ভয়াল নাইন-ইলেভেন

0

ঢাকা: অন্যান্য দিনের মতো সেদিনটাও ছিল স্বাভাবিক, গতানুগতিক। সকালে ঘুম ভেঙে প্রতিদিনের নিয়ম অনুযায়ী সেদিনও যে যার কাজে বেরিয়ে পড়েছিলেন। কারোর হয়তো ঘুম ভাঙতে একটু দেরি হয়ে যাওয়ায় নাস্তা না সেরেই ছুটতে হয়েছিল কাজে। কেউ ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি, কি এক ভয়ংকর পরিস্থিতি দ্রুতই ছুটে আসছে তাদের দিকে।

বলা হচ্ছে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের কথা। আল কায়েদা জঙ্গি সংগঠনের সন্ত্রাসী হামলার কারণে ইতিহাসে কালোতম অধ্যায়ে স্থায়ীভাবে ঢুকে গেছে এ তারিখ। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) বিভিন্ন আয়োজনে দিনটিকে স্মরণ করছে যুক্তরাষ্ট্রবাসী। এরই অংশ হিসেবে টুইন টাওয়ার (গ্রাউন্ড জিরো) এলাকার আকাশ উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে আতশবাজির আলোয়। এছাড়া দিনব্যাপী বিভিন্ন স্থানে আলোক ও চিত্র প্রদর্শনীসহ আয়োজন করা হয়েছে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের।

দিনটা ছিল মঙ্গলবার। স্থানীয় সময় সকালে ক্যালিফোর্নিয়াগামী চারটি যাত্রীবাহী বিমান হাইজ্যাক করে আল কায়েদার ১৯ সন্ত্রাসী। এগুলো বোস্টন, ম্যাসাচুসেটস, নিউ জার্সি ও ওয়াশিংটন ডিসি থেকে উড্ডয়ন করে। চারটি বিমানের মধ্যে দু’টো বোয়িং-৭৫৭ সিরিজের ও দু’টো বোয়িং-৭৬৭ সিরিজের।

হাইজ্যাক করা আমেরিকান এয়ারলাইনস ফ্লাইট-১১ ও ইউনাইটেড এয়ারলাইনস ফ্লাইট-১৭৫ নিয়ে আত্মঘাতী হামলাকারীরা সরাসরি হামলা চালায় নিউইয়র্কে অবস্থিত ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর ও দক্ষিণ ভবনে। এক ঘণ্টা ৪২ মিনিটের মধ্যে ১১০ তলার ভবন দু’টি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। এছাড়া ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার কমপ্লেক্সে অবস্থিত ৪৭ তলার ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার টাওয়ারও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এছাড়া বিধ্বস্ত হয় আশেপাশের আরও দশটি সুউচ্চ ভবন।

হাইজ্যাক করা তৃতীয় প্লেন ‘আমেরিকান এয়ারলাইনস ফ্লাইট-৭৭’ নিয়ে সন্ত্রাসীরা হামলা চালায় ভার্জিনিয়ার পেন্টাগনে। মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদর দফতর এটি। হামলায় ভবনের পশ্চিম দিকের অংশ আংশিক বিধ্বস্ত হয়। চতুর্থ প্লেন ‘ইউনাইটেড এয়ারলাইনস ফ্লাইট-৯৩’ পেনসিলভানিয়ায় শ্যাঙ্কস ভিলের কাছে একটি খোলা জায়গায় বিধ্বস্ত হয়।

এসব ঘটনায় ওই ১৯ সন্ত্রাসীসহ দুই হাজার ৯৯৬ জন মানুষের প্রাণহানী হয়। সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয় ১০ বিলিয়ন ডলারের (৭৭ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা)। মার্কিন ইতিহাসে এ ঘটনা সবচেয়ে প্রাণঘাতী। দেশটির অগ্নিনির্বাপক সংস্থা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্যও এ ঘটনা সবচেয়ে প্রাণঘাতী। সংস্থা দু’টির যথাক্রমে ৩৪৩ জন ও ৭২ জন প্রাণ হারান এদিন।

মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যমতে, আল কায়েদা নেতা খালিদ শেখ মোহাম্মদ ১৯৯৬ সালে ওসামা বিন লাদেনকে প্রথম এ ধরনের হামলার পরামর্শ দেন। সেসময় আল কায়েদা ও বিন লাদেন এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছেন। সুদান থেকে সবে আফগানিস্তানে পৌঁছেছেন তারা। ১৯৯৮ সালের শেষ দিকে অথবা ১৯৯৯ সালের প্রথম দিকে বিন লাদেন খালিদকে হামলার ব্যাপারে সামনে বাড়ার অনুমতি দেন। লাদেনের সহকারী, অপর আল কায়েদা নেতা মোহাম্মদ আতেফ এসময় হামলার পরিকল্পণা প্রণয়ন ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করেন।

হামলার পরপরই আল কায়েদাকে এ জন্য অভিযুক্ত করা হয়। খুব দ্রুত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে আফগানিস্তানে তালেবান ও আল কায়েদা বিরোধী অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। হামলার এ ঘটনায় সারা বিশ্বের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে ব্যাপক বিরূপ প্রভাব ফেলে। বিশ্বের রাজনৈতিক পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটায়। অনেক দেশই তাদের সন্ত্রাস দমন আইনে কড়াকড়ি আরোপ করে। এছাড়া সামরিক ও গোয়েন্দা শক্তিও বৃদ্ধি শুরু করে তারা।

তবে ২০০৪ সালে আল কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেন টুইন টাওয়ার হামলার ঘটনায় অভিযোগ অস্বীকার করেন। কিন্তু এতে দমে যায়নি যুক্তরাষ্ট্র। ২০১১ সালের মে মাসে বিন লাদেনকে খুঁজে বের করে মার্কিন বাহিনী। এক অভিযানে ওই মাসেই তিনি নিহত হন।

এদিকে, হামলার এক বছরের মধ্যে পেন্টাগনের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত করা হয়। এছাড়া ২০০৩ সালের শেষ নাগাদ অস্থায়ীভাবে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার পাথ স্টেশন খোলা হয় ও টুইন টাওয়ারের স্থানে সাতটি ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ভবন নির্মাণ করা হয়। ২০০৬ সালে এগুলো খুলে দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে ২০০৬ সালের ২৭ এপ্রিল ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের মূল ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়ে শেষ হয় ২০১৩ সালের ২০ মে। ভবনটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘ওয়ান ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার’। এর উচ্চতা এক হাজার ৭৭৬ ফুট (৫৪১ মিটার)। ২০১৪ সালের ৩ নভেম্বর এটি খুলে দেওয়া হয়। এখানে নতুন নির্মিত সাতটি ভবনের সামনেই ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিহতদের স্মরণে নির্মাণ করা হয়েছে এক সৌধের। সেই সঙ্গে হাইজ্যাক হওয়া প্লেন চারটির যাত্রীদের স্মরণে আলাদা আলাদাভাবে বিভিন্ন জায়গায়ও স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে।