ভ্যাট বিরোধী আন্দোলনে বিপাকে সরকার

0

ঢাকা : ‘নো ভ্যাট অন এডুকেশন’এর ব্যানারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও প্রকৌশল কলেজে ছাত্র ধর্মঘটের প্রথম দিন অতিবাহিত হচ্ছে। শনিবার সকাল থেকেই ধর্মঘটের সমর্থনে ও শিক্ষার উপর আরোপিত ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করে বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। রাজধানীর সড়কে তারা বিক্ষোভ ও মিছিল করে। এতে রাজধানীতে সৃষ্টি হয় যানজট। ভোগান্তিতে পড়ে রাস্তায় বের হওয়া সাধারণ মানুষ।

দিনভর আন্দোলনের বিষয়ে সন্ধ্যা ৬টায় রাজধানীর ধানমন্ডি ১৫ নম্বরে অবস্থিত স্ট্যামফোর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করবে নো ভ্যাট অন এডুকেশন। সেখানে পরবর্তী কর্মসূচির বিষয়ে জানানো হবে বলে জানান সংগঠনের মুখপাত্র ফারুক আহমাদ আরিফ।

শনিবার বিকেলে তিনি  বলেন, ‘আমরা সারাদিনই বিক্ষোভ করেছি। ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবিতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সমাবেশ ও মিছিল করেছে। আমরা সবার সঙ্গে আলোচনা করছি, তারপরই পরবর্তী আন্দোলনের বিষয়ে জানাবো।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের এ আন্দোলন ছাত্র-ছাত্রীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে হচ্ছে। কিন্তু অনেকেই এ আন্দোলনকে রাজনীতির রঙ দিতে চাচ্ছেন। কিন্তু আমাদের এ আন্দোলন মোটেও রাজনৈতিক নয়। আমরা শুধুমাত্র শিক্ষার ওপর আরোপিত ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলন করছি। আমাদের কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই।’

শনিবার সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ঘুরে  প্রতিবেদকরা জানান, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েই ক্লাস ও পরীক্ষা হয়নি। এর মধ্যে ইউল্যাবের সেমিস্টার ব্রেক ও ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা ছিল।

বেলা ১২টার দিক থেকে রাজধানীর কলাবাগানে স্টেট ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসের সামনে থেকে ছাত্র ধর্মঘটের সমর্থনে এবং ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করে শিক্ষার্থীরা। ইউনিভার্সিটির বিজয় ক্যাম্পাসের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিলটি বের হয়। মিছিলটি মিরপুর রোড প্রদক্ষিণ করে পুনরায় ক্যাম্পাসের সামনে এসে শেষ হয়। এ সময় শিক্ষার্থীরা মিছিল থেকে ভ্যাট বিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দেয়।

শুক্রাবাদে নিজেদের ক্যাম্পাসের সামনে বিক্ষোভ করে ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরাও। ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবিতে তারা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড-ফেস্টুন নিয়ে স্লোগান দেয়।

সাড়ে ১২টার দিকে আসাদ গেটের নিজেদের ক্যাম্পাস থেকে ভ্যাটবিরোধী মিছিল বের করে বাংলাদেশ ইউনিভাসির্টির শিক্ষার্থীরা। আসাদ গেট থেকে রাসেল স্কয়ার (ধানমন্ডি ৩২) হয়ে আবারো নিজেদের ক্যাম্পাসে ফিরে আসে মিছিলটি। তবে ধীর লয়ে চলা এ মিছিলটি এক ঘণ্টারও বেশি সময় চলে। মিছিলে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীরা ধানমন্ডির ২৭ নম্বরে রাপা প্লাজার সামনে, শুক্রবাদ মোড়ে এবং রাসেল স্কয়ারে সড়ক অবরোধ করার চেষ্টা চালায়। কিন্তু নিজেদের মধ্যে মতানৈক্যের কারণে তা হয়নি।

এ মিছিল চলাকালে আসাদ গেট থেকে নিউমার্কেট যাওয়ার রাস্তায় সৃষ্টি হয় প্রচণ্ড যানজট। দীর্ঘক্ষণ ধরে যানবাহনে বসে থেকে বাধ্য হয়ে হেঁটে নিজেদের গন্তব্যের রওনা দেন অনেকেই।

বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির মিছিল শেষে আসাদ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আগামীকাল রোববার ধানমন্ডি ২৭ নম্বরে বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেয়া হয়। রাজধানীর ধানমন্ডি, কলাবাগান এবং এর আশপাশ এলাকায় অবস্থিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই বিক্ষোভ সমাবেশ করবে বলে জানান বাংলাদেশ ইউনির্ভাসিটির বিবিএ ছাত্র ইয়াসিন।

গতকাল শুক্রবারের পর শনিবারও বিক্ষোভ করে রাজধানীর আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা। শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টায় তেজগাঁও লাভ রোড ক্যাম্পাসের সামনে থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। মিছিলটি ওই এলাকায় প্রদক্ষিণ করে পুনরায় ক্যাম্পাসের সামনে এসে শেষ হয়। এর আগে বেলা সাড়ে ১১টায় ক্যাম্পাসের সামনে মানববন্ধন করে শিক্ষার্থীরা। এ সময় শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন থেকে ভ্যাট বিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দেয়। তারা অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের পদত্যাগও দাবি করেন।

সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ধানমণ্ডির ২৭ নম্বর সড়কে দুই প্রান্তে, শুক্রাবাদ এলাকায় এবং ল্যাবএইডের পাশের রাস্তায় শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন ও মিছিল নিয়ে নামে।

ল্যাবএইড হাসপাতালের কাছে বেলা ১২টার দিকে মানববন্ধন করে ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা। এরপর তারা সড়কে অবস্থান নেয়। অবরোধে সিটি কলেজ থেকে কলাবাগান যাওয়ার পথ আটকে যায়। কিছুক্ষণ পর ইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের সঙ্গে যোগ দেয়।

পুলিশের অনুরোধে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে রাস্তা ছেড়ে দেয় শিক্ষার্থীরা। এরপর তারা মানববন্ধন করে এবং দেড়টার মধ্যে কর্মসূচি শেষ করে তারা।

শুক্রাবাদে বেলা ১টার দিকে ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করে। মানববন্ধনের সময় গাড়ি চলাচলের গতি ধীর হলেও শিক্ষার্থীরা সড়ক ছাড়লে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে।

ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবিতে রাজধানীর ধানমন্ডি ১৫ নম্বরে নিজেদের ক্যাম্পাসের সামনে বিক্ষোভ করে স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা। দুপুর ১২টার দিকে তারা জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করে।

নর্দান ইউনির্ভাসিটির শিক্ষার্থীরাও একই জায়গায় সড়ক অবরোধ করে মানববন্ধন করেন। তবে তার স্থায়ীত্ব ছিল মাত্র এক মিনিট।

দুপুর ১২টার দিকে গ্রীন রোডে ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবিতে মানববন্ধন ও মিছিল করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এতে অংশ নেয় ইউনিভার্সিটি অফ লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব), ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ঢাকা ইন্টারনেশনাল ইউনিভার্সিটি, এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটি, স্টেট ইউনিভার্সিটি ও ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা।

এদিকে ভ্যাট কে দেবে এ নিয়ে সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় মালিকপক্ষ এক ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি করেছে। সমিতি সংবাদ সম্মেলন করে বলেছে, তারা ট্রাস্টি বোর্ডের অধীনে বিশ্ববিদ্যালয় চালান এবং এটি একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। সুতরাং সরকার কোনো আইনেই এর ওপর ভ্যাট আরোপ করতে পারে না।

অপরদিকে শিক্ষার্থীদের নয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকেই ভ্যাট দিতে হবে এবং একারণে কোনোভাবেই টিউশন ফি বাড়ানোর সুযোগ নেই- সরকারের এ বক্তব্যেরও বারবার পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গতকাল শুক্রবার শিক্ষামন্ত্রী বললেন, আলটিমেটলি শিক্ষার্থীদেরই ভ্যাটের টাকা দিতে হবে। এবার কর্তৃপক্ষ দিলেও আগামী বছর থেকে শিক্ষার্থীদের দিতে হবে। কিন্তু শনিবার মন্ত্রী অবস্থান পরিবর্তন করে বললেন, ভ্যাট কর্তৃপক্ষকেই দিতে হবে। এ জন্য যাতে কর্তৃপক্ষ বেশি টিউশন ফি নিতে না পারে সে ব্যাপারে শিক্ষার্থীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।