‘রিয়াল এডমিরাল মাহবুব আলী খান একজন দেশপ্রেমিকের প্রতিকৃতি’

0

“এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ, মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান।” কর্মীষ্ঠ পুরুষ রিয়াল এডমিরাল এম এ খানের ক্ষেত্রে এ কথা যথার্থ ভাবেই খাটে। বাংলাদেশ সরকারের সাবেক যোগাযোগ উপদেষ্টা, কৃষিমন্ত্রী ও নৌ-বাহিনী প্রধান রিয়াল এডমিরাল মাহবুব আলী খান কর্মগুণে ও চারিত্রিক মাধুর্যে আমাদের রাজনীতিতে নক্ষত্রের মতোই বিরাজ করছিলেন। তাঁর অস্তিত্বজুড়ে ছিল যেমন অখন্ড কর্মপ্রেরণা, তেমনি ছিল সততা ও দেশপ্রেমের বিরলদৃষ্ট চেতনা।

তিনি বলতেন, “সততা ছাড়া দেশপ্রেম মূল্যহীন, সততা নিয়েই দেশের জন্য কাজ করে যেতে হবে।” বাস্তবিকই স্বল্পপরিসর জীবনের সর্বস্তরে তিনি তাঁর এই চেতনারই বাস্তবায়ন করে গেছেন অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে। আর এই কর্মগুণেই তিনি দেশের মানুষের অতি প্রিয় হয়ে উঠেছিলেন জীবনের শেষ দিনগুলোতে। নিজ জীবনে যেমন সততাকে সঙ্গী করেছিলেন, তেমনি অন্যদেরও সৎ থাকার উপদেশ দিতেন।কঠোর শৃঙ্খলাবোধ ও সময়ানুবর্তিতা ছিল তার চরিত্রের বিশেষ ভূষণ। কর্তব্য-কর্ম যথাসময়ে সম্পাদনে নিজে যেমন ছিলেন নিষ্ঠাশীল, সহকর্মীদেরও তেমনটি করার প্রেরণাও পরামর্শ দিতেন। এভাবেই তিনি সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছে অতি সম্মানীত আপন মানুষ হয়ে উঠেছিলেন আর দেশের উন্নয়নে রেখেছিলেন অমূল্য অবদান।

বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের অধিকারী এই মহান পুরুষের আজ ৩২তম শাহাদৎ বার্ষিকী। গৌরবময় সুদীর্ঘ পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারক রিয়াল এডমিরাল মাহবুব আলী খানের জন্ম ১৯৩৪ সালের ৩ নভেম্বর সিলেটের বিরাহীমপুরের সম্ভ্রান্ত ও বিখ্যাত মুসলিম পরিবারে। তৎকালীন ভারতের ১৯০১ সালে প্রথম মুসলিম ব্যারিস্টার আহমেদ আলী খান তাঁর পিতা। আহমেদ আলী খান ছিলেন নিখিল ভারতের আইন পরিষদের সদস্য-এমএলএ ও আসাম কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট। যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আহমেদ আলী খান তিনটি বিষয়ে এমএ ডিগ্রি লাভ করেছিলেন। তিনি ছিলেন হায়দরাবাদ নিজামের প্রধান আইন উপদেষ্টা।

অন্যদিকে অবিভক্ত বিহার, আসাম ও উড়িষ্যার জমিদার পরিবার খান বাহাদুর ওয়াসিউদ্দিন আহমেদের কন্যা যুবাইদা খাতুন ছিলেন মাহবুব আলী খানের মা। আর যুবাইদা খাতুনের দাদা ব্রিটিশদের থেকে অর্ডার অব এমপায়ার খেতাব পান। ১৮৯৭ সালে ভারতে চতুর্থ মুসলিম হিসেবে আইসিএস লাভ করেছিলেন চাচা গজনফর আলী খান। গজনফর আলী খান ১৯৩০ সালে অর্ডার অব এমপায়ার খেতাব পান।

এম এ খানের দাদা ছিলেন ভারতের বিশিষ্ট চিকিৎসক খান বাহাদুর আজদার আলী খান। তিনি বিহার ও আসামের দারভাঙ্গা মেডিকেল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও পাটনা মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক। ১৯২৪ সালে তিনি সিলেটে নাফিজাবানু চ্যারিটেবল হাসপাতাল ও ১৯৩০ সালে ম্যাটার্নিটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন।

