সাংবাদিক হিসেবে পৌর নির্বাচন যেভাবে দেখেছি

0

বোরহানুল হক সম্রাট

ধামরাইয়ের জ্যোতি বিদ্যা নিকেতন কেন্দ্রে ভোটের রঙ্গলীলা দেখে আমরা সবাই ফিরে আসছি, এমন সময় যমুনা টিভির মনিরুল ইসলাম বললেন, ভাই, অফিস থেকে দুপুর ১টার লাইভে ঢুকতে বলছে। ঘড়িতে সময় ১২ টা ৫৩। ফলে অন্যরা অপেক্ষা করছি। বলা প্রয়োজন, একা একা ভোটকেন্দ্রে যাওয়াটা যেকোনো সময় বিপদ ডেকে আনতে পারে গত কয়েক বছরে বঙ্গদেশে ভোটের উচ্চতর ধরন ও তাতে সহকর্মীদের ঘায়েল হওয়া দেখে এভাবেই ভোট কাভার করতে হচ্ছে। তাই একাত্তর টিভির পারভেজ রেজা, নিউজ টোয়েন্টিফোরের অপু, মনিরসহ আরো আমরা কজন একসাথে থেকেই নিত্য নতুন খবর পাচ্ছি। আর সেসব জায়গায় ছুটে বেড়াচ্ছি। সেটা ছিল এক বিশাল দায়িত্ব। কারণ প্রতিটি কেন্দ্রে অসংখ্য পুলিশ রয়েছে, মাঝেমধ্যেই র‌্যাবের গাড়ি ঘুরে যায়। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ ঢুঁ মারে, আমাদের দেখলে জোরে বাঁশিও বাজায়, সবাই খানিক তটস্থ হয়, অবাকও হয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, কিছু একটা ঘটলে, ভোটের মালিক ভোটার ও সমর্থকরা কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার, আনসার-ভিডিপি, পুলিশ অথবা অন্য কারো জন্য অপেক্ষা করে না এখন।

ভাই সিল দিচ্ছে, সকাল সাড়ে ১১টাতেই ব্যালট শেষ হয়ে গেছে বলে ভোটাররা চিৎকার করছে, পোলিং এজেন্টদের মেরেছে, বের করে দিয়েছে। এ ধরনের ঘটনা ঘটার পর এখন আর সাধারণ মানুষ অন্য কারো নয়, শুধুই সাংবাদিকের ক্যামেরার জন্য অপেক্ষা করে। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে যতগুলো ভোট হয়েছে মনে হয় সবগুলোতেই ভোট কক্ষে ঢুঁ দিয়েছি। মনে আছে গত বিএনপির সরকারের সময় বি চৌধুরীকে দল থেকে বের করে দেওয়ার পর তার ছেলে মাহী বি চৌধুরী যখন কুলা প্রতীকে নির্বাচন করছিলেন সে কথাও। ভোটের পরের দিন প্রথম আলোতে রিপোর্ট করেছিলাম, ‘সারাদিন বন্দি একজন প্রিয় সুনীল মাস্টার’ শিরোনামে। মাহীর বিপক্ষে ভোট দিতে পারে, এই সম্ভাব্য অপরাধে ধানের শীষের লোকেরা সুনীল মাস্টারকে একটি ঘরে আটকে রেখেছিল। ভোট শেষ হওয়ার পর সেই ঘরের তালা খুলে দেয়। সেই ঘরে গিয়ে সুনীল স্যারের সাথে কথা বলেছিলাম সেদিন। জেনেছিলাম, স্যারের বাড়িতে সেদিন উনুনে আগুন জ্বলেনি।

তো, জ্যোতি বিদ্যা নিকেতন কেন্দ্রে ভোটের খবর জানাতে সাংবাদিক মনির বেশ দেরি করেছিল। তাই আবার ঢুকতে হলো, দেখতে। গিয়ে দেখি, যারা কেন্দ্র ফাঁকা করে জাল ভোট দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে তাদের সাথে একাত্তরের পারভেজ, যমুনার মনিরের লুকোচুরি খেলা চলছে। এই সংবাদকর্মীরা একবার বের হওয়ার জন্য পা বাড়ায় আর অমনি স্থানীয় ছাত্রলীগকর্মীরা কেন্দ্রের দিকে এগোতে থাকে। মনিররা আবার পিছনের দিকে পা বাড়ায়, ওরা আবার ফিরে যায়। সবচেয়ে বিপদে স্থানীয় সাংবাদিক ওয়াহাব। ইতিমধ্যে তিনবার তার কাছে ফোন এসেছে স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতার। নেতার কড়া নির্দেশ, ঢাকার সাংবাদিকদের নিয়ে এখনই কেন্দ্র ছাড়ুন, সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ওয়াহাব বললেই তো আর সবাই ফিরবে না। জ্যোতি বিদ্যা নিকেতন কেন্দ্র থেকে দুপুর দেড়টায় আমরা যখন বিদায় নেই তখন স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থীর তিনজন পোলিং এজেন্ট কেন্দ্র ছেড়ে চলে যাচ্ছিলেন। বুকে তাদের নারিকেল প্রতীকের কার্ড।

