ব্যাংকের টাকা লুট মানুষ আতংকিত,উৎকন্ঠিত,নীরব সরকার

0

দেশের মানুষ আতংকিত,উৎকন্ঠিত একের পর এক দূর্ঘটনা ঘটেই চলেছে।এবার দেশের সবচেয়ে বড় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টাকা হ্যাক করে নিলো একটি চক্র।কিন্তু সরকারের পক্ষ হতে কোন বিবৃতি দেয়া হলো না।ব্যাংকের গভর্ণরেরও কোন মন্তব্য নেই।সরকারের উচ্চ মহল জড়িত না থাকবে তবে কেন তারা এটা গন মাধ্যমে প্রচার করলো না?কেন বিদেশী গনমাধ্যমের কাছে এ খবর জানলো দেশবাসী?অর্থ মন্ত্রী আবুল মাল মুহিত বলেছেন-তদন্তের স্বার্থে এটা জানানো হয়নি।তার কথার পরেও কথা থাকে,তার মানে দাড়ায় তারা এ বিষয় কিছু জানেন এবং এও জানেন দেশের কেউ জড়িত এবং সরকার দলের কোন উচ্চ পর্যায়েরই কেউ।ব্যাংকের টাকা হ্যাক নয় চুরি হয়েছে।সাধারন মানুষ এখন ব্যাংকে টাকা জমা করতে ভয়ে আছেন।
পুরান ঢাকা বাদামতলীর এক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন যাত্রাবাড়ীতে বসবাসকারী তোফায়েল আহমেদ। নিয়মিত একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে টাকা জমান তিনি। ব্যাংকিং খাতের সাম্প্রতিক ঘটনায় তিনি গভীর দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। উৎকণ্ঠার শেষ নেই তার।দুশ্চিন্তার বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, ব্যাংক থেকে টাকা যেভাবে গায়েব হয়ে যাচ্ছে, তাতে ব্যাংকে জমানো টাকা ফেরত পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ।তোফায়েলের মতো অনেকে গ্রাহক ব্যাংকের সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনায় উদ্বিগ্ন। তারা বলছেন,‘যেভাবে ব্যাংকের টাকা চুরি হচ্ছে, তাতে মানুষ ব্যাংক বিমুখ হয়ে পড়তে পারে। এমনকি নিজের জমানো টাকার জন্য উদ্বেগ উৎকণ্ঠা আরো বেড়ে যেতে পারে। এতে দেখা দিবে অস্থিরতা। গ্রাহকদের অভিযোগ, সংঘবদ্ধ জালিয়াতচক্র কর্তৃক বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের টাকা গায়েব, দুর্বল প্রযুক্তির কারণে ব্যাংকের এটিএম বুথে রাখা গ্রাহকের টাকা চুরি, নামসর্বস্ব কোম্পানির নামে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ব্যাংকের ভল্ট থেকেও কোটি কোটি টাকা চুরি হয়েছে। ব্যাংকে জমানো সাধারণ মানুষের টাকা নানা প্রক্রিয়ায় চুরি হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে ব্যাংকিং খাতের প্রতি মানুষের নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে বৈশ্বিকভাবে ব্যাংকিং খাতে জালিয়াতির ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অপরাধীদের সক্ষমতা। এতে উদ্বেগের মধ্যে পড়েছে ব্যাংক ও ব্যাংকের গ্রাহকরা। প্রযুক্তিগত অপরাধের ক্ষেত্রে ব্যাংকের কর্মকর্তা ও আর্ন্তজাতিক চক্র জড়িত থাকায় ঝুঁঁকির মধ্যে ফেলেছে গ্রাহকের অর্থ। গ্রাহদের পাশাপাশি অর্থনীতিবিদরাও মনে করছেন ব্যাংক খাতের কার্যকর নিরাপত্তা বাড়ানো জরুরি। সূত্র জানায়, হলমার্ক
কেলেংকারির ঘটনার পর ব্যাংকের ভল্ট থেকে টাকা চুরির ক্ষত শুকাতে না শুকাতে এটিএম কার্ড জালিয়াতির ঘটনায় যখন
ব্যাংকে গ্রাহকরা চরম উদ্বিগ্ন, ঠিক সে সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে টাকা চলে যাওয়া ঘটনা গ্রাহকদের উদ্বেগ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। রিজার্ভের অর্থ খোয়া যাওয়ার ঘটনায় খোদ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্ষদ সভায় অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ এ উদ্বেগ প্রকাশ বলেন, রিজার্ভের অর্থের মালিক অর্থ বিভাগ। এ কারণে তার জন্য এটা উদ্বেগের বিষয়। বড় অঙ্কের এ অর্থ খোয়া যাওয়ায় তিনি চিন্তিত, ব্যথিত ও উদ্বিগ্ন। কীভাবে এ অর্থ খোয়া গেল ও কেন গেল, তা নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্ষদ সভায় আলোচনা হয় এ অর্থ দ্রুত ফেরত