরাপদ নয়, তা গত বছর অনুষ্ঠিত তিন সিটি নির্বাচনে প্রমাণিত হয়েছে এবং সাম্প্রতিক পৌরসভা নির্বাচনে তা আরেকবার প্রমাণিত হয়েছে।

বর্তমান সরকার ও বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে একটি নির্বাচনও জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। বহির্বিশ্বের কাছেও নির্বাচনগুলো গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। খোদ জাতিসংঘ সরকারের কাছে তিন সিটি নির্বাচনের অনিয়মের তদন্ত চেয়েছে। সাম্প্রতিক পৌরসভা নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদলের ভোট ডাকাতির উৎসব দেশ-বিদেশের মিডিয়ায় যথার্থই প্রতিফলিত হয়েছে। ক্ষমতাসীন সরকার নির্বাচনের নামে কার্যত দেশের পৌরসভাগুলো জোর করে দখল করে নিয়েছে। একই ঘটনা ঘটেছে তিন সিটি ও উপজেলাগুলোর ক্ষেত্রেও। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোট ডাকাতির মাধ্যমে সরকার তৃণমূল পর্যায়েও একদলীয় দখলদারিত্ব কায়েম করেছে। কিন্তু এটা খুবই অশুভ আলামত। অতীতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর পিতা এবং বর্তমান সরকারের অন্যতম শরীক এরশাদও দেশে এমন স্বৈরশাসন কায়েম করেছিলেন। কিন্তু তাদের কারোরই শেষরক্ষা হয়নি।

অনেকে মুজিব আমল না দেখলেও এরশাদের আমল দেখেছেন। দীর্ঘ নয় বছর ধরে দেশে স্বৈরতন্ত্র কায়েম করলেও ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে তাকে বিদায় নিতে হয়েছিল খুবই করুণ ও লজ্জাজনকভাবে। স্বৈরাচারী এরশাদের পতনের পর সবাই ধারণা করেছিলেন, বিন্দুমাত্র লজ্জাবোধ থাকলে বাংলাদেশে আর কোনোদিন আর কোনো স্বৈরাচার চেপে বসবে না। কিন্তু আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি গণতন্ত্রকামী জনগণের সে ধারণা পাল্টে দিয়েছে নির্বাচনের নামে জালিয়াতি-প্রহসন করে। কথিত ওই নির্বাচনের মাধ্যমেই বাংলাদেশে স্বৈরশাসন জেঁকে বসেছে। এর পরিণতি নিশ্চয়ই শুভ হতে পারে না।

লেখক : কলামিস্ট ও প্রেসিডিয়াম সদস্য, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এনডিপি)