বাংলাদেশ জাতিয়তাবাদী দলের বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

0

জিসাফো ডেস্কঃ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (জন্মঃ ১ আগস্ট, ১৯৪৮) একজন বাংলাদেশি রাজনীতিবিদ। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশের চারবারের সাবেক সরকারি দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) বর্তমান মহাসচিব। এর আগে ২০ই মার্চ ২০১১ সাল থেকে টানা পাঁচ বছর তিনি দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মির্জা ফখরুল মূলত বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছিলেন, যে পদে তিনি দলের ৫ম জাতীয় সম্মেলনে মনোনীত হন। ২০১১ সালের মার্চে দলের মহাসচিব খন্দকার দেলওয়ার হোসেন মৃত্যুবরণ করলে তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হন। মির্জা ফখরুল এর আগে কৃষি, পর্যটন ও বেসরকারী বিমান চলাচল বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।প্রাথমিক জীবন

 
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৯৪৮ সালের ১ আগস্ট তারিখে ঠাকুরগাঁও জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মির্জা রুহুল আমিন একজন সক্রিয় রাজনীতিবিদ ছিলেন, যিনি ঐ অঞ্চলের একজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
 
মির্জা ফখরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে স্নাতক (সন্মান) ডিগ্রী অর্জন করেছেন।
 
ছাত্রজীবনের সক্রিয় রাজনীতির সাথে জড়িত হলেও কর্মজীবনের শুরুতে তিনি শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন ও একাধিক সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেছেন। তিনি ১৯৮০-র দশকে তিনি মূলধারার রাজনীতিতে আসেন। মির্জা ফখরুল ১৯৭০-র দশকের শেষে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস.এ. বারির ব্যাক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, যে পদে তিনি ১৯৮২ সালে এস.এ. বারির পদত্যাগ পর্যন্ত বহাল ছিলেন।
রাজনৈতিক জীবন, ছাত্র রাজনীতি
 
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্রিয় ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (অধুনা বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন) একজন সদস্য ছিলেন এবং সংগঠনটির এস.এম. হল শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময়ে তিনি সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ছিলেন।
শিক্ষকতা ও অন্যান্য সরকারি দায়িত্ব
 
১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে মির্জা ফখরুল অধ্যাপনাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
 
অন্যান্য সরকারি দায়িত্বের মধ্যে মির্জা ফখরুল বাংলাদেশ সরকারের পরিদর্শন ও আয়-ব্যায় পরীক্ষণ অধিদপ্তরে একজন অডিটর হিসেবে কাজ করেছেন।
 
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনের অধীনে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি রাষ্ট্রপতি জিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী এস.এ. বারির একজন ব্যাক্তিগত সচিব ছিলেন, যে পদে তিনি ১৯৮২ সাল পর্যন্ত বহাল ছিলেন। এস.এ. বারি উপ-প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পদত্যাগ করার পর মির্জা ফখরুল তার শিক্ষকতা পেশায় ফিরে যান, এবং ১৯৮৬ পর্যন্ত ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষকতা করেন।
রাজনীতিতে প্রবেশ
 
১৯৮৬ সালে পৌরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে মির্জা ফখরুল তার শিক্ষকতা পেশা থেকে অব্যাহতি নেন এবং সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। তিনি সফল নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে ১৯৮৮ সালের পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নেন এবং ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
 
জেনারেল এরশাদের সামরিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে যখন দেশব্যাপী আন্দোলন চলছে, তখন মির্জা ফখরুল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-তে যোগদান করেন। ১৯৯২ সালে মির্জা ফখরুল ঠাকুরগাঁও বিএনপির সভাপতি মনোনীত হন।
সংসদ নির্বাচন ও মন্ত্রীত্ব
 
মির্জা ফখরুল ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পান। নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগ প্রার্থী খাদেমুল ইসলামের কাছে হেরে যান। ১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি বিএনপির প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ান এবং আবারও আওয়ামী লীগের খাদেমুল ইসলামের কাছে পরাজিত হন। তবে এবারের পরাজয়ের ব্যবধান ছিল সামান্য। খাদেমুল ইসলাম পেয়েছিলেন প্রায় ৫১ শতাংশ ভোট, এবং মির্জা ফখরুল পান ৪৭ শতাংশ।
 
মির্জা ফখরুল ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসনে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে আওয়ামী লীগের রমেশ চন্দ্র সেনের সাথে প্রতিযোগীতা করেন, এবং বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। মির্জা ফখরুল এবার পেয়েছিলেন ১৩৪,৯১০ ভোট, যা রমেশ চন্দ্র সেনের ভোটের চেয়ে ৩৭,৯৬২ বেশি ছিল।
 
২০০১ সালের নভেম্বরে নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার তার মন্ত্রীসভা ঘোষণা করলে মির্জা ফখরুল সেখানে কৃষি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ করেন। পরে মন্ত্রীসভায় পরিবর্তন আনা হলে মির্জা ফখরুল বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর পদ লাভ করেন, যেটিতে তিনি ২০০৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বহাল ছিলেন।
 
মির্জা ফখরুল ২০০৮ সালের ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে আওয়ামী লীগের রমেশ চন্দ্র সেনের কাছে স্বল্প ব্যবধানে পরাজিত হন।
বিএনপির ৫ম জাতীয় সম্মেলন
 
২০০৯ সালের ডিসেম্বরে বিএনপির ৫ম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে বিএনপির যেসব নেতা গুরুত্বপূর্ণ পদ পাবেন বলে আশা করা হয়েছিল, তাদের একজন ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সম্মেলনে মির্জা ফখরুলকে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব পদে মনোনীত করা হয়। এই পদটিতে এর আগে তারেক রহমান বহাল ছিলেন। তারেক রহমান এই সম্মেলনে দলের ভাইস চেয়ারম্যানের পদ লাভ করেন।
 
