বিএনপির কমিটি গণতন্ত্রের পথে আলোকবর্তিকা হয়ে উঠুক

0

এ বছর মার্চে ষষ্ঠ কাউন্সিল উদ্বোধনকালে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া সমৃদ্ধ দেশ ও আলোকিত সমাজ গড়ার লক্ষ্যে ‘ভিশন-২০৩০’ রূপরেখা ঘোষণা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আগামীতে সরকার গঠন করতে পারলে সুনীতি, সুশাসন ও সুসরকার গঠন নীতিতে দেশ পরিচালনা করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনার কথাও বলেছিলেন। বেগম জিয়া তার বক্তব্যে বারবার বিভক্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তা ও প্রত্যয় ব্যক্ত করে ছিলেন। সম্মেলনে কোনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়নি সম্মেলন থেকে এ দায়িত্ব বেগম খালেদা জিয়ার ওপরই ন্যস্ত করা হয়েছিল।

অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গত ৬ আগস্ট দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পূর্ণাঙ্গ কমিটির সদস্যদের নাম ঘোষণা করেছেন। নাম ঘোষণার পর থেকেই কমিটি নিয়ে নানামাত্রিক আলোচনা চলছে। এমনকি মন্ত্রিসভাতেও এ নিয়ে কথা হয়েছে। সরকারের বিভিন্নজনের পাশাপাশি বিএনপি নেতাদের উদ্ধৃত করে পত্র-পত্রিকাতেও নানামুখী রিপোর্ট ও বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছে, হচ্ছে। মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে এ ধারা হয়তো আরো কিছু দিন চলবে। দেশে গণতন্ত্র থাকলে হয়তো এ আলোচনার ব্যাপ্তি ও বিস্তৃতি আরো হতে পারত।

কমিটি ঘোষনার পরপরই নবনির্বাচিত একজন ভাইস চেয়ারম্যান পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন আর একজন সহ-সম্পাদকও ভিন্ন বিবেচনায় পদত্যাগ করেছেন। অন্যদিকে কমিটিতে নতুন যারা এসেছেন তাদেরকে সংবর্ধনা দেয়া হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ইতিবাচক মিছিলও হচ্ছে বলে খবর বেরুচ্ছে। আলোচনার শুরুতে এবার স্ট্যান্ডিং কমিটিতে স্থান পাওয়া আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর মূল্যায়ন দিয়ে শুরু করা যাক। তিনি বলেছেন, এবার কমিটি যে সামান্য বড় হয়েছে এর সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। তিনি মনে করেন, বিগত বছরগুলোয় বর্তমান সরকারের দমননীতির কারণে বিএনপির অসংখ্য নেতাকর্মী নানাভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন। সরকার দেশে এক ধরনের রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির পক্ষে নিয়মমাফিক সময়ে কাউন্সিল করা সম্ভব হয়নি। সময়ের বিস্তারের কারণে নেতা হওয়ার মতো কর্মীর সংখ্যা বেড়ে গেছে।

