শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক

0

২৫ মার্চ শেখ মুজিব আদৌ কি কোথাও কোন বার্তা পাঠিয়েছিলেন কিনা এ প্রশ্নের বিশ্বাসযোগ্য কোন তথ্য পাওয়া যায়না। ৭১ সালের ২৫ শে মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর রাত। বাংলাদেশের জনগন স্বাধীনতার জন্য রণপ্রস্তুত থাকলেও এই রাতেই সে সময়কার প্রধান রাজনৈতিক নেতা নিজের ধানমন্ডির বাসায় থেকে স্বেচ্ছাসমর্পন করেন পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে। পাকিস্তানীদের হাতে স্বেচ্ছাসমর্পনের আগের কয়েকঘন্টায় কি হয়েছিলো শেখ মুজিবের বাসভবনে। জেনে নেয়া যাক।

২৫ মার্চ সন্ধ্যা ৬টায় ধানমন্ডি ৩২ নম্বর শেখ মুজিবের বাসভবনে পাকিস্তানী সাংবাদিক তারিক আলীর পিতা মাজহার আলী এবং রেহমান সোবহান শেখ মুজিবের সাথে দেখা করেন এবং তাকে জানান মিলিটারী ক্রাকডাউন আসন্ন।  [ সূত্র: বাংলাদেশের অভ্যুত্থান এবং একজন প্রতক্ষ্যদর্শীর ভাষ্য , রেহমান সোবহান , ভোরের কাগজ প্রকাশনী , ১৯৯৪ ]

শেখ মুজিব এরপর ইয়াহিয়ার সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকেন এবং আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ১জন সংবাদবাহক স্থানীয় এবং বিদেশী সাংবাদিকদের মাঝে ১টি প্রেসনোট বিলি করেন যেটিতে উল্লেখ করা হয়,  “প্রেসিডেন্টের সাথে আলোচনা চুড়ান্ত হয়েছে, ক্ষমতা হস্তান্তরের মতানৈক্য হয়েছে এবং আমি  (শেখ মুজিব) আশা করি প্রেসিডেন্ট তা ঘোষনা করবেন”। এ বিষয়ে অ্যান্থনি মাসকারেনহাস বলেন: “আমার দুঃখ হয়, এই নির্বুদ্ধিতা সম্পর্কে আমার কোন মন্তব্য নেই”। [ সূত্র: রেপ অব বাংলাদেশ , অ্যান্থনি মাসকারেনহাস , অনুবাদ মযহারুল ইসলাম , ১৯৭৩ , পৃষ্ঠা:১১৩ ]

২৫ শে মার্চ ইয়াহিয়া এবং ভুট্টোর ভেতর ৪৫ মিনিটের ১টি মিটিং হয়। শেখ মুজিব পূর্বঘোষনা অনুযায়ী ২৫শে মার্চে ইয়াহিয়ার ভাষনের জন্য অপেক্ষা করেন। সন্ধ্যা ৬টায় ইয়াহিয়া করাচীর উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন। তার এই ঢাকা ত্যাগের প্রতক্ষ্যদর্শী ছিলেন ২ জন বাঙালী সামরিক কর্মকর্তা। ১. ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে এটি প্রতক্ষ্য করেন লে. কর্নেল এ. আর চৌধুরী ২.বিমানবন্দরে এটি প্রত্যক্ষ করেন এয়ারফোর্সে গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ.কে. খোন্দকার। শেখ মুজিব তখনো ১ টি ফোনকলের অপেক্ষায় ছিলেন এবং ডক্টর কামাল হোসেন কে বার বার জিজ্ঞেস করছিলেন কোন ফোন এসেছে কিনা। প্রতিবারই ডক্টর কামালের উত্তর ছিলো না সূচক। ফোনটি আসার কথা ছিলো পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লেফটেনেন্ট জেনারেল পীরজাদার কাছ থেকে।কারণ ইয়াহিয়া বলেছিলো তার ভাষন প্রচারের আগে পীরজাদার সাথে শেখ মুজিবের ১টি ছোট বৈঠক হবে। সেই ফোনকল আর আসেনি কোনদিন। শেখ মুজিবও বুঝতে পারেন সব আশা শেষ। ইয়াহিয়া ধোঁকা দিয়েছে।[ সূত্র : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব , জীবন ও রাজনীতি , ১ম খন্ড , সম্পাদক মোনায়েম সরকার , বাংলা একাডেমী ২০০৮ , পৃষ্ঠা:৪৪৭ ]