নতুন পদ পাওয়ার পর মির্জা ফখরুল বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে গভীর ভাবে সক্রিয় হন। তিনি দলের উল্লেখযোগ্য মুখপাত্রে পরিণত হন ও জাতীয় গণমাধ্যমে মুহুর্মুহু বক্তব্য প্রদানের ফলে দেশব্যাপী পরিচিত মুখে পরিণত হন।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব
 
২০১১ সালের মার্চে বিএনপির মহাসচিব খন্দকার দেলওয়ার হোসেন মৃত্যুবরণ করলে চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ঘোষণা করেন। ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর দলের জ্যেষ্ঠ কয়েকজন নেতা এই মনোনয়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেন। কেউ কেউ বলেন বিএনপির সংবিধানে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের কোন বর্ণনা নেই। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া মার্চ ২০১১-র শেষ ভাগে সউদি রাজপরিবারের আমন্ত্রণে সউদি আরব যাবার আগমুহুর্তে মির্জা ফখরুলকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ঘোষণা করে গেলে এই সংক্রান্ত বিভ্রান্তির অবসান ঘটে। সেই থেকে এখন পর্যন্ত মির্জা ফখরুল প্রধান বিরোধী দল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বিরোধী দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালনকালে মির্জা ফখরুল বিভিন্ন ইস্যুতে আওয়ামী লীগ সরকারের কঠোর সমালোচনা করা বজায় রাখেন। তার দায়িত্ব পালনকালে দেশব্যাপী বিএনপির একাধিক বড় মাপের বিক্ষোভ ও আন্দোলন কর্মসূচী অনুষ্ঠিত হয়, যেগুলো অধিকাংশেরই কেন্দ্রে ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবী। উল্লেখ্য আওয়ামী লীগ সরকার সংসদে তাদের দুই-তৃতীয়াংশ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে কাজে লাগিয়ে ২০১১ সালে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে। এই পরিস্থিতি বিএনপি কিছুতেই মেনে নিবে না বলে একাধিকবার ঘোষণা করেছে।২০১১ সালের ২ আগস্ট তারিখে লক্ষ্মীপুর জেলায় মির্জা ফখরুলের গাড়িবহর সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়। হামলার সময়ে তিনি লক্ষ্মীপুর জেলা বিএনপির একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে শহরের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন। হামলাকারীদের শনাক্ত করা না গেলেও মির্জা ফখরুল ও তার সফরসঙ্গীরা দাবী করেন, সন্ত্রাসীরা সকলে ছিল স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা ও কর্মী। হামলার পর মির্জা ফখরুল অক্ষত থাকলেও তাকে বহনকারী গাড়িসহ মোট তিনটি গাড়ি ভাংচুরের শিকার হয় ও বিএনপির ১০ জন নেতাকর্মী হতাহত হন।২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে মির্জা ফখরুল পিলখানায় সেনা কর্মকর্তাদের নির্মম হত্যাকান্ডের ঘটনার জন্য আওয়ামী লীগ সরকারকে দায়ী করে বলেন, এটি ছিল বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার উপর স্থায়ী আঘাত হানবার একটি ষড়যন্ত্র। তিনি এই ঘটনা নিরসনে ও পরবর্তীকালে অপরাধীদের ধরার ক্ষেত্রে যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ সরকার দায়ী করেন
পুর্নাঙ্গ মহাসচিব
তিনি ২০১৬ সালে বিএনপি’র সম্মেলনে পুর্নাঙ্গ মহাসচিব হোন।২০১৭ সালে রাঙ্গুনিয়ায় পাহাড়ী ধসে দূর্গতদের দেখতে যাওয়ার সময় আহত হয়।স্থানীয় আওয়ামীলীগ,যুবলীগ,ছাত্রলীগের জড়িত থাকার প্রমান পাওয়া গেলেও সরকার তাদের গ্রেফতার করেননী।
ব্যাক্তিগত জীবন ও পরিবার
 
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিবাহিত এবং দুই মেয়ের জনক। তার স্ত্রী রাহাত আরা বেগম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছেন ও বর্তমানে ঢাকার একটি বীমা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। তার বড় মেয়ে মির্জা শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে এই প্রতিষ্ঠানেই শিক্ষকতা করেছেন। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় পোস্ট ডক্টরাল ফেলো হিসেবে কর্মরত আছেন। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছেন। তিনি বর্তমানে ঢাকার একটি স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।
 
মির্জা ফখরুলের বাবা মির্জা রুহুল আমিন একজন আইনজীব ছিলেন এবং ঠাকুরগাঁওয়ে স্বাধীনতার আগে ও পরে একাধিক বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। স্বাধীন বাংলাদেশে মির্জা আমিন বিএনপির রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন।
 
মির্জা ফখরুলের চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ একজন বিএনপি নেতা, সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের স্পীকার। মির্জা হাফিজ ১৯৭৮-১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারে ভুমি মন্ত্রী, ১৯৭৯-১৯৮২ সালে বাংলাদেশের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদে স্পীকার এবং ১৯৯১-১৯৯৬ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ম পালন করেন।
 
মির্জা ফখরুলের অপর চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা এপ্রিল ১৯৭১-এ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার, যেটি মুজিবনগর সরকার নামে খ্যাত, এই সরকার কর্তৃক ডাইরেক্টোরেট অফ ইয়ুথ ক্যাম্পের পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন।