শিমুল বিশ্বাসের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও কিছু সত্য কথা

0

রুহুল আমিন

বেশ ক’বছর পূর্বে প্রবাসী বার্তায় “শিমুল বিশ্বাস বেগম খালেদা জিয়ার বিশ্বস্ত সহচর” নামে একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম। নিবন্ধটি প্রকাশের পর ফেসবুকে হৈ চৈ পড়ে যায়। অনেকে এর পক্ষে আবার অনেকে এর বিপক্ষে মতামত দেন। কেউ কেউ আমাকে শিমুল বিশ্বাসের দালাল বলতেও কার্পন্য করেন নি। কেউ কেউ আবার লিখলো আগামীতে বিএনপি ক্ষমতায় আসলে ভাল পদ-পদবী পাওয়ার জন্য আমি শিমুল বিশ্বাসের পক্ষে সাফাই গাইছি। কামরুল ইসলাম সহ দু’একজন ব্যক্তিগতভাবেও আক্রমন করলো। এবং এই বলেও হুংকার দিল যে শিমুল বিশ্বাসের দিন শেষ। খুব শীঘ্রই বেগম খালেদা জিয়া তাকে গুলশান অফিস থেকে তাড়াবেন ইত্যাদি ইত্যাদি। যাক সে সব কথা।