রাত ৮টার দিকে এরকম একটা অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে এইচ এম কামরুজ্জামান, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী , তাজউদ্দীন আহমদ এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম শেখ মুজিবের সাথে দেখা করে চলে যান।  শেখ ফজলুল হক মনি ২৫ শে মার্চ সন্ধ্যায়ই টুঙ্গিপাড়া চলে যায় এবং শেখ কামাল রাত ৯টায় ধানমন্ডী ৩২নং ছেড়ে যান। [ সূত্র : শেখ মুজিব , এস.এ. করিম, ইউপিএল, ২০০৫, পৃষ্ঠা ১৯৫ ]

রাত ৯টার দিকে ডক্টর কামাল হোসেন এবং ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম ৩২নং বাসা থেকে বিদায় নেন। রাত ৯ টা ১০ মিনিটের দিকে ঠিক এই সময়েই প্রথমবারের মত গোলাগুলির শব্দ শুনেছেন জানান রেহমান সোবহান। [ সূত্র : প্রাগুক্ত ]

রাত সাড়ে ১০টার দিকে ইস্ট পাকিস্তান শিপিং  কর্পোরেশনের ম্যানেজেং ডিরেক্টর ক্যাপ্টেন রহমান এবং ২ জন এক্স নেভাল অফিসার কমান্ডার ফারুক এবং লেফটেনেন্ট মতিউর রহমান দেখা করতে আসেন শেখ মুজিবের সাথে। এ সময় আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ প্রধান আব্দুর রাজ্জাক এর কাছ থেকে ১টি ফোন আসে শেখ মুজিবের কাছে। “ইপিআরকে ডিসআর্মড করা হয়েছে” শেখ মুজিব কে এতটুকু বলতে না বলতে লাইন কেটে যায়। [ সূত্র : শেখ মুজিবের বাসভবনে সে সময় অবস্থানরত পারিবারিক কর্মচারী মমিনুল হক খোকা , প্রাগুক্ত , পৃষ্ঠা – ৪৪৭-৪৮ ]

রাত ১১টায় আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ প্রধান আব্দুর রাজ্জাক শেখ মুজিবের সাথে সাক্ষাত করে তাঁকে আত্মগোপন করার অনুরোধ জানান। শেখ মুজিব সরাসরি তাকে জানিয়ে দেন, তিনি বাসা ছেড়ে যাবেননা। সূত্র : আর্চার ব্লাড, দ্য ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ, ইউপিএল, ২০০৬, পৃষ্ঠা ১৯৮]

রাত সোয়া ১১টার দিকে সিরাজুল আলম খান, আ.স.ম আব্দুর রব, শাহজাহান সিরাজ তারা সবাই শেখ মুজিবের সাথে দেখা করে ধানমন্ডীর ৩২ নম্বর বাসা ত্যাগ করেন। শেখ হাসিনার স্বামী ডক্টর ওয়াজেদ মিয়ার বক্তব্য অনুসারে এটাই ছিলো শেখ মুজিবের সাথে ওই রাতে তাদের শেষ বৈঠক।

ডক্টর ওয়াজেদ মিয়ার বক্তব্য অনুসারে জিয়াউর রহমানের উপদেষ্টা জাকারিয়া চৌধুরীর ভাই ঝন্টু ধানমন্ডীতে শেখ মুজিবের বাসায় আসেন রাত সাড়ে ১১টার দিকে। শেখ মুজিবকে অপারেশন সার্চলাইট এবং নির্বিচার গোলাগুলির খবর জানান ঝন্টু। ঝন্টুর মাধ্যমে পরিস্থিতি অবগত হয়ে শেখ মুজিব তার কন্যা শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা এবং জেলীকে ১টি ফ্ল্যাটে পাঠিয়ে দেন আত্মগোপন করার জন্য। শেখ মুজিবের পরিবারের সদস্যদের আত্মগোপনের জন্য আগেই ঐ ফ্ল্যাটটি ভাড়া নেয়া হয়েছিলো।  ওয়াজেদ মিয়া নিজেও রাত সাড়ে ১১টার পর ধানমন্ডী ৩২ নম্বর ত্যাগ করেন। [ সূত্র: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ, ইউপিএল, ২০০০, পৃ ৮৪ ]  “২৫ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শেখ মুজিবের বাসায় ছিলো মানুষের ঢল। কিন্তু ইয়াহিয়ার ঢাকা ত্যাগের খবর প্রকাশ হয়ে পড়ায় এবং সেনাবাহিনীর মতিগতি দেখে সন্ধ্যার পর থেকেই ঢাকার সর্বত্র বাড়তে থাকে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা। এ পরিস্থিতিতে শেখ মুজিব এক বিবৃতিতে বিভিন্নস্থানে সেনাবাহিনীর গুলিবর্ষনের প্রতিবাদে হরতাল আহ্বান করেন।” [ সূত্র : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব , জীবন ও রাজনীতি , ১ম খন্ড , সম্পাদক মোনায়েম সরকার , বাংলা একাডেমী ২০০৮ , পৃষ্ঠা:৪৪৭ ]

