শস্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন সরকারের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত

0

জিসাফো ডেস্কঃ জ্বালানি ব্যবহারে পরিবেশ উপযোগী হওয়ার লক্ষ্যে খাদ্য শস্য ব্যবহার করে ইথানল তৈরির পরিকল্পনা করছে সরকার, যা এখনও আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।

চলতি বছরের শুরুতে সবুজ জ্বালানি উৎপাদন সংক্রান্ত এক সরকারি প্রজ্ঞাপনের সূত্র ধরে থমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে এই শঙ্কার কথা উঠে আসে। ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ভুট্টা, ভাঙা চাল ও গুঁড় ব্যবহার করে ইথানল তৈরি করবে, যা ৫ ভাগ অনুপাতে পেট্রোলের সঙ্গে মেশানো হবে।

এই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও পরিবেশবিদরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের ভূমিকা খুবই সামান্য। উপরন্তু দেশের চাহিদা মেটাতে এখনও খাদ্যশস্য আমদানি করতে হয়৷ ফলে শস্য দিয়ে জ্বালানি তৈরি করলে খাদ্যের দাম বেড়ে যাবে, যার শিকার হবে গরিব মানুষ।

শস্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের এই সিদ্ধান্তকে ‘আত্মঘাতী’ বলেছেন বাংলাদেশ পোলট্রি শিল্প সমন্বয় কমিটির মুখপাত্র মশিউর রহমান।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে উৎপন্ন ভুট্টার বেশিরভাগই মুরগিসহ প্রাণীকূলের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। দেশে এই চাহিদার অর্ধেকই মেটাতে হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিল থেকে আমদানি করে। ইথানল উৎপাদন শুরু হলে ভুট্টার দাম আরও বেড়ে যাবে৷ ফলে ডিম এবং মুরগির দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে।

মশিউর বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় চীনসহ অন্য দেশগুলো জৈব জ্বালানি উৎপাদনের প্রকল্পে অনুমোদন দেওয়া বন্ধ করেছে। বাংলাদেশের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের গবেষণা অনুযায়ী, দেশে বছরে এককোটি ৮০ লাখ লিটার ইথানল উৎপাদন করা সম্ভব৷ তার জন্য ৬০ হাজার টন চাল ভাঙতে হবে, যা দেশের মোট উৎপাদনের ৩ দশমিক ৫ শতাংশ।

আর চালের বিকল্প উৎস হিসেবে বছরে ভুট্টা লাগবে ৬২ হাজার টন, যা মোট উৎপাদনের ২ দশমিক ৮ শতাংশ এবং গুঁড়ের ক্ষেত্রে ৯৭ হাজার টন, যা মোট উৎপাদনের সমান৷ তবে এই মাত্রার চেয়ে বেশি খাদ্য শস্য জ্বালানি উৎপাদনে ব্যবহার করলে তা খাদ্য নিরাপত্তায় মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মন্ত্রণালয়ের গবেষণা প্রতিবেদনেই সতর্ক করা হয়েছে।

এই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যায় জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ থমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশনকে বলেন, “অন্য দেশগুলোর মতো বাংলাদেশকেও সবুজ ও বিকল্প জ্বালানি উৎপাদনের দিকে ঝুঁকতে হবে। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি প্রবণতার বাইরে আমরা অবস্থান করতে পারি না। আমরা শিগগিরই জৈব জ্বালানি উৎপাদনের অনুমতি দিচ্ছি। আগে দেখি কী হয়, খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়ে পরে বিবেচনা করা যাবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের ১৬ কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার কথা না ভেবেই খাদ্য শস্য পুড়িয়ে ইথানল উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে সরকার। যেই দেশে ঝড়, বন্যা, খরা, লবণাক্ততায় মানুষের ফসলহানি হয়, সেরকম একটি দেশের এই সিদ্ধান্ত উদ্বেগের।

গত বছর গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স অনুযায়ী, বিশ্বের অন্যতম ক্ষুধার্ত দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ ২৫তম স্থানে ছিল৷ দেশের অনেক মানুষ এখনও দিনে দুবেলা পেট ভরে খেতে পায় না৷ জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বছরে ১৮ লাখ টন ভাঙা চাল, একলাখ টন গুঁড় ও ৬০ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে অর্ধেক ভুট্টা উৎপাদন করে।

গবাদি পশু ছাড়াও দরিদ্র মানুষও ভুট্টা খায়; আটার সঙ্গে মিশিয়ে তৈরি করা হয় বিভিন্ন খাবার ও বিস্কুট। নিম্ন আয়ের মানুষরাও খুদ বলে পরিচিত ভাঙা চাল খায়। মানুষের ব্যয়ের বড় খাত খাদ্যদ্রব্যের দাম দেশে বেড়ে চলেছে৷ রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন সংস্থা টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, এক বছরে মোটা চালের দাম ২৫ শতাংশ বেড়ে ৪২ টাকায় উঠেছে।

ফেব্রুয়ারিতে দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল সর্বোচ্চ ৬ দশমিক ৮ শতাংশ, যা গত বছর ছিল প্রায় অর্ধেক। খাদ্য মন্ত্রণালয়ে তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে চাহিদার চেয়ে বেশি ধান হয়৷ কিন্তু বাকি খাদ্য শস্যের চাহিদা পূরণে গত বছর ৪৫ লাখ টন গম আমদানি করতে হয়েছে।

সরকারের এই পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা মো. মঈনুদ্দীন আব্দুল্লাহ বলেন, “ভুট্টা দিয়ে জ্বালানি তৈরির কোনো যৌক্তিক কারণ দেখছি না। এই ভুট্টা আমাদের আমদানি করতে হয়। ইথানল উৎপাদনের জন্য প্রথম আবেদনকারী সুনিপুন অর্গানিক লিমিটেড সরকারের অনুমোদনের অপেক্ষায় রযেছে।

এই কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক খান মো. আফতাব উদ্দীন বলেন, খাদ্যশস্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের ফলে তা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি হবে না। কারণ, জ্বালানি উৎপাদনের পাশাপাশি যেসব উদ্বৃত্ত জিনিস থাকবে, তা পোলট্রি বা মাছের খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন অধ্যয়ন ইনস্টিটিউটের ফেলো ও বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন আলোচক টিমের সদস্য মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, “গবাদি পশুদের পুষ্টি নিয়ে আমাদের এখনই অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে৷ তাই ভুট্টা থেকে ইথানল উৎপাদন হলে এসব প্রাণি পুষ্টিহীনতায় ভুগবে… এটা একেবারেই একটা ভুল সিদ্ধান্ত।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, “ইথানল উৎপাদন একবার শুরু হলে এর চাহিদা বাড়তেই থাকবে। জ্বালানির দামের পাশাপাশি এর দাম বাড়বে। ফলে আরও খাদ্যশস্যের প্রয়োজন হবে৷ তখন পশু খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হবে।