শাহাদতের আগের রাতে খাওয়ার সময় জিয়া কাকে যে বললেন, “আরেক টুকরো মাছ হবে?”

0

আজ বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৩৫ তম শাহাদাত বার্ষিকী । ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যের হাতে শহীদ হন তিনি । জিয়ার শাহাদাতের আগের রাতের বর্ননা দিতে গিয়ে সেই সময়ের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বর্তমানে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমান আজ এক নিবন্ধ লিখেছেন।

নোমান লিখেছেন,

এ সময় খাবার টেবিল থেকেই আওয়াজ শুনতে পাই, প্রেসিডেন্ট যেন কাকে বলছিলেন, আরেক টুকরো মাছ হবে? তখন তাকে বলা হলো, নো স্যার সব খাবার শেষ হয়ে গেছে। প্রেসিডেন্টের এই অপূর্ণতাটা আজও আমার মনে পড়ে।

রাত তখন ১১টা ছুঁই ছুঁই। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সামনে চট্টগ্রামের নেতাদের মধ্যে আমিই একমাত্র ব্যক্তি তার সামনে বসা। আমি চলে যাব। স্যারও ডিনারে যাবেন। এ সময় আমাকে শুধু বললেন, মি. ‘নো ম্যান’ ডোন্ট ওরি। এভরিথিং উইল অল রাইট উইদিন থ্রি মান্থ। আমাকে ঠাট্টা করেই নো ম্যান বলেই ডাকতেন স্যার। আবার ‘ইয়েস ম্যান,’ বলেও হাসতেন। এটা এজন্যই তিনি বললেন, জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট তখনো বিএনপির সঙ্গে যুক্ত হয়নি। তার উদ্দেশ্য ছিল জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের সবাইকে বিএনপির সঙ্গে একাকার করা। আমি তখন বিএনপিতে আসলেও কাজী জাফরসহ অনেকেই আসেননি। এটা নিয়েই বেশ কিছুক্ষণ কথা হলো। প্রেসিডেন্ট আশ্বস্ত করে বললেন, এটা নিয়ে ভাববেন না। আগামী তিন মাসের মধ্যেই সবাইকে নিয়ে বিএনপি দেশ গঠন করবে। শুধু দলের নেতা-কর্মীই নয়, অন্য রাজনৈতিক দল, বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে দেশ গঠনে কাজে লাগাতে হবে। এই বলে তিনি সার্কিট হাউসের দোতলায় খাবার টেবিলে যান। রাষ্ট্রপতির পিএস কর্নেল মাহফুজকে তখন খুবই অস্থির দেখাচ্ছিল। আমাকে মাহফুজ বারবার বলছিলেন, স্যার এখন ডিনারে যাবেন। আমিও তখন সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছি। এ সময় সেখানে থাকা মেজর হাফিজকে চিন্তিত অবস্থায় দেখতে পাই। সেখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারিনি সেদিন। এ সময় খাবার টেবিল থেকেই আওয়াজ শুনতে পাই, প্রেসিডেন্ট যেন কাকে বলছিলেন, আরেক টুকরো মাছ হবে? তখন তাকে বলা হলো, নো স্যার সব খাবার শেষ হয়ে গেছে। প্রেসিডেন্টের এই অপূর্ণতাটা আজও আমার মনে পড়ে।

আমি যখন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করছিলাম তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, মহিবুল হাসান, ড. আমিনাসহ ঢাকা থেকে আরও দু-একজন হবে। সন্ধ্যা থেকেই টানা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকসহ দলের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়া। ঢাকা থেকে আসা বিএনপির শীর্ষ নেতারাও এতে অংশ নেন। সবার আগে আসেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ। চট্টগ্রামের বিশিষ্টজনেরাও এসেছিলেন। তাদের ডাকার উদ্দেশ্য ছিল, সবাইকে নিয়ে দেশ গঠন করতে চান জিয়া। কেউ দল করুক আর না করুক, সবারই সহযোগিতা চান তিনি। আমার মনে আছে, রাষ্ট্রপতি জিয়া বলেছিলেন, ’৭১-এ আমরা যেভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছি, ঠিক সেইভাবেই দেশটাকে গড়তে চাই। শুধু বিএনপিই নয়, সবাইকে পাশে চাই। ওই বৈঠকে তিনি সক্রিয় কোনো নেতা-কর্মীদের ডাকেননি। রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত ওই বৈঠক চলে। এরপর প্রেসিডেন্ট জিয়া চট্টগ্রামের নেতাদের একজন একজন করে ডাকেন। তখন চট্টগ্রাম বিএনপিতে কোন্দল ছিল।

