মার্কিন গণমাধ্যমে হাসিনা-টিউলিপের ব্যাপক সমালোচনা

0
জিসাফো ডেস্কঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট পদপ্রত্যাশী ডোলাল্ড ট্রাম্পের মুসলিম বিদ্বেষী প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে যুক্তরাজ্যে তাকে নিষিদ্ধের দাবি তোলায় ব্রিটিশ পার্লামেন্টের লেবার পার্টির এমপি টিউলিপ সিদ্দিকের কড়া সমালোচনা করেছে ওয়াসিংটন ডিসি ভিত্তিক মার্কিন গণমাধ্যম ‘দৈনিক কলার’। সেই সাথে তার খালা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘শরণার্থীবিরোধী নেত্রী’ হিসেবে উল্লেখ করে সমালোচনা করে এ পত্রিকাটি।

প্রতিবেদনে সাংবাদিক ব্লেক নেফ বোঝাতে চেয়েছেন, টিউলিপের খালা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শরণার্থী বিরোধী, গণতন্ত্র ধ্বংস ও বাকস্বাধীনতা খর্বে অভিযুক্ত। অথচ তারই ভাগ্নী হয়ে তিনি অত্যন্ত গর্ববোধ করছেন। অন্যদিকে একই অভিযোগে তিনি ট্রাম্পকেযুক্তরাজ্যে­ প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা চাচ্ছেন। তার এমন আচরণকে হাস্যকর বলে বর্ণনা করেন তিনি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এক সদস্য যে যুক্তরাজ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিষেধাজ্ঞা প্রচেষ্টায় অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। অথচ, হাস্যকরভাবে সে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর গর্বিত ভাগ্নী। যে গণতন্ত্র ধ্বংস ও শরনার্থীদের মানবাধিকার লঙ্ঘনে লিপ্ত রয়েছে বলে নিন্দা করা হয়। ট্রাম্পকে যুক্তরাজ্যে প্রবেশে নিষিদ্ধ করার পক্ষে লেবার পার্টি এমপি টিউলিপ সিদ্দিক তার দলের অন্যতম শক্তিশালী সমর্থক। তিনি সোমবার এ বিষয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বিতর্কের শুরুতে (যা ভোট ছাড়াই শেষ হয়)ট্রাম্পকে একজন বিষধর, ক্ষয়কারী মানুষ হিসেবে বর্ণনা করেন। ট্রাম্প গোষ্ঠীসমূহের মাঝে বিদ্বেষকে উস্কে দিয়েছেন বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প বক্তৃতায় খুবই পটু। তাই সে বাকস্বাধীনতার সুরক্ষার জন্য যোগ্য নয়।

টিউলিপ বলেন, তার (ট্রাম্প) বক্তব্য হাস্যরসাত্মক নয়। তার কথা মজারও নয়। বরং তার কথা বিষাক্ত। তারা অরক্ষিত সম্প্রদায়ের মাঝে উত্তেজনাকে আরও উত্তপ্ত করছে। কথার দ্বারা ‘ঘৃণা অপরাধ’কে উদ্দীপ্ত করা হচ্ছে এবং এতে ইন্ধন জোগানো হচ্ছে। ব্লেক নেফ বলেন, তবে হাস্যকর বিষয় হলো- সিদ্দিক বাংলাদেশের এমন এক রাজনীতিবিদের ভাগ্নী হয়ে অত্যন্ত গর্ববোধ করেন যে ক্ষমতায় থাকাকালে ট্রাম্পের চেয়েও অধিক বিদেশাতঙ্ক (বিদেশিদের সম্পর্কে অহেতুক ভয়) হয়ে পড়েন।

শেখ হাসিনা বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী।২০০৯ সাল থেকে তিনি ক্ষমতায় আছেন। ইসলামি বিশ্বে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ায় এবং বাংলাদেশে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য তিনি আগে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছেন। গত কয়েক বছরে হাসিনার ক্ষমতাকালীন সময়ে বেশ কিছু বড় কলঙ্ককে চিহ্নিত করা হয়। আন্তর্জাতিকভাবে হাসিনার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আচরণ হলো রোহিঙ্গা শরনার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া। রোহিঙ্গারা বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমারের একটি মুসলিম জনগোষ্ঠী। যারা সরকারি নিপীড়নের সম্মুখীন। মিয়ানমার তাদের পূর্ণ নাগরিকত্ব দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ২০১২ সালে মিয়ানমারে ধর্মীয় ও জাতিগত সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পলায়ন করে।

এর প্রতিক্রিয়ায় হাসিনা তাদের সহযোগিতার প্রশ্নে বলেন, এটা আমাদের দায়িত্ব নয়। বিশ্বসম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত সহায়তা দেয়ার প্রস্তাব করা স্বত্ত্বেও হাসিনা সরকার রোহিঙ্গাদের মানবিক আশ্রয় অথবা সরকারিভাবে তাদের নিবন্ধনের সুযোগদিতে অস্বীকৃতি জানায়। সরকার বঙ্গোপসাগর উপকূলে যেসবজীর্ণ শরনার্থী শিবির রয়েছে তা সরিয়ে ফেলারও পরিকল্পনা করে। যাতে করে এসব স্থানে পর্যটন ব্যবস্থাবিকশিত করা যায়।

২০১৫ সালে পার্লামেন্ট নির্বাচনে জেতার পর টিউলিপ সাংবাদিকদের বলেন, আজ আমি আমার খালাকে খুবই স্মরণ করছি। যার কাছ থেকে আমি অধিকাংশ শিক্ষা নিয়েছি। আমি রাজনীতির সবই তার কাছ থেকে শিখেছি। সামাজিক ন্যায়বিচার, কীভাবে তা প্রচার করতে হয় এবং জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হয়। নির্বাচনী গণতন্ত্রের সাথেও হাসিনার ত্রুটিপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। তার সরকার ২০১০ সালে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিতের জন্য দেশের বিদ্যমান সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে। যার ফলে ২০১৪ সালের সংসদীয় নির্বাচন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

দাবি করা হয়, হাসিনার আওয়ামী লীগের পক্ষে ভোট কারচুপি করা হয়েছে। ২০১৫ সালে স্থানীয় নির্বাচনের পর একই ধরনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে সমর্থনজানানো হয়। মাত্র দুইমাস আগে হাসিনা সরকারের তত্ত্বাবধানে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যুদ্ধাপরাধের দায়ে কয়েকজন বিরোধী দলীয় নেতার মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়েছে।

হাসিনা ২০১০ সালে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করে। আমেনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকবার সমালোচনা করা হয় যে, সরকার শুধুমাত্র তার রাজনৈতিক শত্রুর প্রতি মনোযোগ দিয়েছে এবং সুষ্ঠুভাবে বিচার ও আপিল করতে ব্যর্থ হয়েছে। হাসিনার বাংলাদেশে বাকস্বাধীনতা আরেকটি উল্লেখযোগ্য ইস্যু। তাকে আক্রমণ করে একটি গানলেখার কারণে এক বাংলাদেশি নাগরিককে সাত বছরের কারাদ-দেয়া হয়েছে। দেশব্যাপি কয়েকজন নাস্তিক ব্লগার হত্যাকা-ে হাসিনা ক্ষীণভাবে নিন্দা জানায়।

অন্যদিকে তিনি ব্লগারদের অন্যদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না হানার বিষয়ে সতর্ক করেন। তার খালা উল্লেখযোগ্য ‘মুখরা মহিলা’ হলেও টিউলিপ খুব কমই তার পরিবারকে হাসিনার কাছ থেকে দূরে রেখেছেন। বরং এর পরিবর্তে তারপ্রশংসা করেছেন। এমনকি সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফরে তিনি বলেন, তার খালা তাকে বাংলাদেশে ফিরে আসার জন্য বলেছিলেন এবং এখানে একজন রাজনীতিবিদ হতে বলেন। সিদ্দিক বলেন, তার এমন পরিকল্পনা নেই।