সরকার দলীয় লোকজনের সন্ত্রাসী : ট্রাক থামা, গরু নামা! স্টাইলে ছিনতাই

0

ঢাকা: পবিত্র ঈদ- উল আযহাকে সামনে রেখে গরু বহনকারী ট্রাক ছিনতাইসহ অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে পড়েছে। ‘আইন-শৃঙ্খলা’ বাহিনী দেখেও না দেখার ভান করছে। ফলে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।

জানা গেছে, সন্ত্রাসীরা নগরীতে অস্ত্রের মুখে গরুর ট্রাক থামিয়ে ব্যবসায়ীদের বলছে, ‘ট্রাক থামা, গরু নামা’! এ অবস্থা শুধু রাজধানীতে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের সর্বত্রই চলছে এধরনের তা-ব। সরকার দলের লোকজন গরুর হাটের ইজারা নিয়ে ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে ট্রাক ছিনতাই করছে। দিন যত বাড়ছে গরু ব্যবসায়ীদের মধ্যে ‘আতঙ্ক’ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এদিকে আজ সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে বাতেন মার্কেট গরুর হাটে গোলাগুলির ঘটনায় দু’জন নিহত হয়েছেন। চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উত্তর) মোস্তাফিজুর রহমান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন।

জানা গেছে, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও পৌর মেয়র গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় আরও ১জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। নিহত দুই জনের নাম জাহাঙ্গীর ও কবির। এ ঘটনায় বাকী নামে একজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আছে। এ ঘটনায় ওই এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।

এছাড়া, গত ১৯ সেপ্টেম্বর শুক্রবার রাতে রাজধানীর সংসদ ভবন এলাকায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গরুর ট্রাক ছিনতাই করা হয়েছে। এ ঘটনায় ৫ জন গরু ব্যবসায়ী গুরুতর আহত হয়েছেন। জানা গেছে, জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে থেকে ১৬টি গরুসহ একটি ট্রাক ছিনতাই করে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। এসময় ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে চারজন আহত হন। তারা হলেন- মো. মাসুম (২৪), সুজন আলী (২৬), ঠান্ডু মিয়া (৪৫), তানজিমুল হক (২৮) ও চাঁন্দু মিয়া (২৬)। এদের সবার বাড়ি ঝিনাইদহ জেলায় বলে জানা গেছে।

আহতরা ব্যবসায়ীরা জানান, ঝিনাইদহ থেকে তারা ১৮ লাখ টাকা দিয়ে ১৬টি গরু কিনে বিক্রির জন্য শুক্রবার রাতে ঢাকায় এসেছিলেন। রাতে সংসদ ভবনের সামনে আসার পর একটি সাদা পিকআপ তাদের গতিরোধ করে। এরপর ব্যবসায়ীদের ট্রাক থেকে নামিয়ে পিকআপে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় সন্ত্রাসীরা তাদের গরুসহ ট্রাকটি নিয়ে পালিয়ে যায়। পরে তাদেরকে পিকআপ যোগে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ঘুরাতে থাকে এবং নির্যাতন করা হয়। একপর্যায়ে আশুলিয়া এলাকায় পুলিশের গাড়ি দেখে রাস্তায় তাদেরকে নামিয়ে দিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।