উপপ্রধানমন্ত্রী জামালউদ্দিন আহমেদ ও ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার সুলতান আহমেদ চৌধুরীর মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল। আমরা জামালউদ্দিন সমর্থক ছিলাম। প্রেসিডেন্ট জিয়া যেদিন চট্টগ্রামে যান সেদিন বিএনপির কার্যালয় ছিল আমাদের নিয়ন্ত্রণে। আমি তখন চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। সবাইকে একে একে ডেকে কথা বলেন রাষ্ট্রপতি জিয়া। সবশেষে ছিলাম আমি। আমি যেতেই মি. নো ম্যান সম্বোধন করে হাসতে হাসতে বলেন, কেমন আছেন? আপনার ওইসব লোকজন তো এখনো বিএনপিতে আসল না। ওইসব লোকজন বলতে প্রেসিডেন্ট বুঝিয়েছেন, কাজী জাফর আহমদ, হায়দার আকবর খান রনো, রাশেদ খান মেনন, আবদুল মান্নান ভূঁইয়া, মোস্তফা জামাল হায়দারসহ আরও কয়েকজনের কথা।

আমি বললাম, জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের সঙ্গে ফাইনালই না বসে বিএনপি নামে দল ঘোষণা করা ঠিক হয়নি। এটা নেতারা মনে করেন। তবে জিয়া বললেন, তাদের আমার খুব পছন্দ। তাদের সঙ্গে আমার অনেক কিছুরই মিল আছে। আমি ব্যস্ত। দেশের বাইরে যাচ্ছি। তবে আগামী তিন মাসের মধ্যেই সবাইকে নিয়েই দল করব। ’৭১-এর মতো সবাইকে আমি পাশে চাই। কথা বলতে বলতে প্রেসিডেন্ট জিয়া একপর্যায়ে বললেন, আপনারা তো চট্টগ্রামের জোতদার-জমিদার মানুষ। আমার তো তিন কাঠা কিংবা তিন ছটাক জমিও নেই। সবাইকে নিয়ে দেশ চালাতে চাই। আপনারা ভাবেন, কীভাবে দেশ চালাবেন? যাহোক কথাবার্তা বলে আমি আমার বাসায় চলে আসি। রাত ৩টা সাড়ে ৩টার দিকে গোলাগুলির শব্দ শুনতে পাই। ভোরে আমার অফিসের এক কর্মচারী এসে বললেন, স্যার প্রেসিডেন্ট জিয়াকে কেউ হয়তো তুলে নিয়েছে। আমার মাথায় চিন্তার রেখা টানল। সঙ্গে সঙ্গেই একটি রিকশা নিয়ে সার্কিট হাউসের দিকে রওনা দেই। আমার এপিএস সৈয়দ আলমগীরের বাবা তখন চট্টগ্রামের ওসি।সার্কিট হাউসের কাছাকাছি যেতেই তিনি বললেন, স্যার ওদিকে যাওয়া যাবে না। আপনি চলে যান। তখন তিনি বললেন, প্রেসিডেন্ট আর নেই। চারদিকে তখন সুনসান নীরবতা।

পরে আমি পার্টি অফিসে চলে আসি। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে জানতে পারি, প্রেসিডেন্টের ডেডবডি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কাপ্তাই রোডের দিকে। সেনাবাহিনীর একটি অংশ তাকে রাঙ্গুনিয়ায় নিয়ে দাফন করে। ওইদিন আমরা চট্টগ্রামে গায়েবানা জানাজা পড়ি। পরের দিন সকালে একজনকে নিয়ে রাঙ্গুনিয়ার উদ্দেশে রওনা দেই। গিয়ে দেখি ব্রিগেডিয়ার হান্নান শাহ ডেডবডি নিয়ে ক্যান্টনমেন্টের দিকে যাচ্ছেন। আমি কাছে যেতেই আমার পরিচয় জানতে চান। পরিচয় দেওয়া মাত্রই বলেন, চলে যান। পরে জেনেছি, ক্যান্টনমেন্ট থেকে ডেডবডি ভালোভাবে গোসল দিয়ে জানাজা পড়ানো হয়। এরপর তা নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা।