ভূরাজনৈতিক রণক্ষেত্রে পরিণত বাংলাদেশ!

0

বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর স্বার্থ নিয়ে খেলাধুলা করে ক্ষমতায় থাকার কৌশলের পরিণতিতে বাংলাদেশ ভূরাজনৈতিক লড়াইয়ের রণক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে বলে যে আশঙ্কা আমরা অতীতে বিভিন্ন কলামে করেছিলাম, তাই যেন এখন বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে। মাসের পর মাস ধরে বিক্ষিপ্তভাবে সন্ত্রাসী হামলায় নানা শ্রেণীর ব্যক্তি নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার হওয়ার পর গুলশানের নিবিড় নিরাপত্তার একটি স্থানে সন্ত্রাসী হামলায় ১৭ বিদেশী নাগরিকসহ ২২ ব্যক্তি নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এই সন্ত্রাসী ঘটনা চলার সময়ই সিএনএনের মতো বিশ্বখ্যাত মিডিয়ায় এর লাইভ সম্প্রচার হয়েছে। পরদিন থেকেই খ্যাতনামা বৈশ্বিক গণমাধ্যমে খবর বিশ্লেষণে এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এই সন্ত্রাসী ঘটনার নেপথ্যে কী কী বিষয় সক্রিয় থাকতে পারে তা নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ হয়েছে এসব লেখায়। এখন এই সন্ত্রাসী ঘটনার গভীরে যে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বৃহৎ
শক্তিগুলোর কৌশলগত নিরাপত্তা নীতি ও পদক্ষেপের সঙ্ঘাতগুলো সক্রিয় রয়েছে তা উঠে আসতে শুরু করেছে। ভূকৌশলগত নিরাপত্তা জার্নাল স্ট্যাটেজিক কালচারের সাম্প্রতিক এক সংখ্যায় নিরাপত্তাবিশ্লেষক ইয়োচি শিয়াটসু এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

এই খ্যাতনামা অনলাইন জার্নালে দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের কৌশলগত সঙ্ঘাতপ্রবণ এলাকাগুলো নিয়ে বিশ্লেষণমূলক নিবন্ধ নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা হয়। ‘এফার্ট টু কনটেইন চায়না ফেইলড : বাংলাদেশ স্টাকস কাটস ডাউন অ্যাবে’স কাভার্ড নেভাল গাম্বিট’ শিরোনামের এ নাতিদীর্ঘ বিশ্লেষণে এমন অনেক বিষয় তুলে আনা হয়েছে যা সচরাচর স্থানীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়।

গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে সঙ্ঘটিত এ ঘটনাকে বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম এবং সরকারের নীতিনির্ধারকেরা, যথাসম্ভব অগভীর সন্ত্রাসী ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করতে চেয়েছেন। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গ্রুপ হিসেবে পরিচিত আইএস গুলশানের হত্যার ঘটনা ঘটার সময়েই তাদের ওয়েবসাইটে অভিযান পরিচালনাকারীদের ছবি এবং তাদের কিলিং মিশনের দৃশ্য প্রকাশ করে। কিন্তু ঘটনার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এটাকে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির অপকর্ম হিসেবে বর্ণনা করেছেন। স্থানীয় টিভি চ্যানেলের ওপর এর সচিত্র সম্প্রচার বন্ধের জন্য নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করা হয়। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে দীর্ঘ সময় ধরে এ ঘটনা লাইভ সম্প্রচারের জন্য সিএনএনের সমালোচনা করা হয়েছে। একই সাথে স্থানীয় যেসব টিভি চ্যানেল গুলশানের সন্ত্রাসী ঘটনার তাৎক্ষণিক সম্প্রচার করেছে, সেগুলোর লাইসেন্স বাতিলের হুমকিও দেয়া হয়।

ইয়োচি শিয়াটসু তার লেখার শুরুতেই গুলশানের ঘটনাকে বলেছেন, নির্বাচিত লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট কারণে সামরিক কায়দায় পরিচালিত অপারেশন ছিল এটি। তিনি উল্লেখ করেছেন, ইসলামিক স্টেটের জঙ্গিরা বাংলাদেশে ভারতের দ্বারা চাপিয়ে দেয়া ধর্মের শেকড়মুক্ত সেক্যুলার ব্যবস্থার প্রতিস্থাপন চায়। এ ঘটনার যারা পরিকল্পনা করেছে তারা জামায়াতুল মুজাহিদিনের সাথে সম্পৃক্ত হলেও স্পর্শকাতর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা নথিপত্রে তাদের যেভাবেই হোক প্রবেশাধিকার রয়েছে। তারা বাংলাদেশ ও আন্দামান সাগর এলাকায় জাপানের সামরিক কৌশলগত স্বার্থ ও পরিকল্পনা সংক্রান্ত নথিপত্র সম্পর্কে অবহিত। আর এই আক্রমণের লক্ষ্য হলো ‘চতুর্পক্ষীয় নিরাপত্তা সংলাপ’ নামে জাপান-ভারত-আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়া জোটের বাংলাদেশ ও আন্দামান সাগরে নৌঘাঁটি স্থাপনের প্রচেষ্টায় আঘাত করা।