ভুক্তভোগিরা জানান, গরুর হাটের ইজারাদারদের সেচ্ছাসেবীর নামে ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসীর আক্রমনের শিকার হচ্ছেন অনেক গরু ব্যবসায়ী। পশুর প্রতিটি হাটে শতাধিক সেচ্ছাসেবী সন্ত্রাসী বাহিনী রয়েছে। এদের পরিচালনা করছেন সরকার দলীয় কিছু ভুঁইফোড় নেতা। কোরবানির পশু হাটে নেওয়ার পর প্রকাশ্যে চাঁদাবাজী করা হচ্ছে। জোরপূর্বক গাড়ী থামিয়ে সন্ত্রাসী কায়দায় শারীরিক নির্যাতন করা হচ্ছে গরু ব্যবসায়ীদের। হাটে গরু নামাতে চলছে অস্ত্রের ঝনঝনানি। সোমবার চট্টগ্রামের গরুর হাটে গোলাগুলির ঘটনায় ২জন নিহত ও একজন আহত হয়ছেন। কোথাও কোথাও আইন-শৃঙ্খলার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অঙ্গীকারাবদ্ধ বাহিনীকে অসহায় নিরুপায় অবস্থায় দেখা যাচ্ছে। যেন দেখেও দেখছে না, শুনেও শুনছে না, বুঝেও বুঝছে না আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। প্রতিটি হাটে দায়িত্বে রয়েছে পোশাক পরিহিত পুলিশ, র‌্যাব ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে সড়কপথ ও নৌপথে রাজধানীতে গরু আনা হচ্ছে। রাজধানীর চারপাশের বিভিন্ন পয়েন্টে সন্ত্রাসী চাঁদাবাজরা সক্রিয় রয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এক সূত্র জানায়, কোরবানির পশুবাহী পরিবহণ কোন সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া না থামানোর নির্দেশনা রয়েছে। কাগজপত্র তল্লাশীর নামে কোন বিশৃঙ্খলা করা যাবে না।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, প্রশাসনের নির্দেশ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রয়েছে। প্রতিটি গরুর ট্রাক থেকে ১ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা নেয়া হচ্ছে। এ চাঁদা তুলতে মাঠে রয়েছে স্থানীয় সন্ত্রাসীরা। থানা পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশ এর কারে কারো বিরুদ্ধে সন্ত্রাসীদের সহায়তার অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে। চাঁদাবাজীর এ পয়েন্টগুলো হলো কাঁচপুর, মদনপুর, চিটাগাংরোড, চাষাড়া, সাইনবোর্ড, ধনিয়া, যাত্রাবাড়ি, ডেমরা, মেরাদিয়া, রামপুরা, সদরঘাট, জুরাইন, পোস্তগোলা, মোহাম্মদপুর, গাবতলী, মিরপুর, কল্যাণপুর, সাভার, আশুলিয়া, ধামরাই, মানিকগঞ্জ, আরিচা ঘাট, দৌলতদিয়া ঘাট, রূপগঞ্জ, গুলশানসহ বিভিন্ন পয়েন্টে।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিভিন্ন অজুহাতে রাস্তায় যানজট সৃষ্টি করে প্রকাশ্যে গরু ব্যবসায়ীদের ওপর তা-ব চালানো হচ্ছে। তারা বাধ্য হয়ে মোটা অংকের চাঁদা দিচ্ছেন। চাঁদার টাকা পরিশোধের কিছুক্ষণের মধ্যে তারা রাস্তার যানজট নিরসনে ব্যস্ত হন। রাজধানীর মেরাদিয়া বাজারের এক গরু ব্যবসায়ী জানান, চাঁদাবাজীর পাশাপাশি রাত ১টা থেকে ভোর পর্যন্ত চলে জোরপূর্বক গরু নামানোর মহোৎব। রাস্তার উপর শতাধিক হলুদ পোশাক পরহিত লাঠি ও দেশীয় অস্ত্র হাতে সেচ্ছাসেবীর পরিচয়ে সন্ত্রাসীদের দেখা যায়। গরুর ট্রাকের সামনে কয়েকটি মটর সাইকেল রেখে হিন্দি সিনেমা স্টাইলে দাঁড়িয়ে যায় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের নেতার বাহিনী। গাড়ি থেকে নামিয়ে ব্যবসায়ীদের উপর চালানো হয় নির্যাতন। তাদের নির্যাতনের শিকার হয়ে ব্যবসায়ীরা নিরুপায় হয়ে হাটের ভেতরে ট্রাক নিতে বাধ্য হন। এমনকি ট্রাকের ভাড়ার টাকা আদায় করতে না দিয়েই হাট থেকে বের করে দেয়া হয়।

জানা গেছে, খিলগাঁও থানার একজন উপ-পরিদর্শক এর কাছে গরু ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হলেও তিনি তাতে গুরুত্ব দেননি। গরু হাটে ব্যবসায়ীদের ভোগান্তির বিষয়টি তিনি হেসেই উড়িয়ে দেন।

ভুক্তভোগী গরু ব্যবসায়ী সোহেল, মানিক, আজিজ, সাকিল ও সুমন জানান, তাদের গরু বহনকারী ঢাকা মেট্রো ট ১৪-০১৯৪ ও ঢাকা মেট্রো ড ১৪-২৫৬২ নম্বরের ট্রাকসহ শতাধিক ট্রাক থেকে জোরপূর্বক গরু নামানো হয়েছে। এছাড়া মৌচাক, সারুলিয়া, সদরঘাট, ধনিয়াসহ নারায়ণগঞ্জে একইভাবে সরকারি দলের নেতা-কর্মী গরু ব্যবসায়ীদের নির্যাতন করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংসদ ভবনের সামনে থেকে গরুর ট্রাক ছিনতাই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শেরে বাংলানগর থানার সহকারি পরিদর্শক (এসআই) মনিরুজ্জামান  বলেন, এ ঘটনায় ট্রাকের চালক সুজন ম-লকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। খুব শীঘ্রই জড়িতদের গ্রেফতার ও ছিনতাইকৃত গরু উদ্ধার করা সম্ভব হবে বলেও মনে করেন তিনি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার মুন্তাসিরুল ইসলাম বলেন, গরুর ট্রাক ছিনতাইয়ের ঘটনায় কোন অগ্রগতি নেই। ঘটনাটি থানা পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা পুলিশ ছায়া তদন্ত করছে। তবে গোয়েন্দা পুলিশ আশা করছে ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার ও রহস্য উদ্ধার করতে পারবে।