শ্বাসরুদ্ধকর ৩ ঘণ্টা, কী ঘটেছিল তখন বিএনপি কার্যালয়ের পাশে?

0

জিসাফো ডেস্কঃ বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ‘জাতীয়তাবাদী জনতার উচ্চ আদালত’ বসাতে এবারও ব্যর্থ হলেন দলটির পুনর্গঠনের মুখপাত্র দাবিদার কামরুল হাসান নাসিম। বিএনপির সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বাধার মুখে এবার কার্যালয়ের আশপাশেই ঘেঁসতে পারেনি তার অনুসারীরা। গত ২ জানুয়ারি বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ‘জাতীয়তাবাদী জনতার উচ্চ আদালত’ বসানোর লক্ষ্যে কামরুল হাসান নাসিমের অনুসারীরা সেখানে যান। তবে ‘নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় দখল হয়ে যাবে’- এমন আশঙ্কায় ওইদিন সকাল থেকেই কার্যালয়ের সামনে পাহারা বসায় ছাত্রদল। নাসিমের অনুসারীরা জাতীয় পতাকা হাতে পল্টন থানার সামনে দিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে গেলে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ধাওয়ায় পিছু হটে। তবে নাসিম নিজে ওই কর্মসূচিতে হাজির ছিলেন না। তিনি পল্টন থানার সামনে অবস্থান করছিলেন।

এর আগে, গত ২৬ নভেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ‘জাতীয়তাবাদী জনতার নিম্ন আদালত’ বসান কামরুল হাসান নাসিম। সেখান থেকে বিএনপি পুনর্গঠনের জন্য দলটির গঠনতন্ত্র (সংবিধান) অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিতের দাবি করেন তিনি। একইসঙ্গে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ‘জাতীয়তাবাদী জনতার উচ্চ আদালত’ বসানোর ঘোষণা দেয়া হয়। তবে কবে এ আদালত বসানো হবে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখ তখন জানানো হয়নি।

‘কামরুল হাসান নাসিম ফের বিএনপি কার্যালয় দখল করতে আসছেন’-রোববার দুপুর থেকেই দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে এমন খবর ছড়িয়ে পড়ে। তবে তারা প্রথমে এ খবরকে ‘গুজব’ বলে উড়িয়ে দেয়া হয়। এরপর বিএনপি বিটের সাংবাদিকসহ বিভিন্ন মারফতে খবরের সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করে নেতারা। পরবর্তীতে এ খবরকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ছাত্রদলসহ অন্য অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের কার্যালয়ের সামনে আসার নির্দেশ দেয় দলটি। বিএনপি কার্যালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

দুপুর দেড়টার দিকে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে অন্যদিনের মতো স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে। বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদ, সহ-দপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু তখন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অবস্থান করছিলেন। তবে কার্যালয়ের সামনে বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের কোনো নেতাকর্মীকে তখনো দেখা যায়নি।

এরপর একে একে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সেখানে আসতে শুরু করেন। গণমাধ্যম কর্মীদের ভীড়ও বাড়তে থাকে। দুপুর ২টা থেকে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি তারেক উজ্জামান তারেক, নাজমুল হাসান, মাসুদ খান পারভেজ, আবু আল আতিক হাসান মিন্টু, দপ্তর সম্পাদক আবদুস সাত্তার পাটোয়ারীসহ সংগঠনটির শতাধিক নেতাকর্মী সেখানে হাজির হন। আসতে থাকেন যুবদলের কর্মীরাও। বাড়তে থাকে সাদা পোশাকের গোয়েন্দা পুলিশের উপস্থিতিও।

কোনো কর্মসূচি ছাড়া বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে হঠাৎ করে সৃষ্ট এমন পরিস্থিতিতে আশপাশের লোকজনও কৌতুহলী হয়ে ওঠেন। অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো কিছু ঘটার আশঙ্কায় অনেকে আবার আতঙ্কিতও হয়ে পড়েন। এ সময় কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের সড়কে হঠাৎ করে যান চলাচল সীমিত হয়ে যায়।

