বিএনপির ইতিহাস বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ইতিহাস

0

জিসাফো ডেস্কঃ বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের সাথে বিএনপির নাম ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। বিএনপির ইতিহাস বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ইতিহাস। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় প্রতিটি সংগ্রামে বিএনপি সবসময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে এবং অগণতান্ত্রিক শক্তির কবল থেকে গণতন্ত্রকে মুক্ত করে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে।

স্বাধীন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু মাত্র তিন বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি শেখ মুজিব এর নেতৃত্বাধীন তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার এক সাংবিধানিক ক্যু এর মাধ্যম দেশের সকল রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে একদলীয় বাকশাল শাসন প্রতিষ্ঠা করে। সংসদীয় গণতন্ত্র বিলুপ্ত করে একদলীয় এবং এক ব্যক্তির শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়। সরকারী মালিকানায় মাত্র ৪টি পত্রিকা রেখে দেশের সকল পত্র-পত্রিকা এবং জনমত প্রকাশের মাধ্যম বন্ধ করে দেয়া হয়। জনগণের ভোটাধিকার হরন করে একদলীয় সংসদ নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিয়ে সংসদের মেয়াদ এবং প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় নেতাকে নির্বাচন ছাড়াই নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে ৫ বছর পর্যন্ত ক্ষমতার মেয়াদ বৃদ্ধি করে নেয়। গোটাজাতি একদলীয় স্বেচ্ছাচারী শাসনে এক অবরুদ্ধ অবস্থায় নিপতিত হয়। এ অবস্থায় ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট শাসক দল বাকশালেরই একটি অংশ রাষ্ট্রপতিকে হত্যা ও রক্তপাতের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে। একই বছরে ৩রা নভেম্বর শাসক দলেরই আরেকটি অংশের আশীর্বাদে আরেকটি পাল্টা ক্যু — সংগঠিত হয়। এসব ক্যু পাল্টা ক্যু এর প্রেক্ষাপটে ৭ই নভেম্বর সকলে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী সকল চক্রান্তের জাল ছিন্ন করে জনগনকে সাথে নিইয়ে সিপাহী জনতার বিপ্লব ঘটায় এবং ৩র নভেম্বর ক্যু এর হোতাদের দ্বারা বন্দী সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে আনে। নতুনভাবে দায়িত্ব লাভ করে সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন। এবং পূর্ববর্তি সরকারের সময় সেনাবাহিনীর সমান্তরাল হিশাবে গরে তোলা শাসক দলের নিজস্ব বাহিনী রক্ষীবাহিনীকে আত্বীকরণের মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে একটি আধুনিক শক্তিশালী জাতীয় বাহিনী হিশেবে গড়ে তোলেন। ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম নিজে অবসর নিয়ে সেনাপ্রধান জিয়াকে রাষ্ট্রপতির এবং দেশ গড়ার দায়িত্ব প্রদান করেন। এরুপ এক রাজনৈতিক শূন্যতার পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় প্রয়োজনীয়তার অনিবার্যতায় রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণ ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃতে ১৯৭৮ ইং সনের ১লা সেপ্টেম্বর-এ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠিত হয়। এর পূর্বেই প্রেসিডেন্ট জিয়া পরবর্তী এক দলীয় সরকারের সময়ে নিষিদ্ধ ও বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া রাজনৈতিক দলসমূহকে তাদের অস্তিত্ব পুনর্বহাল ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অনুমতি প্রদান করেন। এ সময়ে বাকশাল গঠনের ফলে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগও স্বনামে আত্মপ্রকাশ এবং রাজনৈতিক কার্যকলাপ পরিচালনা শুরু করে। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারী সকল দলের অংশগ্রহণে দেশের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অরজন করে সরকার গঠন করে। এভবে প্রেসিডেন্ট জিয়ার নেতৃতে বিএনপি সরকারের মাধ্যমে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রক প্রতিষ্ঠা ও বিকাশ লাভ করে। জাতীয় সংসদ ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান সমুহ কার্যকর করে দেশে গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠানিকতা দান করা হয়। দেশের সকল সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেয়া হয় এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া সংবাপত্র সমূহ পুনঃ প্রকাশের ব্যবস্থা করা হয়।

কিন্তু সংসদের মেয়াদ দু’বছর পার হতে না হতেই ১৯৮১ সালে ৩০ মে সেনাবাহিনীর কিছু উচ্চাভিলাষী সদস্যের হাতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান শাহাদাত বরণ করেন। এ দুর্যোগেও বিএনপি গণতন্ত্র এবং সংসদকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কার্যক্রম অব্যাহত রাখে এবং নির্বাচনের মাধ্যমে বিচারপতি আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ তৎকালিন সেনাপ্রধান এরশাদ নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করে সামরিক স্বৈরতন্ত্র চালু করেন।

