রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের চট্টগ্রাম সফর

0

১৯৮১ সালের ২৯ মে। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক হিসেবে আমার কাছে দিনটা আলসেমিতে কাটানোর মতো ছিল না। মাত্র দুই দিন আগে আমাকে বঙ্গভবন থেকে জানানো হলো, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে আসছেন। তাঁর দল বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্যদের নিয়ে ২৯ মে তিনি চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে বৈঠক করবেন। ঢাকা থেকে বিএনপির মহাসচিব বদরুদ্দোজা চৌধুরী, উপপ্রধানমন্ত্রী জামাল উদ্দিন আহমেদ, আমেনা রহমান ও বিএনপির কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতা তাঁর সঙ্গে আসছেন। আমাকে জানানো হলো, রাষ্ট্রপতি চট্টগ্রামে এসে রাতে সেখানে থাকবেন। বৈঠক শেষ করে পরদিন ঢাকায় ফিরবেন। আমাকে বিশেষ করে জানিয়ে দেওয়া হলো, এটা রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক সফর। এ সময়ে তিনি কোনো সরকারি কাজে মনোযোগ দেবেন না। আমাকে আরও বলা হলো, রাষ্ট্রপতি তাঁর ইরাক ও ইরান সফর বাতিল করে জরুরি ভিত্তিতে ওই বৈঠক করতে আসছেন। (ওই সময়টাতে চলমান ইরাক-ইরান যুদ্ধ বন্ধে অন্যতম মধ্যস্থতাকারী হিসেবে রাষ্ট্রপতি জিয়া কাজ করছিলেন।)

একজন রাষ্ট্রপতির নির্বিঘ্ন সফর নিশ্চিত করতে যথেষ্ট প্রস্তুতির দরকার হয়। স্বাভাবিকভাবে জেলা পর্যায়ে তাঁর সফরের অন্তত এক মাস আগে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় এ বিষয়ে পরিকল্পনা করে থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থির অবস্থা চলার কারণে তিনি ওই সময় ঘন ঘন চট্টগ্রাম সফর করছিলেন। তা সত্ত্বেও সাধারণত তিনি সেখানে যাওয়ার অন্তত এক মাস আগে আমাকে প্রস্তুতি নিতে বলা হতো। কিন্তু এ সফরের সময় আমাকে মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে নোটিশ করা হয়। রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে আমাকে এর মধ্যে যাবতীয় প্রস্তুতি নিতে বলা হয়। আমি সার্কিট হাউসে তাঁর থাকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করলাম।

জিয়াউর রহমানের নির্দেশমতো চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে অনাড়ম্বরভাবে আমরা তাঁকে অভ্যর্থনা জানালাম। ২৯ মে সকালবেলা চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার সাইফুদ্দিন, মহানগর পুলিশ কমিশনার বদিউজ্জামান, পুলিশের ডিআইজি শাহজাহান ও আমি তাঁকে বিমানবন্দরে রিসিভ করতে গেলাম। রাষ্ট্রপতি ও তাঁর সঙ্গীদের সঙ্গে দেখা করতে আমার সঙ্গে আমার অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তাও সেখানে গিয়েছিলেন। সেখানে স্থানীয় বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারাও ছিলেন। রাষ্ট্রপতি এলে বেসামরিক নেতাদের পাশাপাশি সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর স্থানীয় কমান্ডাররাও তাঁকে স্বাগত জানাতে আসতেন। কিন্তু ওই দিন সকালে রাষ্ট্রপতিকে স্বাগত জানাতে চট্টগ্রামের জিওসি মেজর জেনারেল মঞ্জুর বিমানবন্দরে এলেন না। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার আজিজুর রহমান জেনারেল মঞ্জুরের প্রতিনিধি হিসেবে এলেন। এটাকে অবশ্য আমার খুব বেশি অস্বাভাবিক মনে হয়নি। এর আগেও বেশ কয়েকবার জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে আসার পর তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে মঞ্জুর আসেননি।

