সন্তান তারেক রহমানের স্মৃতিচারণে বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান

0

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দু’টি সন্তান ― দু’জনই ছেলে। বড় ছেলের নাম তারেক রহমান পিনো। আর ছোট ছেলের নাম আরাফাত রহমান কোকো। ইসলামের ইতিহাসের স্পেন বিজয়ী মহান বীর সিপাহশালার তারেকের নামে তিনি বড় ছেলের নাম রাখেন। আর ছোট ছেলের নাম রাখেন ফিলিস্তিন মুক্তিসংগ্রামের মহানায়ক, অকুতোভয় বীর সেনানী ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রপ্রধান ইয়াসির আরাফাতের নামে।

৩০মে,১৯৮১ চট্টলার সার্কিট হাউজে রাষ্ট্রপতি জিয়া যখন নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করেন তখন তারেক ও আরাফাত বেশ ছোট। তারেক তখন নবম শ্রেণীর ছাত্র ও আরাফাত ৬ষ্ট শ্রেণীর ছাত্র। তারেকের বয়স ১৪ ও আরাফাতের বয়স ১২।

এই বয়সে বাবাকে ঘিরে তাদের খুব বেশি স্মৃতি থাকার কথা নয়। তারপরও মনের আবছা অন্ধকারে হাতড়ে তারা কিছু কিছু স্মৃতির কুসুম একত্রিত করেছে, যা এখানে তাদের জবানীতেই তুলে ধরা হলো। এই স্মৃতিচারণের মাধ্যমে বুঝতে পারবে স্নেহ বৎসল, ন্যায়নীতিবান ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে তিনি কতটা সচেতন ছিলেন, কতটা নিষ্ঠাবান ছিলেন।

দেশনায়ক তারেক রহমানের স্মৃতিচারণঃ

প্রতিটি সন্তানের কাছেই তার পিতামাতা গর্বের বিষয়। বিশেষ করে সেই পিতামাতার দেশের কল্যাণে যদি অবদান থাকে এবং কোটি কোটি মানুষের সম্মান, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা তাদের ঘিরে থাকে। তাহলে সেই সন্তানের জীবন হয়ে উঠে স্বার্থক। আমি সে রকম এক সৌভাগ্যবান সন্তান। আমার পিতা ছিলেন মহান স্বাধীনতার ঘোষক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও এদেশের জননন্দিত রাষ্ট্রপতি। তাঁকে দিনের অধিকাংশ সময়ই রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যস্ত থাকতে হতো, সে জন্য আমি ও আমার প্রাণপ্রিয় ছোট ভাই কোকো পিতার সান্নিধ্য খুব কমই পেয়েছি। আমার বাবা যখন মারা যান তখন আমার বয়স চৌদ্দ, নবম শ্রেণীতে পড়ি এবং কাকতালীয়ভাবে ক্লাশে নবম স্থান অধিকার করি। আমার বাবা শাহাদাত বরণের পর দেখতে দেখতে তেইশটি বছর পার হয়ে গেল। ২৩ বছর আগের তাঁর নির্মম মৃত্যুর দিনটির কথা যতবারই মনে পড়ে ততবারই শোকে মুহ্যমান হই, বেদনায় ভরাক্রান্ত হয় আমার হৃদয়। ক্ষণিকের জন্য হলেও হারিয়ে যাই অন্য পৃথিবীতে যেখানে শুধু আমি আর আমার বাবা। এই তেইশটি বছরে জীবনের স্বাপদসংকুল যাত্রা পথকে পাড়ি দিতে গিয়ে বহু স্মৃতি আবছা হয়ে গেছে বা যাচ্ছে। কিন্তু কিছু কিছু ঘটনা আমার স্মৃতির ক্যানভাসে জ্বল জ্বল করছে।

ক) ১৯৭৬ সালের কথা। তখন স্কুলে পড়ি। প্রতিদিনের মতো সেদিনও দু’ভাই স্কুলে যাচ্ছি। সকাল ৭.০০ টায় সেদিন আমরা বের হচ্ছি। বাবা অফিসে যাচ্ছেন। গাড়িতে গিয়ে উঠলাম। বাবা তাঁর গাড়িতে উঠলেন। তাঁর গাড়ি বেরিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ তাঁর গাড়ির ব্রেকলাইট জ্বলে উঠল। বাসার গেট থেকে বেরুবার আগেই জোর গলায় আমাদের ড্রাইভারকে ডাক দিলেন। সে দৌড়ে গেল। আমরা গাড়িতে বসা। ড্রাইভার যখন ফিরে এলো চেহারা দেখে মনে হলো বাঘের খাঁচা থেকে ফিরেছে। জিজ্ঞেস করলাম, কি ব্যাপার? উত্তরে বলল, ‘স্যার বলেছেন, আপনাদের এই বেলা নামিয়ে দিয়ে অফিসে গিয়ে পি.এস-এর কাছে রিপোর্ট করতে। এখন থেকে ছোট গাড়ি নিয়ে স্কুলে যাতায়াত করতে হবে। কারণ ছোট গাড়িতে তেল কম খরচ হয়। আর এই গাড়ির চাকা খুলে রেখে দিতে হবে।’ উল্লেখ্য, এ গাড়িটি ছিল সরকারি দামী বড় গাড়ি।

