সংস্কৃতিবান জিয়াউর রহমান এবং ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার, শেষ বাংলাদেশ’

0

জন্ম তোমার, যুদ্ধে যাবার;
নেতা হবার, সিপাহী জনতার।
তুমি অম্লান, অক্ষয়।
জিয়া তুমি সোনালী ভোরে
নতুন সূর্যোদয়।

জিয়াউর রহমান এমনি একজন অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, যাকে শুধু তার জন্মদিবস বা মৃত্যুদিবসে মনে পড়ে না, তাঁকে মনে করতে হয় সব মুহূর্তে। তাঁর জীবন ছিল সংক্ষিপ্ত কিন্তু জীবনের গল্প ছিল দীর্ঘ। রাজনৈতিক বিবেচনায় বিভাজিত জনগোষ্ঠী ছাড়া অধিকাংশ মানুষের অন্তরে ‘প্রিয়জন’ হিসেবে তিনি ঠাঁই পেয়েছেন অতি সহজে। তাঁর জীবনের ব্যাপ্তি ছিল দু’টি পর্বে। কখনও সামরিক পোশাক পরে, কখনও গণতন্ত্রের পোশাক পরে। কখনও মেজর জিয়া, কখনও রাষ্ট্রপতি জিয়া। এই একের ভেতর দুই, পরিচয়ের ব্যাপকতা, মহত্ত্ব, দেশপ্রেম ছিল পরস্পর সমানে সমান। দেশের শাসনভার পেয়ে রাজনৈতিক প্রথাগত সংস্কৃতি পরিবর্তনের লক্ষ্যে জিয়া ঘোষণা দিলেন ‘রাজনীতিকে কঠিন করে দেব।’ এই ‘কঠিন’ শব্দটি প্রতীকী, যার মর্মার্থ ব্যাপক তাত্পর্যপূর্ণ। রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধিদের রাজধানী ছেড়ে শহর, শহরতলি, গ্রাম-গঞ্জে প্রত্যেকের নিজস্ব এলাকায় অবস্থানের জন্য রাষ্ট্রপতি জিয়া আহ্বান করেছিলেন। সেখানে শিক্ষিত-অশিক্ষিত, নারী-পুরুষ, চাষী-মজুর, কামার-কুমার, জেলে-মাঝি, অসহায় সাধারণ মানুষের দুঃখ-সুখের সাথী হওয়ার তাগিদ দিয়েছিলেন। আসলে তিনি বিশ্বাস করতেন ৬৮ হাজার গ্রামের উন্নতি হলে বাংলাদেশের উন্নতি হবে। স্বহস্তে কোদাল ধরে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করে সারা বাংলাদেশের সজীব উর্বর মাটিতে বইয়ে দিতে চাইলেন ফসলের বন্যা। তিনি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা। এর ফলে সমতলে কিংবা অরণ্য-পাহাড়ে প্রকৃতির সঙ্গে বসবাসকারী এক বিশাল আদি জাতিগোষ্ঠী পেল বাংলাদেশী নাগরিক সম্মান ও বেঁচে থাকার সমসাংবিধানিক অধিকার। ফলে বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতির মূল ভাণ্ডারে অতিরিক্তভাবে সংযুক্ত হলো চাকমা, মারমা, গারো, মণিপুরী ইত্যাদি সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।

বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদের আদর্শে সামাজিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘জাসাস’ প্রতিষ্ঠা করেন জিয়া। এর মহত্ উদ্দেশ্য ছিল সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা, সংরক্ষণ, প্রকাশনা এবং পৃষ্ঠপোষকতা। বিদেশি সাংস্কৃতিক আগ্রাসন থেকে নিজস্ব বাংলাদেশী শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতিকে রক্ষা করা। সামাজিক কল্যাণমুখী কাজে আত্মনিয়োগ করা। শুরুতেই এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন খ্যাতিমান শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, অধ্যাপক, বুদ্ধিজীবী। আর এর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন কবি আল মাহ্মুদ, কণ্ঠশিল্পী সুরকার গীতিকার লোকমান হোসেন ফকীর, পরীক্ষিত সাংস্কৃতিক সংগঠক রেজাবুদ্দৌলা চৌধুরী এবং জাহিদ হোসেন চুন্নু।