বাংলাদেশ বিমানের একটি কমার্শিয়াল ফ্লাইটে রাষ্ট্রপতি সকালে এসে পৌঁছালেন। বিমান থেকে নামার পর এসকর্ট করে আমি তাঁকে ভিআইপি লাউঞ্জে নিয়ে এলাম। সেখানে তিনি স্থানীয় নেতা ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে হাত মেলালেন। একসময় তিনি ব্রিগেডিয়ার আজিজের দিকে চেয়ে তাঁর কাছে মঞ্জুরের খবর জানতে চাইলেন। আজিজ বললেন, টেনিস খেলতে গিয়ে মঞ্জুর আঘাত পেয়েছেন। সে কারণে আসতে পারেননি। জিয়া মৃদু হেসে একটু তির্যক কণ্ঠে বললেন, ‘আমার মনে হচ্ছে ইদানীং সে খেলাধুলা একটু বেশিই করছে। তাঁকে বোলো, টেনিস খেলে খেলে যেন সে নিজেকে একেবারে নষ্ট করে না ফেলে। জিয়া সোজাসোজুি দাঁড়িয়ে রইলো এবং বাইরে গাড়ীর দিকে অগ্রসর হতে থাকলো। আমি তার পিছনে ছিলাম। প্রেসিডেন্টের গাড়ীবহর ভি আই পি লাউঞ্জের বাইরে অবস্থিত ছিল। জিয়া সরাসরি হলদে বাদামী রংয়ের টয়োটা করোলা গাড়ী যা ডেপুটি কমিশনারের অফিসিয়াল গাড়ী যা প্রেসিডেন্ট জিয়া সাধারণত তার চট্টগ্রাম সফরে ব্যবহার করেন। আমি গাড়ীতে তার সঙ্গী হলাম।প্রেসিডেন্টের সফরসঙ্গীর অন্যরা তাকে অনুসরণ করলো তার পিছনের গাড়ীতে যা তাদের দেওয়া হয়েছিল। জিয়া স্বল্পভাষী। তার সার্কিট হাউজে যাত্রাপথে জিয়া কথাবার্তার মুডে ছিলেন। আমরা যখন বন্দর এলাকা পাড় হয়ে যাচ্ছিলাম।

