রত্নগর্ভা পিতামাতার ঔরসে জন্মানো এক মহান নেতা ড. এম ওসমান ফারুক

0

জিসাফো ডেস্কঃ রত্নগর্ভা পিতামাতার ঔরসেই জন্মেছিলেন ড. এম ওসমান ফারুক। পিতা ড. এম ওসমান গণি ছিলেন যেন রূপকথার নায়ক। তদানীন্তন ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জের অজপাড়া গাঁয়ের এক স্বল্পবিত্ত কৃষক পরিবারে জন্মেও উঠেছিলেন খ্যাতির চূড়ায়। গড়েছিলেন কীর্তিময় জীবন। স্বীকৃতি পেয়েছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানীর। তার কর্মের দ্যুতি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন দেশব্যাপী। কৃষক পিতার সামর্থ্য না থাকায় ওসমান গণির প্রাথমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাজীবন কাটে কিশোরগঞ্জের বিত্তশালীদের বাড়িতে জায়গীর থেকে। অজপাড়া গাঁয়ের এ ছেলেটি ১৯২৯ সালে পাঁচ বিষয়ে লেটারসহ স্টার মার্ক নিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর কৃতিত্বের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষি রসায়নে বিএসসি ও এমএসসি পাস করেন। স্বীকৃতিস্বরূপ লন্ডন ইউনিভার্সিটির থেকে লিটন স্কলারশিপ পেয়ে চলে যান বিলাতে। ওই ইউনিভার্সিটি থেকে মৃত্তিকা বিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে ফিরে আসেন দেশে। ১৯৩৯ সালে বেঙ্গল গভর্নমেন্টের ডেপুটি ডিরেক্টর হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরের বছর যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান অনুষদে। এগ্রিকালচারাল কেমিস্ট্রি বিভাগে চার বছর শিক্ষকতা করেন। সেখান থেকে ফের যোগ দেন বেঙ্গল গভর্নমেন্টে। এগ্রিকালচারাল কেমিস্ট হিসেবে আরও চার বছর চাকরি করেন। এরপর দ্বিতীয়বারের মতো ফিরে আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায়। ওই সময় তার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় উপমহাদেশে সর্বপ্রথম মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ। প্রফেসর হিসেবে তিনি নিযুক্ত হন প্রথম বিভাগীয় প্রধান। দায়িত্ব পান সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের প্রভোস্টের। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন চলাকালে আন্দোলনকারী ছাত্রদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করেন তিনি। ওই সময় মুসলিম হলে পুলিশ ও সেনাবাহিনী প্রবেশ করতে চাইলে তিনি নিজে গেটে দাঁড়িয়ে তাদের বাধা দেন। ১৯৫৬ সালে তৎকালীন সরকার তাকে এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেন। এরপর পর্যায়ক্রমে ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল কমিশনার, নর্থ রিজিওনাল ল্যাবরেটরিজ, পাকিস্তান কাউন্সিল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তাকে পূর্ব পাকিস্তান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। ওই সময় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। একইসঙ্গে তিনি বিশ্ববিদ্যালটির প্রতিষ্ঠাতা ভিসির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে একসময়ের ছাত্র ওসমান গণিকেই প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়টির ভিসি নিয়োগ দেয়া হয়। ভিসি থাকাকালীন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে অবকাঠামো এবং শিক্ষা ব্যবস্থাপনার ব্যাপক উন্নয়ন করেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইমেরিটাস অধ্যাপকের নতুন পদ সৃষ্টি করেন। উপমহাদেশের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহকে প্রথম ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেন। ১৯৭০ সালে ড. ওসমান গণিকে তানজানিয়ার রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। ’৭১ সালে রাষ্ট্রদূতের পদ ত্যাগ করে লন্ডনে অবসর জীবনযাপন করেন। ’৭৪ সালে ফিরে আসেন দেশে। ’৭৯ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সরকারের আমলে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে এমপি হন। ১৯৮৯ সালের ২১শে জুলাই ৭৭ বছর বয়সে রাজধানীতে জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে কর্মবীর এ মানুষটির। 

