বেপরোয়া আওয়ামী এমপি আউয়াল,অন্যের জাহাজ নিজ নামে লিখে নেয়ার চেষ্টা

0
জিসাফো ডেস্কঃইউনিয়ন আওয়ামী লীগের এক নেতার সদ্য নির্মাণ করা জাহাজ নিজের নামে লিখিয়ে নেয়ার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে পিরোজপুর সদর আসনের এমপি একেএমএ আউয়ালের বিরুদ্ধে। নান্না মিয়া নামের ওই জাহাজ মালিককে মোবাইল ফোনে হুমকি এবং তার কাছ থেকে সাদা স্ট্যাম্পে সই নেয়া সংক্রান্ত আউয়ালের কথোপকথনের একটি রেকর্ড ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

জাহাজের মালিক পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার ৯নং কলার দোয়ানিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নান্না মিয়া জানান, ‘আমি এবং স্বরূপকাঠির ব্যবসায়ী রাজা মিয়া মিলে জাহাজটি তৈরি করেছি। এখন সেটি জোর করে নিয়ে নিতে চাইছেন এমপি আউয়াল।’ তবে এমপি আউয়ালের দাবি- ‘বিআইডব্লিউটিএর দালাল হিসেবে পরিচিত নান্না বিভিন্ন লোকের তৈরি করা জাহাজের কাগজপত্র করে দেয়ার কথা বলে আমার নাম ভাঙিয়ে বিভিন্নজনের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নিয়েছে। কাজ করে না দেয়ায় তারা আমার কাছে নালিশ করেছে। আমি তাকে ফোনে বলেছি এসব পাওনাদারের ঝামেলা ফয়সালা করে তারপর জাহাজ নামাতে। এখানে মালিকানা লিখিয়ে নেয়ার যে অভিযোগ করা হয়েছে, তা সত্য নয়।’

পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সদর আসনের এমপি আউয়াল এবং নান্না মিয়ার কথোপকথনের রেকর্ড প্রথম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসে ৫ মে শনিবার। অডিও রেকর্ডে শোনা যায় যে, এমপি আউয়াল ফোনে নান্না মিয়াকে শাসাচ্ছেন। জাহাজ তৈরির কাজ প্রায় শেষপর্যায়ে জানিয়ে এখন জাহাজ পানিতে নামানো দরকার বললে এমপি আউয়াল তাকে অশ্লীল ভাষায় গালি দিয়ে জাহাজের কাছে যেতে নিষেধ করেন। পরে ফোনে সেখানে থাকা স্বরূপকাঠি পৌর যুবলীগের সভাপতি শিশির এবং পৌরসভার অ্যাকাউন্টস বিভাগের কর্মচারী লালনকে নান্নার কাছ থেকে সাদা স্ট্যাম্পে সই রাখতে বলেন। এ সময় এমপি আউয়াল বলেন, ‘জাহাজ আমার, এই জাহাজ নামবে না।’

অডিও রেকর্ডের বিস্তারিত:

নান্না : আসসালামালেকুম ভাইজান

আউয়াল : কী ব্যাপার, শবেবরাতের দিন তুমি আবার কী বিরক্ত কর?

নান্না : ভাইজান, শিশির ভাই আইছে।

আউয়াল : জাহাজ নামবে না, নামবে না জাহাজ।

নান্না : জাহাজের নিচের পিলার পুলার ফাইড্ডা গেছে। হেইগুলা একটু ঠিকঠাক করার পরে আমনে আইলে নামামু।

