বেগম খালেদা জিয়া- গৃহবধূ থেকে দেশনেত্রী এবং আপোষহীন নেত্রী

0

জিয়াউর রহমান শহীদ হবার পর দলটিতে উদ্ভুত জটিল অবস্থা শারীরিক ভাবে অসুস্থ বর্ষীয়ান নেতা জাস্টিস সাত্তারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ফলে CMH-এ চিকিৎসাধীন থাকা কালেই ক্ষমতুতর জেনারেল এরশাদ অতি সহজেই তাকে পদত্যাগে বাধ্য করে নিজেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে নেন। ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই তিনি বিএনপির সব ব্যাংক একাউন্ট বাজেয়াপ্ত করে ফেলার হুকুম জারি করেন। এরপর পার্টির সব কর্মকাণ্ড প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।

পার্টির শোচনীয়অবস্থায় জেনারেল এরশাদের ঘোষিত জাতীয়পার্টিতে যোগদানের হিড়িক পরে যায় বিএনপির নেতাদের। ফলে পার্টি হিসাবে বিএনপির অস্তিত্বই প্রায় বিলীন হবার উপক্রম হয়।

সেই সন্ধিক্ষণে জেনারেল নুরুল ইসলাম শিশুর মধ্যস্থতায় গুটিকয়েক সিনিয়র নেতা, ছাত্রদল এবং যুবদলের কিছু ত্যাগী তরুণ নেতা-কর্মী গৃহবধূ বেগম খালেদা জিয়াকে অনেক চেষ্টা করে পার্টির চেয়ারপার্সন বানাতে রাজি করাতে সক্ষম হয়। এতে পার্টির অস্তিত্ব টিকে যায়। পার্টিকে পুনর্গঠনের সম্ভাবনাও সৃষ্টি হয়। শিশুভাই জেনারেল এরশাদ সম্পর্কে বিশেষভাবে অবগত ছিলেন বিধায় হয়তো মনে করেছিলেন জাতীয় স্বার্থে তার সিদ্ধান্তই ছিল সঠিক।

মধ্যপ্রাচ্যের তেল সমৃদ্ধ কয়েকটি দেশের কর্ণধারেরা জিয়ার সাথে তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের সুবাদে তার স্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে আর্থিক সাহায্য ছাড়াও সার্বিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।তারা জেনারেল এরশাদকেও হেদায়েত প্রদান করেন যাতে জিয়ার দলের উপর অন্যায় অবিচার এবং জোর জুলুম না করা হয়।

সেই সময় বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেকাংশে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ ধনী দেশগুলোর উপর নির্ভরশীল বিধায় তাদের হেদায়েত অনিচ্ছা সত্ত্বেও জেনারেল এরশাদকে মেনে নিতে হয়। পর্যায়ক্রমে বিএনপির ব্যাংক একাউন্টগুলোও খুলে দিতে হয়েছিলো প্রেসিডেন্ট এরশাদকে। এ সবের পরও ভারত জেনারেল এরশাদকে আশ্বস্ত করেছিলো, যে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সহযোগিতা এবং সমর্থনে এরশাদ অবশ্যই প্রেসিডেন্সিয়াল এবং পার্লামেন্টারি নির্বাচনে জিতবেন।

বেগম খালেদা জিয়া কিছুতেই এতো অল্পসময়ে ঘর সামলে জেনারেল এরশাদ এবং আওয়ামী লীগের মোকাবেলা করতে সমর্থ হবেন না। এরপরও জেনারেল এরশাদ আশ্বস্ত হতে পারছিলেন না তার ক্ষমতায় টিকে থাকার বিষয়ে।কারণ, জেনারেল মঞ্জুরের হঠকারি অভ্যুত্থান এবং প্রেসিডেন্ট জিয়ার মৃত্যুর সুবাদে কারাপ্রকোষ্ঠে তড়িঘড়ি করে ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসারের ক্যামেরা ট্রায়াল সেরে তাদের ফাঁসি দেয়া এবং বিনাবিচারে জেনারেল মঞ্জুরকে বন্দী অবস্থায় সুচিন্তিত ভাবে হত্যার ফলে সামরিক বাহিনী এবং জনগণের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া এবং ধূমায়িত ক্রোধক্রমশদানাবেঁধেউঠতে থাকে।সেটাই ছিল পাকিস্তান প্রত্যাগত জেনারেল এরশাদের মাথাব্যথার প্রধান কারণ।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জেনারেল এরশাদ জিতলেন আওয়ামীলীগ সমর্থিত প্রার্থী হয়ে।

পীর হাফেজ্জি হুজুর দ্বিতীয় এবং কর্নেল ফারুক তৃতীয় স্থান লাভ করে।সংসদীয় নির্বাচনে জেনারেল এরশাদের জাতীয়পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। ফ্রিডমপার্টি ১টি সিট লাভ করে, মেজর বজলুল হুদা (ফ্রিডম পার্টির সেক্রেটারি জেনারেল)। বিএনপি দুটো নির্বাচনই বয়কট করে।

আওয়ামীলীগএবংজামায়াতেইসলামী নির্বাচনেঅংশগ্রহণ করে। জামায়াত কনোও আসনে জিততে ব্যর্থ হয়। শেখহাসিনা বিরোধীদলীয় নেতার আসন অলংকৃতকরেন। এভাবেই বন্দুকের জোরে ক্ষমতা দখলকারী ভারতের দালাল জেনারেল এরশাদ আওয়ামী লীগের সমর্থনে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে রাষ্ট্রীয়ক্ষমতা উপভোগ করতে সক্ষম হন গায়ে গণতন্ত্রের লেবাস পরে।আমাদের অনুমানকে সঠিক প্রমানিত করলেন জেনারেল এরশাদ।

রাষ্ট্র পরিচালনা করতে থাকেন জেনারেলএরশাদ।ফলে, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অপশাসন, শোষণ, নিপীড়ন তৃণমূল থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সর্বক্ষেত্রে ক্যান্সারেরমতো ছড়িয়েপড়তেথাকেদ্রুত। দূষিত হয়ে ওঠে দেশের রাজনীতি। এরশাদ আর হাসিনার চাপে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন জিয়ার প্রতিষ্ঠিত বিএনপি দলের তখনখুবই করুণ হাল। সুযোগ সন্ধানী বাস্তুঘুঘুদের বিবর্জিত শূন্য খাঁচা পাহারা দিচ্ছেন তখন গৃহবধূ খালেদা জিয়া।প্রতিদিন গুটিকতক তরুণ নেতা-কর্মীর সাথে পার্টি অফিসে বসেন পার্টির চেয়ারপার্সন।

তার সেই দুঃসময়ে তারপাশে যারা ছিল তাদের মধ্যে বি চৌধুরী, সাইফুর রহমান, মীর্জা গোলাম হাফিয, যাদু মিয়া, মোস্তাফিজুর রহমান, তরিকুল ইসলাম। তরুনদের মধ্যে গয়েশ্বররায়, মীর্জা আব্বাস, খোকা, সাঈদ,বুলু, মাহফুজ, আলাল, রিজভী, খোকার নাম উল্লেখযোগ্য। বদরুদ্দোজা চৌধুরী,কর্নেল ওলি এবং অন্যরা মাঝেমধ্যে পার্টি অফিসে আসা যাওয়া করতেন।

দেশবাসী ক্রমশ এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে থাকে। দেশব্যাপী এরশাদবিরোধী আন্দোলন দানাবেঁধে উঠতে থাকে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে।জেনারেল এরশাদ এবং তার দলের জনপ্রিয়তায় দ্রুত ধস নেমে আসতে থাকে।সেইসময় দেশের ধর্মীয় মূল্যবোধেবিশ্বাসী এবং জাতীয়তাবাদী আমজনতা বেগম খালেদা জিয়ার দিকেই চেয়েছিলো এরশাদ বিরোধী গণচেতনাকে সংগঠিত করে এরশাদ বিরোধী রাজনৈতিক গণআন্দোলন গড়ে তুলতে।এরফলে নতুন করে জীবনীশক্তি ফিরে পায় বিএনপি।আর এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে বেগম খালেদা জিয়া হয়ে ওঠেন “দেশনেত্রী”।

১৯৮৬ সালে জেনারেল এরশাদ যখন নির্বাচনের ব্যবস্থা করছিলেন তখন দেশের বড় দুই দল আওয়ামীলীগ এবং বিএনপির মধ্যে একটা সমঝোতা হয় যে এই দুই বড় দল জেনারেল এরশাদের অধীনে কোন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেনা।এই সমঝোতার পর লাল দীঘির ময়দানে এক জন সভায় দর্পভরে হাসিনা এলান করে, “যে এরশাদের নির্বাচনে অংশ গ্রহন করবে তাকে জাতীয় বেঈমান বলে আখ্যায়িত করা হবে।“

কিন্তু নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তেসেই সমঝোতা ভঙ্গ করে জেনারেল এরশাদের সাথে শেখ হাসিনা একরাতে গোপন লংড্রাইভ থেকে ফিরে দেশবাসীকে হতবাক করে ঘোষণা দিলেন আওয়ামীলীগ নির্বাচনে অংশ নেবে।নিয়েও ছিল যৌথআন্দোলনের পিঠে ছুরি মেরে।জামায়াতে ইসলামী ও নির্বাচনে অংশ নেয়।

বিএনপি সেই নির্বাচন বয়কট করার সিদ্ধান্তে অটল থাকে।তখন থেকে দেশ বাসী বেগম খালেদা জিয়াকে আপোষহীন নেত্রী হিসাবে আখ্যায়িতকরে। বলা হয়ে থাকে, সেই মোহনীয় রাতে লংড্রাইভে জেনারেল এরশাদ হাসিনাকে দিয়েছিলেন ১৭কোটি টাকা নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তের জন্য।

এরশাদ বিরোধী আন্দোলন যতই বেগবান হতে থাকলো ততই বেগম খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তাও বৃদ্ধি পেতে লাগলো।

সুত্র

যা দেখেছি যা বুঝেছি যা করেছি

কর্নেল শরিফুল হক ডালিম রচিত