এদিকে পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করেই এগিয়ে যাচ্ছেন ছেলে ড. এম ওসমান ফারুক। ১৯৩৯ সালের ২১শে জুলাই কিশোরগঞ্জের নানাবাড়ি হোসেনপুরের আড়াইবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন বিশিষ্ট এ অর্থনীতিবিদ। দুমাস বয়সেই মায়ের কোলে চড়ে যান পিতার কর্মস্থল কলকাতায়। পিতার চাকরির বদলির সুবাদে ছয়মাস পর ফিরে আসেন ঢাকায়। উঠেন তেজগাঁওয়ের বাংলোবাড়িতে। শৈশব কাটে ওই বাড়িতেই। এরপর প্রাথমিক শিক্ষা জীবন শুরু করেন তেজগাঁও পলিটেকনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ক্লাস ফাইভে ভর্তি হন পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সেন্ট গ্রেগরি স্কুলে। তখন সহপাঠী হিসেবে পান বিএনপি নেতা আ স ম হান্নান শাহ, তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী, সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মোস্তাফিজুর রহমান, মেজর জেনারেল (অব.) নুরুল ইসলামকে। খেলাধুলার প্রতিও প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল। ফুটবলের চেয়ে ক্রিকেট খেলতে বেশি পছন্দ করতেন। তবে ক্লাসের পজিশন এক, দুই, তিনের মধ্যেই থাকতো সবসময়। ’৫৩ সালে পিতা আমেরিকা থেকে গাড়ি কিনে আনেন। কিন্তু পিতার কড়া নিষেধ ছিল- ঝড়-বাদলা ছাড়া গাড়ি হাঁকিয়ে স্কুল-কলেজে না যেতে। তবে ২১৭ টাকা দিয়ে তাকে বিখ্যাত র‌্যালি কোম্পানির গ্রিন মডেলের বাইসাইকেল কিনে দেন। ওই সাইকেল চালিয়ে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতেন। ’৫৬ সালে ওই স্কুল থেকেই প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর পিতা পাঠিয়েছিলেন নটর ডেম কলেজে ভর্তি হতে। কিন্তু তিনি সেখানে না গিয়ে ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। কলেজের প্রথম বর্ষে পড়াকালেই গিটার শেখার ঝোঁক মাথায় আসে। ভয়ে পিতাকে বলতে না পেরে বলেন মাকে। মা-ই তখনকার ১০০ টাকা দিয়ে পুরোনো হাওহাই গিটার কিনে দেন। গিটার শিখতে ভর্তি হন ওয়াইসঘাটে বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে।

ইন্টারমিডিয়েটে পড়াকালীন সাংস্কৃতিক একটি অনুষ্ঠানে পরিচয় হয় ছোটবোনের রূপসী বান্ধবীর সঙ্গে। প্রথম দেখাতেই তাকে ভালো লেগে যায়। এরপর আর ডান-বাম তাকাননি তিনি। পরে ’৬৫ সালে ভালোবাসার মানুষ রানা ফারুকের সঙ্গেই বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন। এদিকে ’৫৮ সালে ঢাকা কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে আইএসসি পাস করেন। ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। ওই সময় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। যোগ দেন ছাত্রশক্তিতে। ’৬১ সালে ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে অর্থনীতিতে অনার্স এবং ৬২ সালে এম এ পাস করেন। আইয়ুর খানের মার্শাল ল বিরোধী আন্দোলনের কারণে ওই বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠান হয়নি। পরের বছরের জুলাইয়ে ইউএসআইডির বৃত্তি নিয়ে এমএস ডিগ্রি নিতে যান যুক্তরাষ্ট্রে। ভর্তি হন টেক্সাস এএনএম বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে এমএস ডিগ্রি নিয়ে ফিরে আসেন দেশে। যোগ দেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। শিক্ষকতার মহান পেশা দিয়েই শুরু করেন কর্মজীবন। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাকালে যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন। ’৭০ সালে পিএইচডি সম্পন্ন করে দেশে ফিরে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে ফের যোগ দেন ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ’৭৩ সালের এপ্রিলে অপ্রত্যাশিতভাবে বিশ্বব্যাংক তাকে স্বল্পকালীন পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেয়। প্রথমে ভারতে একটি প্রকল্পে পরে নাইজেরিয়ায় একটি প্রকল্পে দায়িত্ব পালন করেন। ’৭৪ সালের জানুয়ারিতে কৃষি অর্থনীতিবিদ হিসেবে তাকে স্থায়ী নিয়োগ দেয় বিশ্বব্যাংক। স্বাধীনতার পর প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে বিশ্বব্যাংকে চাকরির সুযোগ পান তিনি। পরে এশিয়া, আফ্রিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১২টি দেশে মিশন লিডার হিসেবে প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেন। পাঁচ বছর ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় বিশ্বব্যাংক অফিসে প্রবীণ কৃষি অর্থনীতিবিদ ও মিশন লিডারের দায়িত্ব পালন করেন। বিশ্বব্যাংকের ২৬ বছরের কর্মজীবনে ২১ বছরই ওয়াশিংটন প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। 

