রাজধানীতে নানা ধরনের অপরাধকর্মে যুক্ত অবৈধ বিদেশি নাগরিক

0

জিসাফো ডেস্কঃ রাজধানীতে অবৈধভাবে বসবাসরত ৯১০ জন বিদেশি নাগরিককে গ্রেফতারে অভিযান জোরদার করা হচ্ছে।  অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগে চলতি বছরের মাঝামাঝি অবৈধ এসব বিদেশির তালিকা করে অভিযান শুরু হয়। সেই সময় ২০ জনকে গ্রেফতার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তারা প্রতারণা, ব্যাংকের টাকা চুরিসহ নানা ধরনের অপরাধকর্মে সরাসরি যুক্ত ছিল।

তবে সম্প্রতি অভিযান কিছুটা ঢিলেঢালা হওয়ার সুযোগে  তারা আবারও প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। জড়িয়ে পড়ছে নানা ধরনের অপরাধকর্মে। অভিজাত এলাকায় তাদের তৎপরতা বেশি বলে জানা গেছে।

সম্প্রতি প্রতারণার অভিযোগে ৪ আফ্রিকান র‌্যাবের হাতে গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে অবৈধ বিদেশিদের গ্রেফতারে অভিযান শুরু করার চিন্তাভাবনা চলছে বলেও পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে।

পুলিশের বিশেষ শাখার ডিআইজি পদ মর্যাদার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে পরিবর্তন ডটকমকে জানান, শিক্ষা, ভ্রমণ, কর্মক্ষেত্র, খেলোয়াড়সহ নানা ভিসায় বিদেশিরা এদেশে আসেন। এরপর ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও তারা ফেরত না গিয়ে লুকিয়ে পড়েন। এছাড়া কর্মক্ষেত্রে আসা বিদেশিদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়। বিষয়টি তদন্ত করতে পুলিশসহ আরো দুটি গোয়েন্দা সংস্থাকে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে। এসব প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর সেই সব বিদেশির ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এর আগে পর্যন্ত ওই বিদেশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শেল্টারে থাকেন। এসব কারণে অনেক সময় তাদের গ্রেফতারে অভিযান চালানো সম্ভব হয় না। তবে তাদের ওপর পুলিশের নজরদারি অব্যাহত থাকে। কারো বিরুদ্ধে অপরাধে যুক্ত থাকার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়ার পরপরই তাদের আইনের আওতায় আনার জন্য পুলিশ সদর দপ্তরকে অনুরোধ করা হয়।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ডিসি শেখ নাজমুল আলম পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, অবৈধ বিদেশিদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান চলছে। পাশাপাশি বৈধভাবে বসবাসরত বিদেশিরাও যেন অপরাধে জড়াতে না পারেন এজন্য কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন অপরাধে যুক্ত থাকা অনেক বিদেশি নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়েছে।

জানা গেছে, বর্তমান দেশে এক লাখ ১১ হাজার ৫৭৫ জন বৈধ বিদেশি নাগরিক রয়েছে। এছাড়া ৯১০ জন বিদেশি নাগরিকের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ায় তারা অবৈধ হয়ে গেছে। তবে পুলিশের বিশেষ শাখায় ওইসব অবৈধ নাগরিককে তালিকা রয়েছে। তাদের ওপর পুলিশের নজরদারিও রয়েছে।

বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে ভারতীয়দের সংখ্যা বেশি। বর্তমানে ২০ হাজার ৬৫৬ জন ভারতীয় নাগরিক অবস্থান করছেন। ভারতীয় নাগরিকরা এদেশে বিনিয়োগকারী, বিভিন্ন সংস্থা/কারখানা ও উন্নয়ন প্রকল্প এবং বিদ্যুৎ সেক্টরে কর্মরত। এছাড়াও কিছু ভারতীয় নাগরিক চিকিৎসা সেবায় নিয়াজিত এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত। তবে আফ্রিকান নাগরিকরা বেশির ভাগ কর্মসংস্থান ও শিক্ষা ভিসায় দেশে এলেও তারাই বেশি অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে। এ কারণে তাদের ওপর পুলিশের নজরদারি বেশি থাকে।

