সামর্থের শেষটুকু দিয়ে লড়াই করে যাবো , বিশেষ সাক্ষাতকারে শহিদুল ইসলাম বাবুল

0

সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে ১৯৭৮ সালে বিএনপির রাজনীতি শুরু। দলটির বয়স এখন প্রায় ৩৮ বছর। এই ৩৮ বছরে বিএনপির উপর দিয়ে বহু ঝড়-ঝঞ্জা গেছে, খারাপ যাচ্ছে বর্তমানটাও। তবে যেকোনো পরিস্থিতিতে ছাত্রদলকে বিএনপির অন্যতম হাতিয়ার বলে মনে করা হয়।

received_1739959312890833

আর দলের বর্তমান পরিস্থিতিতে সাবেক ছাত্রদল নেতাদের ওপর আস্থা অটুট রয়েছে বিএনপির হাইকমান্ডের। এরই ধারাবাহিকতায় দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটিতে জায়গা দেয়া হয়েছে এক ঝাঁক নতুন মুখ। তাদের মধ্যে অন্যতম শহীদুল ইসলাম বাবুল। ঢাকা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক পদে দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি। নতুন পদ পেয়ে তিনি কথা বলেছেন জাগো নিউজের সঙ্গে। পুরো আলাপচারিতার চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো।

প্রশ্নঃ ছাত্রদলের সহ-সভাপতি থেকে সরাসরি বিএনপিতে পদ পেয়েছেন, তাও আবার ঢাকা বিভাগের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব। এতটা কি প্রত্যাশা ছিল?

শহীদুল ইসলাম বাবুল: হ্যাঁ…আমি হ্যাপি। দলের সঙ্গে সেই ছোটবেলা থেকেই আছি। ত্রিশ বছর হলো এক টানা। দীর্ঘকাল ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে ছিলাম। মাঝখানে ছাত্র রাজনীতি থেকে বিদায় নেয়ার পর ট্রানজিশনাল সময়ে গেল। এবারই প্রথম আমি জাতীয় নির্বাহী কমিটিতে এলাম। দল আমাকে যে সম্মান দিয়েছে, এর প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলবো, আগামী দিনে আমার সামর্থের শেষটুকু দিয়ে সংগঠনের মূল্য বা মর্যাদা রক্ষা করার চেষ্টা করবো। আমাকে আরো বড় পরিসরে রাজনীতি করার সুযোগ দেয়ায় আমি কৃতজ্ঞতা জানাই দলের চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতি। তিনি আমাকে স্নেহ করতেন। তার সঙ্গে থেকে কাজ করবার সুযোগ পেয়েছিলাম।

প্রশ্ন: গুরুত্বপূর্ণ পদ তো পেয়েছেন, এবার পরিকল্পনা কী?

শহীদুল ইসলাম বাবুল: আমাকে সুনির্দিষ্টভাবে ঢাকা বিভাগের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এ বিভাগে আটটি জেলা রয়েছে। দলীয় কর্মসূচি, দলীয় নিদের্শনা অনুযায়ী যতটুকু রয়েছে সেটা তো আমি করবোই। এর বাইরে আমি চেষ্টা করবো ঢাকা বিভাগের জেলাগুলোর সভাপতি ও সেক্রেটারির সঙ্গে সার্বক্ষণিক একটা যোগাযোগ রাখার জন্য। এর বাইরে বিভিন্ন থানার নেতৃত্বে যারা আছেন তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করবো। চেষ্টা করবো থানা পর্যায় পর্যন্ত নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করার। আমাদের মূল পরিকল্পনা আসলে এখন দলকে আরো একটি সুন্দর শক্তিশালী কাঠামোর উপর দাঁড় করানো। দেশে বর্তমানে যে ফ্যাসিবাদী শাসন চলছে মানুষ তাতে বিক্ষুদ্ধ। বাংলাদেশে এখন আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের লেশমাত্র নাই। মানুষ ভোটাধিকার বঞ্চিত। এই ফ্যাসিবাদের পতন নিশ্চিত করে গণতান্ত্রিক কাঠামো, গণতান্ত্রিক দেশ রাষ্ট্র, জাতি যাতে প্রতিষ্ঠা করতে পারি সেটাই আমাদের লক্ষ্য। আমাদের নেত্রী এজন্য দল পুনর্গঠন প্রক্রিয়া চালু করেছেন।

received_1739959209557510

প্রশ্ন: ছাত্র রাজনীতি থেকে বিএনপিতে যুক্ত হলেন, নতুন প্রজন্ম কেন বিএনপি করবে বলে আপনি মনে করেন?