এই অঞ্চলে চীনা প্রভাব প্রতিহত করার প্রতিব্যবস্থা হিসেবে নৌঘাঁটি স্থাপনের ব্যাপারে অগ্রগণ্য ভূমিকা রয়েছে জাপানের। দেশটি চীন সাগরের স্পর্শকাতর দু’টি দ্বীপের মালিকানা নিয়ে বেইজিংয়ের সাথে বড় ধরনের বিরোধে জড়িয়ে পড়ার পর ঐতিহ্যগত সামরিক অনাগ্রাসী ভূমিকা থেকে সরে আসছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাভূত হওয়ার পর মিত্রশক্তির নেতা যুক্তরাষ্ট্র জাপানের সাথে সীমিত সামরিক শক্তি অর্জন সম্পর্কিত চুক্তি চাপিয়ে দেয়। এর আওতায় জাপান মুক্তভাবে সমরাস্ত্র গবেষণা, উৎপাদন ও রফতানি করতে পারেনি। বিদেশে দেশটির কোনো সামরিক ভূমিকা এতদিন ছিল না। আমেরিকার ওবামা প্রশাসন বৈশ্বিক সামরিক নিয়ন্ত্রণ কৌশলকে নমনীয় করে আনলে বিভিন্ন আঞ্চলিক মিত্রের নিরাপত্তাসঙ্কটের আশঙ্কা দেখা দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমেরিকান সামরিক নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে যায়।

জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো আধুনিক প্রতিরক্ষা সামর্থ্য অর্জনের ব্যাপারে তাই নিজস্ব প্রচেষ্টা শুরু করে।
জাপানে এখন যিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সেই শিনজো আবের পারিবারিক একটি ঐতিহ্য রয়েছে। তার দাদা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে সরকারের মন্ত্রী হিসেবে সে সময়ের সামরিক শক্তি অর্জন এবং জাপানি প্রভাববলয় সম্প্রসারণ প্রচেষ্টার সাথে যুক্ত, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। আবের নতুন সামরিক কৌশলের মধ্যে পিতামহের সমর প্রভাব বিস্তারের প্রতিফলন রয়েছে বলে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন। আবের পরিকল্পনা হলো, চতুর্পক্ষীয় নিরাপত্তা সংলাপের (কিউএসপি) কৌশলগত পরিকল্পনার আওতায় দক্ষিণ আন্দামান সাগরে একটি নৌঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করা। এশিয়ার নিরাপত্তার ব্যাপারে মার্কিন-জাপান যে জোট রয়েছে, সেটাতে ভারত ও অস্ট্রেলিয়াকে যুক্ত করে কিউএসপি করা হয়েছে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের স্বার্থে। এ ক্ষেত্রে প্রধান লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে এশিয়ার পানিসীমায় চীনা উপস্থিতিকে। কিউএসপি মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে জাপানের যে সামগ্রিক অগ্রগণ্য ভূমিকা ছিল,সেটির পুনরুজ্জীবনেরই অনুমোদন।

দক্ষিণ আন্দামানে বৃহদাকার নৌঘাঁটি প্রতিষ্ঠার সহায়ক হিসেবে বাংলাদেশের মহেশখালী দ্বীপে মাতারবাড়ি সমুদ্রবন্দর এবং এনএনজি টার্মিনাল নির্মাণের বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়। পাঁচ থেকে ছয় বিলিয়ন ডলার ব্যয়সাপেক্ষ এই প্রকল্পে জাপান তিন বিলিয়ন ডলার দেয়ার প্রস্তাব করেছে। এর আগে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের ব্যাপারে চীন আট বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছিল। নানামুখী চাপে শেষ পর্যন্ত এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যাপারে ঢাকা খুব বেশি আগায়নি। বরং সোনাদিয়ার পরিবর্তে পটুয়াখালীর পায়রায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আঞ্চলিক ও বাণিজ্যিক বিবেচনায় সোনাদিয়ার বন্দর নির্মাণ লাভজনক হলেও, চীনা আগ্রহকে সরাসরি নাকচ করা সম্ভব না হওয়ায় পায়রার ব্যাপারে অধিক গুরুত্ব দেয়া শুরু হয়েছে।