জিয়া আমাকে জিজ্ঞেসবাদ করলেন কেন চট্টগ্রাম পৌরসভা রাস্তা প্রশস্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করে নাই। আমি কিছু বলবার পূর্বে রাষ্ট্রপতি তার সমাধানের কথা বলতে থাকলেন তোমার উচিত রাস্তা থেকে আইল্যান্ড সরিয়ে ফেলা উচিত, জনগণের উচিত রাস্তার লেইন অনুসরণ করা ব্যারিকেডের চেয়ে এবং শৃঙ্খলাপরায়ন হওয়া উচিত তিনি বললেন। আমাকে প্রথমে বলা হয়েছে ঢাকার রাস্তাঘাটের ডিভাইডার সব সরিয়ে ফেলা হয়েছে যাতে করে রাস্তাঘাট প্রশস্ত করা যায় ট্রাফিকের জন্য। যখন আমি ভদ্রোচিতভাবে মন্তব্য করলাম রাস্তার আইল্যান্ড সরিয়ে ফেললে ট্রাফিকে বিশৃঙ্খলা দেখা দিবে। জিয়া জবাবে বললো স্বাধীনতা এবং শৃঙ্খলা পাশাপাশি জড়িত। বাংলাদেশীদের শৃঙ্খলা শিখা উচিত এবং কিভাবে রাস্তাঘাটে চলাচল করা উচিত। এই দেশের মানুষ খুবই তাড়াতাড়ি স্বাধীনতা পেয়ে গেছে নয় মাসের কম সময়ের মধ্যে। জিয়া বলতে থাকলো বাংলাদেশীরা যদি ভিয়েতনামে থাকতো তাহলে তারা বুঝতে পাড়তো স্বাধীনতার মূল্য কত। আমি চুপ রয়ে গেলাম। জিয়াকে কিছুটা গম্ভীর দেখা গেল আমরা যখন সার্কিট হাউজে পৌছালাম। গাড়ী থেকে বের হওয়ার পূর্বে তিনি আমাকে জিজ্ঞেসা করলেন জুম্মা নামাজ পড়বার জন্য ঐদিন আমি কোথায় যাচ্ছি, আমি জবাবে বললাম চন্দনপুড়া মসজিদ। সার্কিট হাউজে আমরা কমিশনার, পুলিশের ডি আই জি এবং প্রেসিডেন্টের সফরসঙ্গীর অন্যান্যদের সাথে মিলিত হলাম। রাষ্ট্রপতি তৎক্ষনাৎ সিঁড়িপথ দিয়ে উপড়ে উঠলেন তার কাপড় জামা পরিবর্তনের জন্য এবং কিছুক্ষণ পর আসলেন তার পার্টির লোকদের সাথে যারা বাইরে করিডরের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন মহাসচিব বদ্দরুদ্দৌজা চৌধুরী, উপ প্রধানমন্ত্রী জামালউদ্দিন আহমেদ, ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার সুলতান আহমেদ চৌধুরী এবং চট্টগ্রাম বিএনপির সভাপতি ড ইউসুফ। এই বৈঠকের এজেন্ডা ছিল চট্টগ্রামে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কৌন্দল নিরসনের। এই কৌন্দল সমগ্র চট্টগ্রামে দলের ঐক্য বিষয়ে হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিভাগীয় কমিশনার এবং আমি সার্কিট হাউজ ত্যাগ করেছিলাম যখন বৈঠক শুরু হয়। আমরা যখন ফিরে আসলাম সার্কিট হাউজে প্রেসিডেন্টকে নিয়ে যাওয়ার জন্য চন্দনপাড়া মসজিদ জুম্মা নামাজের জন্য। যখন আমরা ফিরে আসলাম আমরা দেখলাম গম্ভীর প্রেসিডেন্ট জিয়া সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে। তিনি সরাসরি গাড়ীতে উঠে পড়লেন বিনা বাক্যে মসজিদে যাওয়ার জন্য। এই সময় বিভাগীয় কমিশনার সফিউদ্দিন গাড়ীতে তার সঙ্গী ছিলেন। আমি তাকে অনুসরণ করছিলাম পরবর্তী জামালউদ্দিনের গাড়ীতে। জামালউদ্দিন এবং আমি কিছু মতবিনিময় করলাম তার নির্বাচনী এলাকা ফটিকছড়ির রাস্তাঘাটের উন্নয়নের বিষয়ে। তিনি কিন্তু নিরবই ছিলেন। তিনি প্রেসিডেন্টের সাথে চলমান মিটিং সম্পর্কে কিছুই বললেন না। মসজিদ থেকে আসবার পর সাইফুদ্দিন আমাকে জানালো যে প্রেসিডেন্ট বিকালে পুলিশের ডি আইজি, পুলিশ কমিশনারের সাথে ছোট একটি বৈঠক করতে চান চট্টগ্রামের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে। আমি কিছুটা অখুশি ছিলাম কারণ রাষ্ট্রপতি তার বিকালের সম্পূর্ণ সময় রাজনৈতিক বৈঠকের জন্য রেখেছিলেন এবং আমি বিকালে আমার বন্ধুর বাসায় এক দাওয়াতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম।

