স্বীকারোক্তি আদায়ে পরিবারকে চাপ দেওয়ার অভিযোগ

0

কুমিল্লা সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজের ইতিহাস দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান (তনু) হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তাঁর মা-বাবা ও চাচাতো বোনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন, সোহাগীর সঙ্গে ভিক্টোরিয়া কলেজের কোনো শিক্ষার্থীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল—এমন স্বীকারোক্তি আদায়ে চাপ দেওয়া হচ্ছে।

সোহাগীর মা আনোয়ারা বেগম, বাবা মো. ইয়ার হোসেন ও চাচাতো বোন লাইজু জাহানের সঙ্গে গতকাল রোববার কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অতিথিকক্ষে কথা হয়। তাঁরা সেনানিবাস এলাকা থেকে বেরিয়ে মুরাদনগরের মির্জাপুরের গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
২০ মার্চ রাতে কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় সোহাগী খুন হওয়ার সাত দিন পরও সন্দেহভাজন কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গত শুক্রবার রাতে ও শনিবার সোহাগীর পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

র্যা ব-১১ কুমিল্লার উপপরিচালক মেজর মো. খুরশীদ আলম বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কয়েকজনকে আনা হয়েছিল। তাই সোহাগীর মা ও ভাইবোনকে আনা হয়েছিল। তাঁরা কাউকে আটক করেছেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, তদন্ত একটা চলমান প্রক্রিয়া। তার অংশ হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

সোহাগী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তাঁর বাবা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের কর্মচারী ইয়ার হোসেন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের নামে কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলাটি শুক্রবার পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়।

জিজ্ঞাসাবাদ প্রসঙ্গে সোহাগীর মা আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘এক কথা আশি বার জিগগাস করছে। কন ভিক্টোরিয়া কলেজের কার সঙ্গে তনুর সম্পর্ক আছল। আমি তো মেয়ে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে গেলে খোঁজ রাখছি। ভেতরে তো খোঁজ রাখি নাই। এইখানে সে ছোট বেলা থেকে বড় হইছে। সব অনুষ্ঠানে নাচগান করছে। নাটকও করছে। কোনো দিন কোনো কথা উঠে নাই। এখন মেয়ে নাই হাজারটা কথা উঠতেছে।’

সোহাগীকে কেন তাঁর মা-বাবা বিয়ে দেননি এমন প্রশ্নও উঠেছে। সোহাগীর বড় ভাইয়ের সঙ্গে পরিবারের অন্য আত্মীয়দের মধ্যে কারও সঙ্গে সম্পর্ক আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন করা হচ্ছে। এসব জানিয়ে কাঁদতে কাঁদতে আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘এইগুলা কী জিগাস করে। ক্যান করে? তনুর খুনের সঙ্গে এগুলার কী সম্পর্ক?’

এর আগে শুক্রবার রাত ১২টায় সোহাগীর মা আনোয়ারা বেগমকে র্যা ব-১১-এর কার্যালয়ে নেওয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদের পর ফজরের আজানের সময় তাঁকে ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অতিথিকক্ষে রেখে যান তাঁরা। আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘মুরাদনগরের মির্জাপুরের গ্রামের বাড়ি থেকে আমারে আনছে রাত ১২টার দিকে। কইছে আসামি ধরছে। দেখাইব। পরে ইবা-হিবা কইছে। আমার ছেলেরেও কী কী জিগাইছে। ভোরে আজানের সময় আমারে সোহাগীর আব্বার কাছে দিয়ো গ্যাছে ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অতিথিকক্ষে।’

সোহাগীর বাবা ইয়ার হোসেনকেও একই ধরনের প্রশ্ন করা হয় বলে জানান তিনি। ইয়ার হোসেন বলেন, ‘আমি তো আমার মেয়ের খুনের বিচার চাই। আমার থাইকা নাম জানতে চায়। আমি কার নাম বলব।’ চোখ মুছতে মুছতে তিনি বলেন, ‘তনু আমার একমাত্র মেয়ে। সে নাচগান করতে ভালোবাসত। কোনো দিন তার কোনো চাওয়া অপূর্ণ রাখিনি। পড়ালেখা শেষ করে সে সেনানিবাসের ভেতরের স্কুলগুলোয় নাচগানের শিক্ষক হতে চেয়েছিল।’

জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়ে সোহাগীর চাচাতো বোন লাইজু জাহান বলেন, ‘আমার কাছ থেকে নাম জানতে চাইছে। আমি বলছি একজন তাকে (সোহাগী) প্রপোজ করছিল। কিন্তু সে খুন করছে এই কথা বলি নাই। কারণ, তাকে কখনো দেখি নাই জোরাজুরি করতে বা ডিস্টার্ব করতে। সে এইখানে থাকেও না।’

সোহাগীর পরিবার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে সেনানিবাসের ভেতরে ‘অন্য’দের ঢুকতে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘অন্যদের ঢুকতে দিক। তারা দেখুক। ক্যামেরা চেক কইরা দেখুক কে খুন করছে।’

পরিবারের সদস্যরা জানান, ২০ মার্চ রাত সাড়ে ১০টার দিকে সোহাগীর লাশ সেনানিবাসে তাঁদের বাসার দুই-তিন শ গজ দূরে উদ্ধার হয়। খুন করার আগে হত্যাকারীরা সোহাগীর মাথার হিজাব টেনে খুলে ফেলে, মাথার লম্বা চুল কাঁচি দিয়ে কেটে ফেলে।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করলেন স্থানীয় সাংসদ ও প্রশাসন: গতকাল বেলা একটায় ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অতিথিকক্ষে গিয়ে সোহাগীর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেছেন কুমিল্লা-৬ (আদর্শ সদর) আসনের সাংসদ আ ক ম বাহাউদ্দিন, জেলা প্রশাসক মো. হাসানুজ্জামান, জেলা পুলিশ সুপার মো. শাহ আবিদ হোসেন ও বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা। এ সময় সোহাগীর মা-বাবা তাঁদের সঙ্গে কথা বলেন। সেখানে সাংসদ পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।