জিয়াউর রহমান এককালের শক্তিমান নায়ক উজ্জ্বলকে দেশপ্রেম-আশ্রিত শিল্পসম্মত চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ অনুদান দিয়েছিলেন। যদিও সেই বিশেষ চলচ্চিত্র শেষ পর্যন্ত হয়নি। তবে বাণিজ্যিক ছবি ‘নসিব’ প্রযোজনা করে নায়ক উজ্জ্বলের নসিব খুলে যায়। বাংলাদেশী পপসঙ্গীত তারকা ফেরদৌস ওয়াহিদকে জিয়াউর রহমান সঙ্গীতের উন্নয়ন এবং শিল্পী প্রতিভা আবিষ্কারের জন্য অর্থ অনুদান দেন। শেষ পর্যন্ত এ স্বপ্নও বাস্তবায়ন করতে পারেননি ফেরদৌস ওয়াহিদ। এই প্রতিবেদনে বর্ণিত দু’টি তথ্য প্রকাশ করার অর্থ ব্যক্তিগত পর্যায়ে জিয়ার সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠপোষকতার উদাহরণ তুলে ধরা।

আমার লেখা ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’ গানটি নওয়াজিশ আলী খান প্রযোজিত বিটিভির বর্ণালী অনুষ্ঠানে প্রথম প্রচারিত হয়। কণ্ঠশিল্পী ছিলেন শাহনাজ রহমতুল্লাহ। ওই গানটি প্রচারিত হওয়ার অব্যবহিত পরে দু’টি পৃথক সঙ্গীতানুষ্ঠান ‘মালঞ্চ’তে আমার লেখা সৈয়দ আবদুল হাদীর গাওয়া সূর্যোদয়ে তুমি, সূর্যাস্তেও তুমি এবং নিয়াজ মহাম্মদের গাওয়া ‘রাঙামাটির রঙে চোখ জুড়ালো’ গান দু’টি প্রচারিত হয়। অদ্যাবধি এ দু’টি গানের জনপ্রিয়তা অব্যাহত আছে। কিন্তু এই তিনটি গানের মধ্যে ‘প্রথম বাংলাদেশ’ গানটি রাষ্ট্রপতি জিয়ার দৃষ্টি আকর্ষিত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হয়তোবা এ গানে এ দেশের সবুজ সোনালি প্রকৃতি প্রসঙ্গ নিপুণভাবে বর্ণিত হয়েছে। পাশাপাশি দেশ ও মাটির সঙ্গে দেশপ্রেমের অঙ্গীকারের উচ্চারণ ব্যক্ত হয়েছে। তাই তো আমাকে ডেকে নেয়া হয়েছিল দু’বার—১. সরাসরি তাঁর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য পুরান ঢাকার কোনো এক রাজনৈতিক মঞ্চে, ২. বঙ্গভবন থেকে ২৭নং রোডে বিএনপির তত্কালীন কার্যালয়ে।

বাংলাদেশের মতো দেশে একজন রাষ্ট্রনায়কের একজন সাধারণ গীতিকার বা লেখককে খুঁজে নিয়ে তাঁকে দীর্ঘক্ষণ পাশে রাখা এবং তার লেখার প্রশংসা করার নজির সত্যিই দুর্লভ। আমার কাছে এটা ঐতিহাসিক মনে হয়। আমি কোনো আর্থিক অনুদানের প্রকল্প নিয়ে যাইনি তার কাছে। তবে একথা না বললে অকৃতজ্ঞ হব, রাষ্ট্রপতি জিয়া, আমি মোটামুটি শিক্ষিত বেকার শুনে আমাকে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীতে একটি অফিসার পদে নিয়োগ দেয়ার জন্য নির্দেশ দেন।

‘প্রথম বাংলাদেশ’ গানটি বিএনপির দলীয় সঙ্গীত হিসেবে গৃহীত হয় এবং আজও তা অব্যাহত আছে। রাষ্ট্রপতি জিয়ার একজন গীতিকারের প্রতি এতসব উদারতা, তাঁর সংস্কৃতিবান হওয়ার পরিচয়ই বহন করে। রাষ্ট্রপতি জিয়া আমাকে বলেছিলেন, ‘আপনাকে গান লিখতে হবে।’ আপনি শুনতে পান আর না পান আমার আত্মপ্রচার হলেও বলছি, আমি প্রায় ৪০০ চলচ্চিত্রে গান লিখেছি। রেডিও টেলিভিশন ক্যাসেট ডিক্সের জন্য গান লিখেছি প্রায় দুই হাজার।

এই দেশ এই মাটির জিয়া, জনতার জিয়া, সংস্কৃতির জিয়া, ইতিহাসের জিয়া। তাঁকে এদের থেকে বিচ্ছিন্ন করবে কী করে?

মনিরুজ্জামান মনির

monirlyric@gmail.com