সংখ্যা বিচারে ঈশ্বর নিজেই যখন সংখ্যালঘু

0

আমার এক বন্ধু ছিলো, নাম শ্রাবণ। হিন্দু ধর্মের হলেও সে বেশিরভাগ মিশতো মুসলিমদের সাথেই। গরুর মাংশের কালো ভূনা ওর খুব প্রিয় ছিলো। কুরবানির ঈদ সে আমাদের চাইতেও অধিক আনন্দের সহিত পালন করতো। সে আমাদের সবার কাছেই বেশ আদরের ছিলো। স্পেশালী ওর কথার জন্য। ছোটবেলা থেকেই ওর জিহ্বায় একটু সমস্যা থাকার কারণে কথাগুলো বাচ্চাদের মত বলতো। ঠিক তোতলা নয়। ‘র’ কে ‘ল’ উচ্চারণ করে ফেলতো যখন এক্সাইটেড হত। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করেই বলতো “ইলোলা।” কিউট শোনাতো।

তখন আওয়ামিলীগের প্রথম আমল। “সংখ্যালঘু” শব্দটির প্রসূতি কাল। যেখানে সেখানে এই কথা। টিভিতে, রেডিওতে, সংবাদপত্রে। আমরা নতুন করে এই রেইসিস্ট শব্দের মাধ্যমে বর্ণবাদীতার আরেক যাদুর যুগে প্রবেশ করলাম। বিরোধীদল নাকি নাওয়া খাওয়া ভুলে শুধু ‘সংখ্যালঘু’ই পেটায় দিনরাত! হা ভগবান!

একদিন এক গেট টুগেদারে শ্রাবণ এলে তাকে এক ফাজিল বন্ধু বলে ওঠে, “কি জনাব সংখ্যালঘু? খবর কি?” আমরা অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম এই কথায়। কিন্তু তামজীদ নামের সেই বন্ধু বলতেই থাকলো, “মাইন্ড কোরনা বন্ধু। তোমাদের প্রাণের সরকার এই শব্দ এমনভাবে বলছে যে ইদানিং তোমার কাছাকাছি আসতে ভয় হয়। কবে আবার বলে ফেলো নির্যাতন করেছি। বন্ধু হারাতে চাইনা। আঙ্কেলকে বলে কিছু করাও না প্লিজ।” শ্রাবনের বাবা ছিলেন সচীব।

আমরা হতবাক। ভাবলাম দুদিন ধরে কিছু রাজনৈতিক বই টই পড়ে বেশ একদম বিপ্লবী বনে গিয়েছে! চোখের ঈশারা পড়ায় তামজীদ থামে। ও খুব ভালো স্টুডেন্ট ছিলো। পাঠ্যবই ছাড়াও সে প্রচুর কঠিন কঠিন বই পড়তো। পড়ুয়া বলে পরিচিত ছিলো সে। আমরা ভাবতাম তামজীদ একদিন শাইন করবে। আমরা রাজনীতির ‘র’ বুঝিনা তখন কিন্তু তামজীদ কত কিছু জানে এত ছোটবেলাতেই।

শ্রাবণ রাগ করেনি। হাসতে হাসতেই বলে, “মাইন্ড করিনি। সরকারের এসব কার্ড আমরা জানি। তবে এই সরকার যা সুবিধে দিচ্ছেন আমাদের তাতে করে এই সংখ্যালঘু কার্ড খেললেও আপত্তি করবার জো নেই। ক্ষমতায় থাকলে সংখ্যালঘু টঘু ব্যাপার নয়। সামনে আসছে শুভদিন শেখ হাসিনার আশীর্বাদ নিন। হাহাহা”

তামজীদ বলে, “ঠিকই বলেছো। সংখ্যা ব্যাপার নয়। সংখ্যাবিচারে ঈশ্বর নিজেই কিন্তু সংখ্যালঘু। তাতে করে কি তার পাওয়ার কমেছে? হাহাহা।”

এতবছর পর দেশের অফিস আদালত, পুলিশ ফোর্স, সচিবালয়, কেরানী থেকে শুরু করে আমলা, মিডিয়াপাড়া যেখানেই তাকাই সেখানেই দেখি প্রচুর হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অবস্থান। কথাটি বললাম বলে সাম্প্রদায়িক তকমা লাগাবেন না। চোখে পড়ার মত অবস্থা হয়েছে একেবারে। প্রায় ৪৩ শতাংশ হিন্দু ধর্মাবলম্বীর অবস্থান অনেক ক্ষেত্রে। অথচ এদেশে সংখ্যা হিসেবে আসলে কত পার্সেন্ট হিন্দু ধর্মের?

আমাদের এসব কথা তুলতে না দিলেও এগুলোই কিন্তু একদিন দাঙ্গার সূত্রপাত করবে। কেন করবে জানেন?

কারণ, ভারতের হুকুমে হিন্দুত্বকরণ করতে গিয়ে চাকুরীর ক্ষেত্রে এদেশের যেসব মুসলিমদের অধিকার হরণ করা হচ্ছে তাতে একদিন অধিকার বঞ্চিত মানুষেরা উগ্রপন্থা অবলম্বন করতে পারে। সরকারের এই উগ্র মনোভাবের কারণেই এমনটি ঘটতে পারে। এটি ধর্ম নিয়ে নয়। হবে অধিকারের লড়াই। সুতরাং অসাম্প্রদায়িক হতে গিয়ে মুসলমান সম্প্রদায়ের অধিকার হরণ করে দেশে শান্তির ভুয়া ধোয়া তুলবেন না। যার যতটুকু প্রাপ্য ঠিক ততটুকুই দিন। আমরা শান্তি চাই।

লেখকঃ ইলোরা জামান