শমসের মবিন এখন কেবলই অতীত!

0

সিলেট: বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী। দীর্ঘদিন থেকে তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। বিশেষ করে সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের মৃত্যুর পর তিনি সিলেটে একটি বলয় নিয়ন্ত্রণ করে আসছিলেন। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার দল থেকে পদত্যাগ করার পর ওই বলয়ের নেতাকর্মীরা অনেকটা নিরবতা পালন করছিলেন। তবে শুক্রবার বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সিলেট সফরে আসার পর শমসের অনুসারীরাই মাঠে সবর ছিলেন। নেতাকর্মীদের মধ্যে যে উৎসাহ ও উদ্দীপনা বিরাজ করছিল তাতে বোঝা গেছে তারা শমসের মবিন থেকে অনেকটা দূরে সরে গেছেন।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে দ্বিধাবিভক্ত সিলেট বিএনপিকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম. সাইফুর রহমান ও সাংগঠনিক সম্পাদক এম. ইলিয়াস আলী। সাইফুর রহমানের মৃত্যুর পর তার বলয়ের হাল ধরেন কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী। বিভিন্ন সময় বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের কমিটি গঠনে নিজ বলয়ের নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ পদ পাইয়ে দিতে শমসের নেপথ্যে থেকে কাজ করেছেন।

সমশেরের প্রতি তার বলয়ের নেতারাও এতই অনুগত ছিলেন যে- সিলেটে থাকার জন্য বাসা ভাড়া করে দেন তারা। হোটেলে উঠলেও সেখানকার যাবতীয় খরচ মেটাতেন তার বলয়ের নেতারা। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার দুপুরে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী কাউকে কিছু না বলেই দলীয় সব পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এ নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়। বিষয়টি নিয়ে শমসের অনুসারীরা অনেকটা বিপাকে পড়ে যায়। পরে শমসের অনুসারীরা তাদের নেতা কি কারণে পদত্যাগের করেছে তা জানার চেষ্টা করেন। অনেকেই সরাসরি শমসের মবিনকে ফোন দিয়েছেন। আবার অনেকেই কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেছেন।

জানা গেছে, এমনকি শমসের অনুসারীরা অনেকেই লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির আরেক ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও তার স্ত্রী সিলেটের মেয়ে জুবায়দা রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করেও শমসের মবিনের পদত্যাগের কারণ জানার চেষ্টা করেন।

এক পর্যায়ে তারেক রহমানের ইশারায় শুক্রবার সিলেট সফরে আসেন দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সিলেট এসে তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে হযরত শাহজালাল (র.)-এর মাজার ও শাহপরাণের (র.) মাজার জিয়ারত করেন। এছাড়াও স্থানীয় সাংবাদিকের সঙ্গে শমসের মবিন চৌধুরীর পদত্যাগের বিষয়টি নিয়ে কথাও বলেন।

এদিকে, অতীতে যারা শমসের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন তাদেরই শুক্রবার মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরে সঙ্গে সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত দেখা গেছে। বিশেষ করে শমসের মবিন সিলেটে আসলে যারা বিমানবন্দরে স্বাগত জানাতেন তারাই মির্জা ফখরুলকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের সঙ্গে মির্জা ফখরুলও শুভেচ্ছা বিনিময় ও বৈঠক করেছেন বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এ সময় শমসের অনুসারী হিসেবে পরিচিত সিলেট মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি এমএ হক, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট নুরুল হক, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ড. শাহরিয়ার হোসেন, সদস্য সচিব বদরুজ্জামান সেলিম, বিএনপি নেতা আবুল কায়ের শামীম, মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক, আলী আহমদসহ একাধিক নেতা উপস্থিত ছিলেন। তাদের সঙ্গে ফখরুল একটি বৈঠকও করেছেন বলে জানিয়েছে সূত্র।

এছাড়াও সিলেট ছাত্রদলের বিদ্রোহী নেতা সিলেট জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাফেক মাহবুব, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সদস্য মাহবুবুল হক চৌধুরী, জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শাকিল মুর্শেদ ও মহানগর বিএনপির সাবেক সমাজসেবা সম্পাদক রেজাউল করিম নাচনও মির্জা ফখরুলের সঙ্গে দেখা করেন বলে জানা গেছে। তারা সবাই শমসের অনুসারী। তবে নিজেদের ক্যারিয়ারের কথা চিন্তা করে বিএনপির ওই শীর্ষ নেতার কাছে শমসের মবিন চৌধুরীর পদত্যাগের কারণ জানতে অনিহা দেখিয়েছেন শমসের অনুরসারীরা। কারণ দলের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে- দলের হাইকমান্ড শমসের মবিনের উপর অসন্তুষ্ট। এ অবস্থায় শমসের মবিনের পক্ষে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালে দলের হাইকমান্ড তাদের উপরও অসন্তুষ্ট হবে।

এ ব্যাপারে মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব বদরুজ্জামান সেলিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘মির্জা ফখরুল সাহেব ব্যক্তিগত সফরে সিলেট এসেছিলেন। এটা কোনো দলীয় সফর নয়। আমাদের দলের শীর্ষ নেতা তিনি। তাই তাকে আমরা স্বাগত জানিয়েছি। উনার সঙ্গে আমরা সংক্ষিপ্ত বৈঠকও করেছি।’

শমসের মবিন পদত্যাগ সম্পর্কে মির্জা ফখরুল কিছু বলেছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা তো দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব আপনাদের বলেই গেছেন। এটা নতুন করে বলার কিছু নেই।’

সিলেট জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট নূরুল ইসলাম বলেন, ‘শমসের মবিন চৌধুরী সাবেক পররাষ্ট্র সচিব, বীরমুক্তিযোদ্ধা ও অভিজ্ঞ কুটনীতিক। তিনি আরও কিছুদিন রাজনীতিতে সময় দিতে পারলে ভাল হতো।’

কী কারণে তিনি পদত্যাগ করেছেন এবং মির্জা ফখরুল দলীয় নেতাকর্মীদের কোনো দিক নিদের্শনা দিয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমি কোনো মন্তব্য করে চাই না।’

এদিকে, শমসের মবিন চৌধুরী পদত্যাগে ইলিয়াস আলী বলয়ে অনেকটা চাপা উচ্ছ্বাস বইছে। শমসের পদত্যাগে সিলেটে আনন্দ মিছিলও হতে পারে বলে জানিয়েছেন সিলেট মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাইয়ূম জালালী পংকী। তবে তারা মির্জা ফখরুলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি কেন এমন প্রশ্নের উত্তর দিতে নারাজ বিএনপির ওই নেতা।

প্রসঙ্গত, গত ২৯ অক্টোবর শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে হঠাৎই বিএনপির সব পদ থেকে সরে দাঁড়িয়ে রাজনীতি থেকেই অবসরের ঘোষণা দেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী। তার ঘোষণা কিছুটা ঠান্ডা রাজনীতিতে বেশ উত্তাপ ছড়ায়।