আনা ও ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে সে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছি। পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান বলেন, ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে কাজ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সে দেশের এফআইইউ এ বিষয়ে মামলা করেছে। আশা করছি, সব অর্থ দ্রুততম সময়ে ফেরত আনা যাবে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ সব ধরনের নিয়মকানুন মেনে অর্থ ছাড় করেছে কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে। তিনি বলেন, কার কার
অ্যাকাউন্টে গেছে, সে অর্থ কোথায় ব্যবহার করেছে,সে বিষয়ে সেখানকার অ্যান্টি মানি লন্ডারিং বিভাগ কাজ করছে। এদিকে রিজার্ভের টাকা খোয়া যাওয়ার পর ব্যাংকিং খাতের প্রযুক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রযুক্তি নিরাপত্তা পণ্য নির্মাতা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান এইচপি (হিউলেট প্যাকার্ড এন্টারপ্রাইজ) সাইবার রিস্ক রিপোর্ট-২০১৬ এ উদ্বেগজনকতথ্য তুলে ধরেছে। এতে বলা হয়েছে, চলতি বছর সাইবার নিরাপত্তায় উন্নয়নশীল এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোয় সবচেয়ে বড় ঝুঁকি থাকবে ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে। রিপোর্টে উন্নয়নশীল এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর এটিএম বুথগুলোতে পুরনো সংস্করণের উইন্ডোজ এক্সপি ব্যবহার করায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এছাড়া রাশিয়ার প্রযুক্তি নিরাপত্তা পণ্য উৎপাদন ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যাসপারস্কির এক রিপোর্টে দেখা গেছে, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি কম্পিউটার ভাইরাস আক্রান্ত দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ।ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ব্যবহৃত কম্পিউটারের মধ্যে ৬০ দশমিক ৫৩ শতাংশ ২০ ধরনের বিপজ্জনক ভাইরাস আক্রান্ত। প্রসঙ্গত, উচ্চ প্রযুক্তি ব্যবহার করে গত ফেব্রুয়ারি মাসে দেশি-বিদেশি জালিয়াত চক্র সম্প্রতি ৫টি ব্যাংকের
এটিএম বুথ থেকে প্রায় অর্ধ শতাধিক গ্রাহকের টাকা তুলে নেয়। এছাড়া স্কিমিং ডিভাইস ব্যবহার করে আরও প্রায় ৩ হাজার গ্রাহকের তথ্য চুরি করে জালিয়াত চক্র। এছাড়া উচ্চ প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতারক চক্র ‘হ্যাক’ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের প্রায় ৮শ কোটি টাকা সরিয়েছে। ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকে রিজার্ভের অর্থ গত ৫ ফেব্রুয়ারি হ্যাক করে চীনের হ্যাকার গ্রুপ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক দাবি করেছে, চক্রটি হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে এ অর্থ সরিয়ে নিয়েছে শ্রীলংকা ও ফিলিপাইনে। শ্রীলংকায় সরিয়ে নেওয়া অর্থ এরই মধ্যে উদ্ধার করা গেছে।ধারণা করা হচ্ছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের কম্পিউটারের তথ্য চুরি করে হ্যাকাররা রিজার্ভের টাকা তুলে নিয়েছে। তবে ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেম বিষয়টি অস্বীকার করেছে।এছাড়া হলমার্ক ঋণ কেলেঙ্কারির মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক থেকে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছে প্রতারক চক্র।একইভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক থেকেও প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছে জালিয়াত চক্র। এছাড়া বিসমিল্লাহ গ্রুপসহ অর্ধশতাধিক ভুঁইফোড় কোম্পানি আরও কয়েক হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে তুলে নিয়েছে। এর বাইরে কিশোরগঞ্জে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে সোনালী ব্যাংকের ভল্ট থেকে প্রায় ১৭ কোটি টাকা চুরির চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে। কিশোরগঞ্জের ঘটনার দেড় মাস পর সুড়ঙ্গ কেটে চুরির ঘটনা ঘটে বগুড়ার আদমদীঘিতে। তার কয়েক মাস পর চাঞ্চল্যকর আরেকটি ডাকাতির ঘটনা ঘটে জয়পুরহাটে। ২০১৫ সালের এপ্রিলে আশুলিয়ায় দিন-দুপুরে ব্যাংক ডাকাতির ঘটনায় ব্যাংকের ম্যানেজারসহ আটজন নিহত হন।এর কয়েক দিন পরই যশোরে অগ্রণী ব্যাংকের গ্রিল কেটে ভল্ট ভেঙে ২১ লাখ টাকা নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, হলমার্কসহ বিভিন্ন ভুঁইফোড় গ্রুপ ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিয়ে যাওয়াতে যে ধরনের ক্ষতি হয়েছে, তার চেয়ে কয়েকগুন বেশি ক্ষতি হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে টাকা হাওয়া হয়ে যাওয়াতে।তিনি বলেন, ‘ঘটনাটি নিঃসন্দেহে চিন্তার বিষয়।বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে টাকা চলে যাওয়া। এটা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক ঘটনা।এই ধরনের ঘটনা মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে। কারণ, যারা বৈদেশিক মুদ্রা এদেশে পাঠায়, তারা এই ঘটনায় খুশি তো আর হবে না। তবে ম্যাক্রো ইকোনমির জন্য এই ঘটনা খুবই খারাপ নজির স্থাপন করবে। এ জন্য ব্যাংক
খাতের নিরাপত্তা বাড়ানো জরুরি। পরবর্তীতে এই ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে সে জন্য একটি স্বাধীন তদন্ত হওয়া দরকার।এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক সভাপতি ও বেসরকারি মেঘনা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল আমিন সাংবাদিকদের বলেন,এটিএমে ক্রমাগত জালিয়াতির ঘটনা আমাদেরকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। যদিও বিষয়টি এখনও খুব বড় আকারে হয়নি, তবুও এখনই কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। তিনি বলেন, ‘উদ্বিগ্ন হওয়ার সব চেয়ে বড় কারণ হলো, এসব জালিয়াতির সঙ্গে ব্যাংকের কর্মকর্তারা জড়িত। এছাড়া বিদেশি চক্র এখানে সক্রিয়।এদিকে বার্তা সংস্থা
রয়টার্স এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ৮০০ কোটি টাকা চুরি যাওয়ার ঘটনা তদন্তে যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার
নিরাপত্তা কোম্পানি ফায়ারআই ইনক ম্যানডিয়েন্ট ফরেনসিক বিভাগের সহযোগিতা নিচ্ছে বাংলাদেশ। সিলিকন ভ্যালিভিত্তিক যুক্তরাষ্ট্রের এই কোম্পানিটি এর আগেও বিশ্বের বেশ কয়েকটি বড় সাইবার চুরির ঘটনা তদন্ত
করেছে। বাংলাদেশ  ব্যাংকের অর্থ চুরির ঘটনা তদন্তে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড ইনফরমেটিক্স তদন্তের সঙ্গে ফায়ারআইকে
যুক্ত করেছে।ওয়ার্ল্ড ইনফরমেটিক্সের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে,বিশ্বব্যাংকের তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সাবেক উপ-প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাকেশ আস্থানার প্রতিষ্ঠাতা। রাকেশ আস্থানা এ তদন্তে সহযোগিতা করতে ফায়ারআইকে নিয়োগ করেছেন বলে স্পর্শকাতর এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কিছু সূত্র জানিয়েছে।কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিনিয়র একজন কর্মকর্তা বলেন, নিউইয়র্কের রিজার্ভ ব্যাংক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ হ্যাকাররা কীভাবে চুরি করেছে, তা তদন্তে সহযোগিতার প্রস্তাব
দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ের বড় ধরনের এ চুরির ঘটনা তদন্তের ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (এফবিআই) ও মার্কিন বিচার বিভাগের অনানুষ্ঠানিক আলোচনাও হয়েছে।