ভদ্র রাজনীতির এক অনন্য ব্যক্তিত্ব মির্জা ফখরুল

0

জিসাফো ডেস্কঃ ‘পরিচ্ছন্ন, ভদ্র ও দৃঢ় মনোবলসম্পন্ন’ রাজনীতিবিদ হিসেবে বিএনপির কেন্দ্র থেকে তৃণমূল- সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের কাছে সুপরিচিত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আন্দোলন-সংগ্রামেও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু এখনো ‘ভারমুক্ত’ হতে পারেননি তিনি।

এদিকে দলের দুঃসময়ের কাণ্ডারি মির্জা ফখরুলকে এখনো পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব না করায় তৃণমূলের নেতাকর্মীরা চরম হতাশ। তাদের জিজ্ঞাসা, সংগঠনের জন্য আর কতো ত্যাগ স্বীকার করলে, আর কতোবার জেলে গেলে তাকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব করা হবে?

শুক্রবার দুপুরেও রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সেমিনার হলে অনুষ্ঠিত এক প্রতিবাদী আলোচনা সভায়ও নেতাকর্মীদের মধ্যে এ হতাশার চিত্রই ফুটে উঠে। ওই সভায় সাংবাদিক শফিক রেহমান বলেন, ‘মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে শুধু পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ বললে কম বলা হবে। তিনি পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদের পাশাপাশি একজন ‘অতিশয় ভদ্র মানুষ’ হিসেবেও নেতাকর্মীসহ দেশবাসীর কাছে সমধিক পরিচিত। প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়সহ সরকারের অনেক মন্ত্রী-এমপি যেখানে অভদ্রভাবে কথা বলেন, সেখানে মির্জা ফখরুল এর ব্যতিক্রম। তিনি আওয়ামী লীগের কোনো সমালোচনার জবাব দিলেও তা রাজনৈতিক শিষ্টাচারের মধ্যে থেকেই দেন। এজন্য তিনি ভদ্র রাজনীতিবিদ।’

ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) একাংশের সভাপতি কবি আবদুল হাই শিকদার বলেন, ‘মির্জা ফখরুল ইসলাম একজন পরিচ্ছন্ন ও ভদ্র রাজনীতিবিদ হিসেবে সর্বমহলে পরিচিত। একইসঙ্গে তার অন্তরের দৃঢ়তাও প্রবল। বিভিন্ন মিথ্যা মামলায় এতোবার কারা নির্যাতনের পরও মনোবলের ‍দিক থেকে তিনি যে দৃঢ়তা দেখিয়েছেন, তা নজিরবিহীন। দলের জন্য এতো ত্যাগ স্বীকারের পরও তাকে এখনো পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব করা হয়নি। ‘ভারপ্রাপ্ত’ শব্দটি শুনতে শুনতে আমরা তিক্ত-বিরক্ত। আমরা অবিলম্বে তাকে বিএনপির ‘পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব’ হিসেবে দেখতে চাই।’

আবদুল হাই শিকদারের এ বক্তব্যের সময় সভার মঞ্চে আসনগ্রহণকারী মির্জা ফখরুলকে মাথা নিচু করে থাকতে দেখা যায়।

২০১১ সালের ১৬ মার্চ সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান দলের মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন। এরপর ২০ মার্চ চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া সৌদি আরবে যাওয়ার আগে বিমানবন্দরে মির্জা ফখরুলকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়ে যান। তখন থেকেই দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনি। বিভিন্ন সময় গুঞ্জন শোনা গেলেও আজ পর্যন্ত তাকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব করা হয়নি। এজন্য তাকে সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের নানা কটাক্ষেরও শিকার হতে হয়েছে।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবির পর বিরোধী দলে পরিণত হয় বিএনপি। বিরোধী দলের দুর্যোগপূর্ণ রাজনীতিতে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে সাড়ে চার বছরের অধিক সময় ধরে ‘সেকেন্ড ইন কমান্ডের’ হাল ধরে রয়েছেন বিএনপির ‘ভারপ্রাপ্ত’ মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ‘প্রশ্নবিদ্ধ ও হাস্যকর’ বিভিন্ন মামলায় ইতোমধ্যে সাত দফায় গ্রেপ্তার হয়ে জেলও খেটেছেন দলের ‘ক্লিনম্যান’ খ্যাত এই নেতা। গেল দুই বছরের মধ্যে দীর্ঘ সময় তাকে কারাগারেই থাকতে হয়েছে। সর্বশেষ গত ১ ডিসেম্বর জামিনে মুক্তি পান তিনি। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে ৮৪টি মামলা রয়েছে।

ছোটখাটো ভুলত্রুটি থাকলেও দলের তৃণমূল পর্যায়ে তার রয়েছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা। দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দল, বিশিষ্টজনসহ সর্বস্তরের মানুষের কাছেও তার গ্রহণযোগ্যতার কমতি নেই। তবুও দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব তিনি। ভারমুক্ত হয় না তার ‘ভার’। নেতাকর্মীদের প্রশ্ন- আর কতো মামলা হলে, জেল খাটলে মির্জা ফখরুল ভারমুক্ত হবেন? বিএনপির রাজনীতিতে আর কতো পরীক্ষা তাকে দিতে হবে? আর যদি মির্জা ফখরুলকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব নাই বা করা হয়, তাহলে অন্য কাউকে কেন ওই দায়িত্ব দেয়া হয় না? দলের এটা অপূর্ণতা ও সাংগঠনিক দুর্বলতা।