’৯৬ সালে এক বন্ধুর মাধ্যমে প্রথম পরিচয় হয় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে। ওই বছরের শেষের দিকে একদিন ওই বন্ধু তাকে নিয়ে যান ক্যান্টনমেন্টের মইনুল রোডের বিএনপি চেয়ারপারসনের বাসভবনে। প্রথম সাক্ষাতে শুধু হাই-হ্যালো ও দেশের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। পরে আমেরিকা থেকে যখনই ঢাকায় আসতেন তখনই বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। ২০০০ সালে খালেদা জিয়াই তাকে রাজনীতিতে যোগ দিতে উৎসাহিত করেন। ওই বছরের ২২শে অক্টোবর বিশ্বব্যাংকের লোভনীয় চাকরি ছেড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেন বিএনপিতে। এরপর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ-তাড়াইল আসনে তাকে মনোনয়ন দেন বিএনপি চেয়ারপারসন। স্বাধীনতার পর ওই আসনে তিনিই প্রথম বিএনপির টিকিটে এমপি নির্বাচিত হন। এরপর বিএনপি চেয়ারপারসন তাকে জোট সরকারের মন্ত্রিসভায় শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব দেন। ২০০১-০৬ সাল পর্যন্ত সফলভাবে ওই দায়িত্ব পালন করেন। ২০১০ সালের কাউন্সিলে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টার দায়িত্ব পান তিনি। একইসঙ্গে বিএনপির কূটনৈতিক উইংয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। পাঁচ বোন ও চার ভাইয়ের মধ্যে ওসমান ফারুক দ্বিতীয়। তবে ভাইদের মধ্যে তিনিই সবার বড়। তার দ্বিতীয় ভাই ওসমান খালেদ দেশেই থাকেন। একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানিতে স্থপতি হিসেবে কাজ করছেন। তৃতীয় ভাই ওসমান সিদ্দিক যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন তাকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশ ফিজির রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দেন। তিনিই একমাত্র বাংলাদেশি যিনি যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি হিলারি ক্লিনটনের মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার নীতিনির্ধারক কমিটির সদস্য। ছোটভাই ওসমান ইউসুফ যুক্তরাষ্ট্রে এনার্জি সেক্টর সংক্রান্ত একটি আন্তর্জাতিক পরামর্শক ও উদ্যোক্তা সংস্থার অন্যতম প্রধান। ব্যক্তিগত জীবনে ড. ওসমান ফারুক ও রানা দম্পতি তিন ছেলের জনক। বড় ছেলে তারেক ওসমান ফারুক সুমন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসা প্রশাসনে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে সেখানেই বেসরকারি একটি আইটি প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন। দ্বিতীয় ছেলে আহমেদ ওসমান ফারুক সুপলও অর্থনীতিতে ডিগ্রি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রেই একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অন্যতম মালিকানায় আছেন। তৃতীয় ছেলে জামীল ওসমান ফারুক সায়ানও যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসা প্রশাসনে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে সেখানেই আইটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। দুই নাতি এডাম ও গাব্রিয়েল এবং এক নাতনি এ্যারিনের গর্বিত দাদা-দাদি ওসমান ফারুক ও রানা দম্পতি।