এই ঘটনাপঞ্জীতে প্রমানিত হয় শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষনা দেননি এবং দেয়ার কোন আগ্রহও ছিলোনা। স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে ওইদিন সন্ধ্যায় শেখ মুজিবের বাসায় যারা এসেছিলেন তাদের কারো কাছেও দিতে পারতেন। শেখ মুজিব সেটি করেননি।   আওয়ামী লীগ দাবী করে শেখ মুজিব নাকি ২৫ মার্চ স্বাধীনতার একটি ঘোষণা চট্টগ্রামে পাঠিয়েছিলেন। সিলেট ঢাকা কিংবা রাজশাহীতে না পাঠিয়ে ঘোষনাটি চট্টগ্রামেই পাঠাতে হবে কেন? চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার পর সেই কৃতিত্বে ভাগ বসানোর জন্যই কি এই মিথ্যা তথ্যের অবতারনা? শেখ মুজিব চট্টগ্রামে ২৫ মার্চ চট্টগ্রামে স্বাধীনতার বার্তা পাঠালে পরদিন ঢাকা কিংবা চট্টগ্রামের পত্রিকায় এই সংক্রান্ত কোন খবর প্রকাশ হয়নি কেন? শেখ মুজিব ২৫শে মার্চ স্বাধীনতার বার্তা পাঠালে ২৭ শে মার্চ ঢাকায় হরতাল ডাকলেন কোন যুক্তিতে? বাঙালিকে ঘরে বন্দী রাখার এই ফন্দি কেন? কাদের স্বার্থে ? ২৭ মার্চ শেখ মুজিব তৎকালীন পূর্ববাংলায় হরতাল ডেকেছিলেন ওই দিন সেই খবর চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত পিপলস ভিউ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে অথচ শেখ মুজিবের কথিত স্বাধীনতার ঘোষনা প্রকাশিত হয়নি কেন? বরং দেখা যায় শেখ মুজিব কোনরকম স্বাধীনতার ঘোষণার বিপক্ষে ছিলেন। ১৯৭১ সালে ঢাকায় সামরিক শাসক টিক্কা খানের গণসংযোগ কর্মকর্তা মেজর সিদ্দিক সালিক তার লিখিত ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ পুস্তকে দাবী করেছেন, “আমাকে গ্রেফতার কারুন। অন্যথায় চরমপন্থীরা স্বাধীনতা ঘোষণা করতে পারে” ২৩ শে মার্চ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামীলীগের প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে আলোচনাকালে মুজিব ইয়াহিয়াকে এ অনুরোধ করেন। পশ্চিম বাংলার সাংবাদিক জ্যোতি সেন গুপ্ত লিখেছেন, ২৪ তারিখে গোয়েন্দা সূত্র পাক বাহিনীর আক্রমনের আগাম সংবাদ জানিয়ে দেয় আওয়ামী লীগকে। কর্নেল ওসমানী ওই দিনই মুজিবের সাথে দেখা করে তাকে অবহিত করেন। শেষ রাত পর্যন্ত নেতারা করণীয় সম্পর্কে আলোচনা করেন। সিদ্ধান্ত হয়, তারা আত্মগোপন করবেন এবং পালিয়ে ভারতে চলে যাবেন। কিন্তু ২৫ মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় তাজউদ্দিন এসে দেখেন মুজিব তার বিছানাপত্র গুছিয়ে তৈরি হয়ে আছেন। মুজিব তাকে বললেন, তিনি থেকে যাবেন- গ্রেপ্তার বরণ করবেন (সূত্রঃ মাসুদুল হক, দৈনিক ইনকিলাব ২৬ মার্চ ২০০৫)।

peopleview-300x250 pic6-300x239

শেখ মুজিব ২৭ মার্চ হরতাল ডেকে ছিলেন যা পত্রিকায় ফলাও করে প্রচার হয়েছিল। তখনকার চট্রগ্রাম পিপলস ভিউ পত্রিকায় ঐদিনের সংখ্যা দেখলেই বুঝা যায়। তৎকালিন আওয়ামীলীগের মুখপত্র হিসেবে খ্যাত দৈনিক ইত্তেফাকের ১৯৭১ সালের ২৬মার্চের সংখ্যাটি পাকিস্তানী শাসকদের বাঁধার কারনে ছাপা হয়েও গ্রাহকের কাছে পৌছানো সম্ভব হয়নি সে সংখ্যাটিতে প্রথম পাতার লিড নিউজ ছিল ‘এ গণহত্যা বন্ধ কর, ২৭ শে মার্চ সমগ্র বাংলাদেশে সর্বাত্মক ধর্মঘট‘ ।বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের সাক্ষাতকারেও ২৫ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষনার প্রস্তুতি কিংবা উদ্যোগেরও কোন প্রমান পাওয়া যায়নি। ২৫ মার্চ রাতে পাক বাহিনীর হাতে স্বেচ্ছাসমর্পনের আগ পর্যন্ত বেগম ফজিলাতুন্নেসা শেখ মুজিবের সঙ্গেই ছিলেন। ১৯৭৩ সালে বেগম মুজিব এক সাক্ষাৎকারে সে দিনের ঘটনা সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন। ফজিলাতুন্নেসা মুজিব বলেন, “…রাত প্রায় সাড়ে ১২টার দিকে তারা (পাক সেনারা) গুলি ছুড়তে ছুড়তে উপরে এলো।…তারপর মাথাটা নিচু রেখে নেমে গেলেন তিনি নিচের তলায়। মাত্র কয়েক মুহূর্ত। আবার উঠে এলেন উপরে। মেঝো ছেলে জামাল এগিয়ে দিল তার হাতঘড়ি ও মানিব্যাগ। পাইপ আর তামাক হাতে নিয়েই বেরিয়ে গেলেন তিনি ওদের সাথে” (দৈনিক বাংলা, ২৬ মার্চ, ১৯৭২)। এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের কোথাও বেগম মুজিব একটিবারও বলেননি যে, যাওয়ার আগে কোনো এক ফাঁকে শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এমনকি আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমদ যুদ্ধ চলাকালে বা পরবর্তীকালে কখনই জানতেন না যে শেখ মুজিব নিজে কখনো বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে।

