মামলার ফাঁদে ফেলে ‘টাকার খনি’ দখল

0

ফলে এই কমিটি নিয়ে ক্ষমতা দ্বন্দ্ব লেগেই থাকে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মাধ্যমে পরিবর্তন হয় বিভিন্ন টার্মিনালের ক্ষমতা। তবে এখন সময় পাল্টেছে। এখন আপোস মীমাংসার মাধ্যমে ঘটছে এই পরিবর্তন। তবে আওয়ামী লীগ টানা দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা এবং বিরোধী দল কোণঠাসা হয়ে যাওয়ার কারণে টার্মিনাল দখল নিতে দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বীরা বেছে নিচ্ছে আলাদা কৌশল।

মামলার ফাঁদে ফেলে বৈধ কমিটিকে হটিয়ে ভুয়া কমিটি বানিয়ে ‘বহিরাগতরা’ দখলে নিয়েছে ‘ঢাকা জেলা হালকা যানবাহন মালিক সমিতি‘র বাহাদুরশাহ লেগুনা পরিবহন স্ট্যান্ড। এই সমিতির নামে দৈনিক অর্ধ লক্ষ টাকা চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।

রাজধানীর পুরান ঢাকার সদরঘাট জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে থেকে জুরাইন-যাত্রাবাড়ী-ডেমরা-বাবুবাজার রুটে চলাচলকারী বাহাদুরশাহ পরিবহনের শতাধিক গাড়ি থেকে আদায় করা হয় এই চাঁদা।

অভিযোগ রয়েছে, বৈধ কমিটির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা দিয়ে তাদের জেলে ঢুকিয়ে বহিরাগতরা স্ট্যান্ডটি দখলে নিয়েছে। এই রুটে ১০৯টি গাড়ি চলাচল করে। গাড়ি প্রতি দৈনিক চাঁদা তোলা হয় ৫১০ টাকা। সম্পূর্ণ রুটের মধ্যে সদরঘাটে ৩৮০ টাকা, জুরাইনে ২০ টাকা, বাবুবাজারে ২০ টাকা, রায়সাহেব বাজারে ২০ টাকা, যাত্রাবাড়ীতে ২০ টাকা এবং ডেমরায় ৫০ টাকা হারে পরিবহন ব্যয়ের নামে চাঁদা আদায় হচ্ছে। এই চাঁদার টাকা ভাড়া বাড়িয়ে যাত্রীদের কাছ থেকেই আদায় করা হয়।

জানা যায়, গত বছরের শেষ দিকে ওই কমিটির সভাপতি এবং সেক্রেটারিসহ নেতৃস্থানীয় আরো কয়েকজনের বিরুদ্ধে বংশাল, কোতোয়ালি এবং দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় বেশ কয়েকটি মামলা করে সাংবাদিক পরিচয়দানকারী তৌহিদুল ইসলাম মোল্লা, বড় মোস্তফা এবং জনৈক নারী। তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মারামারি এবং নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ মামলা করা হয়। এরপর পুলিশ কমিটির সভাপতি-সেক্রেটারিসহ অন্য আসামিদের গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠায়। আর এ সুযোগে টার্মিনালটি দখল নেয় তৌহিদুল, বড় মোস্তফা, আব্দুল গনি, জামাই নুরুল ইসলাম, ছোট মোস্তফা ও শহীদ চক্র।

বংশাল থানায় মারামারির মামলার বাদী হলেন বড় মোস্তফা। কোতোয়ালি থানায় সেক্রেটারি ফারুক, ইউসুফ, আব্দুস সালাম তালুকদার, শফিকুল ইসলাম ও রিপনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি মামলা করে তৌহিদুল। অন্যদিকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে জনৈক নারী বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে (ধর্ষণ) মামলা করে। এ মামলায় আসামি করা হয় ফারুক, সালাম, শফিকুলসহ অজ্ঞাত আরো একজনকে।

গ্রেপ্তার অনেকেই এখনো জেলে। আর এ সুযোগে গত বছরের ১৪ অক্টোবর সদরঘাট এলাকার বাহাদুর শাহ পরিবহন (লেগুনা) স্ট্যান্ডটি দখলে নেয় সাংবাদিক পরিচয়দানকারী তৌহিদুল-বড় মোস্তফা গং।

অভিযোগ রয়েছে, লালবাগ জোনের উপকমিশনার মফিজুল ইসলামকে ‘ভুল বুঝিয়ে’ বর্তমান কমিটির নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা করে তারা।