এ নিবন্ধ প্রকাশের পর আরো তিন বছর পার হয়ে গেল। কিন্তু একটি চক্র প্রথম থেকেই তার পেছনে লেগে আছেন এবং তারা কখনও শিমুল বিশ্বাসকে ডিজিএফআই-এর দালাল, আবার কখনও “র”এর দালাল, আবার কখনও সরকারের দালাল বলে অভিহিত করেন। তারা সর্তই শিমুল বিশ্বাসের বদনাম রটাচ্ছেন ততই দিনদিন শিমুল বিশ্বাসের অবস্থান পাকাপোক্ত হচ্ছে। শিমুল বিশ্বাসকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি ২০০৩ সাল থেকে। তখন তিনি বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান হিসেবে অত্যন্ত সফলতার পরিচয় দিচ্ছিলেন। লোকসানে ডুবে যাওয়া বিইডব্লিউটিসিকে তিনি ব্যক্তিগত সততা, মেধা ও দক্ষতা দিয়ে অল্প দিনেই লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিনত করেছিলেন। মতিঝিল অফিস পাড়ায় তার বেশ সুনাম ছিল। এমনকি আওয়ামীলীগ, জাতীয় পার্টি সমর্থক শ্রমিক ইউনিয়নও তার ভক্ত ছিল। তার চাচা এ কে এম সাজেদুর রহমান কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে ২০০২-২০০৬ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। আমি তখন কৃষি ব্যাংকে কর্মরত। কিন্তু শিমুল বিশ্বাস একদিনও কোন কাজের তদবির করতে তার চাচার কাছে আসেন নি। আমার বেশ মনে আছে ২০০৩ সালে জিয়াউর রহমান স্মারক গ্রন্থ (৩য় সংস্করন) এ প্রকাশনা অনুষ্ঠান উপলক্ষে একটি স্মরনিকা প্রকাশের লক্ষে শিমুল বিশ্বাসের কাছে একটি বিজ্ঞাপনের জন্য একজন বিজ্ঞাপন কর্মীকে পাঠিয়ে ছিলাম। শিমুল বিশ্বাস উক্ত স্মরনিকায় বিজ্ঞাপন দেননি। কারন হিসেবে জানালেন আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে প্রায় ১ কোটি টাকার ভূয়া বিজ্ঞাপন দিয়ে গেছেন আগের চেয়ারম্যান। এখনও ডিএমপিতে অনেক টাকা বকেয়া রয়েছে। তিনি ৫০০/- টাকা দিয়ে একটি বই কিনলেন এবং প্রকাশনা অনুষ্ঠানের দাওয়াত দেওয়ার জন্য বললেন। জিয়াউর রহমান স্মারক গ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে তাকে আমি দাওয়াত দিয়েছিলাম এবং বক্তব্য রাখারও সুযোগ দিয়েছিলাম। স্মারক গ্রন্থ সম্পর্কে তার বক্তব্য শুনে আমি অনেকটা আশ্চর্যান্বিত হয়েছিলাম এই ভেবে সে অনেক নামকরা বুদ্ধিজীবিরাও তার বক্তব্যের ধারে কাছে যেতে পারেন নি। কারন মনে হয় বইটি তিনি আগাগোড়াই মনযোগ সহকারে পাঠ করেছিলেন। সেই থেকে শিমুল বিশ্বাসের প্রতি আমার শ্রদ্ধাবোধ বেড়ে যায়। এরপর শিমুল বিশ্বাসের সাথে ক’বছর আমার খুব একটা যোগযোগ ছিলনা । ২০০৭-এর ১১ জানুয়ারি আওয়ামীলীগ ও জি-৮ এর সমর্থনে এক-এগারোর সরকার ক্ষমতা দখল করার পর একদিন পত্রিকায় দেখলাম শিমুল বিশ্বাস বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যানের চাকরি স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিয়ে দৈনিক দিনকালে ব্যবস্থাপনা সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেছেন যদিও সরকার থেকে তাকে চাকরির আরো ১ বৎসর মেয়াদকাল পূর্তি করার জন্য বলা হয়েছিল। কিন্তু জিয়া পরিবার ও বিএনপির দুর্দিনে সচিব পদমর্যাদার চাকরির মোহত্যাগ করে জিয়া পরিবারের পাশে দাড়ান। এক-এগারোর সময়কালে তিনিই ছিলেন সর্বশেষ ব্যক্তি যিনি বেগম জিয়ার সাথে আষ্টেপৃষ্টে লেগেছিলেন। এবং খালেদা জিয়াকে বিদেশ না যেতে বার বার অনুরোধ করেছেন এমনকি ভেটোও দিয়েছেন। শুধু তাই নয় অনেক নামী দামী সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীদের দ্বারস্থ হয়েছেন ম্যাডামকে ফোন করে সাহস দিতে যাতে সরকারের চাপকে অগ্রাহ্য করে দেশে থাকেন। সে সময় ডিজিএফআই তার ওপর প্রচন্ড ক্ষিপ্ত ছিল। সেনাবাহিনীতে আমার বেশ কিছু আত্মীয় স্বজন তখন কর্মরত। একদিন আমার এক নিকটাতœীয় আমার বাসায় এসে জিজ্ঞেস করলেন শিমুল বিশ্বাসকে চিনি কিনা। আমি বললাম মোটামোটি চিনি। তিনি কেমন লোক জানতে চাইলেন। আমি বললাম যতটুকু জানি তিনি সৎলোক। ঢাকায় তার নিজের কোন বাড়ি বা ফ্ল্যাট নেই। কোন গাড়ীও নেই। রিক্সা-বাস-টেম্পুতে চলাচল করেন। তিনি বললেন, বলেন কি বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান ছিলেন প্রায় ৫ বছর অথচ তার ঢাকায় কোন বাড়ী-গাড়ি নেই। তার বিরেদ্ধে তদন্ত হচ্ছে নিশ্চয়ই তার কোন অনিয়ম পাওয়া যাবে। আমি বললাম পেতে পারেন আবার নাও পেতে পারেন। বেশ ক’মাস পর হঠাৎ একদিন সন্ধ্যার সময় আমার সেই নিকটাত্মীয় আমার বাসায় এলেন। বললেন আপনার কথাই ঠিক। যতমাস আমাদের লোক তার সাবেক কার্যালয়ে অনেক খোজাখুজি করেছে। কিন্তু কোন অনিয়মের সঙ্গে তাকে জড়িত পাওয়া যায় নি। আরো মজার ব্যাপার হল তার পেছনে আমাদের দুজন কর্মকর্তা লাগানো ছিল তার গতিবিধির উপর নজর রাখার জন্য। সেই দু’জন কর্মকর্তা ১ মাস তাকে ফলো করে জানালেন, স্যার কার পেছনে আমাদেরকে লাগিয়েছেন। এই লোক কখনো রিক্সায়, কখনো বাসে, কখনো টেম্পুতে আবার কখনো হেটে যাতায়াত করেন। ওনাকে ফলো করতে গিয়ে আমাদেরকে বাস-টেম্পু-রিক্সায় চলাচল করতে হচ্ছে। যদি তিনি দুর্নীতি করে টাকা কামাই করবেন। এই ভাবে রিক্সা বাস-টেম্পুতে চলতেন না। ওনাকে ফলো করার দায়িত্ব থেকে আমাদের অব্যাহতি দেন।