এ প্রসঙ্গে যেসব সমালোচনা হচ্ছে সেদিকে ভিন্নভাবেও দৃষ্টি দেয়া যায়। ২০১৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের সূত্র ধরে দেশে যে ধরনের রাজনৈতিক নিপীড়ন-নির্যাতন চলছে তার প্রেক্ষিতে সরকার এবং তার কথকরা প্রায়শই বলে বেড়াচ্ছেন বিএনপি করার মতো কেউ নেই। সারা দেশে বিএনপি নাকি এতিম হয়ে পড়েছে। সরকারের কোনো কোনো রাজনৈতিক পার্টনার তো রীতিমতো বলে বেড়াচ্ছেন আগামীতে নাকি তিনিই ক্ষমতায় আসছেন। রাজনৈতিকভাবে নাকি বিএনপি এখন নামকাওয়াস্তে একটি দলে পরিণত হয়েছে। অথচ কমিটির বড় আকারের পর তারাই আবার এর সমালোচনা করছেন। মূলত যারা কমিটি নিয়ে সমালোচনা করছেন তাদের এটাও বুঝতে হবে পরিস্থিতি শুধু বদলিয়েছে সেটাই চূড়ান্ত নয় বরং নানা বাস্তবতাও স্থান করে নিয়েছে। এবার কমিটি করার আগে বিএনপিকে অনেকটা পথ হাঁটতে হয়েছে। তার অভিজ্ঞতায় জমা হয়েছে অনেক কিছু। মাত্র সেদিনই কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন বিএনপিতে নাকি নেতৃত্ব নেয়ার মতো কেউ নেই। সরকারের কোনো কোনো মহল তো রীতিমতো বিএনপি কোনো দল, এটাই স্বীকার করতে চাচ্ছে না। সে বিবেচনায় কমিটির আকার বড় হওয়া এবং কমিটিতে থাকার জন্য আগ্রহ প্রকাশ গণতান্ত্রিক কর্মী বৃদ্ধিরই আলামত বহন করে, যা আগামীতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথকে সুগম করতে পারে।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আরো মনে করেন বর্তমান সরকারের দমননীতি সৃষ্ট পরিবেশে অনেকেই ত্যাগ-তিতিক্ষার স্বাক্ষর রেখেছেন। দল ও দলের আদর্শের জন্য জীবনবাজি রেখেছেন। জেলে গিয়েছেন, শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এই বিপুলসংখ্যক ত্যাগী নেতাকর্মীর কথা চিন্তায় আনতে হয়েছে। বোধকরি এবার কমিটি গঠনে এ বিষয়টি যে আসবে বা আসতে যাচ্ছে সে কথা অনেক আগে থেকেই বলা হচ্ছিল। আগামীর বিবেচনায় অবশ্যই এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এ আলোচনা কেবলমাত্র বিএনপির জন্যই নয় বরং দেশের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের চিন্তা থেকেও জরুরি। এ কথা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন চরম সংকটপূর্ণ সময় অতিক্রান্ত হচ্ছে। বিগত নির্বাচনে প্রতিবেশী ভারতের সমর্থনে একটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন সমাপ্ত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের অন্তরায় দূর করার চেয়ে টিকিয়ে রাখাকেই প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। সে বিবেচনায় এটা পরিষ্কার যে, বিএনপি এবং সমমনারা যেখানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণপণ চেষ্টায় নিয়োজিত সেখানে সরকার ও তার মিত্ররা অগণতান্ত্রিকতাকেই টিকিয়ে রাখতে চাচ্ছে। এই বিভাজন দেশে যে মারাত্মক রাজনৈতিক এবং আস্থার সংকট তৈরি করেছে সেটিকে সংশ্লিষ্ট মহল নানাভাবে ব্যাখা করে এক ভিন্নতর বাস্তবতা সৃষ্টি করতে চাচ্ছে। এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মহল বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পক্ষে থাকলেও ভারতের কারণে তা যথাযথ স্থান করে নিতে পারছে না।

রাজনৈতিক বাস্তবতা হচ্ছে, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি তথা ২০ দলীয় জোট দেশে অবরোধ-হরতাল আহ্বান করলে সরকারের কোনো কোনো মহল তাকে আখ্যায়িত করতে শুরু করল জঙ্গি কর্মকা- হিসেবে। সে সময়ের করা মামলার এখন শুনানি চলছে, যা নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে। একটু যদি পিছন ফিরে দেখা যায় তাহলে এটা পরিষ্কার হবে যে, দেশের শতকরা ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষ গণতন্ত্রের পক্ষে থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ আসনে নির্বাচন করতে হয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন বাস্তবতায়। যা সংবিধানে বর্ণিত গাইডলাইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ভোট দেয়াই হচ্ছে সাধারণ মানুষের প্রাথমিক অধিকার। এই অধিকার জনগণকে ফিরিয়ে দেয়ার আন্দোলনই এখন চলছে। এক্ষেত্রে অবশ্য অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতার আলোকে মূল্যায়নের দাবিকে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। এই মূল্যায়নের কথা এর আগেও বলা হয়েছে।

বিএনপির বিভিন্ন সভা এবং ফোরামে এ নিয়ে কথা হয়েছে। এবারের কমিটি ঘোষিত হওয়ার পরও এ প্রসঙ্গ বেশ বড় আকারে দেখা দিয়েছে। এ আলোচনায় অনেকের মধ্যে আবদুল্লাহ আল নোমানের নামও রয়েছে। নিঃসন্দেহে বলা যাবে তিনি একজন দক্ষ রাজনীতিক। তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই। তিনি এ যাবৎকাল অন্য কোনো পক্ষ নিয়েছেন এমন প্রমান নেই। বর্তমান অবস্থানে তিনি সন্তুষ্ট নয় বলে যা বলা হচ্ছে তার সঙ্গে হয়তো স্থানীয় রাজনীতির সম্পর্ক রয়েছে। একে বৃহত্তর বিবেচনায় এই মুহূর্তে বড় করে না দেখলে বোধহয় তিনি যদি অন্য কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন তবে তা থেকে সরে আসতে পারেন।