শহীদুল ইসলাম বাবুল: নতুন প্রজন্ম বিএনপি করবে এ কারণে যে, বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতিই তো ভিন্ন। আমরা জাতীয়তাবাদের কথা বলি, জাতীয়তা বোধের কথা বলি। এই যে জাতীয়তা বোধ, এই চলমান রাজনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, বিশ্ব প্রেক্ষাপট এটাতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান জাতীয়তাবাদের রাজনীতির। রুচি-ব্যক্তিত্ব রাজনৈতিক কর্মসূচি সব কিছুতেই বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে নিশ্চয়ই বিস্তর একটা ফারাক আছে। আমাদের নেত্রীও সবসময় দেশ ও দেশের মানুষের জন্য গণতন্ত্রের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করছেন। দেশের গণতন্ত্র বিনির্মানের জন্য উনি দীর্ঘদিন লড়াই করেছেন। আমাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানও নিজে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন। যুদ্ধ করেছেন দেশের জন্য। আধুনিক বাংলাদেশের কোনো কথা বললে নিশ্চয়ই তার রুপকার শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা যদি বলি সেখানেও জিয়াউর রহমান। গণমাধ্যমের কথা যদি বলি সেখানেও তিনি। সব কিছুতেই তার স্পর্শ রয়েছে। একটা ধূমকেতুর মতো তিনি এলেন, দেখলেন, জয় করলেন। আমরা বিশ্বাস করি তিনি আরো কিছুদিন বেঁচে থাকলে সত্যি সত্যি একটি মডেল রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন।

প্রশ্ন: এখনো পর্যন্ত বিএনপির যে আংশিক কমিটি গঠন করা হয়েছে, দেখা যাচ্ছে এর মধ্যে এক ঝাঁক তরুণ প্রজন্মকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। সমালোচনা লক্ষ্য করেছেন কি না?

শহীদুল ইসলাম বাবুল: ওই অর্থে আমি তেমন কিছু লক্ষ্য করিনি। তবে এসব ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে কোনো কমিটির পুনর্গঠন প্রক্রিয়া যখন হয়, শুধুমাত্র বিএনপি নয়, পৃথিবীর সব রাজনৈতিক দলেই এমন হয়। সমালোচনা কিঞ্চিৎ থাকতেই পারে। ছাত্রদলকে বলা হয় ফাউন্ডেশন। একটা ঘরের ফাউন্ডেশন হলো ছাত্র সংগঠন। সত্যিকারার্থেই তাই। আমরা মনে করছি, ছাত্রদলের যে প্রজন্ম বিএনপিতে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে নিশ্চয়ই তাতে এই দল নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। নতুন একটা বার্তা জাতিকে দিতে পারবে। সত্যিকারার্থেই একটা রাজনৈতিক দল হিসেবে আমরা আগামী দিনে ভূমিকা রাখতে পারবো। ছাত্র নেতাদের তো নেতৃত্ব দেয়ার অনেক অভিজ্ঞতা আছে, বয়সও হয়েছে। যারা আসছে, নিশ্চয়ই তারা ভালো করবে বলে আমি বিশ্বাস করি। আর এক নেতার এক পদ যদি বাস্তবায়ন হয়, আমি বিশ্বাস করি নেতা হওয়ার মতো, নেতৃত্ব দেয়ার মতো কেউ আর প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারবেন না যে তিনি পদবঞ্চিত বা কাঙ্ক্ষিত পদ পাননি।

প্রশ্ন: ছাত্রদল থেকে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দায়িত্ব পালন করবেন, বিএনপি-জামায়াত জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনার ব্যক্তিগত চিন্তা কী?

শহীদুল ইসলাম বাবুল: রাজনীতি করলে ব্যক্তিগত চিন্তা প্রকাশ করা কঠিন। আর জামায়াতের সঙ্গে আমাদের আদর্শগত ফারাক তো অবশ্যই আছে। জামায়াত তাদের আদর্শ ধারণ করে। আমরা তাদের আদর্শ ধারণ করি না। কারণ, আমাদের নিজেদেরই একটা আইডোলজি রয়েছে। আমরা যার যার মতো করি। হ্যাঁ… তবে জোটগত আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনীতির ট্রাডিশন। এটা অতীতেও হয়েছে, এখনো আছে। তবে সেটা পুনর্বিবেচনা করা হবে কি, হবে না তা পার্টির হাইকমান্ড ও নীতি নির্ধারণী ফোরাম সিদ্ধান্ত নেবে। এখানে আসলে ব্যক্তিগত মত প্রকাশ করার সুযোগ সময় আসেনি।

প্রশ্ন: সম্প্রতি ব্রিটিশ একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০১৯ সালের আগেই রাজনীতি থেকে ছিটকে যাবেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

শহীদুল ইসলাম বাবুল: এটা নিয়ে অনেকে অনেকবার বলেছে। কেবলমাত্র ব্রিটিশ প্রতিবেদন নয়, জিয়াউর রহমান যখন মারা গিয়েছিলেন তখন সারা পৃথিবীর অনেকে বলেছেন, অনেক পত্রপ্রত্রিকায়ও এসেছে। বিএনপি অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। বিএনপি ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া তার নেতৃত্বের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে, বিএনপি ধ্বংস হয়নি। বিএনপি আরো শক্তিশালী হয়েছে। ১/১১ পর অনেকে বলেছে এ দল আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। আদৌ কি তাই? আমি দ্ব্যর্থহীন ও দৃঢ়ভাবে বলতে পারি বাংলাদেশের আশি ভাগ মানুষ বিএনপির সঙ্গে আছে। একটি সত্যিকারের নির্বাচনের পরিবেশে ভোটের ব্যবস্থা করা হয়, নিশ্চয়ই এ দেশের মানুষ ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে বিএনপির হাতেই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেবে।

প্রশ্ন: নতুন দায়িত্ব পালনে কোন বিষয়টাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন?

শহীদুল ইসলাম বাবুল: চ্যালেঞ্জ একটাই। এদেশে আশি-নব্বই ভাগের মতো মানুষ এই সরকারের ফ্যাসিবাদী আচরণ সমর্থন করে না। তারা এখানে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন কোনো কিছু পরোয়া করছে না। তারা সবকিছু বন্দুক দিয়ে, গায়ের জোরে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। তারা মানুষের ভোটাধিকার হরণ করছে। প্রতিনিয়ত খুন-গুম, অত্যাচার, লুণ্ঠন এখন মহামারি আকার ধারণ করেছে। এভাবে কোন দেশ বা রাষ্ট্র চলতে পারে না। সারাদেশের ছাত্রজনতা, যুবককে ঐক্যবদ্ধ করে আদর্শে উদ্দীপ্ত করে তাদের মাঠে নামিয়ে এই ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন নিশ্চিত করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।

প্রশ্ন: বলা হয় বিগত আন্দোলনে নেতাকর্মীরা মাঠে ছিলেন না, নতুন কমিটির নেতারা কি রাজপথে নামতে পারবেন?

শহীদুল ইসলাম বাবুল: সেটা সময়ই বলে দেবে। মাঠে ছিলেন না, এ কথাও ঠিক না। যে আন্দোলন হয়েছে তাতে বাংলাদেশের হাজার হাজার মানুষ সম্পৃক্ত ছিল। সরকার তখন ঢাকা শহরকে একটি যুদ্ধের শহরে পরিণত করেছিল। বিগত দিনে যে আন্দোলন হয়েছে তার চাইতে নিশ্চয়ই আগামী দিনে আন্দোলনে নেতাকর্মীদের আরো বেশি শক্তিশালী ও সম্পৃক্ত করবো। আমরা দৃঢ়ভাবেই বিশ্বাস করি সেটা হবে, হতেই হবে।

ছাত্রদলের এ নেতা ১৯৮৯ সালে রাজেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে কবি জসিম উদ্দিন হল শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের দফতর সম্পাদক হন। পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় কমিটিতে সহ-দফতর ও দফতর দফতর সম্পাদকের দায়িত্ব পান। এরও পরে কেন্দ্রীয় কমিটির দুই বার ভাইস চেয়ারম্যান, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন। সর্বশেষ  তিনি ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

courtesy: জাগো নিউজ২৪