এক-এগারোর সময় ম্যাডাম জেলে যাওয়ার পর শিমুল বিৎশ্বাসকেই তার উকিল হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন এবং শিমুল বিশ্বাসকে যখন ক্ষমতা প্রদান করেছিলেন যে যখন সে উকিল দরকার তাকে ম্যাডামের উকিল হিসেবে নিয়োগ করবেন। এটাই ছিল তখনকার বাস্তবতা। জিয়া পরিবারের দু’দিনের সময় তিনি নিজের জীবনকে বিপন্ন করে তাদের পাশে বটবৃক্ষের মত ছিলেন। জিয়া পরিবারের ব্যাপারে কারো সাথে তিনি কোন আপস করেননি। এর জন্য তাকে কম নাকান-চুবানি খেতে হয়নি। অনবরত ডিজিএফআই এর লোকজন তাকে হুমকি দিত। একবার তাকে তারা ধরে নিয়ে যায় এবং ২৪ ঘন্টা চোখ বেধে রেখে দেন। তারপরও তিনি তাদের কাছে মাথানত করেননি। তখন কারা কারা এক-এগারোর সরকারের সাথে গোপনে আঁতাত করেছিলেন তার কম বেশী আমার জানা ছিল উক্ত বাহিনীতে আমার কয়েকজন নিকটাত্মীয় থাকার সুবাদে।

২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে বেগম খালেদা জিয়া এক-এগারোর সরকারের জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তারেক রহমানের নির্দেশে শিমুল বিশ্বাস ম্যাডামের বিশেষ সহকারীর দায়িত্ব গ্রহন করেন এবং শত প্রতিকুলদার মাঝেও তার দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করে আসছেন। এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি অনেকের বিরাগভাজন হয়েছেন। অনেকের শত্রুতে পরিনত হয়েছেন। তাছাড়া তার নিয়োগের প্রথম থেকেই একটি মহল তাকে মেনে নিতে পারে নি। তারা সেই ২০০৯ সাল থেকেই শুরু করেছেন তার বিরুদ্ধে চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র। তাদের কিছু ভাড়াটে লোকজন সোসাল মিডিয়া, অনলাইন পত্রিকা এমন কি জাতীয় পিত্রকার কিছু কিছু অসাধু সম্পদিককে হাত করে তার বিরুদ্ধে মনগড়া অপপ্রচার অবিরামভাবে চালাচ্ছেন। বিএনপির অনেক নেতাকর্মীদের সাথে আমার মাঝে মাঝে আলাপ হয়। আমার কাছেও অনেকে বলছেন শিমুল বিশ্বাস ডিজিএফআই-এর দালাল। আবার অনেকে বলেছেন “র” এর দালাল, আবার অনেকে বলছেন সরকারের দালাল। যখন বলি প্রমান দেন তখন প্রমান দিতে পারেন না। তাদের কথা শুনে মাঝে মাঝে হাসি পায়। একজন লোক কিভাবে এতগুলো সংস্থার দালাল হয় তা আমার বোধগম্য নয়। বিএনপির জন্মকালীন থেকে এই দলের সমর্থন করে আসছি। কখনো সক্রিয় ভাবে. কখনো লেখালিখির মাধ্যমে। শহীদ জিয়া, খালেদা জিয়া, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ও বিএনপি নিয়ে আমি যতগুলি তাউশ সাইজের বই লিখেছি ও প্রকাশ করেছি এবং ফটো এলবাম বের করেছি। বিএনপির কোন লেখক বুদ্ধিজীবী তা করেনি। একথা আমি দৃরচিত্তেই বলতে পারি। চট্টলার সার্কিট হাউসে জননন্দিত রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান নিমর্মভাবে শাহাদতবরন করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র থাকা অবস্থায়ই রচনা করে ছিলাম “মৃত্যুঞ্জয়ী জিয়া”। তারপর সুদীর্ঘ ৩৩ বছর কলম কম বেশী চালিয়ে যাচ্ছি। সুতরাং এই দলের নাড়ীর সাথে আমার সম্পর্ক। হাউজ টিউটর হিসেবে জিয়া পরিবারের সাথে সম্পর্কে কথা না হয় বাদই দিলাম। একজন অনুসন্ধিসৎ লেখক রাজনীতির বিশ্লেষক, কলামিষ্ট ও অনলাইন পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে সুদীর্ঘ ৩৪ বৎসর যাবৎ বাংলাদেশের রাজনীতির গতি-প্রকৃতি নিবিড় ভাবে পর্যবেক্ষন করছি। বিএনপির উথান-পতন প্রত্যক্ষ করেছি। সুদীর্ঘ ৩৩ বছরে কারা কখন বিএনপি বা খালেদা জিয়ার সাথে বেঈমানী করে স্বৈরাচারী এরশাদ সহ অন্যসব সরকারের দালালী করেছেন এবং এখনও কারা দালালী করছেন বা সরকারের সাথে আঁতাত করে আন্দোলনের সময় ঘাপটি মেরে থেকেছেন তা কম বেশী আমার জানা আছে। আমাদের চোখের সামনেই অনেকে রাজনীতি করার সুবাধে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন। আলাদীনের চেরাগের বদৌলতে শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন।

শিমুল বিশ্বাস খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী হওয়া সত্ত্বেও লো-প্রফাইলে চলতেন বা এখনো চলেন। প্রায়ই তিনি বাসে করে গুলশান অফিসে যাতায়ত করেন। যদিও অফিস থেকে তার নামে একটি বাড়ী বরাদ্দ ছিল। বাসার ব্যাপারে তিনি আরো বেখেয়ালী। বাসায় বাজার হয় কিনা তার কোন খোজ খবর রাখেন না। এ নিয়ে তার স্ত্রী এবং ছেলেদের অবিযোগের অন্তনাই। তারা মনে করেন স্বামী বা পিতা হিসেবে তিনি উদাসীন। তিনি সারাদিন বিএনপি নিয়েই আছেন। প্রায়ই বন্ধু পরিবহনে গুলশান আসা নিয়ে তাকে একদিন আমি প্রশ্ন করেছিলাম যে আপনি বাসে কেন যাতায়ত করেন। আপনিতো ইচ্ছা করলেই গাড়ী ব্যবহার করতে পারেন। তার সোজাসাপটা উত্তর ছিল বাসে যাতায়াত করলে মানুষের মনের ভাব বুঝা যায়। বাসে অনেকে অনেকে কথা বলেন এতে বোঝা যায়। কোন দলের জনপ্রিয়তা কতটুকু। তাছাড়া আমি লো-প্রফাইলে চলি এই জন্য যে সরকার যাতে আমার পেছনে কেউ না লাগায় বা আমাকে গুরুত্বপূর্ন কিছু না মনে করেন। এতে আমার কাজ করতে সুবিধা হয়।