তৎকালীন তরুণ বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক বাংলার রাখাল রাজা “শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম” ই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এনিয়ে যারা বিতর্ক করতে চান তারা জেনেশুনে সত্যকে অস্বীকার করছেন। জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে যারা বিতর্ক করছেন মুক্তিযুদ্ধে তাদের গৌরবজনক ভুমিকা কতটা ছিলো সেটি রীতিমতো গবেষণার বিষয়। বাস্তবতা ছিলো, ২৫ শে মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পন করেন। আওয়ামী লীগের প্রথম সারির কোন নেতাকেই মাঠে পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায় নিরস্ত্র জনগণের উপর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হামলায় বেঘোরে প্রান হারায় অসংখ্য মানুষ। বাঙালির এই দুঃসময়ে মুক্তিকামী জনগণের সামনে বাংলাদেশের কাংখিত ঘোষণাটি আসে জিয়াউর রহমানের মুখ থেকে। নিজেকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রথম ঘোষণাটি দেন। চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণায় উদ্বেলিত জনগণ সাহসের সঙ্গে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে। স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েই ক্ষান্ত থাকেননি তিনি।“উই রিভোল্ট” হুকার দিয়ে নিজেও নেতৃত্ব দেন সশস্ত্র সংগ্রামে। জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা ২৬ , ২৭ এবং ২৮ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রসহ দেশ বিদেশের বিভিন্ন গনমাধ্যমে প্রচারিত হতে থাকে। [২৬ মার্চ, ১৯৭৪ তারিখে অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘বিচিত্রা’-য় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তদানীন্তন উপপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, বীর উত্তম ‘একটি জাতির জন্ম’ শীর্ষক একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন। শামসুল হুদা চৌধুরী ১৯৮২ সালে তার লেখা “একাত্তরের রণাঙ্গন”’ বইতে ওই নিবন্ধের অংশ বিশেষ ‘উই রিভোল্ট’ শিরোনামে প্রকাশ করেন।] এর আগে অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলায়ও প্রকাশিত হয়েছিলো এই নিবন্ধটি। যারা ইতিহাসের নিরপেক্ষ পাঠক, তাদের জন্য জিয়াউর রহমানের ঐ নিবন্ধটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঐ নিবন্ধে জিয়াউর রহমান তাঁর স্বাধীনতার ঘোষণার কথা লিখেন এভাবে :২৫ ও ২৬ মার্চের মধ্যবর্তী কাল রাত। রাত ১১টায় আমার কমান্ডিং অফিসার আমাকে নির্দেশ দিলেন নৌবাহিনীর ট্রাকে করে চট্টগ্রাম বন্দরে গিয়ে জেনারেল আনসারীর কাছে রিপোর্ট করতে। আমার সঙ্গে নৌবাহিনীর (পাকিস্তানি) প্রহরী থাকবে তাও জানানো হলো। আমি ইচ্ছা করলে আমার সঙ্গে আমার তিনজন লোক নিয়ে যেতে পারি। তবে আমার সঙ্গে আমারই ব্যাটালিয়নের একজন পাকিস্তানি অফিসারও থাকবে। অবশ্য কমান্ডিং অফিসারের মতে, সে যাবে আমাকে গার্ড দিতেই।এ আদেশ পালন করা আমার পক্ষে ছিল অসম্ভব। আমি বন্দরে যাচ্ছি কিনা তা দেখার জন্য একজন লোকও ছিল। আর বন্দরে স্বয়ং প্রতীক্ষায় ছিল জেনারেল আনসারী। হয়তো বা আমাকে চিরকালের মতোই স্বাগত জানাতে।
আমরা বন্দরের পথে বেরুলাম। আগ্রাবাদে আমাদের থামতে হলো। পথে ছিল ব্যারিকেড। এ সময়ে সেখানে এলো মেজর খালেকুজ্জামান চৌধুরী। ক্যাপ্টেন অলি আহমদের কাছ থেকে এক বার্তা নিয়ে এসেছে। আমি রাস্তায় হাঁটছিলাম। খালেক আমাকে একটু দূরে নিয়ে গেল। কানে কানে বলল, তারা ক্যান্টনমেন্ট ও শহরে সামরিক তৎপরতা শুরু করেছে। বহু বাঙালিকে ওরা হত্যা করেছে।