‘কামরুল হাসান নাসিমের অনুসারীরা বিজয়নগর পানির ট্যাংকির সামনে অবস্থান করছে’-এমন খবরে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হঠাৎ তৎপর হয়ে ওঠে। নাসিমকে প্রতিহত করতে তাদের কেউ কেউ বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নিচতলায় গিয়ে লাঠিসোটা হাতে প্রস্তুতিও গ্রহণ করে। পৌনে ৪টার দিকে হঠাৎ খবর আসে, নাসিমের অনুসারীরা নাইটিঙ্গেল মোড় দিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের দিকে আসছে। এ খবরে মুহূর্তেই সেখানকার পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ধর ধর শব্দে লাঠিসোটা হাতে নিয়ে কার্যালয়ের সামনের সড়কের ডিভাইডার ডিঙিয়ে নাইটিঙ্গেল মোড়ের দিকে অগ্রসর হয় তারা।

নাইটিঙ্গেল মোড় দিয়ে তিনটি সাউন্ডবক্স নিয়ে নীল রঙের একটি পিকআপ ভ্যান তখন আনন্দ ভবন কমিউনিটি সেন্টারের সামনে পর্যন্ত এসেছে। গাড়ির সামনে তখন ‘দলীয় বিপ্লবের মহড়া’ লেখা লাল রঙের একটি ব্যানার ঝুলছিল। ছাত্রদলের কর্মীরা এসেই হাতে থাকা লাঠি দিয়ে গাড়িতে ভাঙচুর শুরু করে। পিকআপের উপরে থাকা গাড়ির হেলপার ও সাউন্ড রেকর্ডার তাদের আক্রমণের শিকার হয়। একপর্যায়ে তারা পিকআপ থেকে লাফ দেয়। পিকআপের ভেতরে থাকা চালক আগেই পালিয়ে যায়।

এরপর পিকআপ ভ্যানটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। তবে ছাত্রদলের পদধারী কোনো নেতাকে এ ধ্বংসযজ্ঞে অংশ নিতে দেখা যায়নি। এ সময় রাস্তার লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। লোকজন ভয়ে ছোটাছুটি করতে শুরু করেন। গাড়িগুলোও হর্ন বাজিয়ে এলোমেলোভাবে চলতে থাকে। ইজতেমা ফেরত মুসল্লীদের নিয়ে বলাকা পরিবহনের একটি বাস কোনো উপায় না দেখে কাকরাইলের স্কাউট ভবনের প্রাঙ্গণে ঢুকে পড়ে।

পিকআপ ভ্যানটি যখন আগুনে দাউ দাউ করে পুড়ছিল, তখন আশপাশের লোকজন দাঁড়িয়ে তা দেখছিলেন। কেউ আগুন নেভানোর চেষ্টা করেনি। একপর্যায়ে গাড়িটি সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। একইসঙ্গে পিকআপটিতে থাকা তিনটি সাউন্ড বক্সও পুড়ে যায়। ১৫ মিনিট পর সেখানে পল্টন থানার পুলিশ এসে হাজির হয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়েই তারা তিনজন উৎসুক জনতাকে আটক করেন, যারা সেখানে দাঁড়িয়ে নিজেদের মোবাইলে ‘আগুনে গাড়ি পোড়ার ওই দৃশ্য’ ধারণ করছিলেন।

তবে সেখানে উপস্থিত ইংরেজি দৈনিক ‘নিউ এজ’র চিফ ফটোগ্রাফার সানাউল হকের হস্তক্ষেপে পুলিশ তাদেরকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। পুলিশ এরপর আশপাশের লোকজনের সহায়তায় আগুন নিভিয়ে ফেলে। এ সময় পিকআপ ভ্যান থেকে কয়েকটি বই পাওয়া যায়। ‘নেতৃত্ব’ শিরোনোমে লেখা ওই বইগুলোর লেখক কামরুল হাসান নাসিম নিজেই।