এম এ খানের পিতা আহমেদ আলীর মামা জাস্টিস আমীর আলী কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি ছিলেন। দাদা খান বাহাদুর আজদার আলী ছিলেন সৈয়দ আমীর আলীর জামাতা। স্যার সৈয়দ আমীর আলী ছিলেন ইংল্যান্ডের রয়্যাল প্রিভিকাউন্সিল সদস্য ও ইন্ডিয়ান ভাইসরয় এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল সদস্য। স্যার সৈয়দ আমীর আলীর বিখ্যাত দুটি গ্রন্থ ‘হিস্ট্রি অব সারাসেন’ ও ‘স্পিরিট অব ইসলাম’।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানী ছিলেন এম এ খানের চাচাতো ভাই। শের-ই-সিলেট ও অবিভক্ত পাকিস্তানের মন্ত্রী মরহুম আজমল আলী চৌধুরী ছিলেন তার চাচাতো ভাই।

দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে এমএ খান ছোট। বড়বোন সাজেদা বেগম। মেজভাই চিকিৎসক সেকেন্দার আলী খান। সেকেন্দার আলী খানের মেয়ে আইরিন খান অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, সিলেটের বিরাহীমপুর, কলকাতা ও পুরান ঢাকার ৬৭ পুরানা পল্টন লাইনের বাড়িতে এমএ খানের শৈশব ও কৈশোর কাটে। কলকাতা ও ঢাকায় তার প্রাথমিক শিক্ষাগ্রহণ হয়। ছোটবেলা থেকেই ছিলেন শান্ত, ধীর আর চিন্তাশীল। সুদর্শন, উন্নত শারীরিক গঠন ও ব্যক্তিত্বপূর্ণ অভিব্যক্তির কারণে সবার প্রিয় ছিলেন তিনি। খেলাধুলাও করতেন। ব্যাডমিন্টনে ছিলেন পারদর্শী। প্রতিদিন সকালে নামাজ আদায় করে পবিত্র কোরআন শরিফ তেলাওয়াত করতেন। যেকোনো কাজের আগে স্মরণ করতেন আল্লাহকে। ছিলেন খাদ্যরসিকও। গলদা চিংড়ি, ইলিশ মাছ পছন্দ করতেন খুব।

১৯৫৫ সালে ২১ বছর বয়সে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হন সৈয়দা ইকবালমান্দ বানুর সাথে। তাদের দুই কন্যা শাহিনা খান জামান (বিন্দু) এবং ডা. যুবাইদা রহমান (ঝুনু)। শাহিনা খান জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে পড়াশোনা করেন। ছোট কন্যা যুবাইদা রহমান ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রি লাভ করেন। যুক্তরাজ্য থেকে তিনি প্রিভেনটিভ কার্ডিওলজি থেকে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। এতে ৫২টি দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে অর্জন করেন প্রথম স্থান। বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমডোর সৈয়দ শফিউজ্জামান এমএ খানের জ্যেষ্ঠ জামাতা। তিনি মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ সরকারের সামরিক উপদেষ্টা ছিলেন। আর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড়পুত্র বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার কনিষ্ঠ জামাতা। বাংলাদেশে ১/১১ সরকার আমলে আটক অবস্থায় নির্যাতনের শিকার তারেক রহমান বর্তমানে লন্ডনে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের কন্যা জাইমা রহমান এমএ খানের একমাত্র নাতনি।

১৯৫২ সালে পাকিস্তান নৌবাহিনীতে যোগ দেন এমএ খান। ক্যাডেট হিসেবে প্রশিক্ষণ লাভ করেন কোয়েটার সম্মিলিত বাহিনীর স্কুল থেকে। যুক্তরাজ্যের ডার্মউইথ রয়্যাল নেভাল কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন করেন। ১৯৫৪ সালে ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর রণতরী ট্রাম্পে প্রশিক্ষণ নেন। ১৯৫৬ সালের পহেলা মে স্থায়ী কমিশন লাভ করেন। রয়্যাল কলেজ, গ্রিনিচসহ ইংল্যান্ডের রয়্যাল নেভাল ইনস্টিটিউশনে বিভিন্ন কোর্স সমাপ্ত করেন। ১৯৬৩ সালে কৃতী অফিসার হিসেবে যুক্তরাজ্যে রানী এলিজাবেথ কর্তৃক পুরস্কৃত হন। একই বছর যুক্তরাজ্যে ভূমি থেকে টর্পেডো ও অ্যান্টি-সাবমেরিন ওয়ারফেয়ার অফিসার হিসেবে উত্তীর্ণ হন এবং পাকিস্তান নেভাল স্টাফ কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন করেন। করাচিতে পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট থেকে সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট কোর্স সম্পন্ন করেন। এরআগে ১৯৬০ সালে পিএনএস তুগ্রিলের গানারি অফিসার হন। পরে ১৯৬৪ সালে পিএনএস টিপু সুলতানের টর্পেডো ও অ্যান্টি-সাবমেরিন অফিসার হন। ১৯৬৭-৬৮ সালে তিনি রাওয়ালপিন্ডিতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে জয়েন্ট চিফ অফ সেক্রেটারিয়েট স্টাফ অফিসার (ট্রেনিং এবং মিলিটারি অ্যাসিস্ট্যান্স) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৭০ সালে পিএনএস হিমালয়ে টর্পেডো ও অ্যান্টি-সাবমেরিন স্কুলের অফিসার ইনচার্জ ও করাচিতে সি-ওয়ার্ড ডিফেন্স অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন।

