বিদেশী নাগরিক পরিকল্পিত ভাবে খুন- নিরাপত্তা ব্যাবস্থায় বিদেশীদের আস্থা শুন্যের কোঠায়

0

জিসাফো নিউজ ডেস্কঃ রাজধানীর গুলশানে কূটনীতিকপাড়ায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে ইতালি নাগরিক সিজার তাভেল্লা (৫১) হত্যাকাণ্ড ঘিরে ব্যাপক রহস্য তৈরি হয়েছে। সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে গুলশান-২ এর ৯০ নম্বর সড়কে বাংলাদেশ বাংকের গভর্নরের ভবনের দক্ষিণ পাশের দেয়াল ঘেঁষে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্যমতে, তাভেল্লাকে আগে থেকেই দু’জন অনুসরণ করছিল। তারা তাকে কাছ থেকে গুলি করে। অস্ত্রধারীরা পরে আরেক ব্যক্তির সঙ্গে মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায়। তবে তাভেল্লার কাছ থেকে মানিব্যাগ ও মোবাইল ফোনসহ মূল্যবান কিছুই নেয়নি খুনিরা। তাই ঘটনাটি ছিনতাই নয় বলেই ধারণা করা হচ্ছে। ওই বিদেশিকে হত্যার পেছনে তার ব্যক্তিগত কোনো বিরোধ বা অন্য কোনো কারণ প্রাথমিকভাবে জানতে পারেনি তদন্তকারীরা।

এদিকে হত্যাকাণ্ডের সময় ঘটনাস্থলের সড়কবাতিগুলো জ্বলছিল না। গুলশানের কূটনীতিকপাড়ায় ১০০টি সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলেও হত্যার দৃশ্য পড়েনি কোনো ক্যামেরার আওতায়। অন্যদিকে নিরাপত্তার ‘অজুহাতে’ অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দল নির্ধারিত সময়ে বাংলাদেশ সফরে আসেনি। অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা বিষয়ক একটি প্রতিনিধি দল বর্তমানে দেশে অবস্থান করছে। এসময় এক বিদেশি খুন রাষ্ট্রবিরোধী ‘ষড়যন্ত্র’ হতে পারে বলেও সন্দেহ করছেন গোয়েন্দারা।

জানা গেছে, নিহত তাভেলা নেদারল্যান্ডসভিত্তিক ইন্টারচার্চ কো-অর্ডিনেশন কমিশন ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (আইসিসিও) নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রুফ (প্রফিটেবল অপরচ্যুনিটিজ ফর ফুড সিকিউরিটি) কর্মসূচির প্রকল্প ব্যবস্থাপক ছিলেন। গুলশান ১-এর ৩০ নম্বর সড়কের ১৬ নম্বর বাড়িতে আইসিসিওর অফিস। এছাড়া তার কাছে আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের একটি পরিচয়পত্র পাওয়া গেছে। তিনি গুলশানের ৫৪ নম্বর রোডের একটি বাসায় থাকতেন।

এ ব্যাপারে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোস্তাক আহমেদ জানান, তার বুকে একটি ও পেছনে দুটি গুলি বিদ্ধ হওয়ার চিহ্ন রয়েছে।

ঘটনার পরপরই পুলিশের ভারপ্রাপ্ত আইজি মোখলেছুর রহমান, ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়াসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। এসময় ভারপ্রাপ্ত আইজিপি সাংবাদিকদের বলেন, হত্যার বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। তদন্ত শুরু হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ঘটনাস্থলটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ক্রাইম সিন ইউনিট ঘিরে রেখেছে। সিআইডি ঘটনাস্থল থেকে হত্যার আলামত সংগ্রহ করে। পুলিশ ও র‌্যাবের কর্মকর্তারা কয়েকজন পথচারীর বক্তব্য নিয়েছেন।

ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন বিভাগের ডিসি মুনতাসিরুল ইসলাম বলেন, তাভেল্লা জগিং করছিলেন। তিনি ৯০ নম্বর সড়কের ফুটপাত দিয়ে হাঁটার সময় হামলার শিকার হন। এক যুবক এগিয়ে এসে তাকে লক্ষ্য করে পরপর কয়েক রাউন্ড গুলি করে। গুলির পর ওই যুবক মোটরসাইকেলে উঠে পালিয়ে যায়।

পুলিশের গুলশান বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) আব্দুল আহাদ জানান, ঘটনাস্থল থেকে তিনটি গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে। তাভেল্লাকে তিনজন গুলি করে।

গুলিবিদ্ধ তাভেলাকে ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে যান প্রত্যক্ষদর্শী মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন। তিনি সেনাবাহিনীর সাবেক সার্জেন্ট এবং বর্তমানে ইন্ট্রিগেটেড সিকিউরিটি সার্ভিসেস নামে একটি প্রতিষ্ঠানে এরিয়া ইন্সপেক্টর হিসেবে চাকরি করছেন। সোমবার রাতে হাসপাতালে মোশারফ হোসেন বলেন, তাভেল্লা টিশার্ট ও থ্রিকোয়ার্টার প্যান্ট পরা অবস্থায় ৯০ নম্বর সড়ক ধরে হাঁটছিলেন। তার কয়েক হাত পেছনেই হাঁটছিল আরও দুইজন। ওই বিদেশি বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের ভবনের কাছে যেতেই দুইজনের মধ্যে একজন গুলি করে। পরপর তিনটি গুলির শব্দ হয়। এসময় পাশের ৮৩ নম্বর সড়কে জার্মান ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশনের ভবনের সামনে মটরসাইকেলসহ দাঁড়িয়ে ছিলেন এক ব্যক্তি। গুলির পর দুইজন ওই মোটরসাইকেলে করে চলে যায়।

মোশারফ আরও বলেন, ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে এ ঘটনা ঘটানো হয়ে থাকলে তার সঙ্গে থাকা জিনিসপত্র তারা নিয়ে যেত, কিন্তু নেয়নি। সড়কবাতি নেভানো থাকায় খুনিদের চেহারা দেখতে পারেননি মোশাররফ।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ভিক্ষুক সেতারা বেগম জানান, তিনি ৯০ নম্বর সড়কের গভর্নর ভবনের পেছনের ৮৩ নম্বর সড়কের তিনমাথার কোণায় বসে ভিক্ষা করেন। ঘটনার সময় তিনি সেখানেই ছিলেন। সেতারা বেগম বলেন, ‘তিনডা পোলা একটি মটরসাইকেল নিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়ায়া আছিলো। তিনজনের মধ্যে দুইজন আমার সামনে দিয়েই ৯০ নম্বর রোড দিয়ে বড় রাস্তায় যাইতে থাকে। হেরপরই গুলির শব্দ শুনি। দেখি ওই দুই পোলা দৌড়াইয়া মটরসাইকেলের কাছে আইলো তিনজন মিলা মটরসাইকেলের চইড়া ৮৩ নম্বর রোড ধইরা উত্তর দিকে চইলা গেলো।’

নিহতের সহকর্মী আলো রানী ঢালী বলেন, গত মে মাস থেকে তাভেল্লা ঢাকায় আছেন। ঘটনাস্থলটি তার বাসার অনেকটা কাছেই। তিনি ঘটনার আগে বাসা থেকে বের হয়েছেন। তাভেল্লার কোনো শত্রু ছিল, এমন তথ্য জানা নেই আলো রানীর।

গুলশানের ৯০ নম্বর সড়কের ঘটনাস্থলের তিনশ’ গজের মধ্যে রয়েছে মিশর, নেদারল্যান্ড, স্পেন, পাকিস্তান দূতাবাস এবং জার্মান হাউস। সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বেষ্টনীতে ঘেরা কূটনীতিকপাড়ায় সন্ধ্যায় কীভাবে প্রকাশ্যে অস্ত্রধারীরা গুলি করে হত্যার পর পালিয়ে গেলো এ বিষয়টি আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দাদের ভাবিয়ে তুলছে।

একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, গুলির ঘটনার পরপরই গুলশানের বিভিন্ন এলাকায় স্থাপিত ১০০ সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহের নির্দেশ দেয়া হয়। তবে ঘটনাস্থলের কাছে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকায় দূরের ক্যামেরায় হত্যার দৃশ্য ধরা পড়েনি। তদন্তকারীরা আশপাশের ফুটেজ থেকে খুনিদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন। র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবুল কালাম আজাদ বলেন, সিসিটিভির ফুটেজ বিশ্লেষণসহ বিভিন্ন কৌশলে গুলির ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে।

ডিএমপির অপরাধ ও গোয়েন্দাতথ্য বিভাগের এডিসি (উত্তর) মাহফুজুল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনাটি ছিনতাই নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড তা যাচাই করা হচ্ছে। তাভেল্লা হাঁটতে বের হয়েছিলেন। তাকে এমন অবস্থায় হত্যার তাৎক্ষণিক কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি।’

দায়িত্বশীল একাধিক গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ২০১২ সালের ৫ মার্চ রাতে সৌদি দূতাবাসের কর্মকর্তা খালাফ আল আলী গুলশানের ১২০ নম্বর সড়কে একইভাবে হাঁটতে গিয়ে গুলিতে নিহত হন। পরে ঘটনাটি ছিনতাইকারীদের কাজ বলে তথ্য পায় পুলিশ। তাভেল্লার মৃত্যুর ঘটনাটিকেও ছিনতাই ধারণা করেই প্রাথমিক তদন্ত করা হচ্ছে। তবে ঘটনার সময় এবং ধরন দেখে এটিকে রাষ্ট্রবিরোধী কোনো মহলের ষড়যন্ত্র বলেও সন্দেহ করা হচ্ছে।