আমরা কারণ জানতে চাইলে, ক্ষুব্ধ হয়ে বলছিলেন, ‘থেকে কোনো লাভ নেই। যা হচ্ছে তাতে থেকেও কারো কোনো লাভ নেই। আপনারা যাওয়ার পর কী হবে বোঝেন না।’ এই কেন্দ্রের মোট ভোটার ১৫৭৩। তখন পর্যন্ত ভোট পড়েছিল ৫৩৫টি। শতকরা ৩৪ ভাগ। সন্ধ্যার পর সাভার প্রতিনিধি জানালেন, শতকরা ৭৩ দশমিক ৮২ গড়ে জ্যোতি বিদ্যায় এক হাজার ২২২ ভোট পড়েছে। এই চিত্র শুধু একটি কেন্দ্রে নয়, ব্যালট শেষ হয়ে গেছে, ব্যালট দিচ্ছে না, এমন খবর পেয়ে আমরা সাংবাদিকরা কেন্দ্রে কেন্দ্রে ঘুরেছি। আর প্রিসাইডিং অফিসার ব্যালট বের করেছেন। সারাদিন ধরে আমরা এমন কোনো কেন্দ্র খুঁজে পায়নি, যেখান থেকে পোলিং এজেন্ট বের করে দেওয়া হয়নি। এমন কোনো প্রিসাইডিং অফিসার পাইনি যিনি অনিয়মের কারণে বিব্রত হননি।

সবচেয়ে মজার অভিজ্ঞতা হলো সাভার রেডিও কলোনি বিদ্যালয় কেন্দ্রে। অশীতিপর এক বৃদ্ধ হাতে মাইক্রোফোন দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা এই দেশে কী আর ভালো ভোট হবে না। যদি হয়, কোন সালে বলতে পারেন?’ মনে হলো এবারই তার শেষ, এমন ভোট হলে তাতে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলছেন বহু মানুষ। ভোটারকে ভোট দিতে অনাগ্রহী করে ফেলা। একটা দেশের গণতন্ত্রের ক্ষতি করতে এরচেয়ে বড় আয়োজন আর কী হতে পারে।

এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তথ্য উপাত্ত ঘাটলে অবাক না হয়ে পারবেন না আপনি। যেমন সাভারের ভোটার সংখ্যা এক লাখ ৬৯ হাজারের বেশি। পাশেই ধামরাই যার ভোটার ২১ হাজার। এবারের যে ২৩৪টি পৌরসভায় ভোট হয়ে গেল বিদ্যমান পৌর আইনে তার অনেকই পৌরসভা হওয়ারই যোগ্যতা রাখে না। পৌরসভা আইন ২০০৯ স্পষ্ট বলছে, যে এলাকার জনসংখ্যা কমপক্ষে ৫০ হাজার এবং অকৃষি জমি শতকরা ৩৩ ভাগের কম না, তিনভাগের একভাগ মানুষ অকৃষি পেশায় নিয়োজিত থাকবেন, এসব তথ্য বিশ্লেষণের পর সরকার কোনো পল্লী এলাকাকে পৌরসভায় রূপান্তরের প্রজ্ঞাপন দিতে পারবে। নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ নথি অনুসন্ধানে দেখা যায়, জনসংখ্যায় দেশের সবচেয়ে বড় পৌরসভা বগুড়া, যার ভোটারই চার লাখ ৩২ হাজার ৯৬৮ জন। কিন্তু এখানেই শেষ নয় বরং শুরু। কারণ মোট ভোটার মাত্র সাত হাজার-এমন পৌরসভার সংখ্যা পাঁচটি, ছয় হাজার ভোটারের ঘরে আছে চারটি পৌরসভা। আট হাজার ৯১০ এর ঘরেই বেশি। এরমধ্যে এক পৌরসভার জনসংখ্যা ছয় হাজার ১০০। কোথায় ৫০ হাজারের বাধ্যবাধকতা, কোথায় সোয়া চার লাখ আর মাত্র ছয় হাজার।

ফলে প্রশ্ন, এই নির্বাচন, এই পৌরসভা কী প্রমাণ করে চলেছে? সবাই মিলে আইন ভেঙে, যা খুশি তাই করে যাচ্ছি আমরা। মধ্যম আয়ের দেশ বনাম উন্নত জাতি, এমন তুলনা প্রায়ই করা হয়, তো এই তুলনায় দিকনির্দেশনা কি বেরিয়ে আসছে?

লেখক : সাংবাদিক, এটিএন নিউজ।