এরপর শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সহধর্মিনী বেগম খালেদা জিয়া বিএনপির হাল ধরেন এবং তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম শুরু করে। সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ নইয় বছরের সংগ্রামে বিএনপিকে অনেক ত্যাগ স্বীকার এবং চড়াই উৎরাই অতিক্রম করতে হয়েছে। আন্দোলনের মাঠ থেকে কোন কোন দল বিশেষ করে আওয়ামী লীগ আন্দোলনের পিঠে চুরিকাঘাত করে সামরিক স্বৈরাশাসকের সাথে হাত মিলিয়ে সামরিক স্বৈরতন্ত্রকে ক্ষমতায় থাকার সুযোগ করে দেয়। বিএনপির নিরলস সংগ্রাম এবং দলনেত্রী বেগম জিয়ার আপোষহীন ভূমিকার ফলে শেষ পর্যন্ত ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে স্বৈরতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং সকল দলের ঐক্যমতে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারী অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে সংসদে সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করে বিএনপি পুনরায় সরকার গঠন করে। এ সংসদ থেকেই সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সকল দলের ঐকমতে সংবিধানে সংসদীয় গণতন্ত্রের বিধান পুনঃঅন্তর্ভূক্ত করা হয়। বিএনপি সরকারের নেতৃতে দেশে পুনরায় সংসদীয় গণতন্ত্র চালু হয়।

১৯৯৪ ইং সনের দিকে এসে আওয়ামী লীগ তাদের মিত্র জামায়াত ও জাতীয় পার্টিকে নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধিনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে দেশে অচলাবস্থার সৃষ্টি করে। তারা বিএনপি সরকারের সমঝোতার প্রস্তাব এবং এমনকি আন্তর্জাতিক সংস্থার মধ্যস্থতা ও সমঝোতার উদ্যোগে সাড়া না দিয়ে সংসদ থেকে পদত্যাগ করে গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ করার চেষ্টা করে। ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদে বিএনপি পুনঃনির্বাচিত হয়ে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে দেশে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংবিধানে অন্তর্ভূক্ত করে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ৭ম এবং ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয় এবং দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ গড়ে উঠে। কিন্তু ৮ম সংসদের মেয়াদের শেষে তৎকালিন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ তুচ্ছ অভিযোগে সারা দেশে ব্যাপক আন্দোলন শুরু করে এবং অনুষ্ঠিতব্য নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে দেশে জরুরী অবস্থা জারিকে আহ্বান ও স্বাগত জানায়। সে জরুরী অবস্থার সরকারের সহযোগিতায় ক্ষমতা গ্রহণ করে আওয়ামী লীগ আদালতের একটি খন্ডিত রায়ের অজুহাত দেখিয়ে সারা দেশবাসীর মতামত এবং প্রতিবাদকে উপেক্ষা করে ২০১১ সালে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানকে বাতিল করে দেশে গণতন্ত্রের পথকে রুদ্ধ করে পুনরায় একদলীয় শাসনের পথ সৃষ্টি করে।

আওয়ামী লীগ সরকারের এ পদক্ষেপের বিরুদ্ধে দেশের সর্বস্তরের জনগণ বিক্ষুব্ধ ও প্রতিবাদ মুখর হয়ে ওঠে। বিএনপি দেশের মানুষকে একদলীয় শাসনের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত রাখতে দেশের মানুষের সাথে একাত্ম হয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে পুনরায় অবর্তীর্ণ হয়েছে। নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান পুর্নবহালের দাবীতে বিএনপি জনগনের সাথে মিলে রাজনীতির লেবাস পরিহিত স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে যাচ্ছে।

সত্তর দশকের শেষাংশে বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান একদলীয় বাকশালী বিধান ভেঙ্গে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আশির দশক জুড়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেন। ১৯৯৬ সালে বেগম জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিধান অন্তর্ভূক্ত করে গণতন্ত্রকে মজবুত ভিত্তি প্রদান করে।

গণতন্ত্রের আপোষহীন নেতা বেগম জিয়ার নেতৃত্বে ২০১১ সাল থেকে পুনরায় বিএনপি একদলীয় স্বৈরাশাসকের হাত থেকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য আন্দোলন করে যাচ্ছে। বিএনপি নিরুপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকবার জনগণের কাছে ফিরিয়ে আনার জন্য এখনো স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছন।