শহীদ জিয়া,কর্মীর জিয়া

0

৩০ মে ১৯৮১ শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদত বরণের প্রায় সপ্তাহখানেক আগে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য চট্টগ্রামের প্রথিতযশা চিকিৎসক ডা: এ এফ এম ইউছুফ আমাকে তার চেম্বারে ডেকে নিয়ে বললেন, আগামী ২৯ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম আসবেন এবং বিকেল ৪টায় তিনি চট্টগ্রামের বুদ্ধিজীবী ও বিভিন্ন পেশায় খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাথে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে এক মতবিনিময় সভায় মিলিত হতে চান।
প্রেসিডেন্ট বৈঠকে অংশগ্রহণকারীদের তালিকা ও দাওয়াত দেয়ার দায়িত্ব তাকে দিয়েছেন। এই অনুষ্ঠানে কোন কোন ব্যক্তিকে দাওয়াত দেয়া যায় তা নিয়ে তিনি আমার সাথে মতবিনিময় করেন। তিনি জানালেন আমন্ত্রিত অতিথি ৩০ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে এবং তিনি এও বললেন, এই মতবিনিময় শেষে চট্টগ্রাম বিএনপির কোন্দল নিরসনে রাতে বিএনপির বিবদমান নেতাদের সাথে তিনি আলোচনায় মিলিত হবেন। এরপর আমরা একটি তালিকা তৈরি করি এবং অতিথিদের দাওয়াত প্রদান করি। নির্ধারিত মতবিনিময় সভা সার্কিট হাউজে বিকেল ৪টায় শুরু হওয়ার আগেই আমন্ত্রিত ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত হয়ে সার্কিট হাউজের পশ্চিমাংশের সভায় আসন গ্রহণ করেন।
নির্ধারিত সময়ে রাষ্ট্রপতি সার্কিট হাউজ হলে প্রবেশ করলেন। তার পরনে ছিল ফুলস্লিভ সাদা শার্ট এবং সাদা প্যান্ট। তার চেহারা দেখতে খুব উজ্জ্বল, শান্ত এবং স্নিগ্ধ মনে হলো। তিনি হলে এসে তার চেয়ারে বসলেন। চেয়ারে বসেই সবাইকে বললেন, ‘প্রথমে আপনারা বলবেন, নাকি আমি বলব? আসলে আমি আজকে আপনাদের কাছ থেকে শুনতে এসেছি।’ উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বললেন, স্যার আমরা সবাই আপনার কাছে কৃতজ্ঞ যে, আপনি আমাদের ডেকেছেন এবং আমাদের কাছ থেকে শুনতে চেয়েছেন। তবে আমরা প্রথমেই আপনার কাছ থেকে শুনতে চাই। এর প্রত্যুত্তরে রাষ্ট্রপতি তার বক্তব্য শুরু করলেন। রাষ্ট্রপতি এই বলে শুরু করলেন ‘আপনারা সবাই মেধায় সমৃদ্ধশালী, আপনারা আমাকে মেধা দিয়ে সহযোগিতা করলে আপনাদের পরামর্শ আমি গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করে দেশকে উন্নয়নের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব, ইনশাআল্লাহ। তালপট্টি আমাদের হবে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আপনারা দেখবেন আমাদের প্রতি মুসলিম বিশ্বের অকুণ্ঠ সমর্থন ও সহযোগিতা।’ এভাবে তিনি বিভিন্ন জাতীয় ইস্যু বিশেষ করে ভারতের সাথে গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বিরোধের সম্মানজনক সমাধানের উপস্থিত বুদ্ধিজীবীদের কাছ থেকে পরামর্শ আহ্বান করেন। তার এই বক্তব্য রাখার সময় সভায় ছিল পিনপতন নীরবতা। মাগরিবের আজান শুরু হওয়ার সাথে সাথে সার্কিট হাউজের বাইরে জাতীয় পতাকা নামানোর সময় সামরিক বাহিনীর জোয়ানদের স্যালুট দেয়ার সময় জুতার আওয়াজ যখন আমাদের কানে আসছিল রাষ্ট্রপতি তখন বললেন, ‘এখানে বসে আপনারা যারা সামরিক বাহিনীর বুটজুতার আওয়াজ শুনছেন, তার আগে এদের পায়ে ছিল ক্যামবিসের জুতা, আমি তাদেরকে বুটজুতার ব্যবস্থা করিয়েছি, দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার অতন্দ্রপ্রহরী হিসেবে এবং আমাদের দেশের ভৌগোলিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমি সামরিক বাহিনীকে একটি যুগোপযোগী অত্যাধুনিক বাহিনীতে পরিণত করতে চাই, শত্রুর মোকাবেলা করতে যেন সক্ষম হয়।’ এভাবে তিনি অনেকগুলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যুর ওপর আলোকপাত করেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বক্তব্য শেষ করলেন, বক্তব্য শেষে উপস্থিত সবাই একে একে বক্তব্য রাখা শুরু করল এবং জাতীয় ইস্যুর ওপর অনেক বক্তব্য প্রদান করলেন, যা একপর্যায়ে প্রাণবন্ত আলোচনায় রূপ নিলো। আলোচনা শেষে সামান্য চা আপ্যায়নের ব্যবস্থা ছিল সল্টেস বিস্কুট দিয়ে, রাষ্ট্রপতি সবার সাথে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আলাপ আলোচনায় সবার মাঝে একান্ত আপন হয়ে গেলেন, সেই ফাঁকে ডা: ইউছুফ সাহেব আমাকে রাষ্ট্রপতির কাছে নিয়ে গিয়ে বললেন, ‘স্যার, এনাদের দাওয়াতের অনুষ্ঠানের ব্যাপারে নাসির আমাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন; রাষ্ট্রপতি স্মিতহসে আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন- জজগিরি ভালো, না রাজনীতি ভালো? কোনটা উপভোগ করছেন? আমি তার জবাব দেয়ার কোনো ভাষা খুঁজে না পেয়ে চমকে উঠলাম এবং মনে করলাম সিলেট সার্কিট হাউজে আমাকে তৎকালীন উপপ্রধান মন্ত্রী মরহুম জামাল উদ্দীনের উপস্থিতিতে জজগিরি ছেড়ে রাজনীতিতে আসার যে নির্দেশনা দিয়েছিলেন তা মনে পড়ল। তিনি স্মিত হাসলেন, তার সেই হাসিটা যে জীবনের শেষ হাসি হবে এবং তার ঐতিহাসিক বক্তব্য যে জীবনের শেষ বক্তব্য হবে তা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারিনি। আলোচনার সময় ফ্যানের বাতাসে রাষ্ট্রপতির বামপাশের টেবিলের কোনার চাদর ওপরে উঠে গেলে রাষ্ট্রপতির জীবন রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্নেল মাহফুজ অতিভক্তি ও সতর্কতার সাথে টেবিলের নিচে ক্রোলিং করে এসে চাদর ঠিক করে দিয়েছিলেন। আর তিনিই সেই দুর্ভাগ্যজনক জাতির কলঙ্কজনক অধ্যায়ের নায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে মহান স্বাধীনতার ঘোষক, জাতীয়তাবাদী ইসলামি মূল্যবোধের পুরোধাকে নির্মমভাবে শাহাদত বরণের কালো অধ্যায়ের নেতৃত্ব দিয়েছেন। সেই অভিশপ্ত চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে কামরার বাইরের সিঁড়ির গোড়ায় রাত সাড়ে ১০টার দিকে রাষ্ট্রপতি যখন রাতের খাবারের জন্য ডাইনিং হলের দিকে যাচ্ছিলেন আমি ডা: ইউছুফের কাছ থেকে বিদায় নিতে গেলে তিনি রাষ্ট্রপতি চেয়ারের কাছে গিয়ে বললেন, ‘স্যার নাছির চলে যাচ্ছেন বাসায় তার স্ত্রী একা।’ আমি রাষ্ট্রপতিকে সালাম দেয়ার সাথে সাথে তিনি আমাকে ডিনার করে যেতে বললেন।