এটা ছিল একটা সিদ্ধান্ত গ্রহণের চূড়ান্ত সময়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আমি বললাম, ‘উই রিভোল্ট’ আমরা বিদ্রোহ করলাম। তুমি ষোলশহর বাজারে যাও। পাকিস্তানি অফিসারদের গ্রেফতার করো। অলি আহমদকে বল ব্যাটালিয়ন তৈরি রাখতে। আমি আসছি। আমি নৌবাহিনীর ট্রাকের কাছে ফিরে গেলাম। পাকিস্তানি অফিসার সেনাবাহিনীর চিফ পেটি অফিসার ও ড্রাইভারকে জানালাম যে, আমাদের আর বন্দরে যাওয়ার দরকার নেই। এতে তাদের মনে কোনো প্রতিক্রিয়া হলো না দেখে আমি পাঞ্জাবি ড্রাইভারকে ট্রাক ঘোরাতে বললাম। ভাগ্য ভালো ড্রাইভার আমার আদেশ মানল। আমরা আবার ফিরে চললাম। ষোলশহর বাজারে পৌঁছেই আমি গাড়ি থেকে লাফিয়ে নেমে একটা রাইফেল তুলে নিলাম। পাকিস্তানি অফিসারের দিকে। তাক করে বললাম ‘হাত তোলো, আমি তোমাকে গ্রেফতার করলাম। নৌবাহিনীর লোকেরা এতে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল। পর মুহূর্তেই আমি নৌবাহিনীর অফিসারের দিকে রাইফেল তাক করলাম। তারা ছিল আটজন। সবাই আমার নির্দেশ মানল এবং অস্ত্র ফেলে দিল।
আমি কমান্ডিং অফিসারের জিপ নিয়ে তার বাসার দিকে রওনা দিলাম। তার বাসায় পৌঁছে হাত রাখলাম কলিং বেলে। কমান্ডিং অফিসার জানজুয়া পাজামা পরেই বেরিয়ে এলো। খুলে দিল দরজা। ক্ষিপ্রগতিতে আমি ঘরে ঢুকে পড়লাম এবং গলাশুদ্ধ তার কলার টেনে ধরলাম। দ্রুতগতিতে আবার দরজা খুলে কর্নেল জানজুয়াকে আমি বাইরে টেনে আনলাম। বললাম, বন্দরে পাঠিয়ে আমাকে মারতে চেয়েছিলে? এই আমি তোমাকে গ্রেফতার করলাম। এখন লক্ষ্মী সোনার মতো আমার সঙ্গে এসো। সে আমার কথা মানল। আমি তাকে ব্যাটালিয়নে নিয়ে এলাম। অফিসারদের মেসে যাওয়ার পথে আমি কর্নেল শওকতকে (তখন মেজর) ডাকলাম। তাকে জানালাম আমরা বিদ্রোহ করেছি। শওকত আমার হাতে হাত মেলাল।
ব্যাটালিয়নে ফিরে দেখলাম সব পাকিস্তানি অফিসারকে বন্দি করে একটা ঘরে রাখা হয়েছে। আমি অফিসে গেলাম। চেষ্টা করলাম লেফটেন্যান্ট কর্নেল এমআর চৌধুরীর সঙ্গে আর মেজর রফিকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। কিন্তু পারলাম না। সব চেষ্টা ব্যর্থ হলো। তারপর রিং করলাম বেসামরিক বিভাগের টেলিফোন অপারেটরকে। তাকে অনুরোধ জানালাম ডেপুটি কমিশনার, পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট, কমিশনার, ডিআইজি ও আওয়ামী লীগ নেতাদের জানাতে যে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অষ্টম ব্যাটালিয়ন বিদ্রোহ করেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করবে তারা।এদের সবার সঙ্গেই আমি টেলিফোন যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কাউকেই পাইনি। তাই টেলিফোন অপারেটরের মাধ্যমেই আমি তাদের খবর দিতে চেয়েছিলাম। অপারেটর সানন্দে আমার অনুরোধ রক্ষা করতে রাজি হলো। সময় ছিল অতি মূল্যবান। আমি ব্যাটালিয়নের অফিসার, জেসিও আর জওয়ানদের ডাকলাম। তাদের উদ্দেশে একটি ড্রামের ওপর দাঁড়িয়ে ভাষণ দিলাম। তারা সবই জানত। আমি সংক্ষেপে সব বললাম এবং তাদের পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কথা জানিয়ে নির্দেশ দিলাম স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে। তারা সর্বসম্মতিক্রমে হৃষ্টচিত্তে এ আদেশ মেনে নিল। আমি তাদের একটা সামরিক পরিকল্পনা দিলাম।তখন রাত ২টা বেজে ১৫ মিনিট। ২৬ মার্চ, ১৯৭১ সাল। রক্ত আঁখরে বাঙালির হৃদয়ে লেখা একটা দিন। বাংলাদেশের জনগণ চিরদিন স্মরণ রাখবে এই দিনটিকে। স্মরণ রাখবে, ভালোবাসবে। এই দিনটিকে তারা কোনো দিন ভুলবে না। কো-ন-দি-ন-না।
প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের রাজনৈতিক সচিব মইদুল হাসান তরফদার মূলধারা:৭১ গ্রন্থে লিখেছেন, “মেজর জিয়ার ঘোষণা এবং বিদ্রোহী ইউনিটগুলির মধ্যে বেতার যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা হবার ফলে এই সব স্থানীয় ও খন্ড বিদ্রোহ দ্রুত সংহত হতে শুরু করে। …….এমনিভাবে পাকিস্তানী আক্রমণের এক সপ্তাহের মধ্যে স্বাধীনতার লড়াইয়ে শামিল হয় প্রায় এগারো হাজার ইবিআর এবং ইপিআর-এর অভিজ্ঞ সশস্ত্র যোদ্ধা… কখনও কোন রাজনৈতিক আপোস-মীমাংসা ঘটলেও দেশে ফেরার পথ যাদের জন্য ছিল বন্ধ, যতদিন না বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানীরা সম্পূণরূপে বিতাড়িত হয়।”
বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদে র ভাষায়, first announced through Major Ziaur Rahman, to set up a full-fledged operational base from which it is administering the liberated areas (Bangladesh Document vol-I)

