বুড়িগঙ্গা দখল বাণিজ্যে !

0

ঢাকা :  নদ-নদী ও জলাভূমি উদ্ধারে সরকারে ঘোষণা এবং হাইকোর্টের নির্দেশনা কোনো কিছুই আমলে নিচ্ছে না অবৈধ দখলদাররা। আগের মতোই পেশিশক্তির জোরে বিভিন্ন নদীর তীর দখল করে রেখেছে তারা। আর এ কাজে তাদের সহায়তা করছেন খোদ বিআইডব্লিউটিএ’র বন্দর বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা। ফলে অবৈধ দখলে চলে যাচ্ছে রাজধানীর কোল ঘেঁষে প্রবাহিত বুড়িগঙ্গা নদী। সদরঘাট বুড়িগঙ্গা নদীর তীর এলাকা ঘুরে ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, নদীর তীরের বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা পাঁচ শতাধিক অবৈধ স্থাপনা থেকে বছরে অন্তত ১ কোটি ২০ লাখ টাকা আদায় করা হচ্ছে। এই অসাধু প্রক্রিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) একশ্রেণির কর্মকর্তা ও কর্মচারী এবং কিছুসংখ্যক পুলিশ সদস্য জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে নদীর দুই তীর অবৈধ দখলমুক্ত করতে বিভিন্ন সময় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হলেও গত বেশ কিছুদিন তা বন্ধ রয়েছে।

অভিযোগ রযেছে, দখলবাজ এই চক্রের সুবিধার্থে অবৈধ দখল উচ্ছেদে সম্প্রতি হাইকোর্ট থেকে আরও ৬ মাসের সময় চেয়ে নেয়া হয়েছে। আর এই সুযোগে অবৈধ দখলদার ভূমিদস্যু ও নদীখেকো চক্র পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।

বুড়িগঙ্গার বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা গেছে, বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু (প্রথম বুড়িগঙ্গা সেতু) সংলগ্ন শ্যামবাজার, পোস্তগোলা এলাকায় দুই শতাধিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে। অথচ এসব অবৈধ স্থাপনা কয়েক দফায় ভেঙ্গে ফেলা হয়। এরপরও কোনো এক অদৃশ্য ইশারায় আবার নতুন করে ত্রিপল টানিয়ে গড়ে উঠেছে এসব অবৈধ স্থাপনা। এসব স্থাপনায় চলছে ফল, সবজির আড়ৎ, হোটেল, চায়ের দোকান, ইট, বালু, সিমেন্ট ও মাটির রমরমা ব্যবসা।

নদীর দক্ষিণ পাড়ের আঁটি ও খোলামোড়া থেকে শুরু করে জিনজিরা, কালিগঞ্জ, মাদারীপুর, লসমনগঞ্জ, বরিশুর, মান্দাইল, আগানগর, পার গেন্ডারিয়া, মিরেরবাগ ও হাসনাবাদ এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে উল্লেখ্যযোগ্য সংখ্যক টংঘরসহ চার শতাধিক কাঁচাপাকা স্থাপনা।

অনুসন্ধানকালে অভিযোগ পাওয়া গেছে, পুলিশ ও বিআইডব্লিউটিএ’র একশ্রেণির কর্মকর্তা ও কর্মচারী এসব অবৈধ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত আর্থিক সুবিধা নিয়ে থাকেন। নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, প্রতিটি টংঘর থেকে মাসে দুইশ টাকা থেকে সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা এবং অন্যান্য স্থাপনা থেকে আয়তন ও স্থানের গুরুত্ব ভেদে পাঁচশ’ টাকা থেকে সর্বোচ্চ তিন হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়ে থাকে।

সরেজমিনে অনুসন্ধানে এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগানগর থেকে শুরু করে হাসনাবাদ পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদীর পাড়ে একাধিক প্রভাবশালী মহল বালি ব্যবসা শুরু করেছে।

 সদরঘাট বন্দর সংলগ্ন লালকুটির ঘাট এলাকায় উচ্ছেদের পরও এভাবে ত্রিপল টানিয়ে অবৈধভাবে দখলে রেখেছে নদীর পাড়

অপর একটি সূত্র জানায়, এসব ব্যবসায়ীরা ভলগেটের মাধ্যমে বালি এনে তা নদীর তীরে খালাস করছে। দীর্ঘমেয়াদি এই প্রক্রিয়ার ফলে নদীর পাড় ভেঙে তা নদীগর্ভে পড়ছে এবং ভরাট হচ্ছে নদী। এই ভরাটকৃত স্থানসহ নদীর যেসব স্থানে পানির গভীরতা ও প্রবাহ কম সেসব স্থানে আয়তাকারে বাঁশ, খুঁটির বেড়া দিয়ে ঘিরে চৌহদ্দির মধ্যে ভাঙা ইট, বালির বস্তা ও মাটি ফেলে ভরাট করা হচ্ছে। আর এভাবে ভরাটকৃত স্থান দখল করে নতুন নতুন অবৈধ স্থাপনা গড়ে তোলো হচ্ছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।

