বীরত্ব সূচক পদক পাওয়া বিডিআর কর্মকর্তা সৈয়দ কামারুজ্জামানের করুন বাহিনী

0

এইবার নিয়ে ৮ম বারের মত “সশস্ত্র বাহিনী দিবস” এ দাওয়াত পেলাম না, যা আগামী ২১ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে সেনাকুঞ্জে অনুষ্ঠিত হবে। মহান সশস্ত্রবাহিনী দিবস। এই দিবসে সশস্ত্রবাহিনীর প্রাক্তন ও চাকুরীরতদের মধ্যে আলাপচারিতার এক মহা সুযোগ এনে দেয়। দাওয়াতের তালিকা অনুযায়ী আমি দুইভাবেই নিমন্ত্রণ পাওয়ার যোগ্য – প্রথমতঃ অবসর প্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা হিসেবে এবং দ্বিতীয়ত বীরত্ব সূচক রাষ্ট্রীয় খেতাবপ্রাপ্ত অফিসার হিসেবে। কিন্তু জানিনা কি কারণে আমি দাওয়াত পাইনা বা পাচ্ছিনা।

যে সশস্রবাহিনীর জন্য জীবন যৌবন উৎসর্গ করেছি কিন্তু সেই “সশস্রবাহিনী দিবসে” আমার অবস্থান দিনে দিনে গৌণ হয়ে যাচ্ছে। এটা ঠিক যে সেনাকুঞ্জের “সশস্ত্রবাহিনী দিবস” অনুষ্ঠানে আমাকে নিমন্ত্রণ করলেই বা কি আর না করলেই বা কি এতে অন্যদের কিছু যাই আসেনা!—প্রশ্ন সেখানে না! প্রশ্নটি হচ্ছে কেন পাবো না?———— তাহলে কি আমি দেশদ্রোহী? না কি সন্ত্রাসী? না আমি জঙ্গি? এগুলোর সাথে জড়িত থাকলে দাওয়াত পাওয়ার কোন প্রশ্নই উঠেনা! আমি একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা কিন্তু আমাকে কোন কারণ প্রদর্শন ব্যাতিরেকেই বছরের পর বছর নিমন্ত্রন থেকে বঞ্চিত রাখা হচ্ছে।

সকল সামরিক কর্মকর্তাগণ তাঁদের জীবনের উৎকৃষ্ট সময় যৌবনকাল এই দেশের জন্য উৎসর্গ করেন। জীবনের ২৯ টি স্বর্নালী বৎসর যে সেনাবাহিনীর জন্য উৎসর্গ করেছি, আজ অবসরে এসে নিজেকে মূল্যায়ন করলে দেখি মূলহীন হয়ে গেছি। আমার অবসর জীবনে এটুকু ধারনা হয়েছে যে, সেনাবাহিনী থেকে অবসর মানে আমি একজন অপাংতেয় ব্যক্তি অবশ্য সবার ক্ষেত্রে অপাংতেয় শব্দটি প্রযোজ্য নয়। যখন নিজ ঘরেই অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের সন্মান নাই সেখানে সিভিল প্রশাসন কর্তৃক সন্মান দিবার কথা নাইবা ভাবলাম।

বিগত ২৪শে ফেব্রুয়ারী ২০০৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক পিলখানা প্যারেড গ্রাউন্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) এর সর্বোচ্চ বীরত্ব সূচক পদক “বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড পদক” (বিজিবিএম) পদকটি আমাকে নিজ হাতে পরিয়ে দেন। সীমান্ত সংঘর্ষে উপস্থিত বুদ্ধি, অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বপূর্ণ কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ আমাকে বিজিবির বীরত্ব সূচক রাষ্ট্রীয় খেতাব টি প্রদান করা হয়।