শিমুল বিশ্বাস মনে হয় খুব বেশীদিন সরকারের নজর এড়াতে পারেন নি। ২০১৩ সালের শেষের দিকে খালেদা জিয়া-শেখ হাসিনার টেলিসংলাপের সময় শিমুল বিশ্বাস সরকারের নজরে পড়েন এবং তিনি যে খালেদা জিয়ার একজন বিশ্বস্ত সহচর তা তারা টের পান। যার ফলশ্রুতিতে ২০ নভেম্বর, ২০১৩ কোন মামলা না থাকা সত্ত্বেও তাকে সরকার গ্রেফতার করে। এর একটাই কারন ছিল বেগম খালেদা জিয়ার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া এবং সরকার তাতে সফল হয়েছিল। জেল থেকে বের হবার পর তার পেছনে সরকারী লোকজন আঠার মত লেগে আছে। ৩ জানুয়ারি, ২০১৫ বেগম খালেদা জিয়া ইট-বালুর ট্রাক দিয়ে তার গুলশানের কার্যালয়ে অবরুদ্ধ হওয়ার পর টানা ৯২ দিন যেখানে অবস্থান করে। গুলশান অফিসের একটি সোফার মধ্যে ৯২ দিন শিমুল বিশ্বাস ঘুমিয়েছেন এবং শত প্রতিকুলতার মাঝেও বিশ্বস্ততার সাথে ম্যাডামের প্রতিটি নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। বিএনপির অধিকাংশ নেতাই সরকারের ডজন ডজন হামলা-মামলার শিকার। শিমুল বিশ্বাস বিএনপির নেতা না হয়েও ৪৭টি মামলার আসামী। ম্যাডামের অন্য ষ্টাফদের নামে কয়টি করে মামলা আছে আমার জানা নেই। ম্যাডাম গুলশান অফিসে অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় তার ছোট ছেলে প্রানাধিক আরাফাত রহমান কোকো মালয়েশিয়াতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ছেলের অকাল মৃত্যুও সংবাদ শুনে খালেদা জিয়া মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন ও শারীরিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী তাকে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়। এর মধ্যে গুলশান অফিসে প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব ফোন কেরন যে পুত্রশোকে কাতর খালেদা জিয়াকে সান্তনা দেয়ার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে আসবেন। সেই কথা সেই কাজ। অপর পক্ষের সময় প্রার্থনার আরজি উপেক্ষা করে ফোন করার ১৫ মিনিটের মধ্যেই প্রধান মন্ত্রী গুলশান কার্যালয়ের ফটকে এসে হাজির। প্রধানমন্ত্রী বা তার সভাসদবর্গের এতে কি রাজনীতির চাল ছিল সেদিকে আমি যেতে চাই না। তবে প্রধানমন্ত্রী বিএনপির গুলশান কার্যালয়ের সামনে আসার পর তাকে যথাযথ সম্মান দিয়ে রিসিভ না করা বা তিনি খালেদা জিয়ার সাথে দেখা করতে না পারার সমস্ত দোষ গিয়ে পড়লো শিমুল বিশ্বাসের ঘাড়ে। শুনেছি গুলশান কার্যালয়ের সামনে একজন মন্ত্রীও মিডিয়ার সামনে চিৎকার করে বলেছেন সকল কিছুর হোতা শিমুল বিশ্বাস। পরবর্তীতে সংসদেও শিমুল বিশ্বাসকে দোষারোপ করে এমপি-মন্ত্রীরা উত্তেজক আলোচনা করেছেন। মনের জাল মিটিয়েছেন সেদিনই বুঝতে পেয়েছিলাম যে শিমুল বিশ্বাস সরকারের রোষানলে পড়েছে এবং তার সামনের দিন গুলো হবে আরো কঠিন। তাকে আরো ভয়াবহ সমস্যা মোকাবেলা করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীকে গুলশান কার্যালয়ে ঢুকতে না দেওয়ায় আওয়ামীলীগই শুধু নয় বিএনপির অধিকাংশ নেতাকর্মী ও সমালোচনা মুখর হন। কিন্তু এটা বুঝেন না যে প্রধানমন্ত্রী যখন বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে এসেছিলেন তখন মওদুদ আহমেদ, ব্যারিষ্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া সহ অনেক সিনিয়র নেতাই গুলশান কার্যালয়ে ছিলেন। তারা কেন প্রধান মন্ত্রীকে রিসিভ করতে যান নি। শিমুল বিশ্বাসের কি এমন ক্ষমতা যে তিনি একক সিদ্ধান্তে প্রধানমন্ত্রীকে উক্ত কার্যালয়ে ঢুকতে দেননি। বরঞ্চ বিএনপির সিনিয়র নেতারা যখন কার্যালয়ের বাথরুমে গিয়ে লোকাতে ব্যস্ত তখন শিমুল বিশ্বাস অত্যন্ত সাহস করে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন এবং সরকারের ছলচাতুরির মুখোশ উম্মোচন করেন।
সরকারি মহল সহ সবাই জানেন যে শিমুল বিশ্বাস যুগপৎভাবে বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের আস্থাভাজন বিশ্বস্ত সহচর। তাদের দিক নির্দেশনা বাস্তবায়ন করাই শিমুল বিশ্বাসের অন্যতম কাজ। এ ধরনের পদে যারা কাজ করেন তাদেরকে অনেক সময় সাধারনের কাছে অপ্রিয় মনে হলেও দলের বৃহত্তর স্বার্থে নিজের কাধেঁ দোষ নিয়ে কাজটি করতে হয়।

সরকার বিরোধী আন্দোলন স্থিমিত হওয়ার পর সরকারি দল, গোয়েন্দা সংস্থা ও তাদরে পদলেহী সংবাদ পত্রের মাধ্যমে বিএনপির বিরুদ্ধে চর্তুমুখী ষড়যন্ত্র শুরু করে। জাতীয় পর্যায়ে বিএনপির নেতাদের মধ্যে অবিশ্বাস, সন্দেহ ও বিভেদ সৃষ্টির লক্ষে আগে একের পর এক চক্রান্ত করে যাচ্ছে। সেই চক্রান্তের অন্যতম টার্গেট ও শিমুল বিশ্বাস। এর একমত কারন হল শিমুল বিশ্বাসকে খালেদা জিয়ার কাছ থেকে সরাতে পারলে খালেদা জিয়াকে আরো দুর্বল করতে পারবে এবং ভবিষ্যতে তিনি আন্দোলনে নামার সাহস পাবেন না। সরকার তার স্বার্থে এ ধরনের নোংড়ামী করতেই পারে। কিন্তু আমার দু:খ হয় কিছু না বুঝে ফেসবুক সহ কিছু অনলাইন পত্রিকায় বিএনপির হিতাকাংখী সেজে নাম পরিচয় গোপন করে এমন ভাবে লেখেন যে মনে হয় শিমুল বিশ্বাসকে তাড়াতে পারলেই বিএনপি আন্দোলন করে এ সরকারকে টেনে হেঁচড়ে নামাতে পারবে। তাদের উদ্দেশ্যে শুধু একটি কথা বলতে চাই এ ধরনের নোংড়ামী করে আপনারা বিএনপির ক্ষতি করছেন। আমার মনে হয় অন্য কোন জায়গায় মদদে আপনারা এ ধরনের জঘন্য খেলায় মেতে উঠেছেন। যারা ফেসবুকে আন্দোলনের ঝড় তুলে ফেলেন তারা বাস্তবে কোনদিন রাস্তায় নামানে নি। আন্দোলন করা দুরে থাক। ২০১৩ এবং ২০১৫ এর সরকার বিরোধী আন্দোলন খুব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষন করেছি। কারা কারা আন্দোলনে কি ভূমিকা রেখেছেন, কারা সরকারের দালালী করেছেন, কারা সরকারের সাথে আঁতাত করেছেন সবকিছুই আমার নখদর্পনে। ইনশাল্লাহ ভবিষ্যতে আন্দোলনের ব্যর্থতা নিয়ে কোন বই লেখি তবে তাদের স্বরূপ উম্মোচন করা হবে। আমি ঐ সমস্ত সুবিধাবাদী, আঁতাতকারী নেতাদেরকে মীর্জা ফখরুল, রিজভী আহমেদ, সালাহউদ্দিন আহমেদ, শামসুজ্জামান দুদু, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, মেয়র অধ্যাপক আ: মান্নান, সাবেক ছাত্রদল নেতা আনিসুর রহমান খোকন সহ অগনিত নেতাকর্মীদের ত্যাগ থেকে শিক্ষা নেবার আহবান জানাই। দালালী করে আঁতাত করে রাজনীতিতে কিছু দিন টেকা যায় কিন্তু বেশীদিন টেকা যায় না।

