ভারতের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি – সর্বত্র ক্ষোভ প্রতিবাদ

0

মানববন্ধন সভা-সমাবেশ-বিক্ষোভ মিছিল : চুক্তি সংসদে উত্থাপনের দাবি জনগণ প্রতিরক্ষা চুক্তি বাস্তবায়ন হতে দেবে না -নেতৃবৃন্দ

ভারতের সাথে সম্পাদিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক নিয়ে দেশের সর্বত্র ক্ষোভ প্রতিবাদ চলছে। বিক্ষোভ মিছিল, প্রতিবাদ সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন থেকে নিজ নিজ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে বিক্ষুব্ধরা।

দুই দেশের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকসমূহ জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানিয়ে তারা বলেছেন, ২৫ সালা গোলামি চুক্তির খেসারত জাতিকে চরমভাবে দিতে হয়েছে। দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে শেষ করার জন্য সামরিক চুক্তির নামে গোলামি চুক্তির জিঞ্জিরে আবদ্ধ করা হলো। চিরদিনের জন্য ভারতের গোলামি করতে হবে। এ চুক্তি ভারতের নিরাপত্তার জন্য; আমাদের দেশের জন্য নয়। বঙ্গোপসাগর-ভারত মহাসাগর, আরব সাগরকে ঘিরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের যে যুদ্ধজোট ও পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিরক্ষা সমঝোতা স্মারকের নামে ভারত বাংলাদেশকে তার সাথে যুক্ত করল। এসব চুক্তিতে দেশের জনগণের সম্মতি নেই। জনগণ প্রতিরক্ষা চুক্তি বাস্তবায়ন হতে দেবে না বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন অনেকে।

প্রতিবাদ কর্মসূচি ও বিবৃতিদাতা সংগঠনের মধ্যে রয়েছেÑ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও ট্রান্সপারান্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

নয়াদিল্লিত প্রধানমন্ত্রীর দফতর হায়দ্রাবাদ হাউজে গত শনিবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে ২২টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়। এর মধ্যে প্রতিরক্ষাবিষয়ক ৩টি সমঝোতা স্মারক রয়েছে।

‘তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়, সীমান্তে হত্যা বন্ধ ও দেশবিরোধী চুক্তি বাতিলের প্রতিবাদ’-এ গতকাল বিক্ষোভ মিছিল করেছে বাংলাদেশ লেবার পার্টি। মহানগরীর তোপখানা রোড থেকে পল্টন হয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবে সমাপ্ত ঘোষণা করে। মিছিল-পূর্ব সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে পার্টির চেয়ারম্যান ডা: মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নতজানু পররাষ্ট্রনীতির বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে এবং জাতীয় স্বার্থবিরোধী সামরিক চুক্তির মাধ্যমে দেশের স্বার্বভৌমত্বের হুমকির মুখে ফেলেছে ভোটবিহীন সরকার।

সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি নিয়ে ট্রান্সপারান্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশসহ (টিআইবি) দেশীয় সংগঠনগুলো বিবৃতিতে তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির নিজ কার্যালয়ে ‘পার্লামেন্ট ওয়াচ’ বিষয়ক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তি নিয়ে এর আগেও আমরা কথা বলেছি। সরকারের বিভিন্ন অনলাইনের তথ্য অনুযায়ী এর আগে ৫৯টি চুক্তি হয়েছে। সেগুলো সংসদে উত্থাপন হয়নি, তা নিয়ে আলোচনাও হয়নি। বিষয়টি উদ্বেগের ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করছি। এখন থেকে শুরু করে ভবিষ্যতে ভারত সফরসহ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যেসব চুক্তি হবে সেগুলো নিয়ে সংসদে অবশ্যই আলোচনা হওয়া উচিত বলে মত দেন তিনি।