এ প্রসঙ্গে পল্টন থানার ওসি মোর্শেদ জানান, দুর্বৃত্তরা ‘আসল বিএনপি’র একটি গাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। এ ঘটনায় কেউ আটক হয়নি।

জানতে চাইলে নিজেকে ‘সাউন্ড অপারেটর’ পরিচয় দেয়া পিকআপ ভ্যানে থাকা মো. টিপু বলেন, ‘সেগুনবাগিচার শিল্পকলার সামনে থেকে বিএনপির দলীয় গান বাজাতে বাজাতে আমরা তিনজন (ড্রাইভার, সে ও রাব্বি হেলপার) পিকআপ ভ্যানে করে আসছিলাম। গায়ক মামুন ভাই আমাদেরকে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে যেতে বলেন। কিন্তু আনন্দ ভবন কমিউনিটি সেন্টারের সামনে আসলে সামনে থেকে হঠাৎ করে ৪০-৫০ জন লোক এসে আমাদের পিকআপে হামলা চালায়। তারা গাড়ির সামনের গ্লাস ভাঙচুর ও আমার ওপর হামলা করে। তাদের লাঠির আঘাতে আমার বাম হাত কেটে যায়।’

পিকআপের সঙ্গে কোনো লোক ছিল কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে টিপু বলেন, ‘শিল্পকলার সামনে থেকেই আমাদের পিকআপের পেছন পেছন ৫০-৬০ লোক আসছিলেন। পিছন থেকে তারা কখন সরে গেছে তা আমি দেখিনি। তারা কাদের লোক ছিল, তাও আমি জানি না।’

উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে বিকেল পৌনে ৫টায় নয়াপল্টনের দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপি। সেখানে দলের যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘সরকার গোয়েন্দাদের দিয়ে পাড়া-মহল্লা ও বস্তি থেকে টোকাই ও উচ্ছিষ্টদের ধরে এনে বিএনপি কার্যালয় দখলের চেষ্টা করছে। বিএনপি যাতে শান্তিপূর্ণভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে না পারে সেজন্য সরকার এ ধরনের হীন কৌশল ও অপচেষ্টা করছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।’

রিজভী আরো বলেন, ‘সরকার এসব টোকাই ও উচ্ছিষ্টদের দিয়ে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে মিছিল করিয়ে প্রমাণ করতে চায়, এরা বিএনপির আরেকটি অংশ। কিন্তু এটি করলে তারা বিএনপি হয়ে যাবে না।’

জানতে চাইলে কামরুল হাসান নাসিম বলেন, ‘রুহুল কবির রিজভী আহমেদ ভাড়া করা হাফপ্যান্ট পরা সন্ত্রাসীদের দিয়ে আজ (রোববার) বিএনপির লোকজনের ওপর হামলা চালিয়েছে। পিকআপ ভ্যানে আগুন দিয়েছে। ৯২ দিনের জ্বালাও-পোড়াওয়ের আন্দোলনে যেভাবে গাড়ি পোড়ানো হয়েছে, সেই একই কায়দায় আজ আবারো গাড়ি পোড়ানো হলো। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে বিএনপিকে ছোট করা হয়েছে। এর জন্য একজন রিজভীই দায়ী।’

তিনি দাবি করেন, বিএনপিতে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় দলীয় বিপ্লবের অংশ হিসেবে যেকোনো মুহূর্তে নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে ‘জাতীয়তাবাদী জনতার উচ্চ আদালত’ বসবে।

এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে সোমবার দুপুর ২টা ১৭মিনিটে সেগুনবাগিচার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনি মিলনায়তনে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলন আহ্ববান করেছেন বিএনপি পুনর্গঠনের মুখপাত্র দাবিদার কামরুল হাসান নাসিম।