এবার স্ট্যান্ডিং কমিটিতে পুনরায় প্রবেশ করেছেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। পুনরায় শব্দটির ব্যবহার এ জন্য যে তিনি এই পদমর্যাদায় থাকা অবস্থাতেই বিএনপি ত্যাগ করে তৎকালীন সামরিক শাসক এরশাদের পক্ষাবলম্বন করেছিলেন। সেখানে তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট পদেও নিয়োগ পেয়েছিলেন। জনতার দাবিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আগে গণদাবিতে সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদ পদত্যাগ করেছিলেন ব্যারিস্টার মওদুদের ক্ষমতা হস্তান্তর করে। ওই সরকার পতনের পর তিনি আবার ফিরে আসেন বিএনপিতে। এখানে এসেও তিনি মন্ত্রী হয়েছেন। এরপর কেটে গেছে অনেক দিন, অনেক বছর। তারও বয়স হয়েছে। রাজনীতিতেও গুণগত পরিবর্তন ঘটেছে অনেক। অবশেষে তিনি ফিরে এসেছেন আবার সেই স্ট্যান্ডিং কমিটিতে। তার এই ফিরে আসা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা রয়েছে। এর আগেও আন্দোলন চলাকালে এসব নিয়ে আলোচনা ছিল। সেসব প্রসঙ্গ বড় নয়। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদকে পুনরায় স্ট্যান্ডিং কমিটিতে ফিরিয়ে আনার মধ্য দিয়ে বেগম জিয়া হয়তো সময়কে এবং রাজনৈতিক বিবেচনাকেই অধিকতর প্রাধান্য দিয়েছেন। সে বিবেচনায় বলা যায়, যারা নিজেদের বঞ্চিত বা অবমূল্যায়িত মনে করছেন তাদের যদি মূল রাজনীতির ওপর আস্থা থাকে তাহলে ধৈর্য ধরাই যৌক্তিক। যদিও ইতোমধ্যে বিএনপির মহাসচিব নিজেই সংশ্লিষ্টদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন। এ প্রসঙ্গেই তার কথাও উঠে আসে। বড় দুর্দিনে তিনি দলের হাল ধরেছিলেন। সে একটা সময় এসেছিল বিএনপিতে প্রমাণ করার কে গণতন্ত্রের পক্ষের আর বিপক্ষের।

১/১১-এর সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার যখন বিএপিকে সমূলে বিনাশ করতে সর্বাত্মক উদ্যোগী হয়েছিল এবং লক্ষ্য অর্জনে বিএনপির ভেতর থেকে কোনো কোনো মহল যখন ইন্ধন জোগাচ্ছিল তখন সেই দুঃসময়ে সব রক্তচক্ষুকে বেতোয়াক্কা করে দায়িত্ব নিয়েছিলেন মরহুম দেলোয়ার হোসেন। তিনি দলের মহাসচিব থাকার ফলে প্রথম ধাক্কা সামলিয়ে দলের অস্তিত্ব রক্ষায় প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখেছিলেন। তার মৃত্যুর পর মির্জা ফখরুল ইসলাম এই কঠিন দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। নিজের মেধা -মনন সততা -অভিজ্ঞতা সবকিছু দিয়ে দলকে ধরে রাখার যে প্রাণান্ত চেষ্টা করেছেন সে কারণে তাকে কঠিন জীবনপণ সংগ্রাম করতে হয়েছে। প্রায় মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন। কঠিন কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। তিনিও কিন্তু এ সম্মেলনের আগ পর্যন্ত ভারপ্রাপ্তই ছিলেন। অনেকে অনেক কথা বলে তাকে উস্কাতে চেয়েছেন। বাস্তবে রাজনৈতিক পরিবার থেকে আসা শান্ত স্বভাবের এই মানুষটি কখনই বাস্তবতার বাইরে গিয়ে ভাবেননি।

দীর্ঘদিন ভারপ্রাপ্ত থাকায় তার মধ্যে কোনো ক্ষোভ বা রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে পিছপা হওয়ার লক্ষণ দেখা যায়নি। সামনের কাতারে থেকে সব ঝুঁকি মোকাবিলারই চেষ্টা করেছেন। এবার কমিটি ঘোষিত হওয়ার পরেও নানাজনে নানা কথা বলছেন। বোধকরি জেনে না জেনে যেসব কথা বলা হচ্ছে সেগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। কমিটির কলেবর বৃদ্ধি বা নতুন যারা এসেছেন তাদেরকে আজকে যারা নতুন বলে মনে করছেন তাদেরও মনে রাখা দরকার আজকে এমন অনেকে নামিদামি বলে পরিচিতি পেয়েছেন যারা একসময়ে এরকমই নতুন ছিলেন। বিএনপির প্লাটফর্ম দিয়েই তাদের বর্তমান অবস্থা। যা কিছু করা হয়েছে তার সঙ্গে কোনো ধরনের মূল্যায়ন কাজ করেনি সে কথা কোনোভাবেই বলা যাবে না। অনেকের মধ্যে একজন হাবিব-উন-নবী সোহেল। এবার তিনি যুগ্ম সম্পাদক পদে রয়েছেন। এর আগে তিনি স্বেচ্ছাসেবক দলের দায়িত্বে ছিলেন। তার আন্তরিকতা সম্পর্কে যারা অবহিত তারা সবাই একমত হবেন যে, অবশ্যই তার প্রতি সঠিক মূল্যায়ন করা হয়েছে।

এক সময়ের সাংবাদিক কাদের গনিকে নতুন পদ দেয়া নিয়ে হয়তো বিতর্ক উঠেছে। প্রকৃত বিবেচনায় তিনি বিগত সময়ে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব সততার সঙ্গে পালন করেছেন। এটি তার স্বীকৃতি। এ কথাও কিন্তু সবার মনে রাখতে হবে, চলমান গোটা সময় ধরেই বিএনপির অভ্যন্তরে ‘চর’ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এরা কারা, এদের শেকড় কোথায়? তা নিয়ে যত ধরনের বিভ্রান্তি থাকুক না কেন এ কথা হয়তো উড়িয়ে দেয়া যাবে না যে, কোথাও কিছু রয়েছে। সেসব বিষয়ও যে বর্তমান কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে কোনো বিবেচনায় নেয়া হয়নি তাও হয়তো বলা সঙ্গত হবে না।

সুতরাং মূল্যায়ন -অবমূল্যায়নের যে প্রসঙ্গ উঠেছে বা উঠানো হয়েছে তা বিবেচনায় নিতে গেলে ভাববার রয়েছে অনেক কিছু। এক্ষেত্রে বলা যায়, কমিটি ঘোষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কেউ কেউ অনেকটা মরিয়া হয়েই যেন কমিটির বিরোধিতায় নেমে পড়েছেন। দেখার রয়েছে যাদের নিয়ে কথা হয়েছে বা হচ্ছে তারা বোধহয় নিজেরাও ততক্ষণে কমিটি দেখেননি। এটা যেন পূর্ব থেকেই তৈরি করা ছিল। যারা এ ভূমিকায় নেমেছেন তারা এর আগে যখন কমিটি দিতে দেরি হয়েছে তখন বলেছেন কমিটি দিতে বিএনপি ব্যর্থ। দেয়ার পরে বলছেন, কমিটি তৈরিতে ব্যর্থ। এরা যেন বিএনপিকে ব্যর্থ বলতে পারলেই এক ধরনের তৃপ্তি পান। এখনকার বাস্তবতা হচ্ছে, বিএনপির সমালোচনা বা নিন্দা করলে তাতে হয়তো ভিন্ন সুবিধাপ্রাপ্তির সুযোগ রয়েছে বা থাকতে পারে। এদের অবস্থা হচ্ছে সেই ছোট শিশুর মতো, যে কিনা তার ছোট চাচার সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে বলল, কলা খাব। চাচা অতি যতেœ কলা কিনে দিল। এবার শিশু বলল, কলা ছুলে দাও। চাচা যথারীতি তাই করল। এটি শিশুর পছন্দ না হওয়ায় শখন সে বলল ছুলেছ কেন, ঢেকে দাও। এবার অবস্থা কী দাঁড়াতে পারে সেটি বোঝার দায়িত্ব পাঠকের।

যাইহোক, একথা বলা দরকার, বিএনপি কিন্তু এবারই নয় এরকম আগেও বড় বড় সংকটে পড়েছে। একদল বিপথগামী সেনার হাতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার কিছু দিনের মধ্যে সামরিক শাসন এবং সেই শাসকদের আজ্ঞাবহরা বিএনপি তছনছ করে দিতে চাইলেও তখন অনেকেই মনে করেছিলেন বিএনপির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। সেই দুর্দিনে নেতৃত্বের দুর্বলতার ধুয়া তুলে যারা সে সময়ের সরকারি দলে হালুয়া-রুটির লোভে জড়ো হয়েছিলেন সময় প্রমাণ করেছে তাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আর বেগম জিয়ার প্রজ্ঞা সমান ছিল না। বেগম জিয়ার অবস্থানই সঠিক এবং সঙ্গত ছিল। অনেকের মনে থাকার কথা, সে সময়ও কমিটি নিয়ে এমন এক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল যে অনেকের পক্ষেই বিএনপি অফিসে আসা যেন অসম্ভব ছিল। সে সময় যাদের বাছাই করা হয়েছিল তাদের দ্বারাই গণতন্ত্র মুক্ত করা সম্ভব হয়ে ছিল। এবারও কিন্তু কিছুটা হেরফের থাকলেও সেই চিত্রের সঙ্গে অনেকটাই মিল রয়েছে।

