মনোহরদীর পুরাতন ব্রহ্মপুত্র ভরাট করছে পুলিশ সদস্যরা : পানি প্রবাহ বন্ধ, এলাকায় উত্তেজনা

0
জিসাফো ডেস্কঃ নরসিংদী জেলার মনোহদীর পুরাতন বহ্মপুত্র নদ ভরাট করে দেয়াল নের্মান ও মন্দিরের জায়গা দকলের অভিযোগ উঠেছে মনোহরদী থানা পুলিশের বিরাদ্ধে। আর এ বিষয়টি নিয়ে মনোহদী জুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হচ্ছে।

পুলিশের দ্বারা এভাবে নদ ও মন্দিরের জায়গা দখলের বিষয়টি নিয়ে বিশেষজ্ঞরা উদ্বিগ্ন হলেও চুপ রয়েছেন স্থানীয় প্রশাসন।

পুলিশ ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, মনোহরদী থানার নতুন ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। গত দুই-তিন বছর পূর্বে পুলিশ থানার পাশের পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের একটি বড় অংশের মালিকানা দাবি করে খুটি দিয়ে সীমানা নির্ধারণ করে। এতোদিন সেই সীমানায় বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করতো পুলিশ। কয়েক মাস আগে সেই সীমানা রেখায় দেয়াল তৈরীর উদ্যোগ নেয় পুলিশ। এরই মধ্যে দরপত্রের মাধ্যমে ঠিকাদার চুড়ান্ত করা হয়েছে। পুলিশ ওই সময় মন্দিরের একটি অংশের মালিকানা থানা দাবি করলে বিষয়টি জনসাধারণের দৃষ্টিগোচর হয় ।

গত শনিবার গিয়ে দেখা যায়, মনোহরদী বাজারের পাশ দিয়ে প্রবাহিত পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের উপর মনোহরদী সেতু। সেতু ঘেঁষেই নদীর পাড়ে প্রাচীন শ্রী শ্রী পাগল নাথ আশ্রম। আশ্রমের একাংশ নদীর উপরে এসে পড়েছে। তারপর নদীর পাড়ে মনোহরদী থানা অবস্থিত। থানার সামনের নদীতে বিরাট অংশজুড়ে সারি সারি খুটি দেয়া। সেই সীমানা ধরে বাঁধ দিয়ে সেচ যন্ত্র দিয়ে নদীর পানি শুকানো হচ্ছে। পাড়ে থানার ভবন নির্মাণে কাজ করছেন নির্মাণ শ্রমিকরা।

শ্রমিক সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, শুক্রবার থেকে আমরা পানি সেচ শুরু করেছি। থানার জমি, শুকিয়ে মাটি ফেলবে। নদী আর থাকবে না।

ওই সময় পাশ্ববর্তী খিরাটি চরে জমিতে কাজ করা কৃষক মোসলেহ উদ্দিন বলেন, হেরাও (পুলিশ) সরকারি, নদীও সরকারি। সরকার যদি নদী ভরাট করে তাহলে আমরা সাধারণ মানুষের কিছু করার নাই।

ইদীল পানি মুকানোর কাজ শেষে এখন মাটি ভরাট করে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজ চলছে।

গত বুধবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নদীর বুকে কোন পানি নেই। শুকানো নদীতে মাটি ভরাটের কাজ করছে ১৫ থেকে ২০ জন শ্রমিক।

এদিকে নদী দখলের বিষয়টি পুরো মনোহরদীতে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। তবে ভয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলছেনা। ইতিমধ্যে পুলিশ একবার মন্দিরের জমি নিজেদের দাবী করে সাইনবোর্ড লাগায় এবং আরেকবার মন্দিরের জমিতে খুটি দিয়ে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে। পরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের হস্তক্ষেপে পরিবেশ স্বাভাবিক হয়। বিষয়টি নিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ পুলিশ সুপারের নিকট উদ্বেগ প্রকাশ করলে বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগের আশ্বাস দেয়া হয়। কিন্তু অনেক দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো কোন সমঝোতা হয়নি। উল্টো দ্রæততার সাথে চলছে মাটি দিয়ে নদী ভরাটের কাজ।

শ্রী শ্রী পাগলনাথ আশ্রমের সভাপতি প্রিয়াশীষ রায় বলেন, মন্দিরটি ১০০ বছরের প্রাচীণ। হঠাৎ করেই পুলিশ মন্দিরের একাংশ নিজেদের জমি বলে দাবি করে। যা হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