আমরা সবাই সার্কিট হাউজে সমবেত হয়েছিলাম সন্ধ্যা ৭ টায় তখন আমরা দেখলাম রাজনৈতিক বৈঠক তখনো চলমান যার কোন শেষ হবার নাম নাই। সার্কিট হাউজের কর্মকর্তারা জানালো যে, রাষ্ট্রপতি দুপুরবেলার খাবারের পর বিনা বিরতিতে বৈঠক করছিলেন যা তিনি খেয়েছিলেন জুম্মা নামাজের পর। বৈঠকে উপস্থিত ২০ – ৩০ লোকদের জন্য চা পরিবেশন করা হচ্ছিল। রাত ৮ টায় রাষ্ট্রপতি রাতের খাবারের জন্য বললেন যা কিনা আমাকে ব্যবস্থা করতে হবে সেটা তৈরি করা হয়েছিল চট্টগ্রাম ক্লাবের রান্নাঘরে। প্রেসিডেন্ট জিয়া ক্লাবের রান্না করা খাবার পছন্দ করতেন। রাতের খাবার সাধারণই ছিল তন্দুরি রুটি, গ্রীল চিকেন, সবজি এবং ডাল। আমি আশা করছিলাম রাষ্ট্রপতি আমাদের ডাকবেন নির্ধারিত বৈঠকের জন্য রাতের খাবারের পর এবং আমরা বৈঠকের পর রাত ১০ টার পর বাসায় চলে যেতে পাড়বো। দুর্ভাগ্যবশত রাষ্ট্রপতি তার রাজনৈতিক বৈঠক আবারো শুরু করলেন রাতের খাবারের পর এবং যারা নিচে অপেক্ষারত আছেন তাদের কথা ভুলে গেলেন। রাত ১০ টায় চতুর সাইফুদ্দিন উপরে গেলেন খোজ করবার জন্য যে কোন বৈঠক হবে নাকি আমাদের সাথে। তিনি খুবই তাড়াতাড়ি ফিরে আসলেন এবং জানালেন যে রাষ্ট্রপতি আমাদের সকলকে বাড়ি যাবার জন্য বলেছেন। আমি সার্কিট হাউজে থেকে যাবার পূর্বে সেখানে কর্মরতদের নির্দেশনা দিয়ে গেলাম কাল সকালে রাষ্ট্রপতির চলে যাওয়ার ব্যবস্থাদি ঠিক ঠাক করে রাখবার জন্য। আমি আমার বন্ধুর বাসায় গেলাম রাতের খাবারের জন্য এবং আমার স্ত্রী সহিত মধ্যরাতে বাসায় ফিরে আসলাম। সেই রাতের বৈঠকের ফলাফল আমরা কখনোই
জানতে পাড়লাম না রাষ্ট্রপতির সাথে তার দলীয় নেতাদের।

তথ্যসূত্র : Assassination of Ziaur Rahman and the Aftermath – Ziauddin M Choudhury, Page – 15 – 19, University Press Limited.

রাত তখন ১১টা ছুঁই ছুঁই। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সামনে চট্টগ্রামের নেতাদের মধ্যে আমিই একমাত্র ব্যক্তি তার সামনে বসা। আমি চলে যাব। স্যারও ডিনারে যাবেন। এ সময় আমাকে শুধু বললেন, মি. ‘নো ম্যান’ ডোন্ট ওরি। এভরিথিং উইল অল রাইট উইদিন থ্রি মান্থ। আমাকে ঠাট্টা করেই নো ম্যান বলেই ডাকতেন স্যার। আবার ‘ইয়েস ম্যান,’ বলেও হাসতেন। এটা এজন্যই তিনি বললেন, জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট তখনো বিএনপির সঙ্গে যুক্ত হয়নি। তার উদ্দেশ্য ছিল জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের সবাইকে বিএনপির সঙ্গে একাকার করা। আমি তখন বিএনপিতে আসলেও কাজী জাফরসহ অনেকেই আসেননি। এটা নিয়েই বেশ কিছুক্ষণ কথা হলো। প্রেসিডেন্ট আশ্বস্ত করে বললেন, এটা নিয়ে ভাববেন না। আগামী তিন মাসের মধ্যেই সবাইকে নিয়ে বিএনপি দেশ গঠন করবে। শুধু দলের নেতা-কর্মীই নয়, অন্য রাজনৈতিক দল, বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে দেশ গঠনে কাজে লাগাতে হবে। এই বলে তিনি সার্কিট হাউসের দোতলায় খাবার টেবিলে যান। রাষ্ট্রপতির পিএস কর্নেল মাহফুজকে তখন খুবই অস্থির দেখাচ্ছিল। আমাকে মাহফুজ বারবার বলছিলেন, স্যার এখন ডিনারে যাবেন। আমিও তখন সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছি। এ সময় সেখানে থাকা মেজর হাফিজকে চিন্তিত অবস্থায় দেখতে পাই। সেখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি।