৩ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর কে এম সফিউল্লাহ, বীরউত্তম, তাঁর Bangladesh at War (Dhaka Academy Publishers, 1989) গ্রন্থে, ৪৩-৪৫ পৃষ্ঠায় যা লিখেছেন : মেজর জিয়া ২৫ মার্চের রাত্রিতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সদলবলে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন, তার কমান্ডিং অফিসার জানজুয়া ও অন্যদের প্রথমে গ্রেফতার এবং পরে হত্যা করে, পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। পরে ২৬ মার্চে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর মোকাবিলার জন্য সবাইকে আহ্বান করেন। এই ঘোষণায় তিনি নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধান রূপে ঘোষণা করেন।২৭ মার্চ মেজর জিয়া স্বাধীন বেতার কেন্দ্র থেকে আরেকটি ঘোষণায় বলেন : বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর সামরিক সর্বাধিনায়ক রূপে আমি মেজর জিয়া শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি [I Major Zia, Provisional Commander-in-Chief of the Bangladesh Liberation Army, hereby proclaim, on behalf of Sheikh Mujibur Rahman, the Independence of Bangladesh]|
ভারতীয় সেনাকর্মকর্তা সুখান্ত সিং যিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং পরবর্তীতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল হিসেবে অববসর গ্রহন করেন, তিনি তাঁর [The Liberation of Bangladesh Vol. 1 (Delhi: Lancer Publishers, 1980)] গ্রন্থের ৯ম পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ইতিমধ্যে ২৬ মার্চ চট্টগ্রাম বেতার থেকে একজন বাঙালি অফিসার মেজর জিয়ার কণ্ঠস্বর ভেসে আসে। তিনি আরো লেখেন : এই ঘোষণার মাধ্যমে বাঙালি সেনা অফিসারগণ রাজনীতিক নেতাদের অসন্তুষ্ট করতে চাননি।
১৯৭৭ সালের ২৭ ডিসেম্বরে ভারতের রাষ্ট্রপতি নীলম সঞ্জীব রেড্ডি প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সম্মানে আয়োজিত এক ভোজসভায় তাঁর প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে যে বক্তব্য প্রদান করেন, তাও উল্লেখযোগ্য। রাষ্ট্রপতি রেড্ডি বলেন, ইতিমধ্যে আপনার দেশের ইতিহাসের পাতায় বাংলাদেশের প্রথম স্বাধীনতা ঘোষণাকারী ও সাহসী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আপনার সমুজ্জ্বল অবস্থান নিশ্চিত হয়ে গেছে। [মুহম্মদ শামসুল হক, (Bangladesh in International Politics, Dhaka, UPL, 1993, p-96)]
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা লগ্নে চট্টগ্রামের কালুর ঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ২৬ মার্চ জিয়াউর রহমান নিজ দায়িত্বে এবং ২৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার কথা ১৯৮২ সালে নভেম্বর মাসে প্রথম প্রকাশিত স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্রের ১৫ খন্ডে উল্লেখ রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের রাজনৈতিক সচিব মঈদুল হাসান তরফদার,“২৭ শে মার্চ সন্ধ্যায় ৮-ইবির বিদ্রোহী নেতা মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে স্বাধীন ঘোষনা করেন। জিয়াউর রহমান কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণা প্রসঙ্গে মঈদুল হাসান বলেন, “আমি অন্যের কথা কী বলব, মেজর জিয়ার বেতার বক্তৃতা শুনে নিজে আমি মনে করেছিলাম যে, না, সত্যি তাহলে একটা ফরমিডেবল নাম্বার অব আর্ম ফোর্সের লোক বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। ইট ক্রিয়েটেড এ ট্রিমেন্ডাস ইমপ্যাক্ট অন মি।” ভারতে যাওয়ার পথে তাজউদ্দীন আহমেদ ও আমীর-উল ইসলাম রেডিওতে জিয়ার ঘোষণা শুনতে পান।(মূলধারা:৭১, পৃষ্ঠা ৫)
স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্রের প্রকাশিত ‘মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর’ গ্রন্থে দেয়া সাক্ষাৎকারে বীর মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধের উপ-প্রধান সেনাপতি এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খন্দকার বলেন, ‘জিয়ার ২৭ মার্চের ঘোষণা শোনার সঙ্গে সঙ্গে সারাদেশে এবং বাংলাদেশের বাইরে যারা ছিলেন, তাদের মধ্যে যে একটা প্রচন্ড উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়, সে সম্পর্কে কারও সন্দেহ থাকার কথা নয়।’
ডক্টর হোসেন তৌফিক ইমাম তার ‘বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১’ পুস্তকে বলেছেন, ভারতে যাওয়ার পথে তিনি রেডিওতে জিয়ার ঘোষণা শুনতে পান। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার স্বামী ডক্টর ওয়াজেদ মিয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তিনি ও শেখ হাসিনা দু’জনে রেডিওতে জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা শুনেছেন মালিবাগে বসে। (আমার দেশ, ১৭ ডিসেম্বর ২০০৯)
কর্নেল অলি আহমদ, বীরবিক্রম, অক্সফোর্ড বুকস বিশ্ববিদ্যালয়ে তার পিএইচডি অভিসন্দর্ভের অনুবাদ গ্রন্থ-রাষ্ট্র বিপ্লব : সামরিক বাহিনীর সদস্যবৃন্দ এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ (ঢাকা, অন্বেষা প্রকাশন, ২০০৮) আরো সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, মেজর জিয়া ২৭ মার্চ ১৯৭১ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। মেজর জিয়া ছিলেন আমাদের নেতা এবং বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি (মুখবন্ধ)। অলি আহমদ তখন ছিলেন একজন ক্যাপ্টেন।
মুক্তিযুদ্ধের ৫ নম্বর কমান্ডার তৎকালীন মেজর এবং পরবর্তীতে লেফটেন্যান্ট জেনারেল মীর শওকত আলী, বীরউত্তম তার বইতে লিখেছেন, অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডার জিয়াউর রহমান বিদ্রোহ ঘোষণা করলে এবং পরে স্বাধীনতা যুদ্ধের ডাক দিলে আমি সানন্দে যুদ্ধে যোগদান করি (পৃষ্ঠা ১৬৬, ১৬৭, ১৭১)