প্রধান বিরোধী দলের পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব নিয়োগ না দেয়ায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একে দলের ‘দৈন্যতা’ হিসেবেই দেখছেন। অভিযোগ রয়েছে, বিএনপির নীতি-নির্ধারকদের একটি অংশের বিরোধিতার কারণেই মির্জা ফখরুলকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব করা হচ্ছে না।

তবে মির্জা ফখরুলকে আনুষ্ঠানিকভাবে দলের পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব করা না হলেও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু, যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপনসহ অনেক নেতাই তাকে ‘মহাসচিব’ হিসেবেই সম্বোধন করেন। মির্জা ফখরুল ও রিজভী কারাগারে থাকাবস্থায় দলের মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করেন রিপন। তখন নয়াপল্টনে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে আমরা মহাসচিব হিসেবে ধরেই নিয়েছি। আশা করি, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া অবিলম্বে তাকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব ঘোষণা করবেন।’

সূত্র মতে, চলতি মাসের শেষ দিকে অথবা ফেব্রুয়ারি মাসে বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হতে পারে। সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে সেখানেই মির্জা ফখরুলকে ‘ভারমুক্ত’ করে দলের পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব করা হতে পারে।

এর আগে, ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বিএনপির সর্বশেষ পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে দলের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পান খোন্দকার দেলোয়ার। তিনি মারা যাওয়ার পর ২০১১ সালের ২০ মার্চ মির্জা ফখরুলকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেয়া হলে তা নিয়ে দলে ব্যাপক ধূম্রজালের সৃষ্টি হয়। ওই সময় দলের প্রভাবশালী নেতাদের কেউ কেউ বলেন, দলীয় গঠনতন্ত্রে ‘ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব’ বলে কোনো পদ নেই। প্রকাশ্যেই তারা চেয়ারপারসনের ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলেন। এরই মধ্যে ২৭ মার্চ সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে আসেন খালেদা জিয়া।

দেশে ফিরে ৬ এপ্রিল দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠক ডাকেন। বৈঠক শেষে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘দলের গঠনতন্ত্রের পদ বিন্যাস অনুযায়ী সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন।’ সেই থেকে মির্জা ফখরুল ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ওই সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে নজরুল ইসলাম বলেন, ‘গঠনতন্ত্রে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের পদ না থাকলেও এতে কোনো সমস্যা হবে না। স্থায়ী কমিটি মির্জা ফখরুলকে এ দায়িত্ব দিয়েছে।’

তবে মির্জা ফখরুলকে ‘ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব’ করায় দলীয় চেয়ারপারসনের সিদ্ধান্তের বিরোধিতাকারীরা এখন তার ব্যাপারে ‘কিছুটা’ নমনীয়। তারা মির্জা ফখরুলের বিরুদ্ধে এখন আর প্রকাশ্যে বিরোধিতাও করতে সাহস পান না।

বিএনপির মহাসচিবরা

বিকল্পধারা বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব। এরপর ছিলেন কর্নেল (অব.) মোস্তাফিজুর রহমান (১৯৮৪-১৯৮৬), কে এম ওবায়দুর রহমান (১৯৮৬-১৯৯১), ব্যারিস্টার আবদুস সালাম তালুকদার (১৯৯১-১৯৯৬), আবদুল মান্নান ভূঁইয়া (১৯৯৬-২০০৭)। ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তাকে বহিষ্কার করা হলে খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন মহাসচিবের দায়িত্ব পান। তবে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি গঠিত হওয়ার পর থেকে কোনো মহাসচিবকে মির্জা ফখরুল ইসলামের মতো এতো জেল খাটতে হয়নি। আর ভারপ্রাপ্ত হিসেবে এতোদিন দলের দায়িত্বে থাকাটা রীতিমতো রেকর্ড!

জানতে চাইলে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দলের পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব করার বিষয়টি একেবারেই চেয়ারপারসনের এখতিয়ারভুক্ত। এ ব্যাপারে নেত্রীই সিদ্ধান্ত নেবেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলে আগাগোড়াই জনপ্রিয়, চেয়ারপারসনেরও অত্যন্ত বিশ্বস্ত। সে বিবেচনায় তিনি ‘ভারপ্রাপ্ত না ভারমুক্ত’-এ বিষয়টি দলে ঠিক সেভাবে বড় করে আসে না। তিনি দলের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। একাধিকবার জেল খেটেছেন। পার্টিকে এগিয়ে নিতে যা যা করণীয় তার সবই করছেন।’

দুদু বলেন, ‘খুব শিগগিরই দলের জাতীয় সম্মেলন হবে। এর মধ্য দিয়ে কমিটির অনেক কিছুই পরিবর্তন হবে। সেখানে মহাসচিবের বিষয়টিও আসবে। আশা করছি, সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে চেয়ারপারসন তাকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব করবেন।’