এ ব্যাপারে কামরাঙ্গীরচর এলাকার বাসিন্দা হীরক পাশা চৌধুরী জানান, শারীরিক সুস্থতার জন্য তিনি গত পাঁচ বছর ধরে প্রতিদিন ভোরে কিংবা বিকেলে বুড়িগঙ্গার তীরে অন্তত চার কিলোমিটার পথ হাঁটাহাঁটি করেন। বিভিন্ন স্থানে শত শত ট্রাক বালি বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া যেখানে সেখানে টংঘরসহ বিভিন্ন ধরনের দোকানপাট নির্মাণ করে ভাড়া দেয়া হয়েছে। অনেকক্ষেত্রে অবৈধ ভবনের ভাড়া অংশ পুররায় নির্মাণ করা হয়েছে।

দেখা গেছে, হাজারীবাগের কাছে বুড়িগঙ্গামুখী একটি খাল পুরোপুরি অবৈধ দখলে চলে গেছে। প্রতিদিনই এখানে দখল হয়ে যাচ্ছে নদীর কোনো না কোনো অংশ। প্রভাবশালীদের উদ্যোগে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বালু উত্তোলনসহ নদী ভরাটের কাজও চলছে প্রকাশ্যে। ভরাটকৃত অনেক স্থানেই নির্মাণ করা হচ্ছে পাকা ভবন, শিল্প-কারখানাসহ কাঁচা-পাকা বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা। এসব স্থাপনায় গড়ে তোলা হচ্ছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

লালবাগের ব্যবসায়ী মাসুদুল হক অভিযোগ করেন, বুড়িগঙ্গার অবৈধ দখল ঠেকাতে বিআইডব্লিউটিএ ও ঢাকা জেলা প্রশাসকসহ সরকারের বিভিন্ন মহলে অনেকবার আবেদন করেও কোন কাজ হয়নি। উপরন্তু প্রতিবাদ কিংবা অভিযোগ করায় অবৈধ দখলদারদের রোষানলে পড়তে হয়েছে।

জানা গেছে, গত তত্বাবধায় সরকারের আমলের প্রথম দিকে নদীখেকোদের অপতৎপরতা কিছুদিন বন্ধ থাকলেও বর্তমানে তা আবারও পুরোদমে শুরু হয়েছে। হলে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর কয়েক দফায় উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে। কিন্তু এক দিকে উচ্ছেদ করে করলে অপরদিক থেকে আগের মতোই দখল হয়েছে নদীর তীর।

বিআইডব্লিউটিএ’র বন্দর বিভাগের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও জড়িত বলে অভিযোগ করেন তিনি।

হাজারীবাজের বাসিন্দা শরাফাত আলী হিরা বলেন, ভূমিদস্যুরা প্রশাসনের নাকের ডগায় বুড়িগঙ্গা দখল করলেও অদৃশ্য কারণে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।

এ সব অভিযোগ সম্পর্কে বিআইডব্লিউটিএ’র সদরঘাট বন্দর  বিভাগের যুগ্ম পরিচালক মো. গুলজার আলী বলেন, নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান ও বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান কমডোর মোজাম্মেলন হক-এর মৌখিক অনুমতি আছে দখলদারদের রাখার পক্ষে। চলতি বর্ষা মৌসুম পর্যন্ত তারা দখলে থাকবে। এরপর উচ্ছেদ হবে।

দখলদারদের কাছ থেকে অবৈধ আয়-উৎকোচের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এসব অভিযোগ যারা করেছেন তারা মিথ্যাচার করছেন। তারপরও এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে চাইলে চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।’

গুলজার আলীর বক্তব্যের বিরোধিতা করে স্থানীয় পরিবেশবাদী ও ব্যবসায়ী নয়ন মোল্লা বলেন, ‘বুড়িগঙ্গা ঢাকা নদীবন্দরের অধীন। তাই এটার মূল রক্ষার দায়িত্ব বিআইডব্লিউটিএ’র বন্দর শাখার। কিন্তু বন্দর শাখার শীর্ষ কর্মকর্তারা এতটাই অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত যে, তারা রক্ষক হয়ে এখন ভক্ষকের ভূমিকা পালন করছেন।’