পাবনা জেলা বিএনপি নিয়ে প্রায়ই শিমুল বিশ্বাসকে দোষারোপ করা হয়। আমি যতদূর জানি সেই ১৯৯৪ সাল থেকেই পাবনা জেলা বিএনপিতে দুটি গ্রুপ বিদ্যমান। রফিকুল ইসলাম বকুল বিএনপিতে যোগ দেয়ার পর সিরাজ সরদারদের গ্রুপ কোনঠাসা হয়ে পড়ে। আবার রফিকুল ইসলাম বকুল মারা যাবার পর পূর্বেও গ্রুপ শক্তিশালী হয়। তখনতো শিমুল বিশ্বাস বিএনপি করতেন না। তারপরও শিমুল বিশ্বাসের উচিৎ বিদ্ধমান দু’টি গ্রুপের মধ্যে সমঝোতা করে ঐক্য স্থাপন করা।

বেশ ক’বছর ধরেই সর্বত্রই একটা কানাঘুসা শুনি যে বিএনপির গুলশান অফিস থেকে গোপন সংবাদ ফাঁস হয়ে যায়। এমনকি স্থায়ী কমিটির সভার সিদ্ধান্তও র্ফাস হয়ে যায়। এবং এ ক্ষেত্রেও অনেকেই শিমুল বিশ্বাসকে দোষারোপ করেন। অর্থাৎ যতদুষ নন্দঘোষ। স্থায়ী কমিটির সভায়তো শিমুল বিশ্বাস থাকেন না। তবে তিনি কি করে গোপন তথ্য ফাঁস করবেন? ৩ জানুয়ারি, ২০১৫, ম্যাডাম বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যাবেন সে তথ্য কে ফাঁস করেছিল। বিশ্বস্ত সূত্র থেকে তো আমি জানতে পেরেছি যে ম্যাডামের সাথে যে দু’জন মহিলা নেত্রী ছিলেন তাদের একজনের কাছ থেকেই সরকারি সংস্থা তা জানতে পেরেছেন। হতে পারে সেটা অনিচ্ছাকৃত বা ঘটনার গুরুত্ব বোঝার অজ্ঞতা থেকে।

শিমুল বিশ্বাস সম্পর্কে ইদানিং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন অভিযোগ যে তিনি বিএনপি নেতাদের ঘন্টার পর ঘন্টা বসিয়ে রাখেন। তার যাকে পছন্দ তাকে আগে ম্যাডামের সাথে দেখা করার সুযোগ দেন। আর তৃনমূল কর্মীদের ম্যাডামের সাথে দেখা করতে দেন না। এখানে এ কথাটিই প্রযোজ্য যে ম্যাডাম যার সাথে আগে দেখা করতে চান তাকেই আগে দেখা করতে দেন। ম্যাডামের নির্দেশ ছাড়া কাউকে তিনিতো ম্যাডামের সাথে দেখা করতে দিতে পারেন না। তার ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দ এখানে অবান্তর। তবে তৃনমূল নেতা-কর্মীদের সাক্ষাতের ব্যাপারে যে অভিযোগ উঠেছে তা খতিয়ে দেখা উচিত এবং সপ্তাহে কমপক্ষে একদিন হলেও ম্যাডামের সাতে তৃনমূল নেতাকর্মীদের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা উচিৎ বলে আমি মনে করি।