সরকার চতুর্পক্ষীয় নিরাপত্তা জোটের গোপন চাপের কারণে চীনকে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কাজ না দিতে পারলেও অনেকটা ক্ষতিপূরণের কৌশল ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার বিবেচনায় বাঁশখালী উপকূলের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় একটি বৃহৎ বিদ্যুৎ প্রকল্প চীনা প্রতিষ্ঠানের অর্থানুকূল্যে বাস্তবায়নের জন্য অনুমোদন দেয়। সরকারের ঘনিষ্ঠ একজন শিল্পোদ্যোক্তা এর সাথে জড়িত হলেও এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে স্থানীয় জনগণকে উসকে দিয়ে তা বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করা হয়েছে। এ ব্যাপারে চীনের কৌশলগত প্রতিপক্ষের ইন্ধন রয়েছে বলে বেইজিংয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা গভীরভাবে বিশ্বাস করেন। ইয়োচি শিয়াটসু মনে করেন, মাতারবাড়ি প্রকল্পের মাধ্যমে নৌঘাঁটি প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশকে বেছে নেয়ার পেছনে কিছু কারণ রয়েছে। এর একটি হলো, অর্থনৈতিক ও গ্রহণযোগ্যতার সঙ্কটে থাকা বাংলাদেশের সরকার চীনা প্রভাবের বিরুদ্ধে তৃতীয় দেশকে সামরিক ঘাঁটি করার সুযোগ দিতে পারে।

এ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক শক্তি ভারতের সম্পৃক্ততা বা অনাপত্তি থাকলে সেটি হবে বাড়তি পাওনা। চীনারা কিন্তু এটিকে স্বাভাবিকভাবে নেয়ার কোনো কারণ নেই। তারা মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া কার্যকর হওয়ার পর যে রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে তাতে বাংলাদেশে একটি সমুদ্রবন্দর প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে। এ জন্য তারা ২০১৩ সালে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের প্রস্তাব দেয়। তাদের এই প্রস্তাবের বিপরীতে অনেক পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির ঘনিষ্ঠ আদানি গ্রুপ সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে নতুন করে আগ্রহ দেখিয়েছে। সর্বশেষ গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের ব্যাপারে আগ্রহের কথা জানানো হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও। বন্দর নির্মাণের চেয়েও বঙ্গোপসাগর এলাকার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ থাকতে পারে এসব প্রস্তাবের অন্তরালে।

চীন বাংলাদেশের বৃহদাকার বিনিয়োগে অনেক আগে থেকেই যুক্ত। চলমান বড় অবকাঠামো প্রকল্পের মধ্যে পদ্মা সেতুর বড় দুই অংশের কাজ এককভাবে করছে চীন। আবার কর্ণফুলীর তলদেশে টানেল নির্মাণেও আগ্রহ দেখিয়েছে চীন। এ ছাড়া আনোয়ারার ১৩২০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র্র নির্মাণের জন্য সমঝোতা স্মারকও স্বাক্ষর করেছে। বেইজিং বাংলাদেশের রেল খাতেও ব্যাপক বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম ডুয়াল গেজ ডাবল লাইনসহ হাইস্পিড ট্রেন চালু, দোহাজারী-কক্সবাজার-গুনধুম ডুয়াল গেজ রেলপথ নির্মাণ এবং ময়মনসিংহ-জয়দেবপুর ডুয়াল গেজ ডাবল লাইন নির্মাণে আগ্রহ দেখিয়েছে চীন। বেইজিং বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইএম) অর্থনৈতিক করিডোর নির্মাণের ব্যাপারেও দ্রুত কাঠামো চুক্তি করতে চায়। এর পাশাপাশি প্রতিরক্ষা খাতে চীনের সম্পৃক্ততার ব্যাপারেও আপত্তি রয়েছে ভারত-আমেরিকার। বর্তমান সরকারের আমলে নানা ধরনের আপত্তির পরও চীন বৃহত্তম প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহকারী রয়ে গেছে। ফ্রিগেট-সাবমেরিন সরবরাহের ক্ষেত্রেও চীনকে দরসহ অন্যান্য বিবেচনায় উপেক্ষা করা যাচ্ছে না।

চীনের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক বিনিয়োগ প্রস্তাবের বিপরীতে চতুর্পক্ষীয় জোটের মধ্যে প্রধান ভূমিকা রাখতে পারে জাপান। দেশটি যমুনা রেল সেতু নির্মাণ প্রকল্প, আন্তঃসীমান্ত সড়ক নেটওয়ার্ক উন্নয়ন প্রকল্প, ঢাকা পাস র‌্যাপিড ট্রানজিট উন্নয়ন প্রকল্প (দ্বিতীয়), মাতারবাড়ি আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক প্রকল্প-২, এনার্জি এফিসিয়েন্সি অ্যান্ড কনজারভেন্স প্রমোশন ফিন্যান্সিং প্রকল্প এবং দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।

এর মধ্যে মাতারবাড়ি বন্দর প্রকল্পের আওতায় দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন চারটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হবে। সেখানে তৈরি করা হবে এলএলজি ট্যাংকারের জন্য শিপিং চ্যানেল। ডেস্ট্রয়ার ও সাব-মেরিন হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষমতাসহ বেসামরিক বন্দরটি এমনভাবে নির্মাণ করা হবে যাতে এটি পর্যায়ক্রমে সামরিক কাজেও ব্যবহার করা যায়। প্রাথমিকভাবে এ কাজ করা হবে বাংলাদেশের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের দুর্যোগকালে রেসকিউ ও রিকভারি অপারেশন নামে।
সামিটোমো হেভি ইন্ডাস্ট্রি ও মারুবেনি ট্রেডিং কোম্পানি এ প্রকল্পের সাথে যুক্ত। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সাথে সাসাকাওয়া অর্গানাইজেশন ও সোকা গাকাই নামের দুটি সংস্থা জড়িত। এর মধ্যে শেষোক্তটি ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অংশীদার কোমোইতোর অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। সোকা গাকাই বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়িক সংস্থার সাথে যুক্ত থেকে তাদের বিভিন্ন লবিস্ট কাজ চালায়। সাসাকাওয়া অর্গানাইজেশন নিপ্পন ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে বিভিন্ন চ্যারিটি কার্যক্রম করে থাকে। সাসাকাওয়ার সাথে ইতালীয় বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতার সম্পর্ক রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই। জাপানের নিওমিলিটারিস্ট ও ইতালীয় জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার সেই সম্পর্ক এখনো অব্যাহত রয়েছে।

গুলশান হলি আর্টিজান বেকারিতে এই দুই দেশের নাগরিকদের ওপর আইএসের নির্মম সন্ত্রাসী হামলার পেছনে এ সম্পর্কের কোনো না কোনো যোগসূত্র থাকতে পারে বলে মনে করেন স্ট্র্যাটেজিক কালচারের নিবন্ধকার ইয়োচি শিয়াটসু। তিনি উল্লেখ করেন, হত্যাকাণ্ডের শিকার জাপানি নাগরিকদের মধ্যে একজন ছাড়া আর কেউ প্রকল্পে কর্মরত প্রকৌশলী নন। তারা জেট্রো ও জাইকার বিভিন্ন লবিস্ট কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। এর মধ্যে তিনজন কন্ট্রাকটর ওরিয়েন্টাল কন্সালটেন্টের সাথে জড়িত। সে
দিনের ঘটনার শিকার ইতালীয়রা বাংলাদেশে পোশাক ও বস্ত্র খাতের ব্যবসার সাথে জড়িত হলেও নানা ধরনের বাণিজ্যিক অবাণিজ্যিক কাজে জাপানি নাগরিকদের সাথে তাদের যোগসূত্র ছিল।

জাপানের সাথে সন্ত্রাসী সংগঠন আইএসের সঙ্ঘাত বা বৈরিতা কেন- এ প্রশ্নের জবাবও খুঁজেছেন শিয়াটসু। তিনি উল্লেখ করেন, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার সাথে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন সামরিক ও গোপন গোয়েন্দা তৎপরতায় আইএসের বিরুদ্ধে অনেক কাজ করেছে টোকিও। এ জন্য প্রতিশোধ হিসেবে আইএস হরুনা ইওকাওয়া ও সাংবাদিক কেনজি গোটোসহ জাপানি পণবন্দীদের নির্মমভাবে শিরচ্ছেদ করেছে। ইওকাওয়া ছিলেন জাপানের অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ও নিপ্পন কাইসির প্রতিষ্ঠাতা টোকিও টামোগামির গোয়েন্দা এজেন্ট। টামোগামি জাপানি সংসদের শক্তিশালী রক্ষণশীল লবির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি এবং জাপানের সামরিক পুনর্জাগরণবাদের অন্যতম প্রবক্তা। তিনি নিওকনজার্ভেটিভদের মুখপাত্র হিসেবেও পরিচিত।