আউয়াল : সব যায় যাউক, জাহাজ নামবে না। আমি আসব, ফয়সালা অইবে, তারপর দেখা যাবে।

নান্না : আচ্ছা ঠিক আছে, আপনে আইবেন তারপর জাহাজ নামামু।

আউয়াল : নামাবা ঠিকই কিন্তু জাহাজের কাছেও আসবা না।

নান্না : তাইলে শিশিরকে একটু কইয়া দেন।

এরপর নান্না নিজের মোবাইল ফোন এমপি আউয়ালের পাঠানো ক্যাডার শিশিরকে ধরিয়ে দেন।

আউয়াল : হালারপো হালারে ধইর‌্যা চোফার (থাপ্পর) দিয়া দে। দিয়া কবি তুই আর স্বারূপকাঠি আবি না। কঠিনভাবে দিবি। হালার এতবড় সাহস অইয়া গেছে, আমার লগে দুই নম্বরি করে।

এরপর আরেক ক্যাডারকে আউয়াল : দেখ ও যা কয়, হেডা যদি ঠিক অয় তাইলে ঠিক কর, ঠিক কইর‌্যা কবি তুই আর স্বরূপকাঠি আবি না… কঠিনভাবে দিবি আর বলবি স্বরূপকাঠি আর আবি না। খয়রাতি ছিল, ওর মতো লোক আমার সাথে দুই নম্বরি করতে সাহস পায়?

এরপর মোবাইল ফোন লালনকে দিতে বলেন এমপি আউয়াল।

লালনের উদ্দেশে আউয়াল : কাজ লাগলে করা, কিন্তু জাহাজ নামবে না। কাজ করা, তোর লগে খাতির অউক। কি কইছি কতা বুঝো নাই। কাজ লাগলে কর। ও জাহাজ নামবে না। জাহাজ আমার।

আবার আউয়াল : একটা কাজ কর, সাদা স্ট্যাম্প আইন্না হালারপো হালারে জাইত্যা ধইর‌্যা সই ল। সই দেয়ার পর ওরে চিত কইরা থো। ব্যাগ ডেটে, ব্যাগ ডেটে সই লবি। ও যদি কোথাও কমপ্লেইন করে তাইলে ডেটে যেন মেলে না।

কেউ যেন দেহে না, ও আবার শোনে নাকি? সবই তো কইতে আছি- এরপর আউয়ালের হাসি…।

লালন : না না, আমরা দূরে আইছি, শোনে না।

পরে আরেকটি অডিও রেকর্ডিংয়ে নান্নাকে অশ্লীল গালি দিয়ে আউয়াল বলেন : তোরে লাল দালানের (জেলখানা) ভাত খাওয়ামু। দেহি তোরে কোন ঠাকুর দাদা কোন বাপে আইসা ঠেকায়। আমি বাপের পোলা হইলে তোরে লাল দালানে না ঢুকাইয়া ছাড়তেছি না। দাঁড়া তোরে ঢাকা থিকাই আমি ধরাইয়া দিমু। এরপর মোবাইল ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়।

নান্না মিয়া যুগান্তরকে বলেন, ‘২ মে বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শিশির, লালন এবং স্বরূপকাঠি পৌর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক রাজিব এসে এমপি (আউয়াল) সাহেবের কথা বলে আমাকে জাহাজের কাছে যেতে নিষেধ করে। তারা আমাকে ফোন দিয়ে এমপি সাহেবের সঙ্গে কথা বলতে বলে। এমপি সাহেবকে ফোন দিলে তিনি আমাকে নানা হুমকি দিয়ে জাহাজের কাছে যেতে মানা করেন।’ সদ্য নির্মিত ওই জাহাজটির মালিকানা সর্ম্পকে জানতে চাইলে নান্না বলেন, ‘আমি এবং স্বরূপকাঠির ব্যবসায়ী রাজা মিয়া মিলে জাহাজটি তৈরি করেছি। এখন সেটি পানিতে নামানোর সময় হয়েছে। আর ঠিক এ সময়ই এমপি সাহেব সেটি নামাতে বাধা দিচ্ছেন। এখন তিনি আমার জাহাজ তার নামে লিখিয়ে নেয়ার জন্য হুমকি-ধামকি দিচ্ছেন।’

কথোপকথনের রেকর্ড ভাইরাল হওয়ার পর বর্তমানে প্রাণহানির সংশয়ে ভুগছেন জানিয়ে নান্না মিয়া বলেন, ‘এমপি সাহেবের কাছে আমি অনেক টাকা পাই। এলজিইডির একটা কাজে আমি তাকে ২০ লাখ টাকা দিয়েছি। আমাকে সেই টাকা তিনি ফেরত দেননি। স্বরূপকাঠিতে আমি এ পর্যন্ত চারটি জাহাজ বানিয়েছি। এসব জাহাজ বানাতে ৭-৮ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। আজ তিনি আমার জাহাজ জোর করে নিজের নামে লিখিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছেন।’

এ ঘটনায় থানা পুলিশে কোনো জিডি কিংবা অভিযোগ করেছেন কিনা- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি এখন ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। জিডি কিংবা অভিযোগ করার সুযোগ পাচ্ছি না।’

অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে এমপি আউয়াল বলেন, ‘আমি একবারও বলিনি যে জাহাজ আমার। এই লোককে তো আমি শেল্টার দিয়ে এ পর্যন্ত এনেছি। আগে তাকে সবাই ডাকত চুছড়া নান্না। সে বাজারে বাজারে ঘুরে চুছড়া মাছ বিক্রি করত। সব মিলিয়ে ২ হাজার টাকা পুঁজিও ছিল না। আপনারা খোঁজ নিয়ে দেখেন যে, সে কিভাবে এত অল্পসময়ে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছে। নান্নার মতো একটা লোক দুইটা পার্সোনাল গাড়ি ম্যান্টেন করে কিভাবে? তার এত ধন-সম্পদের উৎস কী? সে নৌপরিবহন অধিদফতরের দালালি করে। বিভিন্ন লোকজন যেসব জাহাজ বানায় তার শুরু থেকে শেষপর্যন্ত সব পারমিশন এবং কাগজপত্র করিয়ে দেয়। ঘুষ-দুর্নীতির দায়ে বর্তমানে দুদকের মামলার আসামি সাবেক চিফ ইঞ্জিনিয়ার ফখরুলের খাস লোক সে। কোটি কোটি টাকা খরচ করে জাহাজ বানানোর টাকা সে কোথায় পেল? এখন সে রাজার কথা বলে পার পাওয়ার চেষ্টা করছে। আমি মানুষের উপকার করার চেষ্টা করেছি। কোনো অন্যায় করিনি।’

বিষয়টি নিয়ে আলাপকালে পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হাকিম হাওলাদার বলেন, ‘এখানে জেলা আওয়ামী লীগ কিংবা এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের কেউ এখন আর এমপি আউয়ালের সঙ্গে নেই। তার এ সমস্ত অনিয়ম দুর্নীতির প্রতিবাদ জানাতেই আমরা তার সঙ্গ ত্যাগ করেছি।’

এমপি আউয়ালের সহোদর এবং পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি পৌর মেয়র হাবিবুর রহমান মালেক বলেন, ‘এসব কারণেই আপন ভাই হওয়া সত্ত্বেও তার সঙ্গে থাকতে পারিনি। অবৈধ দখল এবং অন্যায় দুর্নীতির কারণে একে একে সবাই তাকে ছেড়ে গেছে। আমি নান্নাকে বলছি যে, এমপি আউয়ালের বিরুদ্ধে থানা পুলিশে অভিযোগ করেন। যতরকম সাপোর্ট দেয়ার দরকার তা আমরা দেব।’

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় আইনবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট স ম রেজাউল করিম বলেন, ‘উনি (এমপি আউয়াল) বহুবার হজ করেছেন। উনার মুখ থেকে এ ধরনের অশ্লীল গালাগাল সত্যিই লজ্জাজনক। এ ঘটনায় কেবল তিনি নিজেকেই ছোট করেননি, আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ণ করেছেন।’