মনোহরদী পৌরসভার মেয়র আমিনুর রশিদ সুজন বলেন, নদী ভরাট হয়ে গেলে পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। এমনকি পৌরসভার পানি অপসারণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে। বিষয়টি সত্যিই দুঃখজনক।

এই ব্যাপারে জানতে চাইলে মনোহরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম ফরাজী বলেন, এটা নদী না, নীচু জায়গা। রেকর্ড অনুযায়ী সরকারি সার্ভেয়ার থানার সীমানা নির্ধারণ করেছে। এর কোন অংশ যদি নদীর সীমানায় পড়ে তা ছেড়ে দেয়া হবে।

মন্দিরের বিষয়ে ওসি বলেন, থানার ৬.৩৮ ডিসিম জমি মন্দিরের ভেতরে রয়েছে। আমরা আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানে আগ্রহী।

এ নদী থেকে মাছ ধরে জীবন ভর খেয়েছি। মনোহরদী থানার পুলিশ প্রথমে নদীতে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করতো। এখন ১৬ ভাগের মধ্যে ১২ ভাগই দখল করে ফেলেছে, আর নদী থাকবেনা। পানি কোথায় দিয়ে আসা যাওয়া করবে। এঅবস্থায় পানি না আসলে এলাকা মরুভীম হে যাবে আর কৃষি চাষবাসসহ অনান্য কৃষি কাজ বন্ধ হয়ে যাবে।

পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের খিরাটি চরে পাট ক্ষেতের বীজতলা তৈরীর ফাঁকে ওপারের নরসিংদীর মনোহরদী থানাকে দেখিয়ে কথা গুলো বলেছেন ষার্টোদ্ধ কৃষক আবদুস সাত্তার। তিনি গাজীপুরের কাপাশিয়া উপজেলার চর খিরাটি গ্রামের বাসিন্দা।

নরসিংদীর মনোহরদী থানার পাশ্ববর্তী প্রবাহমান পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদে সেচ যন্ত্র দিয়ে পানি শুকিয়েছে পুলিশ। এখন নদী প্রায় ৭২ শতাংশ জমিতে মাটি ভরাট করে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজ চলছে। একই সঙ্গে পাশ্ববর্তী শ্রী শ্রী পাগল নাথ আশ্রম কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, শুধু নদী নয় আশ্রমের জায়গাও দখলে পায়তারা করছে পুলিশ। বিষয়টি নিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে।

খতিয়ান বিশ্লেষণে দেখা যায়, সিএস ও এসএ খতিয়ানে নদী নামে রেকর্ড থাকলেও আরএস খতিয়ানে নদী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে রেকর্ড হয়েছে। এই সুযোগে এক শ্রেণীর লোক নদী দখলের মহোৎসব শুরু করেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নরসিংদীর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী দ্বীন ইসলাম বলেন, কিছুদিন পূর্বে আমরা নদীটি পরিদর্শন করেছি। আমরা খালি চোখে যা দেখেছি, এটা নদীর অংশ, পুলিশের এটা করা ঠিক হচ্ছেনা। সিএস খতিয়ান দেখে নদী খনন করা হয়। এই ক্ষেত্রে আরএসের গুরুত্¦ থাকবেনা।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাহিদা পারভীন জানান, থানার বিষয়ে কথা বলা আমার এখতিয়ারে নাই। এখানে থানা, মন্দির ও নদী তিনটি স্পর্শকাতর বিষয়। এই বিষয়ে তিনি জেলা প্রশাসকের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।

তবে জেলা প্রশাসক ড. সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস ও এই বিষয়ে বক্তব্য দিতে বিব্রত বোধ করেন।

পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম হীরু (বীর প্রতিক) বলেন, নদীর মালিক পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় না, ভূমি মন্ত্রণালয়। প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে অবৈধ দখলদার পেলে আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগীতায় উচ্ছেদ করি। কিন্তু পুলিশ যদি নদী দখল করে তাহলে তো মুশকিল।

তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক মহা-পরিচালক প্রকৌশলী ম ইনামুল হক বলেছেন, পানির প্রবাহ অক্ষুন্ন রাখা ও দেখাশুনার দায়িত্ব পানি উন্নয়ন বোর্ডের।

বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের সভাপতি মো. মনির হোসাইন বলেন, সিএস খতিয়ানে যদি নদী থাকে তাহলে এটাকে কোন মালিকানায় নেয়ার সুযোগ নেই। পুলিশের জন্য আলাদা আইন নয়। এই নদীর জায়গা যদি কেউ দখলের পায়তারা করে তাহলে নদী রক্ষায় সরকারের যে সকল দপ্তর রয়েছে কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করা তাদের দায়িত্ব।