স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে স্ত্রী ও দুই কন্যাসহ এমএ খান পশ্চিম পাকিস্তানে চাকুরিরত ছিলেন। যুদ্ধকালীন সময়ে পরিবারসহ তিনি গৃহবন্দী হন। তিন বছর বন্দী থাকার পর ১৯৭৩ সালে স্ত্রী ও দুই কন্যাসহ আফগানিস্তান ও ভারত হয়ে কৌশলে বাংলাদেশে পৌঁছেন।

এরপর ১৯৭৩ সালের অক্টোবরে চট্টগ্রাম মার্কেন্টাইল একাডেমির প্রথম বাঙালি কমান্ড্যান্ট নিযুক্ত হন। ১৯৭৪ সালে নৌ-সদর দপ্তরে পারসোনেল বিভাগের পরিচালক পদে নিয়োগ পান। ১৯৭৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি নৌবাহিনীর সহকারি স্টাফ প্রধান (অপারেশন ও পারসোনেল) নিযুক্ত হন। ১৯৭৬ সালের ডিসেম্ভরে রয়্যাল নেভি কর্তৃক হস্তান্তরিত বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রথম রণতরী বিএনএস ওমর ফারুক (সাবেক এইচএমএম ন্যাভডক) এর অধিনায়ক হন। রণতরীটি নিয়ে আলজেরিয়া, যুগোস্লভিয়া, মিসর, সৌদি আরব এবং শ্রীলঙ্কার বন্দরগুলোতে শুভেচ্ছা সফর করেন। ১৯৭৯ সালের ৪ নভেম্বর তিনি নৌবাহিনীর স্টাফ প্রধান নিযুক্ত হন এবং ১৯৮০ সালের পহেলা জানুয়ারি রিয়াল এডমিরাল হন।

স্বাধীনতা যুদ্ধের পর বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে বিশ্বমানের আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে তিনি কঠোর পরিশ্রম করেন। নৌবাহিনীর আইন প্রণয়ন করেছেন তিনি। দেশের সমুদ্রসীমা রক্ষা, সমুদ্রে জেগে ওঠা দ্বীপসহ দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপের দখল রক্ষা, জলদস্যু দমন, সুন্দরবনের নিরাপত্তায় নৌবাহিনীকে সচেষ্ট করতে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। তিনি সরকারের সশস্ত্র বাহিনীর বেতন ও পেনশন কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। এছাড়া দেশের প্রশাসনিক পুনর্গঠনে জাতীয় বাস্তবায়ন পরিষদের চেয়ারম্যানও ছিলেন। বাংলাদেশে উপজেলা পদ্ধতির প্রবক্তাও তিনি।

১৯৮২ সালে দেশে সামরিক আইন জারি হলে, এডমিরাল এমএ খান উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত হন। এ সময় তাকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা করা হয়। ১৯৮২ সালের ১০ জুলাই থেকে ১৯৮৪ সালের ১ জুন পর্যন্ত তিনি যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় শাহজালাল সেতু, লামাকারী সেতু, শেওলা সেতুসহ বড় বড় উন্নয়নকাজের সূচনা হয়।