জাপানের সামরিক শক্তির পুনরুদ্ধারের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে বিশেষভাবে আগ্রহী। সদ্য অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনের আগে তিনি জাপানি ভোটারদের সমর্থন চান বিদেশে সামরিক ভূমিকা গ্রহণের ব্যাপারে যে বিধিনিষেধ জাপানি সংবিধানে রয়েছে তা তুলে দেয়ার জন্য। এ নির্বাচনে আবের জোট আবারও সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। এতে আবের নেতৃত্বে জাপানের নতুন সরকার সামরিক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে আরো আগ্রাসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে। এ ভূমিকাকে যুক্তরাষ্ট্র স্বাগত জানালেও চীন এ নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন। রাশিয়াও জাপানের বর্ধিত সামরিক ভূমিকাকে স্বাগত জানানোর পক্ষে নয়। ফলে চীন সাগরের দু’টি বিতর্কিত দ্বীপকে কেন্দ্র করে দু’দেশের মধ্যে যে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়েছে, এর প্রভাব এশিয়ার অন্যান্য দেশেও পড়বে। যুক্তরাষ্ট্র এ ক্ষেত্রে ভারতকে জাপানের সাথে জোটবদ্ধ করতে চাইলেও নয়াদিল্লি তার প্রতিবেশী দেশগুলোতে চীনকে তো নয়ই আমেরিকাকেও একতরফা ছাড় দিতে চাইছে না। বাংলাদেশে গত কয়েক বছরের নানা ঘটনায় তার প্রতিফলন রয়েছে। সর্বশেষ মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেসাইয়ের বাংলাদেশ সফরকালে সরকারের শীর্ষব্যক্তিদের কাছে দেয়া প্রস্তাব এবং এ ব্যাপারে প্রতিবেশীদের বিরূপ মনোভাবেও এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। অন্য দিকে, ভারতের সীমান্তে চীনের ব্যাপক সৈন্য সমাবেশকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে, তার মাধ্যমে বেইজিং দিল্লির কাছে এ বার্তা দিতে চাইছে যে, চীন সাগরে ভারতের ভূমিকার ব্যাপারে দিল্লি
বেইজিংয়ের সাথে আলোচনা করলে ছাড় পেতে পারে, জাপান-যুক্তরাষ্ট্রের সাথে জোট বেঁধে চীন সাগরে দিল্লির ভূমিকা বেইজিং পছন্দ করবে না।

দক্ষিণ এশিয়ার এই কৌশলগত দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতে বাংলাদেশ ভারতকে একান্তভাবে নির্ভরতার প্রতিবেশী হিসেবে গ্রহণ করলেও সব পক্ষের সাথে এতদিন এক রকম ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করে এসেছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় উন্নয়ন এবং নগদ অর্থের উৎস হিসেবে চীনের সাথে সম্পর্ক রক্ষার যেমন বিকল্প নেই, তেমনি বিপরীতপক্ষের চাপে বেইজিংকে সমুদ্রবন্দরের মতো প্রকল্পে ছাড়ও দিতে পারছে না ঢাকা। এতে এক দিকে চীন-পাকিস্তান ও রাশিয়া আর অন্য দিকে জাপান-ভারত-যুক্তরাষ্ট্র, এই পরস্পর বিপরীত পক্ষের স্বার্থের টানাপড়েন সরকারের জন্য উভয় সঙ্কট হয়ে দেখা দিয়েছে। এত দিন এই দুই পক্ষের মধ্যে কোনোভাবে ভারসাম্য রক্ষা করা গেলেও গুলশানের জঙ্গি হামলার পর সেই ভারসাম্য শেষ পর্যন্ত থাকবে কি না তা নিয়ে বড় রকমের দ্বিধায় রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা। তবে এর মধ্যে নদীর পানি গড়িয়ে গেছে অনেকখানি। রাষ্ট্রের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা দিন দিন বাড়ছে।
জননিরাপত্তা হয়ে পড়ছে ক্রমেই ভঙ্গুর। অনেকের মধ্যে প্রশ্ন, এরপর কী ঘটবে বাংলাদেশে?

লেখক

মাসুম খলিলী

mrkmmb@gmail.com