সরেজমিনে বাহাদুরশাহ লেগুনা স্ট্যান্ডে গেলে অধিকাংশ পরিবহন মালিক মামলা ও পুলিশি হয়রানির ভয়ে দখলদারদের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলতে সাহস পাননি।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন মালিক জানান, দখলদাররা তাদের পক্ষের মালিকের সংখ্যা বেশি দেখাতে জোর করে স্বাক্ষর নিয়ে ট্রেড ইউনিয়নে নির্বাচন ছাড়াই একটি ভুয়া কমিটি দাখিল করে, যার বেশিরভাগ বহিরাগত। কথা না শুনলে মামলা দেয়ার হুমকি দিয়েছে তারা।

জানা যায়, দখল পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তৌহিদুলকে স্ট্যাম্পের মাধ্যমে একটি গাড়ির একাংশের ভুয়া মালিক বানায় আব্দুল গনি। কারণ তৌহিদুল একজন ‘সাংবাদিক’। অন্যদিকে ছোট মোস্তফাও বড় মোস্তাকে তার গাড়ির একাংশ একই কায়দায় মালিক বানায়। যা সমিতির গঠনতন্ত্রের পরিপন্থি। স্ট্যান্ড দখলের আগে গাড়ির মালিকরা দখলদারদের কখনই দেখেননি বা চিনতেন না বলে জানান।

কয়েকজন পরিবহন মালিক জানান, সেক্রেটারি ফারুক জেলে থাকাবস্থায় দখলদার ‘সাংবাদিক’ তৌহিদুল বড় মোস্তফা গং ফারুককে জামিনে মুক্ত করার কথা বলে তার বৃদ্ধ মামাকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ৬০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়। একইভাবে মামলা তুলে নেয়ার কথা বলে শফিকুলের কাছ থেকেও ৭০ হাজার টাকা নেয় তৌহিদুল গং। কিন্ত মামলা না তুলে উল্টো শফিককে পুলিশে ধরিয়ে দেয়।

কথায় কথায় দখলবাজরা লালবাগ জোনের ডিসির ভয় দেখায় বলেও জানা যায়।

এ ব্যাপারে সেক্রেটারি ফারুক বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে অভিযোগকারি মহিলাকে আমি কখনোই দেখিনি। আর ধর্ষণের প্রশ্নই ওঠে না। আমাকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করে মিথ্যা মামলায় প্রায় দুই মাস জেল খাটায়। মামলাটির সুষ্ঠু ও সঠিক তদন্ত হোক। তাহলে আসল ঘটনা উদঘাটিত হবে।’

বর্তমান অবৈধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল গনি দাবি করেন, আগের কমিটি পরিবহন ব্যয়ের নামে মালিকদের কাছ থেকে নানা অজুহাতে বাড়তি টাকা আদায় করতো। পুলিশকে দিতে হয়- এসব কথা বলেও টাকা উঠাতো। ওই কমিটির সভাপতি আব্দুস সালাম তালুকদার এবং সেক্রেটারি ফারুক ৮ দিনে ৮ লাখ টাকা উঠায়। অতিষ্ট হয়ে পরিবহন মালিকরা তাদের বিরুদ্ধে অনাস্থা এনে কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন কমিটি গঠন করে।

এরপর মালিকরা ডিএমপি’র লালবাগ জোনের ডিসি মফিজুল ইসলামের কাছে অভিযোগ দিলে তিনি কলেজিয়েট স্কুলে লালবাগ জোনের বিভিন্ন থানার ওসি এবং এসিদের উপস্থিতিতে পরিবহন মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে মালিকরা গাড়ি প্রতি দৈনিক ২৫০ টাকা চাঁদা নির্ধারণ করেন।

আব্দুল গনি স্বীকার করেন, যে কোনো সমস্যায় তারা লালবাগ জোনের ডিসি’র সহযোগিতা পান।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে লালবাগ জোনের উপকমিশনার মফিজুল ইসলাম বলেন, পূর্বের কমিটি পরিবহন ব্যয়ের নামে চাঁদাবাজি করতো। তাদের বিরুদ্ধে এরকম অভিযোগ আসার পর মালিকরা ওই কমিটিকে বাদ দিয়ে নতুন কমিটি করে।

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘পরিবহনের ব্যয় নির্ধারণ করে দেয়ার আমি কে? এইটা মালিকদের ব্যাপার। তবে আমি যে কোনো প্রকার চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে। কোনো চাঁদাবাজিকেই আমি প্রশ্রয় দিব না।