খ) তখন আমার বয়স কম। স্কুলে পড়ি। কিছু গালাগাল রপ্ত করেছি। সময় পেলেই আক্রমণের সুযোগ হাত ছাড়া করি না। সেদিনও করিনি। কারণটা পুরোপুরি মনে নেই। তবে বাসার বাইরে গেটের সামনে সন্ধ্যা বেলা পাড়ার বন্ধুদের সাথে দুষ্টুমি করছি। রাস্তা দিয়ে মাঝে মধ্যেই গাড়ি আসা-যাওয়া করছে। গেটে কর্তব্যরত সেনাবাহিনীর গার্ড, দাড়িয়ে ডিউটিতে। আমাকে বললো, ‘ভাইয়া সন্ধ্যা হয়ে গেছে। ভিতরে যান।’ আর যায় কোথায়? খেলার মধ্যে বিড়ম্বনা। যা এলো মুখে স্বরচিত কবিতার মত বলে গেলাম। খেলা শেষ। ভেতরে এলাম। ক্লান্ত! কোন মতে পড়া শেষ করে রাতে খেয়ে ঘুম। ঘুমিয়েছি বোধহয় ঘন্টা দেড়েক। হঠাৎ মনে হল ভূমিকম্প হচ্ছে। চোখ খুলে দেখি, শিকারের সময় বাঘ থাবা দিয়ে যেভাবে হরিণ শাবক ধরে, বাবা ঠিক সেভাবে হাত দিয়ে আমার মাথার চুল ধরে টেনে তুললেন এবং বাঘের মতো গর্জন করে বললেন, ‘কেন গাল দিয়েছিস? ও কি তোর বাপের চাকরি করে? যা মাফ চেয়ে আয়।’ আম্মাকে বললেন, ‘যাও ওকে নিয়ে যাও। ও মাফ চাবে তারপর ঘরে ঢুকবে।’ মা আমাকে নিয়ে গেলেন সামনের বারান্দায়। বিনা দোষে গাল খাওয়া সৈনিকটিকে ডেকে আনা হল। যদিও তিনি অত্যন্ত ভদ্রতার সাথে আম্মাকে বলল, ‘না ম্যাডাম, ভাইয়ার কথায় আমি কিছুই মনে করিনি। ছোট মানুষ। ওমন করেই।’ জানি না তিনি আজ কোথায়? তবে ২৭ বছর পরে আজ যদি বেঁচে থাকেন এবং এই লেখা পড়েন, তবে বলছি, ‘সেদিন আমি না বুঝে যা বলেছি, তার জন্য আমি আপনার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।’

গ) তখন বাবা প্রেসিডেন্ট। হঠাৎ বিটিভি থেকে খবর এলো, যেতে হবে। গেলাম। তারা বললেন, গান গাইতে হবে। বয়স কম। গানের ‘গ’ ও পারিনা। তাও আবার টিভিতে। আমাকে পায় কে? প্রযোজক বললেন, কিছু না। আমি ঠিক গান গাইয়ে নিব প্রেসিডেন্ট সাহেবের ছেলেকে দিয়ে এবং সুন্দর গান হবে। বুঝতেই পারছেন সবাই, কি গান গাইলাম। পরে যখন নিজে দেখলাম ও শুনলাম, মনে হলো সেই মুহুর্তে টিভি স্টেশনে কারেন্ট চলে গেলে ভাল হত। যদিও রাতে স্বপ্ন দেখলাম, বিরাট গায়ক হয়ে গেছি। ক’ দিন পর প্রযোজককে ফোন করলাম, ‘চাচা আবার কবে গান গাইব।’ উনি বললেন, ‘বাবা পিএস সাহেব ফোন করে তোমাকে টিভিতে অনুষ্ঠান দিতে বারণ করেছেন।’ ব্যস গায়ক হবার খায়েস মিটে গেল।