জানা গেছে, সম্প্রতি মোবাইলে লটারি জেতার প্রলোভন দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ আসে র‌্যাবের কাছে। বিষয়টি তদন্তে নেমে এর সত্যতা পায় র‌্যাব। এরপর গত ১৩ নভেম্বর উত্তরার ১৪ সেক্টরের ১৪নং রোডের ১৯নং বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ইব্রাহিম নামের নাইজেরিয়ান নাগরিককে গ্রেফতার করে। এ সময় তার কাছ থেকে দুটি মোবাইল, একটি ল্যাপটপ ও কিছু টাকা উদ্ধার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যমতে উত্তরার ৬নং সেক্টরের লন্ডন গেস্ট হাউজে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে প্রিন্স জন, ডেনিশ ওকাওডুরি ও স্যামুয়েল আজুবুকিকে গ্রেফতার করা হয়। এসময় তাদের কাছ থেকে ১২টি মোবাইল ফোন, ২২টি বিদেশি সিমকার্ড, ৪টি ক্রেডিট কার্ড, একটি ডেভিড কার্ড, দুটি ল্যাপটপ, ২৪টি বিদেশি সিমকার্ড, ১৫ হাজার ৪৯০ নাইজেরিয়ান নায়রা, বাংলাদেশি ৭০ হাজার ৮৫০ টাকা ও ১২০ ইউএস ডলার উদ্ধার করা হয়।

ঘটনার পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা লটারি জেতার নাম করে এ পর্যন্ত ১১ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কথা স্বীকার করে। তারা গত ১২ অক্টোবর খেলোয়াড় ও গার্মেন্ট ব্যবসায়ী বলে দেশে আসে। এরপর তারা লন্ডন গেস্ট হাউজে অবস্থান করে বিভিন্ন অপারেটরের মোবাইল ব্যবহারকারীদের এসএমএস-এর মাধ্যমে লটারির টাকা জেতার কথা জানায়। এরপর তাদের ফাঁদে পা দেওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিল। ভুক্তভোগীদের ওই লটারির টাকা পেতে বিকাশে টাকা পাঠানোর অনুরোধ করা হতো। এভাবেই লাখ লাখ টাকা প্রতারণা করে হাতিয়ে নেয় তারা। শুধু এই চার ব্যক্তিই নয়; এ ধরনের আরো একাধিক চক্র দেশে সক্রিয়। তারা বিভিন্ন ফ্ল্যাট ভাড়া করে অথবা গেস্ট হাউজে অবস্থান করে অপরাধকর্ম চালাচ্ছে। পুলিশি অভিযান টের পাওয়ামাত্রই তারা দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন করে অন্যত্র চলে যায়। বিদেশি হওয়ার কারণে সহজেই তারা বসবাসের স্থান পেয়ে যায়। আবার বিদেশিদের হেনস্থা করার ভয়ে অনেক পুলিশ কর্মকর্তাও তাদের ভিসা চেক করার সাহস দেখান না। মূলত এই সুযোগটাই কাজে লাগাচ্ছে অবৈধ বিদেশিরা।

সূত্র জানায়, দেশে অবস্থান করা ১২টি রাষ্ট্রের অন্তত দুই হাজারের বেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।

এর মধ্যে নাইজেরিয়ান, ঘানা, কঙ্গো, লিবিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, আলজেরিয়া, সুদান, তানজানিয়া, উগান্ডা, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইনের নাগরিকদের সংখ্যা বেশি। তাদের তাদের ভিসার মেয়াদও অনেক আগেই শেষ হয়েছে বলে পুলিশের বিশেষ শাখার কাছে তথ্য রয়েছে। আবার অনেকে সীমান্ত পাড়ি দিয়েও দেশে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু ওই বিদেশিরা কোথায় যায়; কী করে সে বিষয়ে পুলিশের কাছে স্পষ্ট তথ্য নেই।

সূত্র জানায়, গত বছরের ৭ ডিসেম্বর উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা করে গার্মেন্ট ব্যবসায়ী আব্দুল লতিফ। ঘানার দুই নাগরিক সুজেতা ও রুহেলার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ইউরোপে গার্মেন্ট মালামাল রপ্তানির কথা বলে ওই দুই ব্যক্তি তার কাছ থেকে ৫ হাজার ডলার নিয়ে লাপাত্তা হয়ে গেছে। বিদেশে অবস্থান করায় এ ঘটনায় ওই দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেনি পুলিশ।