আমি কোনো উত্তর না দিয়ে বিদায় নিয়ে চলে আসি। এই বিদায় যে শেষ বিদায়, এই দেখা যে শেষ দেখা হবে তা আমি কল্পনাও করতে পারিনি। বাসায় ফিরে গিয়ে আমি ও আমার স্ত্রী ডালিয়া রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম, গভীর রাতে প্রচণ্ড ঝড় ও বৃষ্টি হয়েছিল, সকাল ৮টায় ঘুম থেকে উঠে বাসার বারান্দা থেকে দেখি রাস্তাঘাট ফাঁকা নির্জন আমি ডিসি হিলের উত্তরে মোমিন রোডের বাসায় থাকতাম, নিচ থেকে দু-একজন লোক এসে বললেন স্যার গত রাতে সার্কিট হাউজে অনেক গোলাগুলি হয়েছে। শুনতে পাচ্ছি রাষ্ট্রপতি জিয়াকে হত্যা করা হয়েছে। সামরিক বাহিনী চট্টগ্রামের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন এবং জেনারেল মঞ্জুর জিয়াকে হত্যা করেছে। এই খবর শুনে আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে প্রথমে টেলিফোন করলাম আমাদের অত্যন্ত আপনজন জাগদলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বিএনপির বর্ষীয়ান নেতা মরহুম অ্যাডভোকেট এ কে এম শামসুল হুদাকে। টেলিফোন তাকে পেয়ে গেলাম। তিনি কম্পিত কণ্ঠে আমাকে বললেন তুমি তাড়াতাড়ি করে কোর্ট ড্রেস পরে কোর্টের লাইব্রেরিতে চলে যাও, সেখানে অন্যদেরও আসতে বলেছি, সেখানেই দেখা হবে।
হুদা সাহেব তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত নিলেন, কোটবিল্ডিংয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে তার সাথে দেখা করব।
আমরা জেলা প্রশাসকের কাছে গিয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়ার লাশ দাবি করার জন্য মতপ্রকাশ করলাম। আমি তার লাশ গ্রহণের প্রস্তাবে তাৎক্ষণিকভাবে রাজি হয়ে বললাম, সবাই চলুন বলেই আবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে থেকে পায়ে হেঁটে কোর্টবিল্ডিং পাহাড়ে জেলা প্রশাসকের দফতরের সামনে হাজির হলাম সামরিক বাহিনীর জোয়ানদের কয়েকটি গাড়ি কোর্টবিল্ডিংয়ের সামনে জড়ো হওয়া দেখে। এবার ও আগের মতো আমাদের সবাই অ্যাডভোকেট এ কে এম সামশুল হুদা, আমি, অ্যাডভোকেট আবু সালেহ চৌধুরী ও অ্যাডভোকেট শফিকুর রহমানের নাম লিখে সাক্ষাৎ প্রাপ্তির জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে স্লিপ পাঠালাম। স্লিপ-পাওয়ার সাথে সাথে জেলা প্রশাসক এম জিয়াউদ্দীন আমাদের সবাইকে ডাকলেন। আমরা তার অফিস চেম্বারে ঢুকেই চেয়ারে বসার আগে হুদা ভাই জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়ার লাশ কোথায়, কিভাবে আছে, কোন কর্তৃপক্ষের কাছে আছে তা জানতে চাইলেন এবং এও বললেন, আমরা সবাই এসেছি আমাদের রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়ার লাশ গ্রহণ করতে। জেলা প্রশাসক মাথা নিচু করে নিচের দিকে তাকিয়ে রইলেন। একটিবারও মাথা উঁচু করে আমাদের মুখোমুখি হলেন না। মাথা নিচু করে শুধু বললেন, ‘জিয়ার লাশ আমার দায়িত্বে হস্তান্তর হলে আমি নিশ্চয়ই আপনাদের জানাব’। আরো বললেন, ‘আপনারা দ্রুত চলে যান’। আমরা দ্রুত স্থান ত্যাগ করে যার যার বাসার দিকে চলে যাচ্ছিলাম।
রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়ার সাথে দুটো দুর্লভ স্মৃতি ও তার সাহচর্যে দুটো ঘটনা চোখের সামনে ভেসে উঠল। প্রথম দুর্লভ স্মৃতিটি হলো, ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রচারণার সময়। আজ থেকে ৩৮ বছর আগে ১৯৭৮ সালে ‘জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট’-এর রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী প্রচারণাকালে শহীদ জিয়া রাঙ্গামাটি থেকে চট্টগ্রাম শহর অভিমুখে বিভিন্ন জায়গায় নির্বাচনী সভায় বক্তব্য রেখে যখন হাটহাজারী থানার পার্বতী হাইস্কুল ময়দানে এক বিশাল নির্বাচনী সভায় যোগদান করেন। রাষ্ট্রপতি জিয়ার বামপাশের চেয়ারে বসে আমি ওই সভায় সভাপতিত্ব করার সময় রাষ্ট্রপতি জিয়া আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এখানকার খবর কী? আমি এখানে কত শতাংশ ভোট পাবো? আমি প্রত্যুত্তরে বললাম, স্যার, এখানে আপনি ৭০ শতাংশ ভোট পাবেন। তখন তিনি বললেন, আপনি আমাকে সত্য কথাটি জানালেন। রাঙ্গামাটি থেকে এখানে আসা পর্যন্ত যতগুলো নির্বাচনী সভায় বক্তব্য রেখেছি। প্রতিটি সভার সভাপতি আমাকে জানিয়েছেন, ওইসব এলাকায় আমি নাইনটি পার্সেন্ট ভোট পাবো। তারা বুঝতে পারেনি যে, I am not fool. এর পর কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে জামাল উদ্দীন বক্তব্য শেষ করার আগে আমি বললাম, স্যার, আমি কোনো বক্তব্য রাখব না। কারণ আপনার প্রতিটি মুহূর্ত খুবই মূল্যবান। মানুষ আপনার বক্তব্য শুনতে এখানে এসেছে, তিনি বললেন এটা কিভাবে হয়? আমি বললাম- স্যার, আমি সভাপতি হিসেবে আপনার নাম প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন বলে ঘোষণাটুকু দেবো আর আপনি বক্তব্য রাখবেন। তিনি স্মিতহাস্যে গাঢ় কালো চশমা পরিহিত অবস্থায় আমার দিকে তাকিয়ে ভারী গলায় বললেন, আপনার প্রস্তাব চমৎকার। সভায় উপস্থিত সব কেন্দ্রীয় নেতা যারা রাষ্ট্রপতি জিয়ার সফরসঙ্গী ছিলেন তাদেরকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমার চেয়ারে বসার পর রাষ্ট্রপতি তার বক্তব্য শুরু করলেন। বক্তব্য শেষ করেই নিরাপত্তাবলয় ছেদ করে সভায় সমবেত জনতার মাঝে দৌড়ে গিয়ে সবার সাথে হাত মেলাতে শুরু করলেন। আমরা সবাই তার পেছন পেছন ছুটলাম। তিনি কিছুক্ষণের মধ্যে তার মোটরগাড়িতে উঠে চট্টগ্রাম শহর অভিমুখে যাত্রা শুরু করলেন, জামাল উদ্দিন বৃহত্তর চট্টগ্রামের আহ্বায়ক হিসেবে সন্ধ্যায় পাঁচলাইশের ফাইভস্টার বাসভবনে আমি যখন দেখা করতে গেলাম তখন তিনি বললেন, ‘নাছির রাষ্ট্রপতি তোমার ওপর অনেক সন্তুষ্ট হয়েছেন, তুমি নাকি তাকে একটি সত্য কথা বলেছ।’
এর পরের ঘটনাটি ঘটেছে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজের দরবার হলে, ১৯৮০ সালের এক সন্ধায়। হাটহাজারী থানার এক পুলিশ কর্মকর্তা মুস্তফা গোলাম কুদ্দুস হাটহাজারী থানা যুবদলের নেতা মোজাফফর বিভিন্ন নেতার কাছে গিয়ে বিশেষ করে থানার সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদের কাছে এর কোনো প্রতিকার না পেয়ে সভা করছেন সেখানে তাকে নিয়ে বসি। হলে ঢুকে দেখি রাষ্ট্রপতি বক্তব্য রাখছেন, তার একই সারির দুই পাশে মরহুম জামাল উদ্দীন, মরহুম ব্যারিস্টার সুলতান, মিসেস কামরুন নাহার জাফরসহ আমাদের অনেকে উপস্থিত। রাষ্ট্রপতি তার বক্তব্য শেষ করার সাথে সাথে আমি দাঁড়িয়ে বললাম, রাষ্ট্রপতি, আমি একটু বক্তব্য রাখতে চাই বলতেই আমার আগের কথামতো মোজাফফর