“বল বীর চির উন্নত মম শীর” এই বীরের উপাধি বা খেতাব নিয়ে কি লাভ? বিগত ১৬ এপ্রিল ২০০৫ তারিখে আখাউড়া সীমান্তে প্রতিবেশী দেশ কর্তৃক সশস্ত্র বিএসএফ সদস্যের দল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সীমান্তবর্তী হীরাপুর গ্রামে অনুপ্রবেশ করে। অনুপ্রবেশকারী বিএসএফ সদস্যগণ ভারতীয় নাগরিকদের সহায়তায় হিরাপুর গ্রামে ব্যাপক লুটতরাজসহ নিরীহ নারী ও শিশুদেরকে মারধর করে। গ্রামবাসী বাধা দিলে বিএসএফ গুলি বর্ষণ শুরু করে এবং গ্রাম দখল করে রাখে। বাংলাদেশী নাগরিকদের সশস্ত্র বিএসএফ এর কবল থেকে গ্রামবাসীদের উদ্ধার এবং বিএসএফ কে বাংলাদেশের ভূখন্ড থেকে বিতাড়িত করার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঐ সময় বিএসএফ এর সাথে সম্মুখ সংঘর্ষে অংশগ্রহণ করি। আমার নেতৃত্বে বিডিআর ও বিএসএফ এর মধ্যে প্রায় ৪/৫ ঘন্টা তীব্রভাবে গুলি বিনিময় হয়। গুলি বিনিময়ের এক পর্যায়ে বাংলাদেশ সীমান্তের অভ্যন্তরে অনুপ্রবেশকারী বিএসএফ এর কোম্পানী কমান্ডার, এ্যাসিটেন্ট কমান্ড্যান্ট শ্রী জীবন কুমার গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন এবং কনষ্টেবল কে কে সুরেন্দার গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতরভাবে আহত হয়। সেই সাথে সশস্ত্র বিএসএফ দল কোম্পানী কমান্ডারের লাশ ও আহত কনষ্টেবল কে ফেলে রেখে বাংলাদেশের ভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য হয় এবং তাদের কবল থেকে বাংলাদেশী নাগরিকদের জানমাল রক্ষা পায়।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত বীরত্ব সূচক সর্বোচ্চ সম্মান বা পদক বা খেতাব পেয়ে কি লাভ হলো? লাভ হয়েছে নিম্নরূপ:

১. বিডিআর বর্তমানে বিজিবি’র কোন অনুষ্ঠানে দাওয়াত না পাওয়া।

২. সম্মানী ভাতা না পাওয়া।

৩. অবসরের পর থেকে অদ্যবধি ২১ নভেম্বর এর সশস্ত্র বাহিনী দিবস বা অন্য কোন সামরিক অনুষ্ঠানে এমন কি সিগন্যাল কোরের রি-ইউনিওন এর ও দাওয়াত পাইনি।

৪. মানবাধিকার লঙ্ঘন করে বিএসএফ এর কোম্পানী কমান্ডার কে হত্যা করার অপরাধে ভারত ও আমেরিকার ভিসা না পাওয়া (পরবর্তীতে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়নি তা প্রমাণ করা সাপেক্ষে পরবর্তীতে আমেরিকার ভিসা প্রাপ্তি)।

৫. ত্রিপুরা রাজ্যে বেসরকারীভাবে আমার মাথার দাম ০১ (এক) লক্ষ রুপি ঘোষণা।

এক সময়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টগবগে যুবক সুন্দর জীবনের মায়া ত্যাগ করে দেশ মাতৃকার টানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগদান করেছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই স্বল্পকালীন সময়ের স্মৃতি এখনও আমার মনের মানসপটে ভেসে উঠে। সবশেষে এখন লাভ-ক্ষতির হিসাব করলে প্রথমেই বলতে হবে মহান আল্লাহ্‌ তা-আলা যে অবস্থায় রেখেছেন তার জন্যে শুকুর আলহামদুলিল্লাহ্‌! তাই এখন আমাকে কে অসন্মান করল বা কে আমার নিজ প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করল তা নিয়ে আমার কোন অনুযোগ বা অভিযোগ নাই। আসন্ন সশস্ত্র বাহিনী দিবস এর ঐ বিশেষ দিনে বাহিনী সমূহের প্রতিটি সদস্যের (চাকুরীরত ও অবসরপ্রাপ্ত) উত্তরোত্তর উন্নতি, কল্যাণ, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি কামনা করছি। সেই সাথে দেশমাতৃকার প্রয়োজনে যারা শহীদ হয়েছেন এবং যারা ইন্তেকাল করেছেন তাদের রূহের মাগফিরাত কামনা করছি।

ফেসবুকের বন্ধুদের উদ্দেশ্যে বলবো যদিও আমি অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে উপরোক্ত বিষয়ের অবতারনা করেছি। তাই এটি পড়ে যদি কেউ দুঃখ বা কষ্ট পান তাহলে নিজ গুণে আমাকে ক্ষমা করে দিবেন। সবশেষে বলবো কে সন্মান দিল, বা না দিল, কে দাওয়াত দিল, বা না দিল, তাতে আমার কিছু যাই আসেনা কারন ফেসবুকের বন্ধুদের কাছ থেকে যে নিঃস্বার্থ ভালবাসা, শ্রদ্ধা ও সন্মান পেয়েছি, তার জন্যে আমি গর্বিত এবং সন্মানিত। আসুন সকলে মিলে আমরা দেশকে ভালবাসি।

সূত্র : সৈয়দ কামরুজ্জামানের ফেসবুক থেকে