বিপন্ন সুন্দরবন, বিপন্ন সুন্দরবনের প্রাণীকুল

0

জিসাফো ডেস্কঃ বিপন্ন সুন্দরবন, বিপন্ন সুন্দরবনের প্রাণীকুল। বিশ্ব ঐতিহ্য ও সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ সবুজ সুন্দরবন আজ নীল বেদনায় ভারাক্রান্ত। তাই উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা বেড়েছে সচেতনমহলসহ সুন্দরবন সংশ্লিষ্ট বনজীবীদের। সবমিলিয়ে বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল সুন্দরবন।

বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে বিস্তৃত এই বনভূমির বর্তমান আয়তন ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার। এতে বাংলাদেশের অংশ ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার এবং অবশিষ্ট ৩ হাজার ৯৮৩ বর্গকিলোমিটার ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের। পর্যটন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলাসহ দেশের অর্থনীতি ও পরিবেশ রক্ষায় সুন্দরবন দৃশ্যমান ভূমিকা রাখলেও গত এক দশকে উন্নয়নের নামে সুন্দরবনকে কার্যত ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

২০১৪ সালে শ্যালা নদীতে কার্গো ডুবে সাড়ে ৩ লাখ লিটার ফার্নেস তেল ছড়িয়ে পড়ে মহাসর্বনাশ ঘটায় সুন্দরবনের। ভারী এই তেলের কারণে নদী ও বনের প্রাণী-প্রতিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। তেলের কারণে পানির ভেতর মাছের ডিম, রেণু পোনাসহ বহু জলজ প্রাণী ধ্বংস হয়ে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে প্রাণিকুলের খাদ্যচক্রে। ফলে কুমির, ডলফিন, শূকর, হরিণসহ সুন্দরবনের গোটা জীববৈচিত্র্যে ভারসাম্য বিনষ্টের আশঙ্কা করছেন পরিবেশবিদরা।

সুন্দরবন একাডেমির গবেষক পরিবেশবিদ রফিকুল ইসলাম খোকন আমাদের সময়কে বলেন, এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হবে। পানির ভেতরের পরিবর্তন এবং এর ফলে বনের পশুপাখি ও গাছপালার ওপর প্রভাব পড়বে।

এদিকে সুন্দরবনের পাশে বাগেরহাটের রামপালে ভারতের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে যাচ্ছে সরকার। এটি নির্মিত হলে বিপন্ন হতে পারে সুন্দরবনের পরিবেশÑপ্রতিবেশ। এ আশঙ্কায় দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশবিদরা আন্দোলন-সংগ্রাম করে এলেও ধাপে ধাপে এই প্রকল্পের নানা অংশের নির্মাণ কাজ এগিয়ে চলছে।

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল। তিনি একাধিক সভা, সেমিনার ও আলোচনায় বলেছেন, রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষতি সম্পর্কে সরকারকে যতই বলছি সরকার তাতে কোনো ইতিবাচক সাড়া দিচ্ছে না। যুক্তি-তর্ক যতই হোক না কেন সরকার ‘তালগাছটা আমার’ অর্থাৎ নিজেদের পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্ত ও অবস্থানেই অনঢ় রয়েছে।

তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ সুন্দরবন রক্ষায় রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিপক্ষে প্রধান ভূমিকায় আছেন। এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণ হলে সুন্দরবন তথা দেশের কী কী ক্ষতি হতে পারে- বছরজুড়ে তার বৈজ্ঞানিক যুক্তি তুলে ধরেছেন তিনি।

জানা গেছে, সমুদ্রপথে কয়লা আনা হবে বঙ্গোপসাগরের আকরাম পয়েন্টে। সেখান থেকে ছোট ছোট জাহাজে করে সুন্দরবনের মধ্যদিয়ে নদীপথে তা রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে পাঠানো হবে। নির্মাণাধীন ওই কেন্দ্রে বছরে ৪৭ লাখ ২০ হাজার টন কয়লা পুড়বে। প্রতিদিন জাহাজে করে ১৩ হাজার টনের বেশি কয়লা আসবে।

আনু মুহাম্মদের মতে, ‘দেশকে যা বিপন্ন করে, তা উন্নয়ন নয়’। অন্যদিকে সরকার বলছে, দূষণরোধের ব্যবস্থা থাকবে। ফলে সুন্দরবনের কোনো তি হবে না। তবে গবেষণা তথ্যে জানা গেছে যত উন্নত প্রযুক্তিই ব্যবহার করা হোক না কেন, দূষণের হার ৮ থেকে ১০ শতাংশ কমতে পারে, এর বেশি নয়। সে হিসেবে জীববৈচিত্র্য-বৃরাজি ধ্বংসের সব উপকরণই বিদ্যমান থাকছে রামপালে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে।

জানা গেছে, ফার্নেস তেল ভরা জাহাজডুবি যে অপূরণীয় তি করেছে, তা নিরসনে কোনো প্রস্তুতি কিংবা ব্যবস্থা সরকারের ছিল না। বরং সরকারি বাগাড়ম্বরই ছিল বেশি। গত দুই বছরে সরকার এ পথে পরিবহন বন্ধসহ বহু প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যার বাস্তবায়নও হয়েছে যৎসামান্য। তবে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করলে কয়লা পরিবহন ও উৎপাদন পর্যায়ে সুন্দরবনকে কী রকম বিপদে ফেলবে তার কিছু নমুনা নানা সময়ে বন অভ্যন্তরে জাহাজডুবি থেকে পাওয়া যাচ্ছে। এ নিয়ে দেশি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষকের করা গবেষণার কাজে সুন্দরবনের এক হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটারের মধ্যে ১৫টি স্থান থেকে প্রতি ৪৮ ঘণ্টা পর গবেষণার তথ্য-উপাত্ত নেওয়া হয়। একই সময় যেখানে তেল নিঃসরণ হয়নি, যেমন পশ্চিম সুন্দরবনের ঘড়িলাল, জোড় সিং ও কলাগাছিয়া- এসব এলাকা থেকেও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়। যেখানে তেল নিঃসরণ হয়েছে সেই পূর্ব সুন্দরবন ও শ্যালা নদী এবং তেল নিঃসরণ না হওয়া পশ্চিম সুন্দরবনের মধ্যে তুলনা করে গবেষণার ফল বের করা হয়। তাতে দেখা যায়, তেল নিঃসরণের ফলে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যে দীর্ঘমেয়াদি ভয়ংকর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গবেষণার তত্ত্বীয় মডেল নেওয়া হয়েছে আমেরিকান পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশনের (এপিএইচএ) দেওয়া মানের সঙ্গে সংগতি রেখে। সে হিসেবে তেল নিঃসরণের যে নেতিবাচক প্রভাব সুন্দরবনে পড়তে শুরু করেছে তাতে রামপালের প্রকল্প চালু হলে সুন্দরবনের যে কী ভয়াবহ পরিণতি আসবে তা ভেবে শঙ্কিত পরিবেশবাদীরা। তাই একই সময়ে এর প্রতিবাদের মিছিলও ক্রমে দীর্ঘ হচ্ছে।