কিন্তু কিছুই বুঝতে পারিনি সেদিন। এ সময় খাবার টেবিল থেকেই আওয়াজ শুনতে পাই, প্রেসিডেন্ট যেন কাকে বলছিলেন, আরেক টুকরো মাছ হবে? তখন তাকে বলা হলো, নো স্যার সব খাবার শেষ হয়ে গেছে। প্রেসিডেন্টের এই অপূর্ণতাটা আজও আমার মনে পড়ে। আমি যখন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করছিলাম তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, মহিবুল হাসান, ড. আমিনাসহ ঢাকা থেকে আরও দু-একজন হবে। সন্ধ্যা থেকেই টানা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকসহ দলের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়া। ঢাকা থেকে আসা বিএনপির শীর্ষ নেতারাও এতে অংশ নেন। সবার আগে আসেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ। চট্টগ্রামের বিশিষ্টজনেরাও এসেছিলেন। তাদের ডাকার উদ্দেশ্য ছিল, সবাইকে নিয়ে দেশ গঠন করতে চান জিয়া। কেউ দল করুক আর না করুক, সবারই সহযোগিতা চান তিনি। আমার মনে আছে, রাষ্ট্রপতি জিয়া বলেছিলেন, ’৭১-এ আমরা যেভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছি, ঠিক সেইভাবেই দেশটাকে গড়তে চাই। শুধু বিএনপিই নয়, সবাইকে পাশে চাই। ওই বৈঠকে তিনি সক্রিয় কোনো নেতা-কর্মীদের ডাকেননি। রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত ওই বৈঠক চলে।

এরপর প্রেসিডেন্ট জিয়া চট্টগ্রামের নেতাদের একজন একজন করে ডাকেন। তখন চট্টগ্রাম বিএনপিতে কোন্দল ছিল। উপপ্রধানমন্ত্রী জামালউদ্দিন আহমেদ ও ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার সুলতান আহমেদ চৌধুরীর মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল। আমরা জামালউদ্দিন সমর্থক ছিলাম। প্রেসিডেন্ট জিয়া যেদিন চট্টগ্রামে যান সেদিন বিএনপির কার্যালয় ছিল আমাদের নিয়ন্ত্রণে। আমি তখন চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। সবাইকে একে একে ডেকে কথা বলেন রাষ্ট্রপতি জিয়া। সবশেষে ছিলাম আমি। আমি যেতেই মি. নো ম্যান সম্বোধন করে হাসতে হাসতে বলেন, কেমন আছেন? আপনার ওইসব লোকজন তো এখনো বিএনপিতে আসল না। ওইসব লোকজন বলতে প্রেসিডেন্ট বুঝিয়েছেন, কাজী জাফর আহমদ, হায়দার আকবর খান রনো, রাশেদ খান মেনন, আবদুল মান্নান ভূঁইয়া, মোস্তফা জামাল হায়দারসহ আরও কয়েকজনের কথা।

আমি বললাম, জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের সঙ্গে ফাইনালই না বসে বিএনপি নামে দল ঘোষণা করা ঠিক হয়নি। এটা নেতারা মনে করেন। তবে জিয়া বললেন, তাদের আমার খুব পছন্দ। তাদের সঙ্গে আমার অনেক কিছুরই মিল আছে। আমি ব্যস্ত। দেশের বাইরে যাচ্ছি। তবে আগামী তিন মাসের মধ্যেই সবাইকে নিয়েই দল করব। ’৭১-এর মতো সবাইকে আমি পাশে চাই। কথা বলতে বলতে প্রেসিডেন্ট জিয়া একপর্যায়ে বললেন, আপনারা তো চট্টগ্রামের জোতদার-জমিদার মানুষ। আমার তো তিন কাঠা কিংবা তিন ছটাক জমিও নেই। সবাইকে নিয়ে দেশ চালাতে চাই। আপনারা ভাবেন, কীভাবে দেশ চালাবেন? যাহোক কথাবার্তা বলে আমি আমার বাসায় চলে আসি।

ভাষ্য : আবদুল্লাহ আল নোমান, ভাইস চেয়ারম্যান – বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল