সোহাগী তনু: ফরেনসিক মেডিসিনের অভিশাপ না অহংকার

0

জিসাফো ডেস্কঃ ভেবেছিলাম, তনুকে নিয়ে আর কিছু লিখবো না। কিন্তু  আগের একটি লেখার কারনে একাধিক অভিনন্দনের পাশাপাশি ফেসবুকের ইনবক্সে পরিচ্ছন্ন একটি হুমকি পেলাম।

হুমকিদাতা মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন ‘কুমিল্লা থেকে’ আমাকে বাংলাদেশের মেডিকোলিগ্যাল সার্ভিস নিয়ে কিছু ছবকের পাশাপাশি আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা, বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের সঙ্গে তার ভাষায় আমার মিসহ্যাপ (দ্বন্দ্ব) তার জানা আছে বলে আমাকে মনস্তাত্বিক চাপে রাখার হাস্যকর চেষ্টা চালাচ্ছেন। মেসেজের সঙ্গে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধানদের তালিকা সমৃদ্ধ বোর্ডের ছবি পাঠিয়েছেন, যেখানে আমাকে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে দেখানো আছে।

ভুল ইংরেজিতে লেখা সেই মেসেজদাতা সাখাওয়াত হোসেন নামে বাংলাদেশের ফরেনসিক বিভাগে কর্মরত কাউকে আমি চিনি না অথবা সে নামে কেউ আছেন বলেও আমার জানা নেই।

তবে হুমকির তথ্য এবং ইন্ধনদাতা যে ফরেনসিক বিভাগের কেউ হবেন তাতে সন্দেহের আপাতত কোনো কারণ নেই। কেননা, আমার সঙ্গে পিএসসি’র দ্বন্দ্ব যেমন তার জানার কথা নয়, তেমনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধানদের তালিকা সমৃদ্ধ বোর্ডের ছবিও তার পাওয়ার কথা নয়। তিনি অথবা তার ইন্ধনদাতা হয়তো জানেন না, পিএসসি’র সঙ্গে আমার সেই দ্বন্দ্ব সততার সঙ্গে মোকাবেলা করেছি বলেই আমার বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ প্রত্যাহার করে আমার অনুরোধে মন্ত্রণালয় আমাকে অবসর সুবিধা দিয়েছে।

এটি আমার সততার সুফল। সহযোগী অধ্যাপক পদবীতে থেকে নিজের নামের আগে অধ্যাপক লেখা ছিল আমার ভুল যা সংশোধনের জন্য অনুরোধ করেছি।

আসলে প্রায় এক যুগ ধরে অধ্যাপক পদে থাকায় ভুলটি হয়ে গেছে। ভুল ধরিয়ে দেওয়ার জন্য উভয়কে ধন্যবাদ। আলোচিত হুমকি সম্বলিত মেসেজে আমাকে জানানো হয়েছে, তদন্তকারী কর্মকর্তা না চাইলে বাংলাদেশে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য কোনো স্যাম্পল পাঠানো যায় না, যা আমার জানা উচিত। তদন্তকারী কর্মকর্তা না চাইলে কেমিক্যাল টেস্টের জন্য যদি স্যাম্পল পাঠানো যায়, তবে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য স্যাম্পল কেন পাঠানো যাবে না তা আমার বোধগম্য নয়।

শুনলাম, ‘সোহাগী তনু: ফরেনসিক মেডিসিনের অভিশাপ না অহংকার’ লেখায় তনুর ময়না তদন্তে জড়িতদের আমি অর্ধশিক্ষিত বলেছি বলে তারা গোস্বা করেছেন। আমার সে ধারণা সম্ভবত ভুল। ঘটনা সামাল দিতে তারা এখন একসঙ্গে বসে যেভাবে মিটিং-সিটিং আর বিরিয়ানি ইটিং করছেন, তাতে তাদের অর্ধশিক্ষিত বললে বেশিই বলা হয়ে যাবে। ভুলে গেলে চলবে না, আলোচ্য ঘটনায় তারা অন্যায় করে থাকলে শাস্তি পেতে পারেন, ভুল করে থাকলে তা স্বীকার করে মাফ চাইতে পারেন আর ভুল না করে থাকলে বুক ফুলিয়ে যে যার প্রতিবেদন প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন। এর কোনো ব্যত্যয় হলে সারা জীবনের সঞ্চিত সম্মান নিমেষেই ভুলুণ্ঠিত হয়ে যাবে।

এ রকম চিকন এক তরবারির ওপর তারা দাঁড়িয়ে আছেন বলেই আমি সেখান থেকে তাদের উদ্ধারে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিলাম। ইঙ্গিত দিয়ে বলেছিলাম, যে ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদনের জন্য দ্বিতীয় পক্ষের ময়না তদন্তকারীরা অপেক্ষায় আছেন, সেই প্রতিবেদনে চমক ছাড়া আশার কিছু আছে বলে আমি মনে করি না। তনুর মরদেহ আর প্যান্টি নিয়ে চেইন অব কমান্ড না মেনে তো আর কম ঘাটা-ঘাটি হয়নি। ফলে তা কন্টামিনেশন হওয়ার প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। তাই যদি হয়, তাহলে যে তিনজনের ডিএনএ সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে, তার একটি যদি প্রথম ময়না তদন্তকারীর (আসলে হবে সিএমএইচে প্রথম মৃতদেহ পরীক্ষাকারী ডাক্তারের) হয়ে থাকে, তাতে আমি মোটেই অবাক হবো না। অবশ্য ঘাবড়ানোর কিছু নেই।

ভ্যাজাইনাল সোয়াবের ডিএনএ পচে গেছে, প্যান্টিতে ডিএনএ’র উপস্থিতি মানেই তো আর ধর্ষণ নয়। তাদের আশ্বস্ত করতে জানিয়েছিলাম বিখ্যাত বক্সার মাইক টাইসনের গল্প। তিনি যে বিছানায় একজন বিউটি প্যাজেন্টকে ধর্ষণ করেছিলেন, সেই বিছানার চাদরে দুই শতাধিক মানুষের সিমেন (আসলে হবে ডিএনএ) শনাক্ত হয়েছিল। এর মানে এই নয় যে, দুইশ’ মানুষ তার ধর্ষক ছিল!!