১৯৮২ সালের এপ্রিল মাসে তিনি নৌ, রেল ও সড়ক প্রতিনিধি দলের নেতা হিসেবে চীন সফর করেন এবং চীনের নৌ-ঘাঁটিগুলো পরিদর্শন করেন। জুন মাসে জেদ্দায় অনুষ্ঠিত ওআইসি সম্মেলনে রিয়ার এডমিরাল মাহবুব আলী খান বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেন। নভেম্বরে তিনি রাশিয়া যান এবং প্রেসিডেন্ট ব্রেজনেভের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। ডিসেম্বরে জ্যামাইকায় অনুষ্ঠিত সমুদ্র আইনবিষয়ক সম্মেলনে তিনি বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেন ও কনভেনশন অন অফ-সি কনফারেন্সে স্বাক্ষর দেন। ১৯৮৩ সালের মার্চে ব্যাংককে অনুষ্ঠিত রেলওয়ে মন্ত্রীদের সভায় তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। জুলাই মাসে তিনি কোরিয়া সফরে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। ১৯৮৪ সালের ৩০ মার্চ তিনি গিনির প্রেসিডেন্ট আহমদ সেকুতুরের শেষকৃত্যে বাংলাদেশের প্রতিনিধি ছিলেন।

জিয়াউর রহমানের বড়ভাই রেজাউর রহমান নৌবাহিনীতে এমএ খানের সহকর্মী ছিলেন। সেই সুবাদে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে এমএ খানের সম্পর্ক ছিলো নিবিড়। এমএ খানকে বিশেষ সম্মান করতেন জিয়াউর রহমান। ১৯৭৫ সালে দেশে সিপাহি-জনতার বিপ্লবের পরে, জিয়াউর রহমান সরকারের সময় নৌবাহিনী প্রধানের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি তৎকালীন সরকারের যোগাযোগ উপদেষ্টা ছিলেন। জিয়াউর রহমানের গড়া জাগদলের সদস্য ছিলেন তিনি। তবে সরকারি চাকরির কারণে দায়িত্বশীল কোনো পদ গ্রহন করেননি।

সৎ ও অভিজ্ঞ এমএ খানকে এরশাদ সরকার বাংলাদেশের যোগাযোগ ও কৃষিমন্ত্রী করেন। তিনি রাষ্ট্রপতি জিয়ার সবুজ বিপ্লব ও কৃষি আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে যথেষ্ঠ পরিশ্রম করেন। যোগাযোগমন্ত্রী থাকায় তিনি পূর্বাঞ্চলের রাস্তাঘাট-ব্রিজসহ অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করেন। সে সময় জনমুখে প্রচলিত ছিলো যে, সারাদেশে এমএ খানের জনপ্রিয়তায় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এরশাদ ভীত হতে শুরু করেছেন।

এমএ খানের কোনো রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ছিলো না। তাঁর লক্ষ্য ছিলো স্থায়ী ও জনকল্যাণমূলক কাজ করা। তিনি সফলও হয়েছিলেন। শুধু সিলেটের নয়, সারাদেশের জন্যই তিনি নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কৃষিমন্ত্রী।

এমএ খান গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে পছন্দ করতেন। নিজে রাজনৈতিক দল করার স্বপ্ন দেখতেন না। তিনি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করাসহ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, কৃষিবিপ্লব, অবকাঠামো উন্নয়নে মনোযোগী ছিলেন।

১৯৮৪ সালের ৬ আগস্ট সকালে ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দরে বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান ভূপাতিত হলে এমএ খান ঘটনাস্থল পরিদর্শনে করেন। সেই সময় তার বুকে ব্যথা অনুভব করলে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই মারা যান তিনি। মাত্র ৪৯ বছর বয়সে দেশপ্রেমিক এই মহানায়কের জীবনাবসান ঘটে।

রিয়াল এডমিরাল মাহবুব আলী খান ছিলেন সমাজসেবক। স্ত্রী সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানুর প্রতিষ্ঠিত সমাজকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান ‘সুরভি’র জন্য ছিল তাঁর পূর্ণ সহযোগিতা। সুরভির হাজার হাজার শিশুর মাঝে আজও আমরা তাকে দেখতে পাই। সুরভির মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেশের দারিদ্র পীড়িত ছোট্ট শিশুদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করায় ও সমাজসেবায় বিশেষ অবদান বিবেচনা করে ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ সরকার এমএ খানের স্ত্রী সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানুকে স্বাধীনতা পদক প্রদান করে। সুরভীর ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে বর্তমানে কাজ করছেন বড় মেয়ে শাহীনা জামান। এছাড়াও নারীর স্বাস্থ্যসেবা আরো বাড়াতে সিলেটের নাফিজা বানু চ্যারিটেবল হাসপাতাল ও ম্যাটার্নিটি হাসপাতাল উন্নয়নে এমএ খান বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন।