সামরিক চুক্তির জন্য ভারতের জোড়ালো প্রস্তাবের নেপথ্যের কারন জানা প্রয়োজন- বিশেষজ্ঞ অভিমত

0

জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসন্ন ভারত সফর রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিতর্ক উঠছে ভারতের সামরিক চুক্তির আবদার নিয়েও। দেশের প্রধান বিরোধীদল বিএনপি ইতিমধ্যেই এই চুক্তির বিরোধীতা করে বলেছে, ভারতের সঙ্গে সামরিক চুক্তি হলে দেশের সার্ব-ভৌমত্ব থাকবে না। প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফরে ভারতের সঙ্গে কী কী চুক্তি হবে তা প্রকাশ করারও দাবি জানিয়েছে দলটি।

অপরদিকে রাজনীতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক চুক্তি করার কোনো সুযোগ নেই। তাদের মতে, ভারতের সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধকৌশলের চেয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধকৌশল একেবারেই ভিন্ন। বলা যায় বিপরীতমুখি।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত—–

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউটঅব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান বলেন, ‘চুক্তি কিংবা সমঝোতা স্মারক—যা-ই করি না কেন, এর বাস্তবায়ন হবে একই ধারায়। কেন সামরিক সহযোগিতার প্রয়োজন হলো আর কেনই-বা ভারত জোরালোভাবে প্রস্তাবটি দিয়েছে, তা পরিষ্কার নয়। এখন পর্যন্ত ভারতের গণমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, যৌথ উৎপাদনে তারা যেতে চাইছে। যার অর্থ হবে, আমাদের কেনাকাটার ওপর কিছু বাধ্যবাধকতা চলে আসবে। মনে রাখতে হবে, ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের সব সময় সীমাবদ্ধতা থাকে। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে জাতীয় স্বার্থের কথা মাথায় রেখে আমাদের সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে।’

আ ন ম মুনীরুজ্জামান বলেন, নেপালের সঙ্গে ভারতের প্রতিরক্ষা চুক্তিতে তৃতীয় দেশ থেকে অস্ত্র আমদানির ব্যাপারে দুই দেশ আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিধান ছিল। ভারতকে না জানিয়ে নেপাল চীনের কাছ থেকে আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র (এয়ার ডিফেন্স মিসাইল) কিনতে গেলে ভারত তাতে বাধা দেয়। কাজেই বাংলাদেশ এ ধরনের চুক্তি করতে গেলে কোনো সীমাবদ্ধতা থাকবে কি না, তা দেখার কথা বলেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আমেনা মোহসিন বলেন, ভারতকে বুঝতে হবে তাদের বন্ধুর প্রয়োজন আছে। এই চুক্তির প্রস্তাবে আস্থার সংকট আরও বাড়বে। কারণ, ২৫ বছরের মৈত্রী চুক্তির একটি ধারায় কোনো এক পক্ষকে তৃতীয় পক্ষ আক্রমণ করলে একে অন্যকে সহযোগিতার বিধান ছিল,যা নিয়ে পরে প্রশ্ন উঠেছে। কাজেই সাধারণ জনগণ যাতে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে বিভ্রান্ত না হন, সম্পর্ক নিয়ে আস্থার সংকট আরও না বাড়ে, সেটা নীতিনির্ধারকদের ভারতকে বোঝাতে হবে। প্রধানমন্ত্রী ‘র’-এর কথা তুলেছেন। এটি প্রমাণ করছে, তার মধ্যে বিরক্তি কাজ করেছে। তিনি বোঝানোর চেষ্টা করছেন, বাংলাদেশ এ ধরনের হস্তক্ষেপের জন্য তৈরি নয়।

সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল (অব.) জামিল ডি আহসান বলেন, ‘আমার প্রশ্ন, হঠাৎ করে প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রয়োজন হলো কেন? আমরা যদি ঘনিষ্ঠ বন্ধুপ্রতিম দেশ হয়ে থাকি, তাহলে তো বন্ধুত্বপূর্ণ উপায়ে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, জঙ্গিবাদের ক্রমবর্ধমান হুমকিসহ অন্যান্য নিরাপত্তার ঝুঁকি দূর করতে পারি। আমরাই তো ভারতকে বেশি দিয়ে গেছি। বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হস্তান্তরে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়ে তাদের ভারতের কাছে তুলে দিয়েছি। সামরিক চুক্তি বা সমঝোতার বিষয়ে রাখঢাক হচ্ছে বলে এ নিয়ে নানা রকম কথা হচ্ছে। এ ধরনের কারিগরি বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে কারিগরি পর্যায়ে অনেক আলোচনার দরকার ছিল। তবে হওয়া উচিত।’

জামিল ডি আহসানের মতে, বিভিন্ন দেশে প্রতিরক্ষা বাহিনী নির্দিষ্ট ধরনের সমরাস্ত্র (ইলেকট্রনিকস, উইপন সিস্টেম, অ্যামুনিশন, রাডার) ব্যবহার করে থাকে। নানা রকমের আইটেম দিয়ে এটা হয় না। নানা ক্ষেত্র বা উৎস থেকে তা হয় না। দুটি কারণে—প্রথমত যারা এসব পরিচালনা করবে, তারা তো নানা রকমের জিনিস চালাতে পারবে না। তা ছাড়া খাপসই (কমপ্যাটিয়েবল) হওয়া প্রয়োজন।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহমুদ হাসান বলেন, ‘আসলে কী হবে তা প্রধানমন্ত্রীর সফরের পরে বোঝা যাবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী দেশের সবচেয়ে বড় কূটনীতিক। তাই তিনি যা-ই করবেন তার একটা প্রভাব পড়বে দেশে। তার হাতে অনেক ক্ষমতা, উনি কী করবেন, কী নিয়ে আসবেন, তা বোঝা যাবে। প্রধানমন্ত্রীর হাত আরও অনেক বেশি শক্ত হতো যদি দেশে রাজনৈতিক বিভাজন না থাকত। আর এটাই ভারত বারবার কাজে লাগাচ্ছে। তিস্তা চাইলেই দিতে পারে। কিন্তু দিচ্ছে না, এটা-ওটা বলে। দিচ্ছে না, কারণ আমরা দুর্বল। আমাদের একটা শক্ত পার্লামেন্ট নেই বলে তারা দিচ্ছে না।’

সাবেক পররাষ্ট্রসচিব হেমায়েত উদ্দিন প্রতিরক্ষা চুক্তি ও সমঝোতা চুক্তির মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য আছে উল্লেখ করে বলেন, ‘প্রতিরক্ষা চুক্তি হলে তা ভালো করে পড়ে দেখতে হবে। আমি জানি না দুই পররাষ্ট্রসচিবের মধ্যে কী কথা হয়েছে। কিন্তু এটুকু বলতে পারব, হয়তো একটা নির্দেশনা বা ইঙ্গিত থাকবে, যেখানে দুই দেশের মধ্যে কিছু সহযোগিতার ইচ্ছার বিষয় আলোচনার কথা বলা থাকবে। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এই দুই দেশের মধ্যে আস্থার অভাব। আমাদের আরও বাস্তবিক হতে হবে, ভারত বাংলাদেশকে কীভাবে দেখছে, এটার বিষয়ে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন বলেন, ‘বাংলাদেশ রাষ্ট্রটা বেশ ছোট ভারতের তুলনায়। তাই বড় প্রতিবেশী নিয়ে গত কয়েক বছরে নীতিগতভাবে গুণগত একটা পরিবর্তন এসেছে। আমাদের দর-কষাকষির ক্ষমতা বেড়েছে। আমাদের ওপর সবকিছু চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। ভারতের দরকার শান্ত প্রতিবেশী