মাত্র সেদিনও দেখা গেল, কোথাকার কে এসে বিএনপি দাবি করে এক ঘোলাটে পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে। কমিটি গঠন সম্পর্কে আপত্তি রয়েছে বা যারা মনে করছেন অবমূল্যায়িত হয়েছেন কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া অনেকেরই নিজের বুকে হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করা দরকার কতটা অসঙ্গত হয়েছে। এই আলোচনায় আরেকটা ব্যাপার বিবেচনায় নেয়া অত্যন্ত অপরিহার্য। পাশ্চাত্য আর প্রাচ্যের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া- প্রবণতা এক রকম নয়। অর্থনৈতিকভাবে ধনী দেশগুলোতে যেহেতু প্রতিটি নাগরিকের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাবলয় এবং মানবাধিকার রয়েছে তাই তাদের কাছে রাজনীতির যে অর্থ আমাদের দেশে তা নয়।

এদেশে রাজনীতির অর্থ হচ্ছে এক ধরনের ঝুঁকি গ্রহণ। যে কারণে অনেক মেধাবী- যোগ্য- দক্ষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজনীতি করতে চান না বা পছন্দ করেন না। অনেকেই শিক্ষা জীবনে রাজনীতর সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত থাকার পরেও প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে আসেন না। যারা শেষ পর্যন্ত থেকে যান তাদের নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে। অন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে মানবাধিকার। পাশ্চাত্যে অধিকারকে যে বিবেচনায় দেখা হয় এখানে অনেকটাই তার ব্যতিক্রম। কেবলমাত্র রাজনীতি করা বা ভিন্ন মতাদর্শের জন্য কারো নিখোঁজ বা নিহত হওয়ার ঘটনা পাশ্চাত্যে ঘটলে তুলকালাম হয়ে যেত। সরকারকে প্রচ-ভাবে সমালোচনার মুখে পড়তে হতো। এখানে প্রতিদিন নিখোঁজ বা ক্রসফায়ারের খবর প্রকাশিত হলেও এর সুরাহা হওয়ার কোনো চেষ্টা রয়েছে সে কথা বলা যাবে না। মাত্র সেদিন উচ্চতর আদালত বলেছেন সাদা পোশাকে কাউকে গ্রেফতার করা যাবে না। আদালত জিজ্ঞাসাবাদের জন্যও সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি বেঁধে দিয়েছেন। তা সত্ত্বেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়েছে, সে কথা বোধ হয় বলা যাবে না। বরং দেখা যাচ্ছে, এখন কোনো খোঁজই পাওয়া যাচ্ছে না।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলমসহ দেশের বহু নাগরিকের কোনো খোঁজখবর নেই। সংশ্লিষ্টদের আত্মীয়স্বজনরা সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সাহায্য চেয়েও কোনো প্রতিকার পাননি। এই যে বাস্তবতা, এটা যে কোনো ধরনের সুস্থ রাজনৈতিক পরিস্থিতির অন্তরায়। রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে যে, সভা-সমাবেশ করাও অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নিরাপত্তা শিথিল হয়ে পড়েছে। প্রচন্ড দলীয়করণের কারণে সর্বত্রই দলের লোকদের প্রভাব প্রতিপত্তি। কমিটি ঘোষণার পর দুটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ্য করা গেছে। প্রথমত কমিটি নিয়ে তেমন কোনো প্রতিবাদ নেই। দ্বিতীয়ত, ভারতীয় রাষ্ট্রদূত বেগম জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এই সাক্ষাতের নানামাত্রিক ব্যাখ্যা থাকতে পারে। সে ভিন্ন কথা। তবে এটাই ভাবা সঙ্গত যে, নতুন কমিটির মধ্যে হয়তো সম্ভাবনা বিদ্যমান রয়েছে।

আরো কিছু দিনের মধ্যে হয়তো সরকারের মূল প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে। তখনই বোঝা যাবে কমিটির প্রকৃত সফলতা কোথায়। নতুন কমিটি গণতন্ত্রের পথে আলোকবর্তিকা হয়ে উঠুক, এটাই জনপ্রত্যাশা।

লেখক

আওয়াল ঠাকুর