১১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার (১৫ নভেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বর) ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট এম হামিদুল্লাহ খান এক সাক্ষাত্কারে বলেন : ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চে মেজর জিয়ার সদলবলে বিদ্রোহ এবং পরবর্তীতে স্বাধীনতার ঘোষণা স্বাধীন বাংলাদেশের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়।বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনকারী ভারতের অন্যতম সমরনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জেএফ আর জ্যাকব (JFR Jacob)। তিনি তার Surrender At DACCA Birth of a Nation, (Dhaka, UPL, 1997) বই এর ৩৪ পৃষ্ঠায় লিখেছেন : চট্টগ্রামের আট ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কম্যান্ড মেজর জিয়াউর রহমান রেজিমেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং বেতার ভবনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ২৭ মার্চে স্বাধীনতার ঘোষণা দান করেন। সেই ঘোষণা অনেকেই শুনেছেন। যারা নিজ কানে শোনেননি তারাও মুখে মুখে চারদিকে প্রচার করেন। তিনি আরো বলেন, মেজর জিয়া বাঙালি রেগুলার ও আধা-সামরিক বাহিনীর জওয়ানদের সহায়তায় চট্টগ্রামে পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। (পৃষ্ঠা ৩৫)
বাংলাদেশে ভারতের প্রথম ডেপুটি হাইকমিশনার জে এন দীক্ষিত যিনি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন, তার লেখা Liberation And Beyond: Indo-Bangladesh Relations, (Dhaka, UPL, 1999) ৪২ পৃষ্ঠায় লিখেছেন : চট্টগ্রামের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডার মেজর জিয়াউর রহমান (যিনি ১৯৭৬-৭৭ সময়কালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন) স্বল্পকালীন পরিসরে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র দখল করেন এবং সেই কেন্দ্র থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের ঘোষণা দান করেন। সেই ঘোষণায় তিনি বাংলার সকল সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনীর সদস্যদের পাক হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধের আহ্বান জানান। শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেফতার হওয়ার আগে রেকর্ড করা তাঁর ঘোষণার পূর্বেই জিয়াউর রহমানের ঘোষণা প্রচারিত হয় (In fact, Ziaur Rahman’s broadcast came a little earlier than Mujib’s broadcast)
১৯৮৭ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সাপ্তাহিক মেঘনায় ‘বঙ্গবন্ধু ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে স্বাধীনতার প্রশ্নে আপস প্রস্তাব বিবেচনা করছিলেন’ শিরোনামে আওয়ামী লীগ নেতা আবদুর রাজ্জাকের একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। সাক্ষাৎকারে আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘২৭ মার্চ সকালে চায়না বিল্ডিং-এর কাছে আমার বন্ধু আতিয়ারের বাসায় গেলাম। তার কাছ থেকে একটা লুঙ্গি আর একটা হাফ শার্ট নিয়ে রওনা হলাম নদীর ওপারে জিঞ্জিরায়। নদী পার হয়েই রওনা হলাম গগনদের বাড়িতে। পথে দেখা হলো সিরাজুল আলম খানের সঙ্গে। পরে আরো অনেকের সঙ্গে দেখা হলো। সিরাজ ভাইয়ের সঙ্গে এক লোক, তার ঘাড়ে ইয়া বড় এক ট্রানজিস্টর। আমরা যাব বালাদিয়া। নৌকায় শুনলাম হঠাৎ কোনো বেতার কেন্দ্র থেকে বলা হচ্ছে আই মেজর জিয়াউর রহমান ডিক্লেয়ার ইন্ডিপেনডেন্স অব বাংলাদেশ। আমরা তো অবাক। বলে কি? পরে আবার শুনেছি জিয়া বলছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি।’
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম তার ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম’ বইয়ে লিখেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই ২৭ মার্চ মেজর জিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা দেন যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা’।
কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেছেন, স্বাধীনতার ঘোষক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান নন, তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার, ভারতের প্রেসিডেন্ট মোরারজী দেশাইও বিভিন্ন সময়ে জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক বলে উল্লেখ করেছেন। জিয়ার কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা সিআইএর মত লন্ডনের সাপ্তাহিক গার্ডিয়ান সহ গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ও সংবাদ মাধ্যম লিপিবদ্ধ করে রেখেছে। ঔপন্যাসিক হুমায়ুন আহমেদ তার “জোসনা ও জননীর গল্প” উপন্যাসের (১৮২-১৮৩) পাতায় জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে লিখেছেন।
১৯৭১ এর এপ্রিলে প্রবাসী সরকার গঠনের প্রাক্কালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ কিভাবে চলছে সে সম্পর্কে স্বাধীন বাংলা বেতারে প্রচারিত এক ভাষণে তাজউদ্দিন আহমদ জাতিকে অবহিত করেন, “The brilliant success of our fighting forces and the daily additions to their strength in manpower and captured weapons has enabled the Government of the People’s Republic of Bangla Desh, first announced through major Zia Rahman, to set up a full-fledged operational base from which it is administering the liberated areas.”

(Ref: Bangladesh Document vol-I, Indian Government, page 284)

সংগ্রহেঃ

মোঃ-আলফাজ উদ্দিন