পরিশেষে একটি কথা বলতে চাই বেগম খালেদা জিয়া ৩ বারের প্রধানমন্ত্রী ২ বার বিরোধী দলীয় নেত্রী। ১৯৮২ সাল থেকে অদ্যাবধি পর্যন্ত অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে তিনি এ অবস্থায় এসছেন। অনেক ঘটনার চাক্ষুস সাক্ষী তিনি। তিনি ঘাস খেয়ে ৩ বার প্রধান মন্ত্রী হননি যে একজন ডিজিএফআই-এর দালালকে বা “র” এর দালালকে তিনি বিশেষ সহকারী নিযুক্ত করবেন। ম্যাডাম যার ওপর আস্থাবান, যিনি তার সততা, দক্ষতা ও মেধা দিয়ে ম্যাডামের বিশ্বস্ততা অর্জন করেছেন তাকেই তিনি এ গুরুত্বপূর্ন পদে নিয়োজিত করেছেন। আপনার বা আমার কাঁদাছোড়াছুড়ি, লাফালাফি, ফালাফালিতে কিছু যায় আসেনা। সবশেষে একটি বাস্তব ঘটনার বিবরন দিয়ে আমার এ প্রসঙ্গেও ইতি টানব। ২০০৪ সালের কথা। আমি তখন কৃষি ব্যাংকে কর্মরত। কৃষি ব্যাংকে জিয়া পরিষদের সভাপতি তার কয়েকজন সহকর্মী নিয়ে ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান আহ্বাব আহমেদের কাছেইগয়ে আরজি জানালেন যে, চেয়ারম্যান স্যারের পিএস কাজী রুহুল হাসান কট্টর আওয়ামীলীগের। তাকে প্রধান কার্যালয় থেকে অন্যত্র বদলী করতে হবে। ঝানু আমলা আহ্বাব আহমেদ সবকিছু শুনে বললেন, আমার পিএস নিয়ে আপনাদের মাথা ব্যথা কেন? মাথা ব্যথাতো আমার হওয়া উচিৎ। আমি ঘাস খেয়ে সিএসপি অফিসার হয়নি। আমার পিএস যতক্ষন আমার পারপাস সার্ভ করতে পারবে ততখন সে এখানে থাকবে। পারপাস সার্ভ করতে না পারলে বিদায় হবে।

শিমুল বিশ্বাসের ক্ষেত্রে কি এ উপমাটি প্রযোজ্য নয়? বেগম খালেদা জিয়া বা তারেক রহমানের পরপাস যতদিন শিমুল বিশ্বাস সার্ভ করতে পারবেন ততদিনই তিনি সেখানে থাকবেন। যদি তাদের পারপাস সার্ভ করতে না পারেন বিদায় হবেন। কাজেই খামাকা কষ্ট করে তার চরিত্র হনন করে বা তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে কোন লাভ হবে না। খামাকা সময় নষ্ট। আর যদি টুপাইসের বিনিময়ে দলের দুর্দিনে এ ধরনের নোংড়ামী কাজে নিয়োজিত থাকেন। তবে করতে থাকেন আর টুপাইস কামাই করতে থাকেন।

সবশেষে বিএনপি নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্য একটা নিবেদন করতে চাই। বিএনপি এবং দেশের এই ক্রান্তিকালে সরকারের ফাঁদে পা না দিয়ে মান-অভিমান ভূলে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পাশে দাড়ান। তার হাতকে শক্তিশালী করুন। মনে রাখবেন তিনিই হচ্ছে এদেশের কোটি কোটি নির্যাতিত-নিস্পেষিত জনতার আশা-আকাঙ্খার মূত প্রতীক। একমাত্র তিনিই পারবেন আমাদের হারানো গনতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে। আর যদি গনতন্ত্র নির্বাসিত হতেই থাকে তবে সেদিন খুব বেশি দূরে নয় সে দিন আমাদের কপালে আরো দু:খ ঘনীভূত হবে। নবাব সিরাজউদ্দোলার ইতিহাস থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া উচিৎ।