আমার সে লেখায় দেওয়া ইংগিত তারা বুঝতে পারেননি! তাই তারা যুগল বেধে খুঁজে ফিরছেন এমন এক পরামর্শ যাতে দুজনেরই কূল রক্ষা হয়! তারা কি নিজেদের ভুল বুঝতেও অক্ষম হয়ে পড়েছেন!! আরো সোজা করে তাদের ভুল ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা যাক। জানুন তনুর ঘটনায় একজন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ হিসেবে যা

আপনাদের করা উচিত ছিল এবং যা আপনারা করেছেন। যদি কিছু বাদ পড়ে যায়, তবে সেটাই মোদ্দা কথায় আপনাদের ভুল।

১। আত্মীয় এবং তদন্তকারী কর্মকর্তার সঙ্গে ঘটনা নিয়ে আলোচনা এবং সুরতহালের সঙ্গে মিল-অমিল।

২। ঘটনাস্থল পরিদর্শন আর সম্ভাব্য রহস্য সমাধানের সূত্র কালেকশন।

৩। সিএমএইচ থেকে চিকিৎসার ফাইল এবং অন্তর্বাস এনে পরীক্ষা।

৪। ময়না তদন্ত এবং তার প্রতিটি স্তরের একাধিক ছবি গ্রহণ।

৫। সকল ধরনের স্টেইন পরীক্ষা (ডিএনএসহ)। পুলিশ ল্যাব এবং ফরেনসিক ল্যাব আলাদা আলাদাভাবে এ পরীক্ষা করবে এবং কোনো গড়মিল হলে তাৎক্ষণিকভাবে তৃতীয় ল্যাবে পরীক্ষার জন্য পাঠানোর ব্যবস্থা করবে।

৬। ময়না তদন্ত শেষে তাৎক্ষণিকভাবে প্রাথমিক রিপোর্ট প্রদান।

৭। সকল পরীক্ষার ফলাফল প্রাপ্তিতে মূল প্রতিবেদন দাখিল।

প্রটোকলটি দেখলে যে কেউ বুঝতে পারবেন, এটি মেনে ময়না তদন্ত করা বাংলাদেশে অসম্ভব নয়। এখন পর্যন্ত দ্বিতীয় দফায় করা ময়না তদন্তের কোনো প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে বলে আমার জানা নেই। খবরে প্রকাশ, ডিএনএ প্রতিবেদন প্রাপ্তি সাপেক্ষে প্রতিবেদন দেওয়া হবে- এ মানসিকতা পরিহার করা উচিত। এক্ষেত্রে প্রথমিক প্রতিবেদন না দেওয়াটাই অনিয়ম।

মনে আছে, ২০০২ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্বে থাকাকালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ময়না তদন্তের প্রতিবেদন দেওয়ার সময়সীমা ৪৮ ঘণ্টা বেধে দিয়ে আদেশ জারি করেছিল। সে আদেশ এখনও বিদ্যমান কি-না জানা নেই, তবে অনির্ধারিত অপেক্ষমান কাল মেনে নেওয়া যায় না।

এ রকম অনিয়ম মেডিকোলিগ্যাল সার্ভিসের অনিয়ম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যেকোনো মামলায় পুলিশ, ফরেনসিক আর অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা এক অপরের পরিপূরক। উভয়েই সত্য উদ্ঘাটনে সহায়তাকারী, যাদের মতামতের ওপর ভিত্তি করে আদালত রায় দিয়ে থাকেন। এখানে একজন যদি আরেকজনকে প্রতিপক্ষ ভাবেন তাহলে তা বিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এটি মনে রাখা উভয়পক্ষের জন্য শ্রেয়।

স্বনামধন্য এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেনসিক বিভাগের ভুল স্বীকার নিয়ে একটা সত্য ঘটনা বলছি। ময়না তদন্ত শেষে ময়না তদন্তকারী তার প্রতিবেদনে লিখেছিলেন, ‘প্লিহা স্বাস্থ্যবান’। অথচ হাসপাতাল রেকর্ডে দেখা যায় বছর খানেক আগে মৃতের প্লিহা অপেরেশন করে ফেলে দেওয়া হয়েছে। খবরের কাগজের মাধ্যমে ব্যাপারটি জানাজানি হলে ডাক্তাররা বিভক্ত হয়ে পড়েন। পরে ফরেনসিক ডাক্তার তার ভুল স্বীকার করলে আদালত এবং ডাক্তাররা তা মেনে নিয়েছিলেন।

পরিশেষে বলবো, নিজের ভুল বুঝতে পারলে তা স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়াই উত্তম। তবে ভুল না করে থাকলে বুক ফুলিয়ে নিজের দেওয়া প্রতিবেদন প্রতিষ্ঠিত করুন। ময়না তদন্ত মানেই হল, যা দেখেছি, যা পেয়েছি। সুতরাং রটনার পেছনে ঘটনা না থাকলে ভয় কেন?