দাঁড়িয়ে শাট খুলেই তার পিঠের বেত্রাঘাতের জখমসহ রাষ্ট্রপতিকে দেখালেন। আমি বললাম, তার অপরাধ সে পুলিশের অপকর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় তার ওপর এই নির্যাতন। আর সে হচ্ছে আপনার একজন যুবদলের কর্মী হাটহাজারী থানার, যার পিতা নেই। এটা বলার সাথে সাথে এক হুলস্থুল অবস্থা। রাষ্ট্রপতি সাথে সাথে বললেন, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে এবং জামাল উদ্দীনকে রাষ্ট্রপতি কানে কানে কী যেন বললেন, তারপর রাষ্ট্রপতি দ্রুত গতিতে সভা ত্যাগ করে গাড়িতে করে ঢাকার উদ্দেশে চট্টগ্রাম এয়ারপোর্টের দিকে রওনা হলেন আর জামাল সাহেব আমাকে অত্যন্ত সহানুভূতির সাথে বললেন, ‘তুমি আমাকে না বলে মোজাফফরকে রাষ্ট্রপতির কাছে কেন নিয়ে আসছ।’ আমি বললাম, মোজাফফরকে এখানে না আনা ছাড়া আমার কোনো উপায় ছিল না। আমি যাদেরকে নিয়ে হাটহাজারী থানায় জাগদল প্রতিষ্ঠা করেছি আজকে তারা নিগৃহীত, নির্যাতিত ও অবহেলিত।
পরে জামাল ভাই জানিয়েছেন, ‘নাসির প্রেসিডেন্ট সাহেব যে কত ক্ষুব্ধ হয়েছে তোমাকে ভাষায় বলতে পারব না একজন কর্মীর জন্য তার যে কত ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া তা বর্ণনা করা যাবে না। শুধু এইটুকু বলব, যা হোক ওই ঘটনাটি এমন সম্মানজনকভাবে সমাধান হয়েছিল যে হাটহাজারী তথা চট্টগ্রামের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের মাঝে ‘রাষ্ট্রপতি জিয়া যে কর্মীর জিয়া’ তা সবাইকে অবাক করে দিয়েছিল।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়া যাদেরকে নিয়ে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন তাদের অনেকেই আজ না-ফেরার দেশে চলে গেছেন আর যারা শহীদ জিয়ার স্পর্শে স্পর্শিত হয়ে এখনো বেঁচে আছেন, তার প্রতিষ্ঠিত দলের পতাকা সমুন্নত রাখছেন, তারা যখন শুনতে পান একজন স্বাধীনতার ঘোষক, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সেক্টর কমান্ডারকে যারা রাজাকার ও পাকিস্তানের গুপ্তচর হিসেবে আখ্যায়িত করার যে ধৃষ্টতা দেখায়, তাদের জানা উচিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেই জিয়াকেই স্বাধীনতাযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ও গৌরবোজ্জ্বল অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বীর উত্তম উপাধিতে ভূষিত করেন এবং তার আমলেই একজন দেশপ্রেমিক স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াকে মেজর থেকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল, কর্নেল, ব্রিগেডিয়ার এবং মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দেন। আর তাদের এটাই জানা উচিত সামরিক বাহিনীতে পদোন্নতির বিষয়টি অত্যন্ত চুলচেরা বিশ্লেষণ, মেধা, দেশপ্রেম ও ত্যাগই হচ্ছে পদোন্নতির মাপকাঠি। শহীদ জিয়াকে তার দলের কর্মী এবং দেশপ্রেমিক জনগণের হৃদয় থেকে তত দিন মুছে ফেলা যাবে না, যত দিন বিশ্বমানচিত্রে বাংলাদেশ থাকবে।

লেখক

অ্যাডভোকেট মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন
সাবেক প্রতিমন্ত্রী, মেয়র, রাষ্ট্রদূত ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা