স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চাঁদা ও ঘুষ বাণিজ্য

0

জিসাফো ডেস্কঃ দেশে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ আছে ৭১টি এবং ডেন্টাল কলেজ ২৫টি। এসব মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজের কোনোটিই নিয়মনীতি মেনে চলছে না। কোনোটির নীতিমালা অনুযায়ী নেই প্রয়োজনীয় জমি, কোনোটির শিক্ষক নেই, রোগী নেই, অবকাঠামো নেই। প্রভৃতি নানাভাবে নীতিমালা লঙ্ঘনের মধ্য দিয়েই চলছে এই বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলো। আর সেই সুযোগটিই নিচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদফতর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতিবাজচক্র। বেসরকারি মেডিকেল কলেজের অনুমতি নবায়ন ও ছাত্রভর্তিকে কেন্দ্র করে দুর্নীতিবাজ চক্রটি ব্ল্যাকমেইলিং, চাঁদা ও ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে গত বছর প্রায় একশ’ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এবারও ছাত্রভর্তির মৌসুমকে কেন্দ্র করে একই চক্র মাঠে নেমেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত বারের মতো এবারও দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সেই একই ব্যক্তি, স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (মেডিকেল এডুকেশন) ডা. আব্দুর রশিদ। তিনি এই ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য অধিদফতরের তার অধীনস্থ কর্মকর্তাদের দিয়ে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের প্রিন্সিপাল ও মালিকদের হুমকি-ধমকি দিয়ে চলেছেন। মোটা অংকের টাকা না দিলে মেডিকেল কলেজের ছাত্রভর্তি বন্ধ করে দেয়া হবে, বলা হচ্ছে। এ ব্যপারে উদাহরণ হিসেবে গত ১৭ আগস্টের সভার তথ্য তুলে ধরা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত ১৭ আগস্ট বৃহস্প্রতিবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় পাঁচটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও একটি ডেন্টাল কলেজের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি কার্যক্রম স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। পরিচালনার জন্য সরকার নির্ধারিত নীতিমালার শর্ত পূরণ না করায় এ সকল কলেজের ভর্তি কার্যক্রম স্থগিত করা হয় বলে মন্ত্রণালয়ের তথ্য কর্মকর্তা পরীক্ষিৎ চৌধুরী ওইদিন সভাশেষে সাংবাদিকদের জানান। কলেজগুলো হলো ঢাকার নর্দান ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ, আইচ মেডিকেল কলেজ, সাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ, কেয়ার মেডিকেল কলেজ, কেরানীগঞ্জের আদ-দ্বীন বসুন্ধরা মেডিকেল কলেজ এবং রাজধানীর সাফেনা উইমেন্স ডেন্টাল কলেজ। সভায় অন্যদের মধ্যে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিব সিরাজুল ইসলাম, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর ডা. আবুল কালাম আজাদ, বিএমডিসির সভাপতি প্রফেসর ডা. শহীদুল্লাহ, বিএসএমএমইউর ডিন প্রফেসর ডা. ইকবাল আর্সলানসহ মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অবাক ব্যাপার হলো, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর প্রায় এক মাস হতে চললেও ১১ সেপ্টেম্বর এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ওই সভার কার্যবিবরণী অনুমোদিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ওই সভার কার্যবিবরণী মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা তৈরি করে রেখেছেন। কিন্তু, মন্ত্রীর অনাগ্রহের কারণে কার্যবিবরণী চূড়ান্ত করা যাচ্ছে না। আর এর মাঝে চলছে দরকষাকষি। পরিচালক ডা. আব্দুর রশিদ মন্ত্রী ও পরিদর্শন কমিটির সদস্যদের কথা বলে এই মেডিকেল কলেজগুলোর কাছে মোটা অংকের অর্থ ঘুষ চাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে অন্যান্য বেসরকারি মেডিকেল কলেজের কাছেও ঘুষ চাওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, সবগুলো মেডিকেল কলেজ পরিদর্শন করার পর নীতিমালা অনুযায়ী কোনটিতে কী ঘাটতি আছে তা বিবেচনায় এনে সমন্বিতভাবে অর্থাৎ একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়া কথা। স্বচ্ছতার জন্যই এই নীতি অনুসরণ করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তা করা হচ্ছে না। দুর্নীতিবাজ চক্রটি গত বারের মতোই আলাদা আলাদা সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে গেছে মন্ত্রণালয়কে। যাতে ঘুষ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ব্যাপকভাবে চালানো যায় সেজন্যই এই কৌশলের আশ্রয় নেয়া হয়েছে।
বস্তুত, মেডিকেল কলেজগুলো বিভিন্ন সময়ে চালুই হয়েছে নীতিমালা অনুসরণ না করে। আর পরবর্তীতেও কখনো নীতিমালা অনুসরণের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়নি। এই সমস্যাগুলো জিইয়ে রেখেছে মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরই। এরা নীতিমালা অনুসরণের কথা বলে চাপ দিয়ে, ব্ল্যাকমেইল করে শুধু কাড়ি কাড়ি ঘুষই আদায় করছে। বাস্তবে এগুলোকে নিয়মনীতি অনুযায়ী চালানোর ব্যাপারে এরা কখনো আন্তরিকভাবে কাজ করেনি। তাই মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষরাও সেই সুযোগটি নিয়েছে। এর কারণ, মন্ত্রণালয় এবং অধিদফতর নিজেরাই নিয়মনীতি মানে না, এখনো মানছে না। একই অপরাধে কোনোটির সাজা হচ্ছে, আবার কোনোটি ছাড় পেয়ে যাচ্ছে। পরিদর্শন রিপোর্টেও সামঞ্জস্যতা নেই। রিপোর্টও ভালো থেকে খারাপ, আবার খারাপ থেকে ভালো হয়ে যাচ্ছে। সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক ডা. আব্দুর রশিদ (চিকিৎসা শিক্ষা) বরাবরই একজন দুর্নীতিবাজ হিসেবে পরিচিত। তিনি দুর্নীতিতে হাতেনাতে ধরাও পড়েছেন ইতিপূর্বে। মন্ত্রণালয়ের তদন্তে তার দুর্নীতি প্রমাণিতও হয়েছে। তারপরও ডা. রশিদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। বরং সেই দুর্নীতি ধামাচাপা দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পরিচালক ডা. আব্দুর রশিদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের অত্যন্ত প্রিয়ভাজন বলে পরিচিত। মন্ত্রীর বাধার কারণেই রশিদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে তখন ব্যবস্থা নেয়া যায়নি। ফলে এই কর্মকর্তা দুর্নীতিতে এখন আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন।
( সূত্রঃ সাপ্তাহিক শীর্ষ কাগজে ২০১৭ সালের ১১ সেপ্টেম্বর )