মে দিবস : শোষণ ও নির্যাতনই কি এর তাৎপর্য ?????

0

আজ ১লা মে।মহান মে দিবস।শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার,দাবি আদায়ের মহান ও ত্যাগী এই দিন।বাংলাদেশ সহ বিশ্বের সকল দেশে দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালিত হচ্ছে।

একটু পেছনে ফিরে তাকানো যাক।

ঊনিশ শতকের গোড়ার দিককার কথা। শ্রমিকরা তখনো শোষিত, সপ্তাহে ৬ দিনের প্রতিদিনই গড়ে প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘন্টার অমানবিক পরিশ্রম করতো কিন্তু তার বিপরীতে মিলত নগন্য মজুরী। অনিরাপদ পরিবেশে রোগ-ব্যধি, আঘাত, ম্রত্যুই ছিল তাদের নির্মম সাথী। তাদের পক্ষ হয়ে বলার মত কেউ ছিলনা তখন। ১৮৬০ সালে শ্রমিকরাই মজুরি না কেটে দৈনিক ৮ ঘন্টা শ্রম নির্ধারনের প্রথম দাবি জানায়। কিন্তু কোন শ্রমিক সংগঠন ছিলনা বলে এই দাবী জোরালো করা সম্ভব হয়নি। এই সময় সমাজতন্ত্র শ্রমজীবি মানুষের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করতে থাকে। শ্রমিকরা বুঝতে পারে বনিক ও মালিক শ্রেণীর এই রক্ত শোষণ নীতির বিরুদ্ধে তাদের সংগঠিত হত হবে। ১৮৮০-৮১ সালের দিকে শ্রমিকরা প্রতিষ্ঠা করে Federation of Organized Trades and Labor Unions of the United States and Canada [১৮৮৬ সালে নাম পরিবর্তন করে করা হয় American Federation of Labor]। এই সংঘের মাধ্যমে শ্রমিকরা সংগঠিত হয়ে শক্তি অর্জন করতে থাকে। ১৮৮৪ সালে সংঘটি ‘৮ ঘন্টা দৈনিক মজুরি’ নির্ধারনের প্রস্তাব পাশ করে এবং মালিকও বনিক শ্রেণীকে এই প্রস্তাব কার্যকরের জন্য ১৮৮৬ সালের ১লা মে পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়। তারা এই সময়ের মধ্যে সংঘের আওতাধীন সকল শ্রমিক সংগঠনকে এই প্রস্তাব বাস্তবায়নে সংগঠিত হওয়ার পুনঃ পুনঃ আহবান জানায়। প্রথম দিকে অনেকেই একে অবাস্তব অভিলাষ, অতি সংস্কারের উচ্চাকাংখা বলে আশংকা প্রকাশ করে। কিন্তু বনিক-মালিক শ্রেণীর কোন ধরনের সাড়া না পেয়ে শ্রমিকরা ধীরে ধীরে প্রতিবাদি ও প্রস্তাব বাস্তবায়নে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হতে থাকে। এ সময় এলার্ম নামক একটি পত্রিকার কলাম ‘একজন শ্রমিক ৮ ঘন্টা কাজ করুক কিংবা ১০ ঘন্টাই করুক, সে দাসই’ যেন জ্বলন্ত আগুনে ঘি ঢালে। শ্রমিক সংগঠনদের সাথে বিভিন্ন সমাজতন্ত্রপন্থী দলও একাত্মতা জানায়। ১লা মে কে ঘিরে প্রতিবাদ, প্রতিরোধের আয়োজন চলতে থাকে। আর শিকাগো হয়ে উঠে এই প্রতিবাদ প্রতিরোধের কেন্দ্রস্থল।

১লা মে এগিয়ে আসতে লাগল। মালিক-বনিক শ্রেণী অবধারিতভাবে ঐ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল। ১৮৭৭ সালে শ্রমিকরা একবার রেলপথ অবরোধ করলে পুলিশ ও ইয়ুনাইটেড স্টেটস আর্মি তাদের উপর বর্বর আক্রমন চালায়। ঠিক একইভাবে ১লা মে কে মোকাবেলায় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের প্রস্তুতি চলতে থাকে। পুলিশ ও জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা শিকাগো সরকারকে অস্ত্র সংগ্রহে অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করে। ধর্মঘট আহবানকারিদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য শিকাগো বানিজ্যিক ক্লাব ইলিনয় প্রতিরক্ষা বাহিনীকে ২০০০ ডলারের মেশিন গান কিনে দেয়। ১লা মে – সমগ্র যুক্ত্ররাষ্ট্রে প্রায় ৩০০,০০০ শ্রমিক তাদের কাজ ফেলে এদিন রাস্তায় নেমে আসে। শিকাগোতে শ্রমিক ধর্মঘট আহবান করা হয়, প্রায় ৪০,০০০ শ্রমিক কাজ ফেলে শহরের কেন্দ্রস্থলে সমবেত হয়। অগ্নি গর্ভ বক্তৃতা, মিছিলে, মিটিং, ধর্মঘট, বিপ্লবী আন্দোলনের হুমকি সবকিছুই মিলে ১লা মে উত্তাল হয়ে উঠে। পার্সন্স, জোয়ান মোস্ট, আগস্ট স্পীজ, লুই লিং সহ আরো অনেকেই শ্রমিকদের মাঝে পথিকৃত হয়ে উঠেন। ধীরে ধীর আরো শ্রমিক কাজ ফেলে আন্দোলনে যোগ দেয়। আন্দোলনকারি শ্রমিকদের সংখ্যা বেড়ে দাড়ায় ১লক্ষ। আন্দোলন চলতে থাকে। ৩ মে (কারো কারো মতে ৪মে)১৮৮৬ সালে সন্ধ্যাবেলা হালকা বৃষ্টির মধ্যে শিকাগোর হে-মার্কেট বাণিজ্যিক এলাকায় শ্রমিকগণ মিছিলের উদ্দেশ্যে জড়ো হন। আগস্ট স্পীজ জড়ো হওয়া শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলছিলেন। হঠাত দূরে দাড়ানো পুলিশ দলের কাছে এক বোমার বিস্ফোরন ঘটে, এতে এক পুলিশ নিহত হয় এবং ১১ জন আহত হয়, পরে আরো ৬জন মারা যায়। পুলিশবাহিনীও শ্রমিকদের উপর অতর্কিতে হামলা শুরু করে যা সাথে সাথেই রায়টের রূপ নেয়। রায়টে ১১ জন শ্রমিক শহীদ হন। পুলিশ হত্যা মামলায় আগস্ট স্পীজ সহ আটজনকে অভিযুক্ত করা হয়। এক প্রহসনমূলক বিচারের পর ১৮৮৭ সালের ১১ই নভেম্বর উন্মুক্ত স্থানে ৬ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। লুই লিং একদিন পূর্বেই কারাভ্যন্তরে আত্মহত্যা করেন, অন্যএকজনের পনের বছরের কারাদন্ড হয়। ফাঁসির মঞ্চে আরোহনের পূর্বে আগস্ট স্পীজ বলেছিলেন, “আজ আমাদের এই নি:শব্দতা, তোমাদের আওয়াজ অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী হবে”।

২৬শে জুন, ১৮৯৩ ইলিনয়ের গভর্ণর অভিযুক্ত আটজনকেই নিরপরাধ বলে ঘোষণা দেন, এবং রায়টের হুকুম প্রদানকারী পুলিশের কমান্ডারকে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। আর অজ্ঞাত সেই বোমা বিস্ফোরণকারীর পরিচয় কখনোই প্রকাশ পায়নি।

শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের “দৈনিক আট ঘন্টা কাজ করার” দাবী অফিসিয়াল স্বীকৃতি পায়। আর পহেলা মে বা মে দিবস প্রতিষ্ঠা পায় শ্রমিকদের দাবী আদায়ের দিন হিসেবে, পৃথিবীব্যাপী আজও তা পালিত হয়।

এখন আসি বর্তমানের প্রেক্ষাপটে ।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই দিনে অনেক শ্রমিক সমাবেশ,সেমিনার হয়।সমাবেশে শ্রমিক নেতারা গলা ফাটিয়ে বলেন যে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে,শোষণ নিপীড়ন বন্ধ করতে হবে,মালিকদের নির্যাতন বন্ধ করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি।

কিন্তু বাস্তবতা কি তা বলে????

আজ শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে,তাদেরকে দৈনিক ৮ ঘন্টার বেশি কাজ করতে হয়,কোনো কোনো সময় ১৪ থেকে ১৬ ঘন্টা পর্যন্তও কাজ করানো হয়।কিন্তু নিজেদের সেই পারিশ্রমিকও সেভাবে তারা পায় না।মালিক পক্ষ শ্রমিকদের ঠিকমত পারিশ্রমিকও দেয় না।

it

যে বয়সে শিশু কিশোরদের বই পত্র নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা ,আজ তাদের দিয়ে ইটের ভাটায়,গ্যারেজে ,হোটেলে কাজ করানো হয়।অনেক সময় তাদেরকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়,এমনকি মেরেও ফেলা হয়।

child 3 child

আজ বাবা দাদার বয়সী বৃদ্ধ মানুষদের রিক্সা,ভ্যান,ঠ্যালা গাড়ী সহ অনেক ভারী কাজ করতে হয়।যে বয়সে তাদের বাড়িতে বসে থাকার কথা আজ তাদের জীবন সংগ্রাম করে চলতে হচ্ছে।

briddho n sssss

আজ দেশের গার্মেন্টস শিল্পে সবচেয়ে বেশি হল নারী।নিজের পরিবারের জীবিকা নির্বাহে ,পরিবারের ভরণ পোষণের জন্য আজ নারীদের কাজ করতে হচ্ছে।কিন্তু কর্মক্ষেত্রেও আজ নিরাপদ নয় নারীরা।তাদেরকে বিভিন্নভাবে শারীরিক নির্যাতন করা হয়।

nari

কোথায় গেল আজ শ্রমিক নেতারা? কোথায় গেল আজ দেশ?

এগুলোর মানেই কি শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রাপ্তি? একটা দিন শ্রমিকদের জন্য গলা ফাটিয়ে বছরের বাকিটা সময় চোখে স্টিলের চশমা পড়ে যদি ঘুরেন তবে আপনাদের কাছে থেকে কি আশা করবে আমার শ্রমিক ভাইবোনেরা????

তবে কি বর্তমানে শ্রমিকদের শোষণ নিপীড়নই কি আজকের মে দিবসের তাৎপর্য??????

প্রশ্ন রইল সচেতন মহল ও শ্রমিকনেতাদের প্রতি।

লেখা: জাবিন সাজ্জাদ