সেই ভয়াল ১৫ নভেম্বর আজ

0

বরগুনা : ‘হায়রে মোর বাপ জান, তোরে মুই ক্যামনে ভুলমু, ক্যামনে? আল্লাহ ঘর বাড়ি সব নেছো মোর পোলাডারে নেলা ক্যা? বইন্নার পর এতো রিলিপ পাইছি মোর পোলাডারে তো পাইনায়।’

মনের ক্ষোভ এভাবেই প্রকাশ করলেন বরগুনার গোলবুনিয়া গ্রামের ছত্তার মিয়া। ২০০৭ সালের এই দিনে ছত্তার মিয়া হারিয়েছে ১১ বছর বয়সি তার একমাত্র আদরের সন্তান সবুজকে। সিডরের সেই ভয়াল গ্রাসের কথা মনে করিয়ে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কান্নায় ভেঙে পড়েন ছত্তার মিয়া। আর চোখের পানি ফেলতে ফেলতে বলতে থাকে তার জীবনের সব থেকে প্রিয় মানুষটিকে হারানোর মুহূর্তগুলো।

এ সময় ছত্তার মিয়া আরো বলেন, ‘হেইদিন বইন্নার কতা হুইন্না রাস্তায় দৌড়াইয়া উটছি। ওডার লগে লগেই হুনি পানি আইতে আছে। এইয়া হুইন্না মুই ঘরের দিগে দৌড় দিয়া যাওয়ার আগেই পানি উটটা গ্যাছে। এ্যার মধ্যেই মোরে পানিতে ঠেইল্লা গাছের লগে চাইপ্পা ধরছে। হেই হানে গোনে ছুইট্টা ভাসতে ভাসতে বাড়িতে যাইয়া দেহি ঘর বাড়ি সব ভাসাইয়া লইয়া গ্যাছে। পশ্চিম দিগে চাইয়া দেহি মোর বৌ আর পোলাডা গাছে বাইজ্জা রইছে। তহন অগো লইয়া পাশের একটা বড় ঘরে যাইয়া উটছি।

ছত্তার মিয়া আরো বলেন, ‘কতকুন পর হে ঘরডার টিনের চাল উড়াইয়া নিয়া গ্যাছে। মোরা সবাই হেই সময় ঘরের পাডাতোনে খারাই রইছিলাম। তহন সবাই ওই পাডাতোনে নৌকার মতো ভসতে আছেলাম। এ্যার মধ্যে মোর বৌয়ের কোলে গোনে কোন ফাঁকে মোর হারা ধনরে পানিতে লইয়া গ্যাছে। আলাপও পাইনাই। ১০ মিনিটে মোর হাজানো সংসার শ্যাস হইয়া গ্যাছে।’

শুধু সত্তার মিয়াই নয়, বরগুনার আরো অনেক মানুষই এখনও ভুলতে পারেনি ঘূর্ণিঝড় সিডরের সেই তাণ্ডবলীলা। প্রলয়ঙ্করী সাইক্লোন সিডরের ক্ষতি এখানকার মানুষ কিছুটা পুষিয়ে নিতে পারলেও ভয়াবহতার কথা আজও ভুলতে পারেনি তারা।

ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত পৌনে ৮টা। মহাবিপদ সংকেতের কথা শুনে আতঙ্কিত এলাকার মানুষ। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির সঙ্গে বইছে দমকা হাওয়া। সচেতন কিছু মানুষ আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে শুরু করলেও বেশির ভাগ মানুষ থেকে যায় বাড়িতে। রাত ১০ টার দিকে প্রবল বাতাসের সাথে যুক্ত হল পানি প্রবাহ। আঘাত হানল প্রলয়ঙ্করী ‘সিডর’। নিমিষেই উড়ে গেল ঘর-বাড়ি ও গাছ-পালা। বঙ্গোপসাগরের সব পানি যেন যমদূত হয়ে ভাসিয়ে নিল হাজার হাজার মানুষ। মাত্র কয়েক মিনিটে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল গোটা এলাকা। যে যেভাবে পারলেন ঝাঁপিয়ে পড়লেন বাঁচার সংগ্রামে। পরের দিন দেখা গেল চারিদিকে শুধুই ধ্বংসলীলা। উদ্ধার করা হল লাশের পর লাশ। দাফনের জায়গা নেই, রাস্তার পাশে গণকবর করে চাপা দেয়া হল বহু হতভাগার লাশ। স্বজন আর সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেল বরগুনার কয়েক লাখ মানুষ।

আগামীকাল সেই ১৫ই নভেম্বর। ২০০৭ সারের ওই দিনে ঘূর্ণিঝড় সিডর লণ্ডভণ্ড করে দেয় বরগুনাসহ উপকূলের বেশ কিছু জেলা। ভয়াল সেই দিনটির পরে কেটে গেছে ৮টি বছর। কিন্তু ক্ষত কাটেনি উপকূলের। ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ নির্মাণ ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন সরকারি বেসরকারিভাবে কোটি কোটি টাকা অর্থ বরাদ্দ করা হলেও জনপ্রতিনিধি ও কিছু কুচক্রি মহলের কারণে এখনও ভোগান্তি পোহাচ্ছে উপকূলবাসী।

২০০৭ সালের ওই দিনে ঘণ্টায় ২৬০ কিলোমিটার বেগে বাতাসের সাথে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ১০ থেকে ১২ ফুট উচ্চতায় পানি আঘাত হানে বরগুনাসহ উপকূলীয় এলাকায়। পানির চাপে পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বর নদীপাড়ের বেড়িবাঁধ ভেঙে ভাসিয়ে নিয়ে যায় ৬৮ হাজার ৩শ’ ৭৯টি ঘরবাড়ি, পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয় ৩৭ হাজার ৬৪ একর জমির ফসল। আর প্রাণ হারায় ১ হাজার ৪শ’ ৩৫জন মানুষ।

এদিকে দীর্ঘ ৮বছর পরেও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে বিধ্বস্ত ঘরেই বসবাস করছে অনেকেই। ঝড়ের পরে যে অল্প সংখ্যক মানুষকে দেয়া হয়েছে বসতবাড়ি, তাদের কাছ থেকেও নেয়া হয়েছে টাকা। অন্যদিকে এখনও ভাঙা রয়েছে নদীপাড়ের বেড়িবাঁধগুলো। যা দিয়ে প্রতিনিয়তই জোয়ারের পানি ঢুকে প্লাবিত হয় গ্রামের পর গ্রাম।

এ বিষয়ে সুশীল সমাজের মানুষরা জানান, সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বেড়িবাঁধগুলো এখনও হুমকিতে রয়েছে। সিডরের মত এমন আরেকটি বন্যা হলে আবারো প্রাণ হারাবে বরগুনার হাজারো মানুষের।

এ সময় তারা অভিযোগ করে বলেন, বিভিন্ন সময় সরকারি ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এসব এলকার বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য যে অর্থ বরাদ্দ হয়েছে তা সবই ঠিকাদাররা হরিলুট করেছে। দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের জীবন মালের নিরাপত্তায় অভিজ্ঞ ঠিকাদার দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধগুলো মেরামত করার দাবি জানান তারা।

এ বিষয়ে বরগুনা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক জাফর হোসেন হাওলাদার বলেন, সিডরের পরে সরকারি ও বেসরকারি এনজিও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের যেসব ত্রাণ দিয়েছে সেসব ত্রাণ জনপ্রতিনিধিরা সঠিকভাবে বণ্টন করেনি। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে যারা সরকারিভাবে ঘর পেয়েছে তাদের সবাইকে টাকা দিয়ে ঘর নিতে হয়েছে। এ সময় প্রতিটি ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যারা কোটিপতি হয়েছে।

অবশ্য বরগুনা জেলা প্রশাসক মীর জহুরুল ইসলামের দাবি পানি উন্নয়ন বোর্ডের সমন্বয়ে শিগগিরই বাঁধের স্থায়ী মেরামত ও অনুসন্ধানের পরে গৃহহীনদের পুনর্বাসন করা হবে। তিনি  বলেন, ইতোমধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ড বিভিন্ন পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। এ ছাড়াও ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে যারা ঘর পায়নি জেলা প্রশাসন থেকে তালিকা করে তাদের পুনর্বাসন করা হবে।

ঘূর্ণিঝড় সিডরে বরগুনা জেলার প্রায় অর্ধ লক্ষাধিকেরও বেশি ঘর-বাড়ি বিধ্বস্ত হয়। ঘূর্ণিঝড়ের পরে মাত্র ৫ হাজার ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে বসতঘর দেয়া হয়। এছাড়া বরগুনার পায়রা, বালেশ্বর ও বিষখালী নদীপাড়ের প্রায় ৩শ’ কিলোমিটার এলাকার বেড়িবাঁধ বিধ্বস্ত হয়। দীর্ঘ ৮ বছরেও যার স্থায়ী মেরামত কাজ শেষ করতে পারেনি পানি উন্নয়ন বোর্ড।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিস সূত্রমতে, সিডরের আঘাতে বরগুনায় প্রাণ হারান এক হাজার ৪শ’ ৩৫জন মানুষ। ৩০ হাজার ৪৯৯ টি গবাদী পশু ও ছয়লাখ ৫৮ হাজার ২৫৯টি হাঁস-মুরগী মারা যায়। জেলার দুই লাখ ১৩ হাজার ৪৬১ টি পরিবারের সবাই কমবেশি ক্ষতির শিকার হয়। সম্পূর্ণভাবে গৃহহীন হয়ে পড়ে জেলার ৭৭ হাজার ৭৫৪ টি পরিবার। এছাড়া আংশিক ক্ষতি হয়েছে আরও এক লাখ ১২ হাজার ৩১ টি বসতঘরের। এছাড়া রাস্তাঘাট, ব্রিজ- কালভার্ট, বিদ্যুৎসহ সব ক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে।

সিডর দিবস উপলক্ষে বরগুনা কর্মসূচি: জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগ, বরগুনা প্রেসক্লাব, বরগুনা সাংবাদিক ইউনিয়ন সিডর দিবসটি পালনের জন্য পৃথক পৃথক নানা কর্মসূচি গ্রহণ করবে। ১৫ নভেম্বর সকাল সাড়ে ৮টায় বরগুনা সদরের গর্জনবুনিয়া গণকবরে শ্রদ্ধা নিবেদন, সকাল সাড়ে ৯টায় বের হবে শোক র‌্যালি শেষে বরগুনা প্রেসক্লাবে স্মরণ সভা।