এ বিষয়ে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য সুলতানা কামাল বলেন, সংবিধান অনুযায়ী সবকিছুর মালিক জনগণ। জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত নয় কিন্তু জাতীয় স্বাথর্-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো তিনি (প্রধানমন্ত্রী) আমাদের সঙ্গে কিংবা সংসদে আলোচনা করবেন। সংসদের মাধ্যমে জনগণের কাছে সে তথ্য যাবে এবং যাওয়া উচিত বলেই আমরা মনে করি।

সম্পাদিত চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক নিয়ে শনিবার রাতেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, হাসিনার (শেখ হাসিনা) আজীবন ক্ষমতায় থাকার স্বপ্ন। এই স্বপ্নের জন্য সে এ দেশের কিছুই রাখেননি, সবই বিক্রি করেছে। আরো বোধহয় বাকি যেটা আছে, সেটাও বিক্রি করে আসবে। কিন্তু দেশ বিক্রি করেও পৃথিবীর ইতিহাসে ধারণা আছে, কেউ রক্ষা পায়নি। হাসিনা মনে করে না, যাদের কাছে দেশ বিক্রি করলাম, যখন মানুষ জেগে উঠবে, তখন তারা তাকে বাঁচাতে আসবে না।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ দেশের মানুষ অলরেডি ফুলে উঠেছে, ফুঁসে উঠেছে। এখন দেশের মানুষ শুধু সময়ের অপেক্ষা করছে, কখন তারা রাস্তায় বেরুবে এবং এই অন্যায়-জুলুম অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে তারা রুখে দাঁড়াবে- এটা সময়ের ব্যাপার।

ভারতের সাথে বাংলাদেশের সদ্য সম্পাদিত প্রতিরক্ষাবিষয়ক ৩টি সমঝোতা স্মারকের প্রসঙ্গ টেনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, এটি ভারতের নিরাপত্তা চুক্তি হয়েছে, বাংলাদেশের নিরাপত্তার চুক্তির হয়নি। ভারত তার ভ‚খÐকে নিরাপদ করার জন্য অন্যান্য বড় বড় শক্তির সাথে যদি কখনো তার যুদ্ধের প্রয়োজন হয়, তখন তারা বাংলাদেশটাকে ভারতের একটি অংশ হিসেবে যাতে অবাধে ব্যবহার করতে পারে, সে জন্য তাদের এই নিরাপত্তা চুক্তি। এছাড়া আর কিছুই না। সার্বভৌমত্বের কথা যদি বলেন বাংলাদেশ একটি ছোট দেশ, সে দেশের তিন দিকে কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে বৃহত্তম রাষ্ট্র, এটা কী আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান? নিশ্চয়ই না।

ভারত থেকে অস্ত্র ক্রয়ের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের ফেলানীর লাশ পড়ে থাকে তাতে ভারতে কিছু যায় আসে না। কারণ আমরা পণ করেছি আমরা গুলি ছুড়ব না কিন্তু বিএসএফ গুলি ছুড়বে নাÑ এই অঙ্গীকার তারা করেনি। গুলি চলতেই থাকবে, চলতেই থাকবে। সুতরাং তাদের অস্ত্র প্রয়োজন, তারা বিদেশ থেকে অস্ত্র আমদানি করে। আর আমি সীমান্তে গুলি ছুড়ব না, আমি মিয়ানমারের সীমান্তে গুলি ছুড়ব না, ভারতের দিকে গুলি ছোড়া তো দূরের কথা তাদের বন্দুকও দেখানোর ক্ষমতা নেই। তাহলে আমি প্রশ্ন করতে চাই, আমাদের অস্ত্রের কিসের প্রয়োজন? আমি এই অস্ত্র দিয়ে কী করব? যে টাকা দিয়ে অস্ত্র কিনবে সেই অর্থ যদি সামরিক বাহিনীকে দেয়া হয়, তাহলে তারা ভবিষ্যতে ভালো থাকতে পারবে।

দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, আজকে আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, টেরিটোরিয়াল যে সভরেনিটিটা, এই সার্বভৌমত্বটা গতকালকে (শনিবার) ভারতের জিম্মায় দিয়ে দিলেন আমাদের প্রধানমন্ত্রীÑ এর চাইতে দুঃখজনক কিছু থাকতে পারে না। আমাদের বাঁচা-মরা এখন ভারতের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করবে। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এখন ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’তে পরিণত হতে যাচ্ছে। এজন্য কী আমরা একাত্তর সালে জীবন উজাড় করে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছি, লক্ষ মানুষ জীবন দিয়েছে, পিন্ডির কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দিল্লির নিগঢ়ে বাঁধার জন্য কী যুদ্ধ করেছি? সরকার এহেন সমঝোতা করে দেশ ও জনগণের বিরুদ্ধে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি বিবৃতিতে বলেন, ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা ও সামরিক সহযোগিতা সংক্রান্ত যেসব সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে তার মধ্যে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা বিপন্ন হবার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এসব চুক্তি-স্মারকের মধ্য দিয়ে আমাদের দেশের প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টিকে ভারতের জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার অংশে পরিণত করা হয়েছে। এটা খুবই বিপজ্জনক এবং দেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করতে পারে। এই সমঝোতা দক্ষিণ এশিয়ার এই অঞ্চলে বাংলাদেশকে ভারতের সামরিক কৌশলগত অংশীদারে পরিণত করবে। এতে আমাদের দেশের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও জোটনিরপেক্ষ নীতির পরিপন্থী। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ কোনো দেশপ্রেমিক মানুষ এই সমঝোতা গ্রহণ করবে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিল্লি থেকে কেবল আশা আর আশ্বাসের ফানুস ছাড়া কিছুই নিয়ে আসতে পারবেন না। কিন্তু‘ চুক্তি কেবল ঝুলেই গেল না পুরোপুরি অনিশ্চিত হয়ে গেল বলে দাবি করেন এই দল।

বিবৃতি দিয়ে সম্পাদিত সকল চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক প্রকাশের দাবি জানিয়েছে জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল। কাউন্সিলের সভাপতি বদরুদ্দীন উমর ও সম্পাদক ফয়জুল হাকিম বিবৃতিতে বলেন, বঙ্গোপসাগর-ভারত মহাসাগর, আরব সাগরকে ঘিরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের যে যুদ্ধজোট ও পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিরক্ষা সমঝোতা স্মারকের নামে ভারত বাংলাদেশকে তার সাথে যুক্ত করল। ফলে দেশ নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ল।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম পীর সাহেব চরমোনাই বলেছেন, ২৫ সালা গোলামি চুক্তির খেসারত জাতিকে চরমভাবে দিতে হয়েছে। এখন সামরিক চুক্তি হলে চিরদিনের জন্য ভারতের গোলামি করতে হবে। কাজেই দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে শেষ করার জন্য সামরিক চুক্তির নামে গোলামি চুক্তির জিঞ্জিরে আবদ্ধ করা হলো।

দেশবিরোধী চুক্তি করে অতীতে কেউ রক্ষা পায়নি। বর্তমান সরকারও রেহাই পাবে না। সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ভারতের সাথে যা করার তাই করছে। জনগণের সেন্টিমেন্ট বিরোধী কাজ করে আখের রক্ষা করতে পারবেন না।

তিনি বলেন, ভারত কৌশলে বাংলাদেশ থেকে সব নিয়ে যাচ্ছে কিন্তু বাংলাদেশকে তারা কিছুই দিচ্ছে না। ভারতের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব চরম হুমকির মুখে পড়বে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের যে সমস্যাগুলো আছে, সেগুলোর সমাধান বেশি প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তিস্তা চুক্তি প্রসঙ্গে মমতা বলছেন, তারা বাংলাদেশে পানি দেবে না। পীর সাহেব চরমোনাই বলেন, ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের ন্যায্য হিস্যা তো দূরে থাক, এসব নদীর উজানে একতরফা পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে ভারত। অপরদিকে বাংলাদেশ অংশে এই নদীগুলো মরা খালে পরিণত হয়েছে।